Ami Tarashis Bolchi

Ami Tarashis Bolchi
The blog of Tarashis Gangopadhyay (click the photo to reach our website)

Monday, 6 July 2026

Gosaiteertha Shantipur o Babla

  গোঁসাইতীর্থ শান্তিপুর ও বাবলা শ্রীপাট দর্শন ও সাধুসঙ্গ 

তারাশিস গঙ্গোপাধ্যায়

(পূর্ব প্রকাশিতের পর)


আমি বলতে থাকি,

"অবশেষে আকাশগঙ্গা পাহাড়ে দেখা হল তাঁর ইষ্টনির্দিষ্ট গুরু ব্রহ্মানন্দ স্বামীর সাথে। পরমহংসজী নামেই তিনি পরিচিত ছিলেন সাধনমহলে। তিনিই শ্রীবিজয়কৃষ্ণকে দীক্ষা দেন। আর তাঁর কৃপাতেই সিদ্ধিলাভ করেন শ্রীবিজয়কৃষ্ণ। সেই সময় থেকেই ধীরে ধীরে গোস্বামীজী বা গোঁসাইজী নামেই তিনি পরিচিত হয়ে ওঠেন জনমানসে। তখন আকাশগঙ্গা পাহাড়ের একটি গুহাতেই তিনি নিবিষ্ট হয়ে থাকতেন কঠোর সাধনায়।

গোস্বামীজী যোগীদের অলৌকিক শক্তি বা যোগবিভূতিতে বিশ্বাস করতেন না। কিন্তু পরমহংসজীর যৌগিক বিভূতি দেখে তাঁরও প্রত্যয় হল। আর তারপরই তিনি মনোনিবেশ করলেন যোগে। কঠোর সাধনায় লাভ করলেন অষ্টসিদ্ধি।

শ্রীত্রৈলঙ্গস্বামী, শ্রীভোলাগিরি মহারাজ, শ্রীরঘুবরদাস বাবাজী, শ্রীলোকনাথ ব্রহ্মচারী, শ্রীভাষ্করানন্দ, শ্রীবিশুদ্ধানন্দ পরমহংস, শ্রীদ্বারকানাথ বাবাজী প্রভৃতি মহাত্মারা সকলেই ছিলেন তাঁর প্রশংসায় পঞ্চ মুখ। অতএব ধীরে ধীরে তাঁর নাম ছড়িয়ে পড়তে থাকে। শিষ্যভক্তও হয় প্রচুর। মূলতঃ তাঁদের উৎসাহেই গড়ে ওঠে গোস্বামীজীর গেণ্ডারিয়ার আশ্রম। সেই আশ্রমকে কেন্দ্র করে দিকে দিকে শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর মতই অকাতরে প্রেম বিলিয়ে যেতে থাকেন গোস্বামীজী। তাঁর হরিসংকীর্তন ও জীবে প্রেম স্বয়ং শ্রীচৈতন্যের মতই বিরাট আলোড়ন তোলে ভক্তজনমানসে।

বৃন্দাবনে গোস্বামীজীর একটি অপার্থিব অভিজ্ঞতার কথা বলছি। একদিন তিনি গিরি গোবর্দ্ধনে থাকাকালীন সহসা একটি গুহার সামনে একটি কংকালমূর্তিকে দেখতে পেলেন। দীর্ঘ এই কংকালমূর্তির দেহে কোথাও কোন রক্তমাংস নেই; কেবলমাত্র চোখের কোটরে আছে দুটি উজ্জ্বল চোখ ও মুখের মধ্যে জিভমাত্র। গোস্বামীজী কাছে যেতেই কংকালটি তাঁকে ভূমিষ্ঠ হয়ে প্রণাম করলেন এবং বললেন, 'ভগবানের লীলা দর্শন ও হরিনাম করিবার বাসনা এখনও আছে। সেইজন্য চক্ষু ও জিহ্বা রহিয়াছে, ভগবান যশোদানন্দনের কৃপায় অদ্য আমার একটি বাসনা পূর্ণ হইল।' তিনি আরো জানালেন যে তাঁর বয়স চারশো বছরেরও বেশী। তিনি এই বৃন্দাবনে শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু ও শ্রীনিত্যানন্দ প্রভুকেও দর্শন করেছেন। এবার মহাপ্রভুর এই নবতম রূপকেও দর্শন করলেন।

সাধনজগতে কথিত আছে- ভগবানের এক অবতার থেকে আরেক অবতার হওয়া পর্যন্ত পূর্ণ অবতারের একজন করে লীলা পার্ষদ সেই দেহেই বিরাজ করেন। যেমন ত্রেতায় শ্রীরামচন্দ্রের মুখ্য পার্ষদ মহাবীর হনুমানজী শ্রীকৃষ্ণকে দর্শন করেছেন দ্বাপরে, আবার দ্বাপরে শ্রীকৃষ্ণের সখা শ্রীদাম শ্রীচৈতন্যের মরলোকে আগমন পর্যন্ত ভাণ্ডীর বনে একটি গুহায় সমাধিস্থ ছিলেন এবং শ্রীচৈতন্যের আবির্ভাবের পর নবদ্বীপে গিয়ে শ্রীচৈতন্যদেবকে দর্শন করে এসেছেন। তেমনভাবেই এই কংকালরূপী মহাত্মাও শ্রীচৈতন্যদেবের নব কলেবররূপী মহাত্মা শ্রীবিজয়কৃষ্ণ গোস্বামীজীকে দর্শন করলেন। পরবর্তীকালে মহাত্মা অর্জুন দাসও গোস্বামীজীর সম্বন্ধে বলেছেন, 'সাক্ষাৎ শ্রীকৃষ্ণচৈতন্য মহাপ্রভু হ্যায়।'

গোস্বামীজী অনেক তীর্থদর্শনও করেছেন। মূলতঃ কাশী, বৃন্দাবন প্রভৃতি মহাতীর্থে অপার্থিব সব উপলব্ধি অর্জনের পর অবশেষে তিনি আসেন নীলাচলে। দারুব্রহ্ম জগন্নাথদেবকে দর্শনের পর তিনি প্রেমের মোহন আবেশে আবিষ্ট হয়ে যান। তাঁর কীর্তনের মাধ্যমে গৌড়ীয় বৈষ্ণবদের মধ্যে আবার প্রেমভক্তির বান দেখা যায়। কৌপীনধারী, জটাজুটসমন্বিত এই মহাত্মাকে উৎকলবাসীরা 'জটিয়া বাবা' নামে ডাকতে থাকে। ধীরে ধীরে বছর খানেকের মধ্যেই স্থানীয় ভক্তসমাজের মধ্যমণি হয়ে ওঠেন তিনি।

ভক্তজনমানসে গোস্বামীজীর প্রতিপত্তি দেখে স্থানীয় পাণ্ডাগণ এবং কিছু বৈষ্ণব মঠের মোহন্ত ঈর্ষান্বিত হয়ে পড়েন। তারপর তাঁরাই তৎপর হয়ে ওঠেন গোস্বামীজীর প্রাণনাশের জন্য। একদিন ভোরবেলায় গোস্বামীজী অন্য ভক্তদের নিয়ে বসে আছেন ভক্ত নীলমণি বর্মণের বাড়িতে। এমন সময়ে জগন্নাথদেবের প্রসাদী নাড়ুর ঝাঁপি নিয়ে কিছু পাণ্ডা এসে দাঁড়ালেন তাঁর সামনে। বললেন, 'জগন্নাথ মহাপ্রভুর মহাপ্রসাদ এনেছি আপনার জন্য।' তারপর গোস্বামীজীর হাতে তুলে দিলেন সেই নাড়ু। অষ্টসিদ্ধি সম্পন্ন গোস্বামীজী দিব্যদৃষ্টিতে জগন্নাথদেবের কৃপায় স্পষ্ট দেখলেন এতে বিষ মেশানো আছে। কিন্তু গোস্বামীজী তাসত্বেও সেই প্রসাদী নাড়ু ফেলতে পারলেন না। এ যে মহাপ্রসাদ। অতএব জেনে বুঝেও সেই বিষ তিনি খেলেন মহাপ্রসাদের সম্মানরক্ষার জন্য। তারপরই তাঁর শরীরে বিষক্রিয়া শুরু হয়ে যায়। তিনি অচেতন হয়ে পড়েন। চিকিৎসকের চেষ্টায় যদিও বা জ্ঞান ফিরল কিন্তু শরীর বিধবস্ত হয়ে গেল। যে বিষপান করলে মানুষ তৎক্ষণাৎ মারা যায় সেই বিষ তাঁকে মারতে পারল না ঠিকই কিন্তু মাসখানেক ধরে তাঁর শরীরের উপর এই ভয়ংকর বিষের ক্রিয়া চলতে লাগল। দীর্ঘ এক মাস ধরে এই বিষের যন্ত্রণায় জ্বলতে হল তাঁকে।

শোনা যায় - অষ্টসিদ্ধিসম্পন্ন গোস্বামীজী প্রায়ই এই অবস্থায় বিষের দহনজ্বালা থেকে ক্ষণিকের নিস্তারের জন্য স্থূলদেহ ছেড়ে রেখে সূক্ষ্মদেহে ঊর্দ্ধলোকে ভ্রমণ করতেন। কিন্তু তাও তিনি নিজের যোগবিভূতি কখনো ব্যবহার করেননি নিজের যন্ত্রণা নিরাময়ের জন্য। আসলে যোগবিভূতি যে পার্থিব কারণে ব্যয় করতে নেই। এই ঐশ্বর্য্য ধরে রেখে অগ্রসর হতে হয় সাধনপথে। নাহলে শক্তি নাশ হয়ে যায় আর তাতেই ঘটে যোগীর পতন। তাই গোস্বামীজীও এই বিষয়ে সেই সনাতন পন্থাই অনুসরণ করেছেন।

অবশেষে বাংলা ১৩০৬ সালের ২২শে জ্যৈষ্ঠ বিষে জর্জরিত এই স্থূলশরীর ত্যাগ করে গোস্বামীজী চলে যান অমৃতলোকে। কিন্তু তাঁর মহাজীবনী ও মহাবাণী তিনি রেখে গেছেন আমাদের আলোর পথ দেখানোর জন্য। এবার সেই মহাত্মার গৃহদেবতা শ্যামসুন্দরের মন্দিরেই আমরা যাব।"

দেখতে দেখতে আমাদের গাড়ি এসে থামল একটি বড় বাড়ির সামনে। বুঝলাম আমরা এসে গেছি সেই সদাজাগ্রত শ্যামসুন্দরের মন্দিরের সামনে। তাই সানন্দেই আমরা গাড়ি থেকে নামলাম। এক সময়ে এখানে আতাবন ছিল বলে এই বাড়ির নাম আতাবুনিয়া গোঁসাই বাড়ি। গেরুয়া সাদায় মেলানো এই বাড়ির রঙ। বাড়ির সদর দরজা দিয়ে প্রবেশ করলাম ভিতরে। ঢুকতেই সবুজ ঘাসের গালিচা দেয়া আঙিনা। ডানদিকে গেরুয়া রঙের একতলা ঘর, আর সামনে শ্বেতশুভ্র একতলা মন্দির। তবে মন্দিরের উপরে কোন চূড়া নেই- রয়েছে বসতবাড়ির একতলা ছাদ। মন্দিরের বারান্দায় একটি দোলনাও আছে। গর্ভগৃহে শ্রীবিজয়কৃষ্ণ গোস্বামীপ্রভু পুজিত শ্যামসুন্দর ও রাধারাণী বিরাজ করছেন। সানন্দে তাঁদের দর্শন করলাম। আনুমানিক পঞ্চদশ শতাব্দীর মাঝামাঝি বা শেষভাগে বলরাম মিশ্রের চতুর্থ পুত্র শ্রীদেবকীনন্দন গোস্বামী এই শ্রীবিগ্রহ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। শ্যামসুন্দরের কি অপূর্ব রূপ! যে রূপের বাহার একদিন গোস্বামীপ্রভুকে ভুলিয়ে নাস্তির দুনিয়া থেকে অস্তির জগতে নিয়ে এসেছিল সেই রূপ দর্শন করে আমরাও ধন্য হয়ে গেলাম। একপাশে রয়েছে শ্রীবিজয়কৃষ্ণ গোস্বামী প্রভুর বিরাট প্রতিকৃতি আর অন্যপাশে রয়েছে শ্যামসুন্দর ও রাধারাণীর শয্যা। শ্যামসুন্দরের ঠিক পাশে হাসিমুখে উপবিষ্ট ছোট্ট গোপালসোনা। সবাইকেই আমরা জানালাম প্রাণের প্রণতি।


(ক্রমশ)




#spiritual #আধ্যাত্মিক #bijaykrishnogoswami #Gosai #bookstagram #booksbooksbooks

No comments:

Post a Comment