Ami Tarashis Bolchi

Ami Tarashis Bolchi
The blog of Tarashis Gangopadhyay (click the photo to reach our website)

Monday, 15 June 2026

ওঙ্কার সাধনা কিভাবে করতে হয়?

‘ওঁ’কার সাধনা কিভাবে করতে হয়?
 - তারাশিস গঙ্গোপাধ্যায়

আমাদের মধ্যে অনেকেই ‘ওঁ’ জপ করে থাকেন। কিন্তু আপনি কি জানেন, ওঁ জপ করার একটি নির্দিষ্ট সময়, সঠিক দিক এবং সঠিক পদ্ধতি রয়েছে? কখন, কোথায় এবং কোন দিকে মুখ করে ‘ওঁ’ জপ করলে চার গুণ ফল পাওয়া যায়? যার মাধ্যমে এই শক্তিশালী মন্ত্রের চার গুণ শুভ ফল পাওয়া যেতে পারে। এছাড়াও, ওঁ জপ করার সময় এমন ২০টি ভুল আছে, যা কখনোই করা উচিত নয়। জানতে চাইলে পড়ুন এই ধারাবাহিক লেখা।
_________________________

শিষ্য: গুরুদেব, ‘ওঁ’ কে বলা হয় আমাদের সকলের জন্য শক্তির এক বিশাল উৎস। এটা কি সত্যি? ‘ওঁ’-এর বৈজ্ঞানিক দিক কী? এবং ‘ওঁ’-এর জপ আমাদের শরীরের বিভিন্ন অঙ্গ-প্রত্যঙ্গে কীভাবে ইতিবাচক প্রভাব ফেলে?

গুরুদেব: দেখ, ‘ওঁ’ তিনটি অক্ষর নিয়ে গঠিত—অ, উ এবং ম। অ + উ + ম মিলেই ‘ওঁ’ হয়।
‘ওঁ’ কোন মানুষ, কোন ঋষি-মুনি বা কোন দেবতার সৃষ্টি করা মন্ত্র নয়। এই মন্ত্র স্বয়ংপ্রকাশিত। এটি নিজে থেকেই প্রকাশিত হয়েছে।
এই ধ্বনির উৎস হলো অনাহত নাদ। এই অনাহত নাদের উৎপত্তি নাভি থেকে। সেখান থেকেই ওঁ-এর ধ্বনি বেরিয়ে আসে। 

ওঁ হল এক আদিম ও মৌলিক ধ্বনি। এটি উচ্চারণ করার সময়
শরীর ও মস্তিষ্কে এক বিশেষ কম্পনের সৃষ্টি হয়। ‘অ’ ধ্বনি পেট ও বুকে অনুরণন সৃষ্টি করে। ‘উ’ ধ্বনি গলা ও কণ্ঠদেশে পৌঁছয়। আর ‘ম’ ধ্বনি মাথা ও মস্তিষ্কে কম্পন সৃষ্টি করে।

এই কম্পন আমাদের স্নায়ুতন্ত্রকে শান্ত করে। মানসিক চাপ কমায়। তাই ওঁ উচ্চারণ করলে মানসিক শান্তি আসে।
রাগ, বিরক্তি ও অস্থিরতা কমে।
মনোযোগ ও একাগ্রতা বৃদ্ধি পায়।

অনেক বিজ্ঞানীর মতে,
ওঁ ধ্বনির প্রাকৃতিক কম্পাঙ্ক প্রায় ৪৩২ হার্টজ। যা প্রকৃতির নানা স্বাভাবিক শব্দের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। যেমন—
পাখির ডাক, বাতাসের সোঁ সোঁ শব্দ, এবং প্রকৃতির আরও নানা কম্পন।

তাই ওঁ ধ্বনি শুনলে ও উচ্চারণ করলে আমাদের শরীর ও প্রকৃতি যেন একই ছন্দে মিলিত হয়। এর ফলে শরীরের ভারসাম্য বজায় থাকে। মন শান্ত থাকে এবং প্রকৃতির সঙ্গে এক গভীর সংযোগ তৈরি হয়।

হিন্দি বা সংস্কৃতের সমস্ত বর্ণমালার মূল উৎসও এই ওঁ। ক থেকে ক্ষ পর্যন্ত, অ থেকে ঔ পর্যন্ত—সব ধ্বনির মূল উৎস এই ওঁ। কোন ঋষি বা মানুষ এগুলো সৃষ্টি করেননি, এগুলো স্বয়ংপ্রকাশিত।

এ প্রসঙ্গে বলা যায় ভারতে রাধাস্বামী সম্প্রদায় নামে একটি সম্প্রদায় আছে। তাদের প্রধান সাধনাই হলো অনাহত নাদের সাধনা।

শিষ্য : অনাহত নাদের সাধনা বলতে কী বোঝায়?

গুরুদেব : যখন তোমার শরীর সম্পূর্ণ শূন্যতার অবস্থায় স্থির হয়ে যাবে, ইন্দ্রিয়গুলো অন্তর্মুখী হয়ে যাবে, মনও অন্তর্মুখী হয়ে যাবে, আর তোমার চিত্ত সম্পূর্ণ শান্ত হয়ে যাবে -  যাকে বলা হয় ‘কাষ্ঠ-মৌন’ তখন ভিতর থেকে যে নাদ শোনা যায় এ হল অনাহত নাদ।

শিষ্য : এই কাষ্ঠ-মৌন বলতে বোঝায়?

গুরুদেব: যেমন একটি কাঠ কোথাও রেখে দিলে তার নিজের কোন ক্রিয়া থাকে না,
ঠিক তেমনি শরীর, মন ও ইন্দ্রিয় সম্পূর্ণ নিস্তব্ধ ও নিষ্ক্রিয় হয়ে যাবে। কোন চিন্তা থাকবে না। এই অবস্থাকেই কাষ্ঠ-মৌন বলা হয়। তখন নাভির মধ্যে যে ‘ওঁ’-এর ধ্বনি অনবরত ধ্বনিত হচ্ছে, তা নিজের এই কান দিয়েই শোনা যেতে শুরু করবে।
আর এই অবস্থাই ব্রহ্মপ্রাপ্তি। এই অবস্থাই ঈশ্বরপ্রাপ্তি। এই ‘ওঁ’-এর ধ্বনি শুনতে পাওয়াই ঈশ্বরকে উপলব্ধি করা।
এটাই ঈশ্বরের প্রত্যক্ষ বোধ।
এককথায় বলা যায় - যখন মানুষের মন, ইন্দ্রিয় এবং চিত্ত সম্পূর্ণ অন্তর্মুখী হয়ে যায় এবং গভীর নীরব অবস্থায় পৌঁছায়, তখন নাভির সেই ওঁ-ধ্বনি নিজের কানেই শোনা যায়। এটিকেই বলা হয় ঈশ্বর-প্রাপ্তি বা ব্রহ্মজ্ঞান। 

গীতায় একটি শ্লোক আছে—
"এতদ্ দ্বয়মক্ষরং জ্ঞাত্বা ব্রহ্মলোকে মহীয়তে।"
অর্থাৎ, যে এই ‘ওঁ’ শব্দের প্রকৃত জ্ঞান লাভ করে, সে ব্রহ্মকে উপলব্ধি করতে পারে। সে ব্রহ্মের স্বরূপ জানতে পারে। আগেই বলেছি -  আমাদের যত অক্ষর ও যত স্বরচিহ্ন আছে, সবকিছুর উৎপত্তিই এই ‘ওঁ’ থেকে। ‘ওঁ’ অনাহত নাদ থেকে স্বয়ং প্রকাশিত হয়েছে। এবং এই ‘ওঁ’ প্রত্যেক মানুষের মধ্যেই বিদ্যমান। প্রত্যেক নারী ও পুরুষের মধ্যেই এটি রয়েছে।
যে কোন নারী বা পুরুষ যদি ধ্যান ও সাধনার অবস্থায় বসে,
এক-দুই ঘণ্টা নীরব থাকার অভ্যাস করেন, এবং নিজের মন ও ইন্দ্রিয়কে অন্তর্মুখী করার চেষ্টা করেন, তাহলে সাধনার মাধ্যমে তিনি এই ‘ওঁ’-এর ধ্বনি শুনতে পারবেন। ‘ওঁ’-এর ধ্বনি সত্যিই শোনা যায়। তবে এর জন্য কঠোর সাধনার প্রয়োজন।"

শিষ্য: এই ধ্বনি শোনার কোন সহজ উপায় নেই?

গুরুদেব: আরেকটি উপায়ও আছে। বিজয়পুরে রাজা বাবা নামে এক সিদ্ধপুরুষ থাকতেন। শোনা যায়, তিনি নেপালের রাজপরিবারের সদস্য ছিলেন।
ভবঘুরের মতো ঘুরতে ঘুরতে তিনি বিন্ধ্যাচলে এসে পৌঁছেছিলেন। মাত্র ১২-১৩ বছর বয়স থেকেই তিনি সেখানে বহুদিন ছিলেন।
পরে বিজয়পুরের পাহাড়ে নিজের আশ্রম স্থাপন করেন। আজও সেই স্থান ‘রাজা বাবার বাখুলি’ নামে পরিচিত।
রাজা বাবা তাঁর এক বইয়ে লিখেছেন— যদি প্রতিদিন ১২ হাজার বার ‘ওঁ’-এর অজপা জপ করা যায়, এবং টানা এক বছর তা পালন করা যায়,
তাহলে মানুষের হৃদয়ের মধ্যেই ঈশ্বরের দর্শন ঘটে।

শিষ্য: এই অজপা জপ বলতে কি বোঝায়?

গুরুদেব: শ্বাস নেওয়ার সময় মনে মনে ‘ও...’ আর শ্বাস ছাড়ার সময় মনে মনে ‘ম...’ উচ্চারণ। অর্থাৎ— ‘ও... ম...’ ‘ও... ম...’ এইভাবে শ্বাস-প্রশ্বাসের সঙ্গেই জপ চলতে থাকবে। এভাবে প্রতিদিন ১২ হাজার বার জপ করতে হবে। দিনে মাত্র একবার আহার করতে হবে। সেটাও অল্প পরিমাণে। কারও সঙ্গে অপ্রয়োজনীয় মেলামেশা করা যাবে না। নির্জনে থাকতে হবে।
সম্পূর্ণ শুচিতা ও পবিত্রতা বজায় রাখতে হবে। এবং টানা এক বছর এই নিয়ম পালন করতে হবে। তাহলে তাঁর বইয়ের বর্ণনা অনুযায়ী,
মানুষের হৃদয়ের মধ্যেই ঈশ্বরের জ্যোতি প্রকাশিত হবে।

শিষ্য: এখন ১২ হাজার অজপা জপ করতে কত সময় লাগতে পারে?

গুরুদেব: একজন স্বাভাবিক মানুষ গড়ে প্রতি মিনিটে ১৫ বার শ্বাস প্রশ্বাস নেয়। অর্থাৎ এক ঘণ্টায় একজন মানুষের প্রায় ৯০০ বার শ্বাস-প্রশ্বাস হয়।
এর চেয়ে বেশি হলে আয়ু কমে যায়। আর এর চেয়ে কম হলে আয়ু বাড়ে। কারণ শাস্ত্র মতে মানুষের আয়ু শ্বাসের সংখ্যার উপর নির্ভরশীল। তাই আমাদের শাস্ত্রে প্রাণায়ামের উপর এত জোর দেওয়া হয়েছে।

প্রাণায়াম করলে মানুষ দীর্ঘক্ষণ শ্বাস ধরে রাখতে পারে। শ্বাস যত সঞ্চয় হবে, আয়ুও তত বৃদ্ধি পাবে। ৯০০ শ্বাসের হিসাবে যদি ১২,০০০ বার জপের হিসাব করা হয়, তাহলে ১০ ঘণ্টায় প্রায় ৯,০০০ বার সম্পন্ন হবে।
আর বাকি ৩,০০০ বার করতে আরও প্রায় ৪ ঘণ্টা লাগবে।
অর্থাৎ, মোটামুটি ১৪ ঘণ্টার সাধনায় ১২,০০০ বার ওঁ জপ সম্পূর্ণ হতে পারে। যে ব্যক্তি প্রতিদিন ১৪ ঘণ্টা ধরে ওঁ-এর সাধনা করবে, সে যদি এক বছরের মধ্যে ঈশ্বরকে না পায়, তাহলে আর কে পাবে? আমার বিশ্বাস -- অবশ্যই সে ঈশ্বরপ্রাপ্ত হবে। এটাই রাজা বাবার মত।

(চলবে)
(পরের সব অংশ ফেসবুকেনামার প্রোফাইলে পেয়ে যাবেন)

#ওঁকার_সাধনা
#প্রণব_ধ্যান
#অনাহত_নাদের_সন্ধানে
#ওঁকারের_মহাশক্তি
#ব্রহ্মমুহূর্ত_সাধনা
#আত্মজাগরণের_পথে
#অন্তর্নিহিত_দিব্যশক্তি
#spirituality #spiritualawakening

চন্দনের মাহাত্ম্য (দ্বিতীয় পর্ব)

চন্দন শুধু কপালের তিলক নয়—এ এক জীবনদর্শন।

গুরু শেষবারের মতো শিষ্যকে বললেন—
"কপালে চন্দন মাখার আগে হৃদয়টাকে পবিত্র করো। কারণ ঈশ্বর সুগন্ধ নয়, সত্যকে গ্রহণ করেন।"

 শেষ পর্বে উঠে এসেছে—
প্রকৃত তিলকের রহস্য, বাহ্যিক আচার বনাম অন্তরের ধর্ম,  কিভাবে চন্দনের মত মানুষের জীবনও অন্যকে সুগন্ধে ভরিয়ে তুলতে পারে,
 আর সেই শিক্ষা, যা হয়তো আপনার জীবন দেখার দৃষ্টিভঙ্গিই বদলে দেবে।

শেষ পর্যন্ত না পড়লে, চন্দনের প্রকৃত মাহাত্ম্য হয়তো অধরাই থেকে যাবে।
_________________________

গুরু ও শিষ্যের সংলাপ : চন্দনের মাহাত্ম্য (শেষ পর্ব)

তখন গোধূলির সূর্য ধীরে ধীরে পশ্চিমাভিমুখে ঝুঁকছে। আশ্রমের প্রাচীন অশ্বত্থের ছায়ায় গুরুদেব বসে আছেন। চারিদিকে নিস্তব্ধতা, কেবল দূরের মন্দির থেকে ভেসে আসছে ঘণ্টাধ্বনি। শিষ্য নীরবে এসে গুরুদেবের চরণে প্রণাম করে বসল।

কিছুক্ষণ নীরব থেকে শিষ্য মৃদুস্বরে বলল : গুরুদেব,   আপনি চন্দনের আধ্যাত্মিক তাৎপর্য বড় সুন্দর ভাবে বোঝালেন। কিন্তু মানুষের জীবনে তো সংসারও আছে—অভাব, অশান্তি, রোগ, দুঃখ, বিবাদ, উদ্বেগ। অনেকেই বলেন, চন্দনের দ্বারা এই সব দোষও দূর হতে পারে। এই বিশ্বাসের ভিত্তি কী?

গুরুদেব কিছুক্ষণ আকাশের দিকে তাকিয়ে রইলেন। তারপর ধীর কণ্ঠে বলতে শুরু করলেন: বৎস, মনে রেখ, কোনো বস্তু অলৌকিকভাবে মানুষের ভাগ্য পরিবর্তন করে না। কিন্তু কোন কোন বস্তু মানুষের মনে এমন এক শুভ সংস্কার জাগিয়ে তোলে, যা তার জীবনকেই পরিবর্তন করে দেয়। চন্দন তারই একটি উৎকৃষ্ট উদাহরণ।
যে ব্যক্তি প্রতিদিন স্নানশেষে ঈশ্বরস্মরণ করে কপালে চন্দনের তিলক ধারণ করে, সে অন্তত কয়েক মুহূর্ত নিজের মনকে সংযত করে। সেই কয়েক মুহূর্তের সংযমই ধীরে ধীরে তার চরিত্রে রূপ নেয়।

শিষ্য: কিন্তু গুরুদেব, লোকমুখে তো আরও নানা প্রতিকারের কথা শোনা যায়।

গুরু: হ্যাঁ, বহু প্রাচীন আচার-অনুষ্ঠানে নানা প্রতীকী প্রথা রয়েছে। যেমন—কেউ বলেন মঙ্গলবার লাল চন্দন শুভ, কেউ বলেন সোমবার সাদা চন্দন, কেউ আবার বিশেষ পূজায় কেশর-মিশ্রিত চন্দন ব্যবহার করেন। এসবের পেছনে রয়েছে ভক্তি, প্রতীক এবং সংস্কারের ঐতিহ্য। এগুলিকে সেই দৃষ্টিতেই দেখা উচিত।

শিষ্য: তবে কি মানুষের বিশ্বাসও শক্তি সৃষ্টি করে?

গুরুদেব মৃদু হাসলেন। বললেন: অবশ্যই। যদি বিশ্বাস মানুষকে সৎপথে নিয়ে যায়, তবে সেই বিশ্বাসই শক্তি। যদি বিশ্বাস তাকে সত্যবাদী করে, নম্র করে, সংযমী করে, তবে সেই বিশ্বাসই আশীর্বাদ। কিন্তু যদি বিশ্বাস তাকে অন্ধ করে দেয়, কর্মহীন করে দেয়, তবে তা আর ধর্ম নয়—তা কেবল মোহ।

শিষ্য গভীর মনোযোগে শুনছিল। কিছুক্ষণ পরে সে আবার জিজ্ঞাসা করল: গুরুদেব, গৃহে চন্দনের ধূপ জ্বালানোর কথাও তো বহু জায়গায় বলা হয়।

গুরু: সুগন্ধ মানুষের মনের উপর গভীর প্রভাব ফেলে। পরিচ্ছন্ন গৃহ, নির্মল পরিবেশ, প্রদীপের আলো, ধূপের সুগন্ধ—এসব মিলিয়ে মানুষের অন্তরেও শান্তি নেমে আসে। তাই বহু যুগ ধরে পূজায় চন্দন, ধূপ ও দীপের ব্যবহার চলে আসছে।
তবে মনে রেখ, যে ঘরে প্রতিদিন মিথ্যা বলা হয়, যেখানে ক্রোধ, লোভ ও হিংসা বাস করে, সেখানে কেবল ধূপের ধোঁয়ায় শান্তি নেমে আসে না। ঘরের প্রকৃত পবিত্রতা শুরু হয় মানুষের হৃদয় থেকে।

শিষ্য: গুরুদেব, সংসারে সুখ প্রতিষ্ঠার সবচেয়ে বড় উপায় কী?

গুরুদেব শিষ্যের দিকে গভীর দৃষ্টিতে তাকিয়ে বললেন : তিনটি বিষয় কখনো ভুলো না।
প্রথম—ভোজনের আগে ঈশ্বরকে কৃতজ্ঞতা জানাতে। দ্বিতীয়—কথা বলার আগে বিবেচনা করে তবেই বলতে।
তৃতীয়—কর্ম করার আগে বিবেককে অনুসরণ করতে।
যে পরিবারে ঈশ্বরের প্রতি কৃতজ্ঞতা আছে, পরস্পরের প্রতি সম্মান আছে এবং সত্যের প্রতি শ্রদ্ধা আছে, সেখানে মা লক্ষ্মীর আগমন ঠেকানোর ক্ষমতা কারও নেই। চন্দন সেখানে কেবল সেই শুভ পরিবেশের  অগ্রদূতমাত্র।

শিষ্য: গুরুদেব, আজকাল অনেক পিতা-মাতা সন্তানদের জন্য বিপুল সম্পদ সঞ্চয় করেন, কিন্তু তাদের চরিত্র গঠনের দিকে তেমন মনোযোগ দেন না।

গুরুদেবের মুখে এক গম্ভীর ছায়া নেমে এল। তিনি ধীরে ধীরে বললেন: বৎস, সন্তানের জন্য সোনাদানা রেখে যাওয়ার চেয়ে সৎ চরিত্র রেখে যাওয়া অনেক বড় উত্তরাধিকার। বাড়ি, জমি, ধন—এসব একদিন হারিয়েও যেতে পারে। কিন্তু সত্যবাদিতা, নম্রতা, ভক্তি, শৃঙ্খলা ও করুণার শিক্ষা যদি শিশুর হৃদয়ে রোপণ করা যায়, তবে সে পৃথিবীর যেখানেই যাক না কেন, কখনো প্রকৃত অর্থে নিঃস্ব হবে না।

শিশুকে ছোটবেলা থেকেই ঈশ্বরকে প্রণাম করতে শেখাও।
ভোজনের আগে কৃতজ্ঞতা জানাতে শেখাও। অন্যের দুঃখে সহানুভূতি অনুভব করতে শেখাও। নিজের ভুল স্বীকার করতে শেখাও। এই শিক্ষাগুলোই জীবনের প্রকৃত সম্পদ।

জানবে কপালের চন্দন একদিন মুছে যাবে। কিন্তু যদি হৃদয়ে সত্য, করুণা ও ধর্মের চন্দন লেপন করতে পারো, তবে সেই সুগন্ধ মৃত্যুর পরেও মানুষের স্মৃতিতে অম্লান হয়ে থাকবে।”

শিষ্য মৃদুস্বরে বলল: গুরুদেব, এবার আমার শেষ প্রশ্ন।
মানুষের জীবনে সত্যিই সবচেয়ে মূল্যবান চন্দন কোনটি?

গুরুদেবের ঠোঁটে এক অপূর্ব মৃদু হাসি ফুটে উঠল।
তিনি বললেন: বৎস, জঙ্গলে জন্মানো চন্দন মূল্যবান, দেবমন্দিরে নিবেদিত চন্দন আরও পবিত্র; কিন্তু মানুষের অন্তরে যে চন্দন জন্মায়, তার মূল্য সর্বাধিক।

শিষ্য: অন্তরের চন্দন?

গুরু: হ্যাঁ। যে মানুষের হৃদয় শীতল, বাক্য মধুর, চরিত্র নির্মল, আচরণ স্নিগ্ধ এবং অন্যের কল্যাণে সদা নিবেদিত—সেই মানুষই জীবন্ত চন্দন।
চন্দনের গাছ নিজেকে সুগন্ধময় করে না; সে চারপাশকে সুগন্ধে ভরিয়ে তোলে। তেমনি একজন সত্যিকারের সাধক নিজের জন্য বাঁচেন না, অন্যের জীবনেও শান্তির সুবাস ছড়িয়ে দেন।

 মনে রেখ, কপালে তিলক ধারণ করলেই ধর্ম হয় না।
জপমালা হাতে নিলেই ভক্তি আসে না। মন্দিরে গেলেই ঈশ্বরলাভ হয় না। যদি হৃদয়ে অহংকার, ঈর্ষা, বিদ্বেষ ও প্রতারণা লুকিয়ে থাকে, তবে কপালের চন্দন কেবল বাহ্যিক অলঙ্কার মাত্র। আর যদি অন্তর সত্যে, দয়ায় ও প্রেমে পূর্ণ হয়, তবে তিলক না থাকলেও ঈশ্বর সেই হৃদয়ে অধিষ্ঠান করেন।

শিষ্য: গুরুদেব, তবে কি ধর্মের মূল আচার কিছুই নয়?

গুরু: আচার পথ, কিন্তু গন্তব্য নয়। আচার মানুষকে প্রস্তুত করে, শুদ্ধ করে, নিয়মানুবর্তিতা শেখায়। কিন্তু আচারের উদ্দেশ্য হল মানুষের অন্তরে ধর্মকে জাগিয়ে তোলা। যে কেবল আচারে আটকে থাকে, সে বাইরে ঘোরে। যে আচারের অন্তর্নিহিত সত্য উপলব্ধি করে, সে অন্তরে প্রবেশ করে।

কিছুক্ষণ নীরব থেকে গুরুদেব আশ্রমের মন্দিরের দিকে তাকিয়ে বললেন : জানো বৎস, পৃথিবীর সবচেয়ে বড় পূজা কোনটি? ক্ষুধার্তকে অন্ন দেওয়া। ভীত মানুষকে সাহস দেওয়া। অসুস্থের সেবা করা।
অসহায়ের চোখের জল মুছে দেওয়া। এবং নিজের অহংকারকে প্রতিদিন একটু একটু করে বিসর্জন দেওয়া।
এই পূজার চেয়ে বড় পূজা আর নেই।

শিষ্যের চোখ ভিজে উঠল।
সে ধীরে বলল: গুরুদেব, এবার আমি বুঝতে পারলাম কেন চন্দনকে শীতলতার প্রতীক বলা হয়।
গুরুদেব বললেন: ঠিক তাই।
যেখানে ক্রোধ আছে, সেখানে চন্দন হও। যেখানে বিদ্বেষ আছে, সেখানে সুগন্ধ হও।
যেখানে অন্ধকার আছে, সেখানে প্রদীপ হও। যেখানে হিংসা আছে, সেখানে করুণা হও। আর যেখানে অহংকার আছে, সেখানে বিনয় হয়ে দাঁড়াও। এই-ই প্রকৃত তিলক।
এই-ই প্রকৃত পূজা। এই-ই প্রকৃত সাধনা।

এবার গুরুদেব ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়ালেন। তিনি সামনের চন্দনগাছটির কাছে গিয়ে তার কাণ্ডে আলতো করে হাত রাখলেন। তারপর যেন নিজের মনেই উচ্চারণ করলেন,
“চন্দনকে কুঠার কেটে ফেলে, অথচ সেই কুঠারের ফলাতেও চন্দন নিজের সুগন্ধ রেখে যায়।
মানুষের জীবনও তেমনই হওয়া উচিত। যে তোমাকে আঘাত করেছে, তার প্রতি প্রতিশোধ নয়—তাকে নিজের চরিত্রের সুগন্ধ দাও। যে তোমাকে অপমান করেছে, তার প্রতি ঘৃণা নয়—নিজের মহত্ত্ব দাও। যে তোমাকে ভুল বুঝেছে, তাকে ক্রোধ নয়—নিজের সত্য দাও।
কারণ সুগন্ধ কখনো যুদ্ধ করে না, সে নিঃশব্দে চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে।”

চাঁদের আলো তখন আরও উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে। দূরের বাতাসে যেন সত্যিই চন্দনের মৃদু সুবাস ভেসে আসছে।

শিষ্য গুরুদেবের চরণে সম্পূর্ণ দেহ সমর্পণ করে প্রণাম করল।
তার মনে হল—আজ সে শুধু চন্দনের তত্ত্ব শেখে নি; আজ সে শিখেছে মানুষ হওয়ার বিদ্যা।

আর গুরুদেবের কণ্ঠে ধীরে ধীরে শেষ বাণী ধ্বনিত হল,
“বৎস, প্রতিদিন কপালে চন্দন ধারণ করার আগে একবার নিজের হৃদয়ে তাকিয়ে দেখো।
যদি সেখানে সত্য থাকে, তবে তিলক পূর্ণ। যদি সেখানে দয়া থাকে, তবে পূজা সম্পূর্ণ।
যদি সেখানে প্রেম থাকে, তবে ঈশ্বর ইতিমধ্যেই তোমার মধ্যে অধিষ্ঠিত।”

এরপর আশ্রম আবার নীরব হয়ে গেল। শুধু পূর্ণিমার আলোয়, প্রাচীন চন্দনবৃক্ষটি যেন যুগযুগান্তরের সাক্ষী হয়ে নীরবে দাঁড়িয়ে রইল—নিজের জন্য নয়, চারদিকে অনন্ত সুগন্ধ বিলিয়ে।

#Chandan #SanatanDharma #Mahadev #HarHarMahadev #SpiritualWisdom #HinduCulture #Bhakti #SpiritualJourney

চন্দনের মাহাত্ম্য (প্রথম পর্ব)

চন্দনের গন্ধ শুধু শরীরকে শীতল করে না… বদলে দিতে পারে মানুষের অন্তরও।
এক নির্জন আশ্রমে এক শিষ্যের একটি মাত্র প্রশ্ন—
“গুরুদেব, চন্দনের প্রকৃত মাহাত্ম্য কী?”
তারপর শুরু হয় এমন এক কথোপকথন, যেখানে উঠে আসে— চন্দনের শাস্ত্রীয় রহস্য,  তৃতীয় নয়নের প্রকৃত অর্থ,  আজ্ঞা চক্রের গভীর তাৎপর্য,
কেন দেবতার অঙ্গে চন্দন নিবেদন করা হয়, আর কেন চন্দনের মতো মানুষ হওয়াই জীবনের সর্বশ্রেষ্ঠ সাধনা।
______________________

চন্দনের মাহাত্ম্য (প্রথম পর্ব)

সন্ধ্যার নরম আলো ক্রমশ আশ্রমের বটগাছের পাতায় পাতায় মিশে যাচ্ছে। দূরে ধূপের সুগন্ধ, মন্দিরের ঘণ্টাধ্বনি আর বেদপাঠের ক্ষীণ ধ্বনি পরিবেশকে এক অপার্থিব প্রশান্তিতে ভরিয়ে তুলেছে। সেই সময় শিষ্য গুরুদেবের চরণে প্রণাম করে নতস্বরে প্রশ্ন করল।

শিষ্য: গুরুদেব, বহুদিন ধরে আমার মনে একটি প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে। আমরা প্রতিদিন পূজায় চন্দন ব্যবহার করি, দেবমূর্তিতে চন্দন নিবেদন করি, কপালে চন্দনের তিলক ধারণ করি। কিন্তু এর প্রকৃত মাহাত্ম্য কী?

গুরুদেব স্নিগ্ধ হেসে শিষ্যের মাথায় হাত রাখলেন। তারপর বললেন: বৎস, চন্দন কেবল একটি সুগন্ধি কাঠ নয়। এটি শীতলতার প্রতীক, পবিত্রতার প্রতীক, আবার আত্মসংযম ও ঈশ্বরস্মরণেরও প্রতীক।

সনাতন ধর্মে যখনই কোনো পূজা বা যজ্ঞ শুরু হয়,  মন্ত্রোচ্চারণের মাধ্যমে বলা হয় যে চন্দন পবিত্রকারী, পাপ নাশকারী এবং লক্ষ্মীর কৃপা আনয়নকারী। এরপর হাতে রক্ষাসূত্র বাঁধা হয় এবং তারপর পূজার মূল প্রক্রিয়া শুরু হয়। চন্দন মানুষের উপর অশুভ শক্তির প্রভাব দূর করে এবং রক্ষাসূত্র দশ দিক থেকে সুরক্ষা দেয়—এমন বিশ্বাস রয়েছে। তাই সনাতন ধর্মে পূজার সূচনাতেই এই আচার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মন্দিরে ধূপ, দীপ ও সুগন্ধি দ্রব্য ব্যবহারের ফলে পরিবেশে এক পবিত্র ও শান্ত আবহ সৃষ্টি হয়। এর ফলে মন ভালো থাকে এবং নেতিবাচক চিন্তা দূরে থাকে—এমন ধারণা প্রচলিত। 

 মহামৃত্যুঞ্জয় মন্ত্রে একটি শব্দ আছে—"সুগন্ধিম্ পুষ্টিবর্ধনম্"। অর্থাৎ সুগন্ধ এমন এক শক্তি, যা পুষ্টি ও বিকাশ ঘটায়। চন্দনের মধ্যেও সেই সুগন্ধ বিদ্যমান। কারণ, মানুষের বাহ্যিক পরিচ্ছন্নতার পাশাপাশি অন্তরের পবিত্রতার কথাও শাস্ত্র স্মরণ করিয়ে দেয়। তাই আচমন ও প্রাণায়ামের পর যখন যজমানকে পবিত্র করা হয়, তখন কপালে চন্দনের তিলক পরানো হয়।

শিষ্য: গুরুদেব, শুধু একটি তিলকই কি এত বড় তাৎপর্য বহন করে?

গুরু: অবশ্যই। শাস্ত্রে বলা হয়েছে, চন্দন পাপক্ষয়কারী, মনকে নির্মলকারী এবং শুভশক্তির আহ্বানকারী। চন্দন ব্যবহারে মস্তিষ্ক ও চোখের শক্তি বৃদ্ধি পায়—এমন বিশ্বাস রয়েছে। চন্দনের সুগন্ধ মানসিক চাপ, উদ্বেগ এবং হরমোনের ভারসাম্য রক্ষায় সহায়ক বলে অনেকে মনে করেন। কপালে চন্দনের তিলক লাগালে মন শান্ত থাকে এবং শীতল অনুভূতি হয়। এর ফলে মানসিক ক্লান্তি কমে এবং মাথাব্যথাও হ্রাস পেতে পারে। তাই চন্দন অত্যন্ত উপকারী বস্তু। চন্দনের তিলক কেবল কপালে একটুকরো চিহ্ন নয়—এ যেন নিজের চিত্তকে ঈশ্বরের শরণে সমর্পণের এক নীরব অঙ্গীকার।

শিষ্য: গুরুদেব, মলয়গিরির চন্দনের কথা প্রায়ই শুনি। তার কি আলাদা মাহাত্ম্য আছে?

গুরু: মলয়গিরির চন্দনকে বহু প্রাচীনকাল থেকেই সর্বোৎকৃষ্ট বলে মানা হয়েছে। তার সুগন্ধ গভীর, তার প্রকৃতি অত্যন্ত শীতল। বর্তমানে এর দাম অত্যন্ত বেশি এবং বাজারে নকল চন্দনের ব্যবসাও প্রচুর চলছে। তবে যদি খাঁটি চন্দনের সঙ্গে কেশর মিশিয়ে দেবতাদের নিবেদন করা হয় এবং পরে প্রসাদ হিসেবে গ্রহণ করা হয়, তবে তা অত্যন্ত শুভ বলে ধরা হয়।

তাই প্রাচীন কবিরা বলেছেন—
"চন্দন বিষ ব্যাপত নহি, লিপটে রহত ভুজঙ্গ।"অর্থাৎ বিষধর সাপ চন্দনগাছে জড়িয়ে থাকলেও চন্দন নিজের স্বভাব হারায় না। এ শুধু গাছের কথা নয়, মানুষের জীবনেও এক গভীর শিক্ষা—অশুভের সংস্পর্শে এসেও যে নিজের শুভ গুণ অটুট রাখতে পারে, সেই প্রকৃত চন্দনের মত।

শিষ্য: গুরুদেব, দেবতা ও মানুষের ব্যবহৃত চন্দনের মধ্যেও কি কোন পার্থক্য আছে?

গুরু: পুরাণে এমন উল্লেখ পাওয়া যায়। দেবতাদের নিবেদিত চন্দনকে হরিচন্দন এবং মানুষের ব্যবহৃত চন্দনকে শ্রীচন্দন বলা হয়েছে। আবার সংস্কৃত ভাষায় চন্দনের আর-এক নাম ‘শ্রীখণ্ড’।

শিষ্য: কপালে চন্দন ধারণের বিশেষ কারণ কী?

গুরু: যেখানে মানুষ তিলক ধারণ করে, যোগশাস্ত্রে সেই স্থানকেই আজ্ঞা চক্র বলা হয়। এটি জ্ঞান, বিবেক ও অন্তর্দৃষ্টির প্রতীক। তাই বহু সাধক বিশ্বাস করেন, এই স্থানে চন্দন ধারণ করলে মন শান্ত হয়, চিন্তা নির্মল হয় এবং ঈশ্বরচিন্তার প্রতি মন স্বাভাবিকভাবেই আকৃষ্ট হয়।

শিষ্য: তাহলে কি সব সম্প্রদায়ের মানুষেরই চন্দন ধারণ করা উচিত?

গুরু: প্রাচীন সনাতন প্রথায় বলা হয়েছে, ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয় ও বৈশ্য—এই তিন জাতির মানুষের কপালে তিলক থাকা উচিত। যে যেমন সম্প্রদায়ের, সে তেমন রীতিতে তিলক ধারণ করবে। বৈষ্ণব হলে ঊর্ধ্বপুণ্ড্র, শৈব হলে ত্রিপুণ্ড্র এবং শাক্ত হলে নিজ নিজ প্রথা অনুযায়ী তিলক ধারণ করা উচিত। তাই বৈষ্ণব, শৈব, শাক্ত—সকলেই নিজ নিজ আচার অনুযায়ী তিলক ধারণ করেন। উদ্দেশ্য একটাই—নিজেকে সর্বদা ঈশ্বরস্মরণে স্থিত রাখা।

শিষ্য: ভস্মের কথাও তো শুনেছি, গুরুদেব।

গুরু: হ্যাঁ। শৈব সাধনায় ভস্মের বিশেষ মাহাত্ম্য আছে।ঐতিহ্যগত পদ্ধতিতে গোময় থেকে বিশেষ প্রক্রিয়ায় ভস্ম প্রস্তুত করা হয় এবং তাতে সুগন্ধি মেশানো হয়। এই ভস্মই ভগবান শিবের অঙ্গে লেপন করা হয় এবং শিবলিঙ্গেও নিবেদন করা হয়। উজ্জয়িনীর মহাকালেশ্বর মন্দিরের বিখ্যাত ভস্ম আরতিতেও ভস্মের বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। এর মধ্যেও রয়েছে অনিত্য জগতের শিক্ষা—একদিন সবই ভস্মে পরিণত হবে, তাই অহংকার নয়, ভক্তিই মানুষের প্রকৃত অলঙ্কার।

শিষ্য: গুরুদেব, আপনি আজ্ঞা চক্রের কথা বললেন। অনেকে বলেন, চন্দন ধারণ করলে তৃতীয় নয়ন জাগ্রত হয়। এর অর্থ কী?

গুরুদেব কিছুক্ষণ নীরব রইলেন। তারপর শান্ত কণ্ঠে বললেন গুরু: বৎস, তৃতীয় নয়নকে অনেকে ভুল বোঝে। 
এটি কোনো সাধারণ চোখ নয়, আবার অলৌকিক প্রদর্শনের বিষয়ও নয়। এর প্রকৃত অর্থ অন্তর্দৃষ্টি—যে দৃষ্টি বাহ্য জগতের আড়ালে সত্যকে উপলব্ধি করতে শেখায়।

যেখানে ভগবান শিবের তৃতীয় নেত্রের প্রতীক ধরা হয়, সেই স্থানেই কপালে চন্দন ধারণ করা হয়। নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সকলেই সেই স্থানে চন্দন ধারণ করতে পারেন। এই স্থানকে অধ্যাত্ম জগতে আজ্ঞা চক্রের প্রতীক হিসেবে মানা হয় এবং এটিকে অন্তর্দৃষ্টি ও আধ্যাত্মিক জ্ঞানের কেন্দ্র বলে বিবেচনা করা হয়। যোগসাধনায় অনেকেই এই আজ্ঞা চক্র জাগ্রত করার চেষ্টা করেন এবং এর সঙ্গে গভীর আধ্যাত্মিক সাধনার সম্পর্ক রয়েছে।

 অনেকেই মনে করেন শিবের তৃতীয় নয়ন মানেই রুদ্ররূপ বা ধ্বংসের প্রতীক। কিন্তু এর আরও গভীর একটি অর্থ রয়েছে। তৃতীয় নয়ন বলতে বোঝায় এমন এক অন্তর্দৃষ্টি, যার মাধ্যমে অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যতের সূক্ষ্ম উপলব্ধি লাভ করা যায়। এই অন্তর্দৃষ্টিকেই প্রাচীন সাধকেরা ‘অন্তর্চক্ষু’ বলে অভিহিত করেছেন।

অন্তর্চক্ষুর অর্থ হল দিব্যজ্ঞান দ্বারা সত্যকে উপলব্ধি করা। বাহ্যিক চোখে যা দেখা যায় না, অন্তরের জ্ঞান সেই অদৃশ্য সত্যকেও অনুভব করতে পারে।

যখন কোন সাধক গভীর সাধনায় প্রবৃত্ত হন, তখন তাঁর অন্যতম লক্ষ্য থাকে আজ্ঞা চক্রকে জাগ্রত করা। এই আজ্ঞা চক্র সেই স্থানেই অবস্থিত, যেখানে নারীরা টিপ পরেন এবং পুরুষেরা চন্দনের তিলক ধারণ করেন।

যোগশাস্ত্রে বলা হয়েছে, এই আজ্ঞা চক্রের দ্বিদল পদ্মে শিবের ধ্যান করা হয়। এটি কেবল শরীরের একটি স্থান নয়, বরং চেতনার এক উচ্চতর স্তরের প্রতীক।

কুণ্ডলিনী শক্তি যখন আজ্ঞা চক্রে পৌঁছয়, তখন সেই অবস্থাকে অত্যন্ত সূক্ষ্ম ও গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হয়। তাই এই সাধনায় সামান্য অসাবধানতাও বিপজ্জনক হতে পারে বলে বহু আধ্যাত্মিক ধারায় সতর্ক করা হয়েছে। সেই কারণেই প্রকৃত গুরুর দীক্ষা ও তত্ত্বাবধানকে অপরিহার্য বলে গণ্য করা হয়।

একজন সিদ্ধ গুরু প্রয়োজনে বিশুদ্ধ চক্র থেকে সেই শক্তিকে সহস্রার পর্যন্ত পরিচালিত করতে পারেন বলে যোগশাস্ত্রে বর্ণনা রয়েছে।

সনাতন দর্শনের একটি ব্যাখ্যা অনুযায়ী, কুণ্ডলিনী শক্তির অবস্থান দুই স্তরে কল্পনা করা হয়। একটি মূলাধার চক্রে এবং অন্যটি সহস্রারে। এই শক্তিকে ত্রিবলয়াকারে কুণ্ডলী পাকানো সাপের প্রতীক হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়।

মূলাধারে অবস্থিত কুণ্ডলিনীর মুখ নিম্নদিকে এবং সহস্রারের শক্তি ঊর্ধ্বমুখী—এমন প্রতীকী বর্ণনাও বহু প্রাচীন গ্রন্থে পাওয়া যায়।

কুণ্ডলিনী জাগরণের সময় শক্তির প্রবাহ অত্যন্ত দ্রুত ও শক্তিশালী বলে বিবেচিত হয়। যদি সুষুম্না নাড়ি জাগ্রত না থাকে এবং সেই শক্তি ইড়া বা পিঙ্গলা নাড়ির পথে প্রবাহিত হয়, তবে আধ্যাত্মিক ভারসাম্য নষ্ট হতে পারে—এমন বিশ্বাস যোগতত্ত্বে প্রচলিত রয়েছে।
আবার এমনও বলা হয়, যদি কুণ্ডলিনী মূলাধারেই আবদ্ধ থেকে যায় এবং ঊর্ধ্বগামী না হয়, তবে মানুষের চেতনা নিম্ন প্রবৃত্তির দিকে আকৃষ্ট হতে পারে এবং আধ্যাত্মিক উন্নতির পথ বাধাগ্রস্ত হতে পারে।

তাই সুষুম্না নাড়ি জাগ্রত হয়েছে কি না, কুণ্ডলিনী সাধনার উপযুক্ত সময় এসেছে কি না—এসব নির্ণয় কেবলমাত্র একজন যোগসিদ্ধ ও অভিজ্ঞ গুরুই করতে পারেন।

যেমন ‘রাম’ নামটি উচ্চারণ করে দেখ। ‘রা’ ধ্বনিতে মুখ উন্মুক্ত থাকে এবং শব্দ উপরের দিকে অনুরণিত হয়। ‘ম’ উচ্চারণের সময় ঠোঁট বন্ধ হয়ে যায় এবং শরীরের ভিতরে এক সূক্ষ্ম কম্পনের অনুভূতি জাগে। এই ধ্বনির মধ্যেও যোগতত্ত্বের এক গভীর আধ্যাত্মিক তাৎপর্য নিহিত রয়েছে।

তাই দেখা যাচ্ছে যে কপালে চন্দনের তিলক ধারণ শুধুমাত্র একটি ধর্মীয় চিহ্ন নয়। এটি আজ্ঞা চক্র, অন্তর্দৃষ্টি, আত্মসংযম এবং ঈশ্বরস্মরণের এক পবিত্র প্রতীক। তবে মনে রেখ, প্রকৃত জাগরণ কখনো বাহ্যিক চিহ্নে নয়—তা ঘটে মানুষের অন্তরের পবিত্রতা, সাধনা এবং সত্য উপলব্ধির মধ্য দিয়ে। মানুষ যখন নিজের মনকে শুদ্ধ করে, ইন্দ্রিয়কে সংযত করে এবং ঈশ্বরচিন্তায় নিমগ্ন হয়, তখন তার অন্তরে সেই জ্ঞানের আলো জ্বলতে শুরু করে।

শিষ্য: তাহলে সাধকরা কেন আজ্ঞা চক্র জাগ্রত করার কথা বলেন?

গুরু: যোগশাস্ত্রে মানুষের শরীরে বিভিন্ন চক্রের কথা বলা হয়েছে। তাদের মধ্যে আজ্ঞা চক্র বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। বহু সাধক ধ্যানের মাধ্যমে এই চেতনার বিকাশের চেষ্টা করেন। তবে এ পথ অত্যন্ত গুরুগম্ভীর। কেবল বই পড়ে বা কৌতূহলবশত এ পথে প্রবেশ করা উচিত নয়।

শিষ্য: কেন গুরুদেব?

গুরু: কারণ আধ্যাত্মিক সাধনা কখনো খেলার বিষয় নয়। একজন যোগ্য ও অভিজ্ঞ গুরুর নির্দেশ ছাড়া গভীর সাধনায় প্রবেশ করলে মানসিক ও শারীরিক উভয় বিপর্যয় ঘটতে পারে। তাই শাস্ত্র সর্বদা গুরু-পরম্পরার উপর গুরুত্ব দিয়েছে।

শিষ্য: গুরুদেব, চন্দনের তিলক ধারণের বাস্তব উপকারিতা কী?

গুরু: চন্দন স্বভাবতই শীতল। তাই কপালে চন্দনের প্রলেপ দিলে প্রশান্তির অনুভূতি হয়। এর সুগন্ধ মনকে শান্ত করে, উদ্বেগ কমাতে সাহায্য করে এবং ধ্যান বা প্রার্থনার পরিবেশকে আরও একাগ্র করে তোলে। অনেক আয়ুর্বেদীয় গ্রন্থে চন্দনের শীতল ও প্রশমক গুণের উল্লেখ রয়েছে। যদিও নানা অলৌকিক দাবি করা হয়, সেগুলির সবকটির বৈজ্ঞানিক প্রমাণ সমানভাবে প্রতিষ্ঠিত নয়। তাই বিশ্বাস ও চিকিৎসাবিজ্ঞানের ক্ষেত্রকে আলাদা করে বোঝা উচিত।

শিষ্য: গুরুদেব, বিভিন্ন দেবতার পূজায় কি বিভিন্ন রঙের চন্দন ব্যবহৃত হয়?

গুরু: হ্যাঁ, বহু প্রাচীন আচারেই এমন রীতি দেখা যায়। ভগবান বিষ্ণু ও তাঁর অবতারদের পূজায় সাধারণত সাদা বা হলুদ চন্দন ব্যবহৃত হয়।

দেবী দুর্গার উপাসনায় লাল চন্দনের বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে।

সরস্বতী, লক্ষ্মী ও গায়ত্রী মন্ত্রের জপে সাদা চন্দনের মালা ব্যবহারকেও বহু আচার্য শুভ বলে বর্ণনা করেছেন। শিবের পূজায় চন্দনের পাশাপাশি ভস্মেরও বিশেষ মাহাত্ম্য রয়েছে।

শিষ্য: গুরুদেব, অনেকে বলেন চন্দন ঘরে শুভশক্তি নিয়ে আসে।

গুরু: দেখ, যেখানে পরিচ্ছন্নতা, সুগন্ধ, ভক্তি ও নিয়মিত উপাসনা থাকে, সেখানে মানুষের মনও শান্ত থাকে। চন্দনের সুগন্ধ সেই পরিবেশকে আরও পবিত্র ও স্নিগ্ধ করে তোলে। তাই বহু পরিবারে আজও পূজার সময় চন্দনের ধূপ, তিলক বা প্রলেপের ব্যবহার চলে আসছে।

তবে মনে রেখ, শুভশক্তির সবচেয়ে বড় উৎস কোন বস্তু নয়—মানুষের নির্মল মন, সৎকর্ম এবং ঈশ্বরের প্রতি আন্তরিক ভক্তি।

শিষ্য: গুরুদেব, লোকমুখে তো আরও নানা কথা শোনা যায়—চন্দন নাকি গ্রহদোষ দূর করে, সংসারের অশান্তি কমায়, ধন-সম্পদ বৃদ্ধি করে। এই কথাগুলোর মধ্যে কতখানি সত্য?

গুরু: বৎস, মানুষের বিশ্বাস, শাস্ত্রের ব্যাখ্যা এবং বাস্তব অভিজ্ঞতা—এই তিনকে কখনো এক করে ফেলবে না।

চন্দনের কিছু গুণ প্রকৃতিগত—তার শীতলতা, তার সুগন্ধ, তার স্নিগ্ধতা। আবার কিছু বিষয় আছে, যা যুগ যুগ ধরে ধর্মীয় আচার, লোকবিশ্বাস ও জ্যোতিষশাস্ত্রের সঙ্গে জড়িয়ে এসেছে। সেই বিশ্বাসকে সম্মান করা যায়, কিন্তু অন্ধভাবে গ্রহণ করা উচিত নয়।

শিষ্য: তাহলে শাস্ত্রে চন্দনের ব্যবহার কেন এত বেশি?

গুরু: কারণ চন্দন মানুষের মনকে ঈশ্বরমুখী করে। যখন তুমি নিজের হাতে চন্দন ঘষো, তখন তোমার মধ্যে ধৈর্য জন্মায়। যখন দেবতার শ্রীঅঙ্গে তা নিবেদন করো, তখন অহংকার কমে। যখন নিজের কপালে তিলক পর, তখন মনে পড়ে—আমি শুধু দেহ নই, আমি চৈতন্যের সন্তান। এই স্মরণই মানুষের সবচেয়ে বড় আশীর্বাদ।

 জ্যোতিষশাস্ত্রে অনেকেই মনে করেন, বিভিন্ন গ্রহের সঙ্গে বিভিন্ন উপাদানের এক প্রতীকী সম্পর্ক রয়েছে। সেই কারণেই কোথাও লাল চন্দন, কোথাও সাদা চন্দন, কোথাও আবার কেশর মিশ্রিত চন্দনের ব্যবহার দেখা যায়। কিন্তু মনে রেখ—কোনো বস্তুই মানুষের কর্মের বিকল্প হতে পারে না।

শিষ্য: অর্থাৎ শুধু চন্দন ব্যবহার করলেই ভাগ্য বদলে যাবে—এমন কথা বলা ঠিক নয়?

গুরুদেব স্নিগ্ধ হাসলেন।
গুরু: যদি তাই হত, তবে চন্দনের বনে জন্মানো প্রতিটি মানুষই মহাপুরুষ হয়ে উঠত।
ভাগ্য পরিবর্তনের মূল ভিত্তি তিনটি—সৎকর্ম, সৎচিন্তা এবং ঈশ্বরের প্রতি আন্তরিক সমর্পণ। চন্দন সেই সাধনার একটি পবিত্র সহায়ক মাত্র।

শিষ্য: গুরুদেব, অনেকেই বলেন ঘরে প্রতিদিন চন্দনের ধূপ জ্বালালে অশুভ শক্তি দূরে থাকে।

গুরু: ধূপের সুগন্ধ পরিবেশকে নির্মল ও মনোরম করে। পরিচ্ছন্ন গৃহ, সুগন্ধময় পরিবেশ এবং নিয়মিত প্রার্থনা মানুষের মনে ইতিবাচক প্রভাব ফেলে। সেই কারণেই বহু প্রাচীনকাল থেকে ধূপ, দীপ ও চন্দনের ব্যবহার চলে আসছে।

কিন্তু যদি ঘরে মিথ্যা, লোভ, হিংসা ও অহংকার বাস করে, তবে কেবল সুগন্ধ দিয়ে সেই অশুভ শক্তিকে দূর করা যায় না।

শিষ্য: গুরুদেব, তাহলে প্রকৃত শুভশক্তি কোথায়?

গুরুদেব দূরের অস্তমিত সূর্যের  দিকে তাকিয়ে দিলেন উত্তর: যেখানে সত্য আছে, সেখানেই শুভশক্তি। যেখানে করুণা আছে, সেখানেই দেবত্ব।
যেখানে ক্ষমা আছে, সেখানেই লক্ষ্মীর বাস। আর যেখানে মানুষের হৃদয় চন্দনের মত শীতল ও সুগন্ধময়, সেখানে ঈশ্বর স্বয়ং অবস্থান করেন।

শিষ্যের চোখে এক অদ্ভুত আলো ফুটে উঠল। সে অনুভব করল—এতদিন সে চন্দনের গন্ধ চিনত, আজ সে চন্দনের দর্শন উপলব্ধি করতে শুরু করেছে।
গুরুদেব এবার আসন ত্যাগ করে আশ্রমের প্রাচীন চন্দনগাছটির দিকে এগিয়ে গেলেন। গাছের কাণ্ডে স্নেহভরে হাত রেখে তিনি শিষ্যকে বললেন, “বৎস, চন্দনের সবচেয়ে বড় শিক্ষা জানো কী?
কুঠারের আঘাতে যে তাকে কেটে ফেলে, সেই কুঠারের ফলাকেও সে নিজের সুগন্ধে ভরিয়ে দেয়।

এই পৃথিবীতে তুমিও তেমন মানুষ হও। যে তোমায় আঘাত করবে, তার প্রতিও বিদ্বেষ নয়—নিজের চরিত্রের সুগন্ধই দান করবে। সেই দিনই বুঝবে, চন্দনের প্রকৃত তিলক কপালে নয়, মানুষের অন্তরে ধারণ করতে হয়।”

শিষ্য গভীর শ্রদ্ধায় গুরুদেবের দিকে তাকিয়ে রইল। সন্ধ্যার বাতাসে চন্দনের সুগন্ধ আরও যেন স্পষ্ট হয়ে উঠল। তার মনে হলো—আজ সে কেবল চন্দনের কথা শুনল না, নিজের অন্তরের শুদ্ধতার পথেরও পাঠ গ্রহণ করছে।

(আগামী সংখ্যায় শেষ)

(এরকমভাবে প্রশ্নোত্তরের মাধ্যমে আধ্যাত্মিক জগতের বিশেষ সকল তত্ত্ব ও তথ্য  আরো বেশী ভালোভাবে জানতে পড়ুন লেখকের অনন্তের জিজ্ঞাসা ৫ খণ্ড। Whatsapp করুন জয় মা তারা পাবলিশার্স 9153391909)

#Chandan #ChandanMahatmya #SanatanDharma #Hinduism #Spirituality #Mahadev #Bhakti #harharmahadev

Sunday, 14 June 2026

পুরুষোত্তম মাসের শেষ অমাবস্যা: আমাদের কি করা উচিৎ?

পুরুষোত্তম মাসের শেষ অমাবস্যা: আমাদের কি করা উচিৎ?

আগামীকাল সোমবার পুরুষোত্তম মাসের শেষ অমাবস্যা পড়েছে। এই অমাবস্যা বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ, কারণ এটি তিন বছর অন্তর আগত পুরুষোত্তম মাসের অমাবস্যা এবং সোমবারে পড়ায় একে সোমবতী অমাবস্যাও বলা হয়। এই তিথিতে পূর্বপুরুষদের আশীর্বাদ লাভের বিশেষ সুযোগ রয়েছে।
    হিন্দু ধর্মে প্রতিটি তিথি ও প্রতিটি দিন কোনো না কোনো দেবদেবীর উদ্দেশে নিবেদিত। অমাবস্যা তিথির অধিষ্ঠাতা হলেন পিতৃদেবতা। তাই এই দিনটি পিতৃস্মরণ, পিতৃপূজা ও পিতৃতর্পণের জন্য অত্যন্ত শুভ বলে বিবেচিত।
     শাস্ত্রমতে, যদি পূর্বপুরুষরা সন্তুষ্ট না হন, তবে জীবনের বহু ক্ষেত্রে বাধা সৃষ্টি হতে পারে। তাই অমাবস্যার দিনে তাঁদের স্মরণ করা, আশীর্বাদ প্রার্থনা করা, দান-পুণ্য করা, তাঁদের ছবি বা স্মৃতির সামনে শ্রদ্ধা নিবেদন করা এবং তিল-তর্পণ করা বিশেষ ফলদায়ক বলে মানা হয়।
     অনেকেই তাঁদের প্রিয় খাদ্য রান্না করে নিবেদন করেন এবং পরে কাক, গরু, পাখি বা পিঁপড়েদের খাদ্য দেন। বিশ্বাস করা হয়, এইসব প্রাণীর মাধ্যমে পিতৃলোকের আত্মারা সেই অর্ঘ্য গ্রহণ করেন।
     কেউ কেউ মনে করেন অমাবস্যা পালন করা উচিত নয়, আবার কারও বাড়িতে প্রবীণদের নিজস্ব নিয়ম থাকে। পরিবারের বড়দের মতামতকে সম্মান করেই চলা উচিত। তবে অমাবস্যার দিনে দান, তর্পণ ও পূর্বপুরুষদের স্মরণ করা সর্বদাই শুভ বলে শাস্ত্রে উল্লেখ রয়েছে।
     শাস্ত্র অনুযায়ী, এই দিনে যজ্ঞ, ব্রত, অনুষ্টান ও সংকল্প অত্যন্ত শুভ ফল প্রদান করে। অমাবস্যাকে কেবল পিতৃপক্ষের সঙ্গে যুক্ত করে দেখলে ভুল হবে। এই তিথির সঙ্গে মহালক্ষ্মীরও গভীর সম্পর্ক রয়েছে। ধন, ঐশ্বর্য, যশ, স্থায়ী সমৃদ্ধি এবং সংসারে লক্ষ্মীর কৃপা লাভের জন্যও এই দিনটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
দীপাবলির মতো মহাশুভ লক্ষ্মীপূজাও অমাবস্যাতেই অনুষ্ঠিত হয়। তাই অমাবস্যাকে কখনও অশুভ ভেবে অবহেলা করা উচিত নয়।
      এই দিনে সম্পূর্ণ কালো উড়দ ডাল, কম্বল ইত্যাদি দান শুভ বলে মনে করা হয়। এর ফলে পিতৃলোকের আত্মারা তৃপ্ত হন এবং রাহু-কেতুর অশুভ প্রভাবও প্রশমিত হয় বলে বিশ্বাস।
      পাখিদের খাদ্যদান বিশেষ পুণ্যজনক বলে বিবেচিত। কাককে ক্ষীর বা পনিরজাতীয় খাদ্য নিবেদন করাও বহু স্থানে প্রচলিত, কারণ ধর্মীয় বিশ্বাস অনুযায়ী পূর্বপুরুষরা কাকের রূপে এসে সেই অন্ন গ্রহণ করেন। এর মাধ্যমে পরিবারে সুখ, সমৃদ্ধি, যশ ও সাফল্য বৃদ্ধি পায় বলে মনে করা হয়।
বিশেষ করে এই অমাবস্যায় জলাভিষেক, অশ্বত্থ গাছে কাঁচা দুধ অর্পণ, কালো তিল নিবেদন, প্রদীপ প্রজ্বলন, দান-পুণ্য, পিতৃস্মরণ এবং তাঁদের ছবির সামনে সর্ষের তেলের চারমুখী প্রদীপ জ্বালানো শুভ বলে উল্লেখ করা হয়েছে। সাদা ফুল নিবেদন, অশ্বত্থ বৃক্ষরোপণ ও পূজা, হোম-যজ্ঞ এবং পূর্বপুরুষদের প্রিয় খাদ্য দান করাও বিশেষ ফলদায়ক বলে ধরা হয়।
     যাঁরা কালসর্প দোষের প্রতিকার করতে চান, তাঁদের জন্য নাগ-নাগিনের বিধিবদ্ধ পূজা করে গঙ্গা বা যমুনায় বিসর্জনের কথাও বলা হয়।
অমাবস্যার রাতে মহালক্ষ্মীর মন্ত্রজপ, গোলাপ ফুল নিবেদন এবং রাত্রিজাগরণ করে পূজা করাও শুভ বলে বিবেচিত।
     রাহু-কেতুর কষ্ট থেকে মুক্তির উদ্দেশ্যে জুতো, ছাতা, উড়দ ডাল, সর্ষের তেল, কালো রঙের চটি, চা-পাতা, কম্বল ও বেগুন দান করার কথাও বলা হয়েছে। দরিদ্র মানুষের মধ্যে খাদ্যশস্য, চাল, তেল ও ঋতুভিত্তিক বস্ত্র বিতরণ, গোশালায় দান, গরুকে সবুজ ঘাস, গুড় ও খাদ্য প্রদান এবং ঘি দান করাও পুণ্যস্বরূপ বিবেচিত।
    যদি সম্ভব হয়, এই দিনে গঙ্গাস্নান বা গঙ্গায় ডুব দেওয়া অত্যন্ত শুভ বলে বিশ্বাস করা হয় এবং বহু বছরের দুঃখ-কষ্ট দূর হয় বলে লোকবিশ্বাস রয়েছে।
     পুরুষোত্তম মাসের সমাপ্তি উপলক্ষে যাঁরা এই মাসে কিছু খাদ্য বা ব্যবহার্য বস্তু ত্যাগ করেছিলেন, তাঁদের সেই বস্তুগুলি দান করার পরামর্শ দেওয়া হয়। যেমন—চটি, ছাতা, বেগুন, চা-পাতা, কম্বল কিংবা যে খাদ্যসামগ্রী ত্যাগ করা হয়েছিল, তা দরিদ্রদের মধ্যে বিতরণ করা। বিশেষভাবে খিচুড়ি বিতরণ এবং ক্ষীর রান্না করে পূর্বপুরুষ ও মহালক্ষ্মীকে নিবেদন করারও পরামর্শ দেওয়া হয়। পিতৃঅর্ঘ্যের জন্য সাধারণ সাদা ক্ষীর এবং মহালক্ষ্মীর নিবেদনের জন্য কেশর মিশ্রিত ক্ষীর অর্পণের কথাও বলা হয়েছে।
     সোমবার হওয়ায় মহাদেবের পূজাও এই দিনে বিশেষ ফলদায়ক বলে ধরা হয়। শিবলিঙ্গে দুধ, দই, মধু, চিনি ও ঘি নিবেদন করা শুভ।
এছাড়া সমগ্র গৃহে ঘণ্টা ও শঙ্খধ্বনি করা, লোবানের ধোঁয়া দেওয়া, সমস্ত আলো জ্বালানো, ঘর পরিষ্কার করা, গঙ্গাজল ও গোলাপজল মিশিয়ে মেঝে মোছা, প্রবেশদ্বারে তোরণ ও আমপাতা সাজানো—এসবকেও সৌভাগ্য ও সমৃদ্ধির প্রতীক হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে।
    সবশেষে সকল পূর্বপুরুষের প্রতি শ্রদ্ধা ও প্রণাম নিবেদন করে তাঁদের আশীর্বাদ কামনা করা হয়েছে, যাতে জীবনে সুখ, সমৃদ্ধি, যশ, সাফল্য এবং কোনো কিছুর অভাব না থাকে।
 #অমাবস্যা #spirituality #spiritualgrowth  #spiritualjourney #spiritualawakening