ভোরের প্রথম আলো নরম ভঙ্গিতে হিমালয়ের চূড়া ছুঁয়ে নামল, যেন সোনালী কিরণের জোয়ার গড়িয়ে পড়ল উপত্যকায়। উত্তরকাশী তখন জেগে উঠছিল, তবুও আশ্রমের ভেতর নিস্তব্ধতা এত গভীর ছিল যে ধ্যানমন্দিরের খোলা জানলা দিয়ে দূরবর্তী গঙ্গার ক্ষীণ গুঞ্জনও স্পষ্ট শোনা যাচ্ছিল। গঙ্গার স্রোতে দূরে রুপালী ঝিলিক দেখা যাচ্ছিল—চঞ্চল, প্রাণবন্ত, যেন খাপছাড়া এক তরবারি।
অরুণ শান্তভাবে বসে ছিল আশ্রমের হলের ঠান্ডা তক্তপোশের ওপর, হাঁটুর উপর হাত রেখে। এই অতল নীরবতায় সে এখনো পুরোপুরি অভ্যস্ত নয়। বাতাসে চন্দনের হালকা ঘ্রাণ ভেসে বেড়াচ্ছিল, সাথে পাহাড়ি হাওয়ার শীতল নিশ্বাস।
তার সামনে গুরুজী একটি নীচু আসনে বসেছিলেন পদ্মাসনে, অবলীলায় সোজা হয়ে। তাঁর দেহটি যেন এক অতি প্রাচীন দেবদারু—অচঞ্চল, অথচ জীবন্ত। চোখ অর্ধেক বুঁজে, তবু অরুণ অনুভব করল—চোখ না খুলেও গুরুজী তাকে যেন অন্তর্ভেদী দৃষ্টিতে গভীরভাবে দেখছেন।
দীর্ঘক্ষণ কারো মুখে কোনো শব্দ উঠল না। শেষমেশ নীরবতা ভেঙে অরুণ বলল, “গুরুজী, গতকাল আপনি চক্র আর মেরুদণ্ডের মানচিত্র নিয়ে বলেছিলেন। কিন্তু আপনি কৌশলগুলোর কথাও বলেছিলেন—এই অন্তঃপথে চলার অনুশীলন। বলেছিলেন সাধনা করতে হলে এই ক্রিয়া দিয়ে শুরু করতে হয়। আজ কি আপনি আমাকে এটি শেখাবেন?”
গুরুজী ধীরে ধীরে চোখ তুলে চাইলেন। তাঁর শান্ত অথচ গভীর দৃষ্টি যেন অরুণকে ভেদ করে গেল। “হ্যাঁ,” তিনি বললেন। “ ক্রিয়ার পথ শুরু হয় আটটি মৌলিক কৌশল দিয়ে। তার প্রথমটিই হলো তালব্য ক্রিয়া। এটি জিভকে প্রস্তুত করে খেচরী মুদ্রার জন্য। আর খেচরী মুদ্রাই খুলে দেয় ঊর্ধ্বস্রোতের দ্বার।”
অরুণ সাগ্রহে চেয়ে থাকে।
“ভালো করে শোনো,” গুরুজী বললেন, “অনেক সাধক তাড়াহুড়ো করে শ্বাসসাধনায় ঝাঁপিয়ে পড়ে। কিন্তু প্রাচীন গুরুরা জানতেন—জিভকে প্রস্তুত না করে দিলে মেরুদণ্ড আর মস্তিষ্কের মধ্যে যে স্রোতপথ আছে, সেটি সম্পূর্ণ হয় না।”
অরুণ অজান্তেই সামনের দিকে ঝুঁকে পড়ল, “তাহলে আমাকে কী করতে হবে, গুরুজী?”
গুরুজি বললেন,
“প্রথমে জিভ শিথিল রাখো। জিভের আগা হালকা করে রাখো উপরের দাঁতের গোড়ায়।। ডগাটা উপরের দাঁতের পেছনে হালকা ঠেকিয়ে দাও—পেছনে ভাঁজ কোরো না, জোরে তুলো না। তারপর জিভের মূল অংশ উপরের তালুতে চেপে ধরো, যেন একপ্রকার শূন্যতা বা সাকশন তৈরি হয়। ডগাটা থাকবে সামনের দাঁতের গায়ে। এরপর নীচের চোয়াল ধীরে ধীরে নামাও—তখন একটা টান অনুভব করবে।”
তিনি নিজের চিবুকের নীচে আঙুল রাখলেন—সেখানে টান ধরার ইঙ্গিত দিলেন। অরুণও অনুভব করল—মৃদু টান, তারপর ক্রমে হালকা ব্যথার মতো এক টান ফুঁটে উঠল।
অরুণ চেষ্টা করল, কিন্তু হঠাৎই তার চোয়াল শক্ত হয়ে গেল। গুরুজির চোখ তীক্ষ্ণ হলো।
“ওভাবে নয়,” তিনি বললেন। “অনেকে স্বভাবতই জিভ উল্টে দেয় বা একেবারে খাড়া রাখে—তাতে কাজ হয় না। আগা রাখো সামনের দিকে, শরীর চাপ দাও ওপরের দিকে। এবার নিচের চোয়াল আস্তে নামাও, suction ধরে রেখে। টানটা টের পাবে এখানে।”
তিনি আঙুল দিয়ে দেখালেন থুতনির নিচের নরম অংশে। অরুণ সেখানে প্রথমে মৃদু টান অনুভব করল, তারপর ধীরে ধীরে ব্যথার মতো এক টান জেগে উঠল।
“এখন suction ছেড়ে দাও, যেন একটা ক্লিক শব্দ হয়,” গুরুজি নির্দেশ দিলেন। “তারপর জিভ বাড়িয়ে দাও বাইরে, চিবুকের দিকে নামিয়ে দাও। দিনে দশবারের বেশি করবে না শুরুতে। শরীরকে কষ্ট দিয়ে নয়, ধীরে ধীরে প্রস্তুত করে এগোতে হয়। কয়েক মাস পরে তুমি পঞ্চাশ বারও করতে পারবে। তখন সময় লাগবে দুই মিনিট।”
বাইরে গঙ্গার স্রোত যেন মিলিয়ে গেল অরুণের অনুশীলনের ছন্দে—চাপ, টান, ক্লিক, প্রসার।
“কিন্তু গুরুজি,” অরুণ একটু দ্বিধায় বলল, “মাসের পর মাস পরে কী হয়?”
গুরুজির চোখ যেন তার সীমার বাইরে কোথাও চাইল, অদৃশ্য কোনো মন্দিরের দিকে।
“একদিন, কোনো কষ্ট ছাড়াই, জিভ নিজে থেকেই সরে যাবে তালুর পেছনের গহ্বরে। তখন খেচরী হবে সহজসাধ্য। তখন নিঃশ্বাস প্রায় মিলিয়ে যাবে; মন ভেতরে ফিরে যাবে; আর স্রোত বইবে এমনভাবে—যা ভাষায় ধরা যায় না।”
অরুণ জিজ্ঞাসা করল,
“এটা কি সত্যিই এত প্রয়োজনীয়, গুরুজি? এত ছোট জিনিস, অথচ লক্ষ্য এত বিরাট…”
গুরুজি হেসে উঠলেন মৃদু স্বরে।
“অনন্তের দরজা প্রায়ই লুকিয়ে থাকে ক্ষুদ্রতম গতিতে। তালব্য ক্রিয়া কোনো ব্যায়াম নয়—এটা সেই চাবি, যেটি একদিন তোমার চেতনা খুলে দেবে মাথার উপরে অবস্থিত সহস্রার-এর আকাশে।”
অরুণের মনে ছবি গেঁথে গেল—যেন এক ফোঁটা জাফরান দুধের বাটিতে মিশে রঙ ছড়িয়ে দিল। ঘরের নীরবতা আরও ঘনীভূত হল।
কিছুক্ষণ পরে অরুণ আস্তে বলল,
“গুরুজি, গতকাল আপনি চক্রের পথের কথা বলেছিলেন। কিন্তু তখনও বলেছিলেন কৌশলের কথা। তাহলে কি এখন শুরু করবেন?”
গুরুজি মাথা নাড়লেন ধীরে।
“নদীকে আগে পাথর থেকে মুক্ত করতে হয়, তারপরই সে সমুদ্রের দিকে সোজা বয়ে যেতে পারে। তালব্য ক্রিয়া হলো সেই প্রথম ধাপ। দেখতে সহজ, অদ্ভুতও লাগতে পারে, কিন্তু এর মাধ্যমেই তোমার যাত্রা শুরু হবে—খেচরী মুদ্রা আর তারও অনেক দূরে।”
অরুণ ভ্রু কুঁচকালো,
“কিন্তু গুরুজি, কেন জিভ দিয়ে এই প্রক্রিয়ার শুরু?"
গুরুজি উত্তর দিলেন শান্ত ভঙ্গিতে,
“ক্রিয়ায় জিভই হলো সেতু। ওকে না প্রস্তুত করলে মেরুদণ্ড আর মস্তিষ্কের মধ্যে যোগ হয় না। এমনকি খেচরী আয়ত্তের পরও তালব্য চালিয়ে যেতে হয়। এতে মন একেবারে স্থির হয়—কেন হয়, কেউ বলতে পারে না। তুমি নিজেই একদিন বুঝতে পারবে।”
তিনি ইশারা করলেন অরুণের মুখের দিকে।
“বসো আরাম করে। জিভের আগা রাখো উপরের দাঁতের গোড়ায়। উল্টাবে না, খাড়া করবে না। আগা থাকুক সেখানেই, বাকিটা চাপ দাও তালুর সঙ্গে। এবার চোয়াল নামাও আস্তে করে, আর টানটা অনুভব করো নিচে।”
অরুণ সেভাবেই করল। আবারও সেই টান, সেই ব্যথা।
“ভালো,” গুরুজি বললেন। “এখন ক্লিক করে ছেড়ে দাও, তারপর জিভ বাড়িয়ে চিবুকের দিকে নামাও। দিনে দশবারের বেশি নয়। কয়েক মাস পর তুমি পঞ্চাশে পৌঁছাবে। তখন শরীর প্রস্তুত হলে জিভ নিজেই ঢুকে যাবে তালুর পেছনের গহ্বরে। সেটাই খেচরী।”
অরুণ একটু ইতস্তত করল।
“গুরুজি, হঠযোগের বইতে পড়েছি কাপড় দিয়ে টেনে জিভ লম্বা করার কথা। সেটা কি দরকার?”
গুরুজির দৃষ্টি তীক্ষ্ণ হলো, কিন্তু স্নেহভরা, “কেউ কেউ করে থাকে। কিন্তু লাহিড়ী মহাশয় নিজে এর বিরোধিতা করেছিলেন—কোনো কেটে বা আঘাত দিয়ে দ্রুত ফল আনতে নেই। কাপড় দিয়ে টানার প্রক্রিয়া করা যায়, তবে খুব কোমলভাবে, আঘাত ছাড়াই। চাইলে আঙুল দিয়ে জিভ আর নিচের পেশিতে মালিশ করতে পারো। কিন্তু মনে রেখো—ধৈর্যই ক্রিয়ার সত্যিকারের ধারক।”
তারপর তিনি সামান্য ঝুঁকে বললেন, “আর মনে রেখো—তালব্য ক্রিয়া আর খেচরী মুদ্রা এক নয়। আয়নার সামনে করলে দেখবে জিভের নিচে দু’পাশে ফাঁকা জায়গা তৈরি হয়, যা জিভের মূল দেহ থেকে আলাদা। কিন্তু খেচরীতে uvula এগিয়ে আসে, আর কেবল জিভের গোড়া দেখা যায়। এই দুইটি পথ তাই ঘনিষ্ঠ হলে পৃথক।”
অরুণ আবার করল চাপ, টান, ক্লিক, প্রসার—চোয়াল ইতিমধ্যেই ভারী লাগছে। সে জিজ্ঞেস করল,
“গুরুজি, এই প্রথম কৌশল… কি শ্বাসসাধনার সঙ্গে সম্পর্কিত?”
গুরুজি হেসে উঠলেন, “সংক্ষিপ্ত শ্বাসের যে প্রাণায়াম আছে, তাকে ক্রিয়া প্রণায়ামেরই একটি রূপ বলা যায়। বিশেষ কিছু কারণে সেটাকে আগেভাগে শেখানোও হতে পারে। কিন্তু সেটা পরের অধ্যায়ের কথা।”
বাইরে গঙ্গার স্রোত ধ্বনি উঠছিল মৃদু, যেন অন্তহীন এক স্তোত্র।
গুরুজি বললেন,
“একদিন তুমি দেখবে—এই ছোট্ট ক্রিয়া করতে গিয়েই তোমার মনের কোলাহল থেমে যাবে। যেমন গঙ্গা প্রবাহিত হয় নিঃশব্দে তার ঢেউয়ের কোলাহলের নিচে, তেমনি তোমার চেতনাও বইবে একই ভাবে যখন অন্তঃস্রোত মুক্তি পাবে।”
অরুণ গুরুজীকে প্রণাম করল। মুখে ব্যথার টানটা তখন আর যন্ত্রণার মতো লাগছিল না, বরং এক দীক্ষার চিহ্নের মতো। বাইরে নদী মৃদু কল্লোলে পাহাড়কে গল্প শোনাচ্ছিল। অরুণ নিজের ভেতরেও অনুভব করল সেখান থেকেও কিছু একটা মৃদু কল্লোলের শব্দ যেন ভেসে আসছে।
ক্রমশ
লেখকের website - https://www.tarashisgangopadhyay.in/
#ক্রিয়াযোগ #ক্রিয়াযোগবাংলা #বাংলাযোগ #ধ্যানযোগ #ধ্যানওসাধনা
#প্রাণায়াম #আধ্যাত্মিকযাত্রা #অন্তরযাত্রা #আত্মসাধনা #গুরুশিষ্য
#যোগেরগোপনবিদ্যা #সত্যঅন্বেষণ #শান্তিরপথ #আত্মজ্ঞান #যোগবাংলায়
#ক্রিয়াযোগ
#বাংলাযোগ
#ধ্যানওসাধনা
#অন্তরযাত্রা
#প্রাণায়াম
#আত্মসাধনা
#ধ্যানমার্গ
#যোগেরগোপনবিদ্যা
#আধ্যাত্মিকযাত্রা
#শান্তিরপথ
#ধ্যানযোগ
#গুরুশিষ্য
#সত্যঅন্বেষণ
#আত্মজ্ঞান
#যোগবাংলায়
#প্রাণায়াম #আধ্যাত্মিকযাত্রা #অন্তরযাত্রা #আত্মসাধনা #গুরুশিষ্য
#যোগেরগোপনবিদ্যা #সত্যঅন্বেষণ #শান্তিরপথ #আত্মজ্ঞান #যোগবাংলায়
#ক্রিয়াযোগ
#বাংলাযোগ
#ধ্যানওসাধনা
#অন্তরযাত্রা
#প্রাণায়াম
#আত্মসাধনা
#ধ্যানমার্গ
#যোগেরগোপনবিদ্যা
#আধ্যাত্মিকযাত্রা
#শান্তিরপথ
#ধ্যানযোগ
#গুরুশিষ্য
#সত্যঅন্বেষণ
#আত্মজ্ঞান
#যোগবাংলায়