Ami Tarashis Bolchi

Ami Tarashis Bolchi
The blog of Tarashis Gangopadhyay (click the photo to reach our website)
Showing posts with label আধ্যাত্মিক. Show all posts
Showing posts with label আধ্যাত্মিক. Show all posts

Sunday, 5 July 2026

স্বর্গ বা নরক আছে কোথায়?

স্বর্গ বা নরক আছে কোথায়? আমাদের মাঝেই -- আমাদের মনের ভিতরে।দুটিই আমাদের মানসিক অবস্থা। মন যখন নানা জাগতিক সমস্যায় জড়িয়ে নিজে পুড়তে থাকে সেটাই নরক যন্ত্রণা। আর যখন সে আনন্দের সাথে সব কাজ করে যেতে থাকে সেবা রূপে সেটাই স্বর্গের সুখ।
   যখন জীবনে নরক যন্ত্রণা আসে তখন তার বীজ খুঁজে বের করতে হয়। তাহলে দেখা যায় বীজ ছিল আমাদের কোন কর্মের মাঝে। তখন শান্ত হয়ে আত্মায় আত্মস্থ হলে ঠিক তার থেকে বেরনোর পথ খুঁজে বের করা যায়।
    মনের স্বর্গকে গড়ে তোলার জন্য চিন্তার পারে যেতে হয়। তাই তারাশিস গঙ্গোপাধ্যায় বলে,যত জীবনকে বাইরের দিকে চিনতে চাইব ততই বাড়বে চিন্তা। তাই চিন্তার চিতা সাজিয়ে মনের মাঝে স্বর্গের আনন্দে থাকব। বাইরের পৃথিবীর আঘাতের সাধ্য কি সেখানে পৌঁছয়।

#spirituality  #spiritualgrowth  #spiritualawakening  #আধ্যাত্মিক  #tarashisauthor

Monday, 15 June 2026

ওঙ্কার সাধনা কিভাবে করতে হয়?

‘ওঁ’কার সাধনা কিভাবে করতে হয়?
 - তারাশিস গঙ্গোপাধ্যায়

আমাদের মধ্যে অনেকেই ‘ওঁ’ জপ করে থাকেন। কিন্তু আপনি কি জানেন, ওঁ জপ করার একটি নির্দিষ্ট সময়, সঠিক দিক এবং সঠিক পদ্ধতি রয়েছে? কখন, কোথায় এবং কোন দিকে মুখ করে ‘ওঁ’ জপ করলে চার গুণ ফল পাওয়া যায়? যার মাধ্যমে এই শক্তিশালী মন্ত্রের চার গুণ শুভ ফল পাওয়া যেতে পারে। এছাড়াও, ওঁ জপ করার সময় এমন ২০টি ভুল আছে, যা কখনোই করা উচিত নয়। জানতে চাইলে পড়ুন এই ধারাবাহিক লেখা।
_________________________

শিষ্য: গুরুদেব, ‘ওঁ’ কে বলা হয় আমাদের সকলের জন্য শক্তির এক বিশাল উৎস। এটা কি সত্যি? ‘ওঁ’-এর বৈজ্ঞানিক দিক কী? এবং ‘ওঁ’-এর জপ আমাদের শরীরের বিভিন্ন অঙ্গ-প্রত্যঙ্গে কীভাবে ইতিবাচক প্রভাব ফেলে?

গুরুদেব: দেখ, ‘ওঁ’ তিনটি অক্ষর নিয়ে গঠিত—অ, উ এবং ম। অ + উ + ম মিলেই ‘ওঁ’ হয়।
‘ওঁ’ কোন মানুষ, কোন ঋষি-মুনি বা কোন দেবতার সৃষ্টি করা মন্ত্র নয়। এই মন্ত্র স্বয়ংপ্রকাশিত। এটি নিজে থেকেই প্রকাশিত হয়েছে।
এই ধ্বনির উৎস হলো অনাহত নাদ। এই অনাহত নাদের উৎপত্তি নাভি থেকে। সেখান থেকেই ওঁ-এর ধ্বনি বেরিয়ে আসে। 

ওঁ হল এক আদিম ও মৌলিক ধ্বনি। এটি উচ্চারণ করার সময়
শরীর ও মস্তিষ্কে এক বিশেষ কম্পনের সৃষ্টি হয়। ‘অ’ ধ্বনি পেট ও বুকে অনুরণন সৃষ্টি করে। ‘উ’ ধ্বনি গলা ও কণ্ঠদেশে পৌঁছয়। আর ‘ম’ ধ্বনি মাথা ও মস্তিষ্কে কম্পন সৃষ্টি করে।

এই কম্পন আমাদের স্নায়ুতন্ত্রকে শান্ত করে। মানসিক চাপ কমায়। তাই ওঁ উচ্চারণ করলে মানসিক শান্তি আসে।
রাগ, বিরক্তি ও অস্থিরতা কমে।
মনোযোগ ও একাগ্রতা বৃদ্ধি পায়।

অনেক বিজ্ঞানীর মতে,
ওঁ ধ্বনির প্রাকৃতিক কম্পাঙ্ক প্রায় ৪৩২ হার্টজ। যা প্রকৃতির নানা স্বাভাবিক শব্দের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। যেমন—
পাখির ডাক, বাতাসের সোঁ সোঁ শব্দ, এবং প্রকৃতির আরও নানা কম্পন।

তাই ওঁ ধ্বনি শুনলে ও উচ্চারণ করলে আমাদের শরীর ও প্রকৃতি যেন একই ছন্দে মিলিত হয়। এর ফলে শরীরের ভারসাম্য বজায় থাকে। মন শান্ত থাকে এবং প্রকৃতির সঙ্গে এক গভীর সংযোগ তৈরি হয়।

হিন্দি বা সংস্কৃতের সমস্ত বর্ণমালার মূল উৎসও এই ওঁ। ক থেকে ক্ষ পর্যন্ত, অ থেকে ঔ পর্যন্ত—সব ধ্বনির মূল উৎস এই ওঁ। কোন ঋষি বা মানুষ এগুলো সৃষ্টি করেননি, এগুলো স্বয়ংপ্রকাশিত।

এ প্রসঙ্গে বলা যায় ভারতে রাধাস্বামী সম্প্রদায় নামে একটি সম্প্রদায় আছে। তাদের প্রধান সাধনাই হলো অনাহত নাদের সাধনা।

শিষ্য : অনাহত নাদের সাধনা বলতে কী বোঝায়?

গুরুদেব : যখন তোমার শরীর সম্পূর্ণ শূন্যতার অবস্থায় স্থির হয়ে যাবে, ইন্দ্রিয়গুলো অন্তর্মুখী হয়ে যাবে, মনও অন্তর্মুখী হয়ে যাবে, আর তোমার চিত্ত সম্পূর্ণ শান্ত হয়ে যাবে -  যাকে বলা হয় ‘কাষ্ঠ-মৌন’ তখন ভিতর থেকে যে নাদ শোনা যায় এ হল অনাহত নাদ।

শিষ্য : এই কাষ্ঠ-মৌন বলতে বোঝায়?

গুরুদেব: যেমন একটি কাঠ কোথাও রেখে দিলে তার নিজের কোন ক্রিয়া থাকে না,
ঠিক তেমনি শরীর, মন ও ইন্দ্রিয় সম্পূর্ণ নিস্তব্ধ ও নিষ্ক্রিয় হয়ে যাবে। কোন চিন্তা থাকবে না। এই অবস্থাকেই কাষ্ঠ-মৌন বলা হয়। তখন নাভির মধ্যে যে ‘ওঁ’-এর ধ্বনি অনবরত ধ্বনিত হচ্ছে, তা নিজের এই কান দিয়েই শোনা যেতে শুরু করবে।
আর এই অবস্থাই ব্রহ্মপ্রাপ্তি। এই অবস্থাই ঈশ্বরপ্রাপ্তি। এই ‘ওঁ’-এর ধ্বনি শুনতে পাওয়াই ঈশ্বরকে উপলব্ধি করা।
এটাই ঈশ্বরের প্রত্যক্ষ বোধ।
এককথায় বলা যায় - যখন মানুষের মন, ইন্দ্রিয় এবং চিত্ত সম্পূর্ণ অন্তর্মুখী হয়ে যায় এবং গভীর নীরব অবস্থায় পৌঁছায়, তখন নাভির সেই ওঁ-ধ্বনি নিজের কানেই শোনা যায়। এটিকেই বলা হয় ঈশ্বর-প্রাপ্তি বা ব্রহ্মজ্ঞান। 

গীতায় একটি শ্লোক আছে—
"এতদ্ দ্বয়মক্ষরং জ্ঞাত্বা ব্রহ্মলোকে মহীয়তে।"
অর্থাৎ, যে এই ‘ওঁ’ শব্দের প্রকৃত জ্ঞান লাভ করে, সে ব্রহ্মকে উপলব্ধি করতে পারে। সে ব্রহ্মের স্বরূপ জানতে পারে। আগেই বলেছি -  আমাদের যত অক্ষর ও যত স্বরচিহ্ন আছে, সবকিছুর উৎপত্তিই এই ‘ওঁ’ থেকে। ‘ওঁ’ অনাহত নাদ থেকে স্বয়ং প্রকাশিত হয়েছে। এবং এই ‘ওঁ’ প্রত্যেক মানুষের মধ্যেই বিদ্যমান। প্রত্যেক নারী ও পুরুষের মধ্যেই এটি রয়েছে।
যে কোন নারী বা পুরুষ যদি ধ্যান ও সাধনার অবস্থায় বসে,
এক-দুই ঘণ্টা নীরব থাকার অভ্যাস করেন, এবং নিজের মন ও ইন্দ্রিয়কে অন্তর্মুখী করার চেষ্টা করেন, তাহলে সাধনার মাধ্যমে তিনি এই ‘ওঁ’-এর ধ্বনি শুনতে পারবেন। ‘ওঁ’-এর ধ্বনি সত্যিই শোনা যায়। তবে এর জন্য কঠোর সাধনার প্রয়োজন।"

শিষ্য: এই ধ্বনি শোনার কোন সহজ উপায় নেই?

গুরুদেব: আরেকটি উপায়ও আছে। বিজয়পুরে রাজা বাবা নামে এক সিদ্ধপুরুষ থাকতেন। শোনা যায়, তিনি নেপালের রাজপরিবারের সদস্য ছিলেন।
ভবঘুরের মতো ঘুরতে ঘুরতে তিনি বিন্ধ্যাচলে এসে পৌঁছেছিলেন। মাত্র ১২-১৩ বছর বয়স থেকেই তিনি সেখানে বহুদিন ছিলেন।
পরে বিজয়পুরের পাহাড়ে নিজের আশ্রম স্থাপন করেন। আজও সেই স্থান ‘রাজা বাবার বাখুলি’ নামে পরিচিত।
রাজা বাবা তাঁর এক বইয়ে লিখেছেন— যদি প্রতিদিন ১২ হাজার বার ‘ওঁ’-এর অজপা জপ করা যায়, এবং টানা এক বছর তা পালন করা যায়,
তাহলে মানুষের হৃদয়ের মধ্যেই ঈশ্বরের দর্শন ঘটে।

শিষ্য: এই অজপা জপ বলতে কি বোঝায়?

গুরুদেব: শ্বাস নেওয়ার সময় মনে মনে ‘ও...’ আর শ্বাস ছাড়ার সময় মনে মনে ‘ম...’ উচ্চারণ। অর্থাৎ— ‘ও... ম...’ ‘ও... ম...’ এইভাবে শ্বাস-প্রশ্বাসের সঙ্গেই জপ চলতে থাকবে। এভাবে প্রতিদিন ১২ হাজার বার জপ করতে হবে। দিনে মাত্র একবার আহার করতে হবে। সেটাও অল্প পরিমাণে। কারও সঙ্গে অপ্রয়োজনীয় মেলামেশা করা যাবে না। নির্জনে থাকতে হবে।
সম্পূর্ণ শুচিতা ও পবিত্রতা বজায় রাখতে হবে। এবং টানা এক বছর এই নিয়ম পালন করতে হবে। তাহলে তাঁর বইয়ের বর্ণনা অনুযায়ী,
মানুষের হৃদয়ের মধ্যেই ঈশ্বরের জ্যোতি প্রকাশিত হবে।

শিষ্য: এখন ১২ হাজার অজপা জপ করতে কত সময় লাগতে পারে?

গুরুদেব: একজন স্বাভাবিক মানুষ গড়ে প্রতি মিনিটে ১৫ বার শ্বাস প্রশ্বাস নেয়। অর্থাৎ এক ঘণ্টায় একজন মানুষের প্রায় ৯০০ বার শ্বাস-প্রশ্বাস হয়।
এর চেয়ে বেশি হলে আয়ু কমে যায়। আর এর চেয়ে কম হলে আয়ু বাড়ে। কারণ শাস্ত্র মতে মানুষের আয়ু শ্বাসের সংখ্যার উপর নির্ভরশীল। তাই আমাদের শাস্ত্রে প্রাণায়ামের উপর এত জোর দেওয়া হয়েছে।

প্রাণায়াম করলে মানুষ দীর্ঘক্ষণ শ্বাস ধরে রাখতে পারে। শ্বাস যত সঞ্চয় হবে, আয়ুও তত বৃদ্ধি পাবে। ৯০০ শ্বাসের হিসাবে যদি ১২,০০০ বার জপের হিসাব করা হয়, তাহলে ১০ ঘণ্টায় প্রায় ৯,০০০ বার সম্পন্ন হবে।
আর বাকি ৩,০০০ বার করতে আরও প্রায় ৪ ঘণ্টা লাগবে।
অর্থাৎ, মোটামুটি ১৪ ঘণ্টার সাধনায় ১২,০০০ বার ওঁ জপ সম্পূর্ণ হতে পারে। যে ব্যক্তি প্রতিদিন ১৪ ঘণ্টা ধরে ওঁ-এর সাধনা করবে, সে যদি এক বছরের মধ্যে ঈশ্বরকে না পায়, তাহলে আর কে পাবে? আমার বিশ্বাস -- অবশ্যই সে ঈশ্বরপ্রাপ্ত হবে। এটাই রাজা বাবার মত।

(চলবে)
(পরের সব অংশ ফেসবুকেনামার প্রোফাইলে পেয়ে যাবেন)

#ওঁকার_সাধনা
#প্রণব_ধ্যান
#অনাহত_নাদের_সন্ধানে
#ওঁকারের_মহাশক্তি
#ব্রহ্মমুহূর্ত_সাধনা
#আত্মজাগরণের_পথে
#অন্তর্নিহিত_দিব্যশক্তি
#spirituality #spiritualawakening

চন্দনের মাহাত্ম্য (প্রথম পর্ব)

চন্দনের গন্ধ শুধু শরীরকে শীতল করে না… বদলে দিতে পারে মানুষের অন্তরও।
এক নির্জন আশ্রমে এক শিষ্যের একটি মাত্র প্রশ্ন—
“গুরুদেব, চন্দনের প্রকৃত মাহাত্ম্য কী?”
তারপর শুরু হয় এমন এক কথোপকথন, যেখানে উঠে আসে— চন্দনের শাস্ত্রীয় রহস্য,  তৃতীয় নয়নের প্রকৃত অর্থ,  আজ্ঞা চক্রের গভীর তাৎপর্য,
কেন দেবতার অঙ্গে চন্দন নিবেদন করা হয়, আর কেন চন্দনের মতো মানুষ হওয়াই জীবনের সর্বশ্রেষ্ঠ সাধনা।
______________________

চন্দনের মাহাত্ম্য (প্রথম পর্ব)

সন্ধ্যার নরম আলো ক্রমশ আশ্রমের বটগাছের পাতায় পাতায় মিশে যাচ্ছে। দূরে ধূপের সুগন্ধ, মন্দিরের ঘণ্টাধ্বনি আর বেদপাঠের ক্ষীণ ধ্বনি পরিবেশকে এক অপার্থিব প্রশান্তিতে ভরিয়ে তুলেছে। সেই সময় শিষ্য গুরুদেবের চরণে প্রণাম করে নতস্বরে প্রশ্ন করল।

শিষ্য: গুরুদেব, বহুদিন ধরে আমার মনে একটি প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে। আমরা প্রতিদিন পূজায় চন্দন ব্যবহার করি, দেবমূর্তিতে চন্দন নিবেদন করি, কপালে চন্দনের তিলক ধারণ করি। কিন্তু এর প্রকৃত মাহাত্ম্য কী?

গুরুদেব স্নিগ্ধ হেসে শিষ্যের মাথায় হাত রাখলেন। তারপর বললেন: বৎস, চন্দন কেবল একটি সুগন্ধি কাঠ নয়। এটি শীতলতার প্রতীক, পবিত্রতার প্রতীক, আবার আত্মসংযম ও ঈশ্বরস্মরণেরও প্রতীক।

সনাতন ধর্মে যখনই কোনো পূজা বা যজ্ঞ শুরু হয়,  মন্ত্রোচ্চারণের মাধ্যমে বলা হয় যে চন্দন পবিত্রকারী, পাপ নাশকারী এবং লক্ষ্মীর কৃপা আনয়নকারী। এরপর হাতে রক্ষাসূত্র বাঁধা হয় এবং তারপর পূজার মূল প্রক্রিয়া শুরু হয়। চন্দন মানুষের উপর অশুভ শক্তির প্রভাব দূর করে এবং রক্ষাসূত্র দশ দিক থেকে সুরক্ষা দেয়—এমন বিশ্বাস রয়েছে। তাই সনাতন ধর্মে পূজার সূচনাতেই এই আচার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মন্দিরে ধূপ, দীপ ও সুগন্ধি দ্রব্য ব্যবহারের ফলে পরিবেশে এক পবিত্র ও শান্ত আবহ সৃষ্টি হয়। এর ফলে মন ভালো থাকে এবং নেতিবাচক চিন্তা দূরে থাকে—এমন ধারণা প্রচলিত। 

 মহামৃত্যুঞ্জয় মন্ত্রে একটি শব্দ আছে—"সুগন্ধিম্ পুষ্টিবর্ধনম্"। অর্থাৎ সুগন্ধ এমন এক শক্তি, যা পুষ্টি ও বিকাশ ঘটায়। চন্দনের মধ্যেও সেই সুগন্ধ বিদ্যমান। কারণ, মানুষের বাহ্যিক পরিচ্ছন্নতার পাশাপাশি অন্তরের পবিত্রতার কথাও শাস্ত্র স্মরণ করিয়ে দেয়। তাই আচমন ও প্রাণায়ামের পর যখন যজমানকে পবিত্র করা হয়, তখন কপালে চন্দনের তিলক পরানো হয়।

শিষ্য: গুরুদেব, শুধু একটি তিলকই কি এত বড় তাৎপর্য বহন করে?

গুরু: অবশ্যই। শাস্ত্রে বলা হয়েছে, চন্দন পাপক্ষয়কারী, মনকে নির্মলকারী এবং শুভশক্তির আহ্বানকারী। চন্দন ব্যবহারে মস্তিষ্ক ও চোখের শক্তি বৃদ্ধি পায়—এমন বিশ্বাস রয়েছে। চন্দনের সুগন্ধ মানসিক চাপ, উদ্বেগ এবং হরমোনের ভারসাম্য রক্ষায় সহায়ক বলে অনেকে মনে করেন। কপালে চন্দনের তিলক লাগালে মন শান্ত থাকে এবং শীতল অনুভূতি হয়। এর ফলে মানসিক ক্লান্তি কমে এবং মাথাব্যথাও হ্রাস পেতে পারে। তাই চন্দন অত্যন্ত উপকারী বস্তু। চন্দনের তিলক কেবল কপালে একটুকরো চিহ্ন নয়—এ যেন নিজের চিত্তকে ঈশ্বরের শরণে সমর্পণের এক নীরব অঙ্গীকার।

শিষ্য: গুরুদেব, মলয়গিরির চন্দনের কথা প্রায়ই শুনি। তার কি আলাদা মাহাত্ম্য আছে?

গুরু: মলয়গিরির চন্দনকে বহু প্রাচীনকাল থেকেই সর্বোৎকৃষ্ট বলে মানা হয়েছে। তার সুগন্ধ গভীর, তার প্রকৃতি অত্যন্ত শীতল। বর্তমানে এর দাম অত্যন্ত বেশি এবং বাজারে নকল চন্দনের ব্যবসাও প্রচুর চলছে। তবে যদি খাঁটি চন্দনের সঙ্গে কেশর মিশিয়ে দেবতাদের নিবেদন করা হয় এবং পরে প্রসাদ হিসেবে গ্রহণ করা হয়, তবে তা অত্যন্ত শুভ বলে ধরা হয়।

তাই প্রাচীন কবিরা বলেছেন—
"চন্দন বিষ ব্যাপত নহি, লিপটে রহত ভুজঙ্গ।"অর্থাৎ বিষধর সাপ চন্দনগাছে জড়িয়ে থাকলেও চন্দন নিজের স্বভাব হারায় না। এ শুধু গাছের কথা নয়, মানুষের জীবনেও এক গভীর শিক্ষা—অশুভের সংস্পর্শে এসেও যে নিজের শুভ গুণ অটুট রাখতে পারে, সেই প্রকৃত চন্দনের মত।

শিষ্য: গুরুদেব, দেবতা ও মানুষের ব্যবহৃত চন্দনের মধ্যেও কি কোন পার্থক্য আছে?

গুরু: পুরাণে এমন উল্লেখ পাওয়া যায়। দেবতাদের নিবেদিত চন্দনকে হরিচন্দন এবং মানুষের ব্যবহৃত চন্দনকে শ্রীচন্দন বলা হয়েছে। আবার সংস্কৃত ভাষায় চন্দনের আর-এক নাম ‘শ্রীখণ্ড’।

শিষ্য: কপালে চন্দন ধারণের বিশেষ কারণ কী?

গুরু: যেখানে মানুষ তিলক ধারণ করে, যোগশাস্ত্রে সেই স্থানকেই আজ্ঞা চক্র বলা হয়। এটি জ্ঞান, বিবেক ও অন্তর্দৃষ্টির প্রতীক। তাই বহু সাধক বিশ্বাস করেন, এই স্থানে চন্দন ধারণ করলে মন শান্ত হয়, চিন্তা নির্মল হয় এবং ঈশ্বরচিন্তার প্রতি মন স্বাভাবিকভাবেই আকৃষ্ট হয়।

শিষ্য: তাহলে কি সব সম্প্রদায়ের মানুষেরই চন্দন ধারণ করা উচিত?

গুরু: প্রাচীন সনাতন প্রথায় বলা হয়েছে, ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয় ও বৈশ্য—এই তিন জাতির মানুষের কপালে তিলক থাকা উচিত। যে যেমন সম্প্রদায়ের, সে তেমন রীতিতে তিলক ধারণ করবে। বৈষ্ণব হলে ঊর্ধ্বপুণ্ড্র, শৈব হলে ত্রিপুণ্ড্র এবং শাক্ত হলে নিজ নিজ প্রথা অনুযায়ী তিলক ধারণ করা উচিত। তাই বৈষ্ণব, শৈব, শাক্ত—সকলেই নিজ নিজ আচার অনুযায়ী তিলক ধারণ করেন। উদ্দেশ্য একটাই—নিজেকে সর্বদা ঈশ্বরস্মরণে স্থিত রাখা।

শিষ্য: ভস্মের কথাও তো শুনেছি, গুরুদেব।

গুরু: হ্যাঁ। শৈব সাধনায় ভস্মের বিশেষ মাহাত্ম্য আছে।ঐতিহ্যগত পদ্ধতিতে গোময় থেকে বিশেষ প্রক্রিয়ায় ভস্ম প্রস্তুত করা হয় এবং তাতে সুগন্ধি মেশানো হয়। এই ভস্মই ভগবান শিবের অঙ্গে লেপন করা হয় এবং শিবলিঙ্গেও নিবেদন করা হয়। উজ্জয়িনীর মহাকালেশ্বর মন্দিরের বিখ্যাত ভস্ম আরতিতেও ভস্মের বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। এর মধ্যেও রয়েছে অনিত্য জগতের শিক্ষা—একদিন সবই ভস্মে পরিণত হবে, তাই অহংকার নয়, ভক্তিই মানুষের প্রকৃত অলঙ্কার।

শিষ্য: গুরুদেব, আপনি আজ্ঞা চক্রের কথা বললেন। অনেকে বলেন, চন্দন ধারণ করলে তৃতীয় নয়ন জাগ্রত হয়। এর অর্থ কী?

গুরুদেব কিছুক্ষণ নীরব রইলেন। তারপর শান্ত কণ্ঠে বললেন গুরু: বৎস, তৃতীয় নয়নকে অনেকে ভুল বোঝে। 
এটি কোনো সাধারণ চোখ নয়, আবার অলৌকিক প্রদর্শনের বিষয়ও নয়। এর প্রকৃত অর্থ অন্তর্দৃষ্টি—যে দৃষ্টি বাহ্য জগতের আড়ালে সত্যকে উপলব্ধি করতে শেখায়।

যেখানে ভগবান শিবের তৃতীয় নেত্রের প্রতীক ধরা হয়, সেই স্থানেই কপালে চন্দন ধারণ করা হয়। নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সকলেই সেই স্থানে চন্দন ধারণ করতে পারেন। এই স্থানকে অধ্যাত্ম জগতে আজ্ঞা চক্রের প্রতীক হিসেবে মানা হয় এবং এটিকে অন্তর্দৃষ্টি ও আধ্যাত্মিক জ্ঞানের কেন্দ্র বলে বিবেচনা করা হয়। যোগসাধনায় অনেকেই এই আজ্ঞা চক্র জাগ্রত করার চেষ্টা করেন এবং এর সঙ্গে গভীর আধ্যাত্মিক সাধনার সম্পর্ক রয়েছে।

 অনেকেই মনে করেন শিবের তৃতীয় নয়ন মানেই রুদ্ররূপ বা ধ্বংসের প্রতীক। কিন্তু এর আরও গভীর একটি অর্থ রয়েছে। তৃতীয় নয়ন বলতে বোঝায় এমন এক অন্তর্দৃষ্টি, যার মাধ্যমে অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যতের সূক্ষ্ম উপলব্ধি লাভ করা যায়। এই অন্তর্দৃষ্টিকেই প্রাচীন সাধকেরা ‘অন্তর্চক্ষু’ বলে অভিহিত করেছেন।

অন্তর্চক্ষুর অর্থ হল দিব্যজ্ঞান দ্বারা সত্যকে উপলব্ধি করা। বাহ্যিক চোখে যা দেখা যায় না, অন্তরের জ্ঞান সেই অদৃশ্য সত্যকেও অনুভব করতে পারে।

যখন কোন সাধক গভীর সাধনায় প্রবৃত্ত হন, তখন তাঁর অন্যতম লক্ষ্য থাকে আজ্ঞা চক্রকে জাগ্রত করা। এই আজ্ঞা চক্র সেই স্থানেই অবস্থিত, যেখানে নারীরা টিপ পরেন এবং পুরুষেরা চন্দনের তিলক ধারণ করেন।

যোগশাস্ত্রে বলা হয়েছে, এই আজ্ঞা চক্রের দ্বিদল পদ্মে শিবের ধ্যান করা হয়। এটি কেবল শরীরের একটি স্থান নয়, বরং চেতনার এক উচ্চতর স্তরের প্রতীক।

কুণ্ডলিনী শক্তি যখন আজ্ঞা চক্রে পৌঁছয়, তখন সেই অবস্থাকে অত্যন্ত সূক্ষ্ম ও গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হয়। তাই এই সাধনায় সামান্য অসাবধানতাও বিপজ্জনক হতে পারে বলে বহু আধ্যাত্মিক ধারায় সতর্ক করা হয়েছে। সেই কারণেই প্রকৃত গুরুর দীক্ষা ও তত্ত্বাবধানকে অপরিহার্য বলে গণ্য করা হয়।

একজন সিদ্ধ গুরু প্রয়োজনে বিশুদ্ধ চক্র থেকে সেই শক্তিকে সহস্রার পর্যন্ত পরিচালিত করতে পারেন বলে যোগশাস্ত্রে বর্ণনা রয়েছে।

সনাতন দর্শনের একটি ব্যাখ্যা অনুযায়ী, কুণ্ডলিনী শক্তির অবস্থান দুই স্তরে কল্পনা করা হয়। একটি মূলাধার চক্রে এবং অন্যটি সহস্রারে। এই শক্তিকে ত্রিবলয়াকারে কুণ্ডলী পাকানো সাপের প্রতীক হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়।

মূলাধারে অবস্থিত কুণ্ডলিনীর মুখ নিম্নদিকে এবং সহস্রারের শক্তি ঊর্ধ্বমুখী—এমন প্রতীকী বর্ণনাও বহু প্রাচীন গ্রন্থে পাওয়া যায়।

কুণ্ডলিনী জাগরণের সময় শক্তির প্রবাহ অত্যন্ত দ্রুত ও শক্তিশালী বলে বিবেচিত হয়। যদি সুষুম্না নাড়ি জাগ্রত না থাকে এবং সেই শক্তি ইড়া বা পিঙ্গলা নাড়ির পথে প্রবাহিত হয়, তবে আধ্যাত্মিক ভারসাম্য নষ্ট হতে পারে—এমন বিশ্বাস যোগতত্ত্বে প্রচলিত রয়েছে।
আবার এমনও বলা হয়, যদি কুণ্ডলিনী মূলাধারেই আবদ্ধ থেকে যায় এবং ঊর্ধ্বগামী না হয়, তবে মানুষের চেতনা নিম্ন প্রবৃত্তির দিকে আকৃষ্ট হতে পারে এবং আধ্যাত্মিক উন্নতির পথ বাধাগ্রস্ত হতে পারে।

তাই সুষুম্না নাড়ি জাগ্রত হয়েছে কি না, কুণ্ডলিনী সাধনার উপযুক্ত সময় এসেছে কি না—এসব নির্ণয় কেবলমাত্র একজন যোগসিদ্ধ ও অভিজ্ঞ গুরুই করতে পারেন।

যেমন ‘রাম’ নামটি উচ্চারণ করে দেখ। ‘রা’ ধ্বনিতে মুখ উন্মুক্ত থাকে এবং শব্দ উপরের দিকে অনুরণিত হয়। ‘ম’ উচ্চারণের সময় ঠোঁট বন্ধ হয়ে যায় এবং শরীরের ভিতরে এক সূক্ষ্ম কম্পনের অনুভূতি জাগে। এই ধ্বনির মধ্যেও যোগতত্ত্বের এক গভীর আধ্যাত্মিক তাৎপর্য নিহিত রয়েছে।

তাই দেখা যাচ্ছে যে কপালে চন্দনের তিলক ধারণ শুধুমাত্র একটি ধর্মীয় চিহ্ন নয়। এটি আজ্ঞা চক্র, অন্তর্দৃষ্টি, আত্মসংযম এবং ঈশ্বরস্মরণের এক পবিত্র প্রতীক। তবে মনে রেখ, প্রকৃত জাগরণ কখনো বাহ্যিক চিহ্নে নয়—তা ঘটে মানুষের অন্তরের পবিত্রতা, সাধনা এবং সত্য উপলব্ধির মধ্য দিয়ে। মানুষ যখন নিজের মনকে শুদ্ধ করে, ইন্দ্রিয়কে সংযত করে এবং ঈশ্বরচিন্তায় নিমগ্ন হয়, তখন তার অন্তরে সেই জ্ঞানের আলো জ্বলতে শুরু করে।

শিষ্য: তাহলে সাধকরা কেন আজ্ঞা চক্র জাগ্রত করার কথা বলেন?

গুরু: যোগশাস্ত্রে মানুষের শরীরে বিভিন্ন চক্রের কথা বলা হয়েছে। তাদের মধ্যে আজ্ঞা চক্র বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। বহু সাধক ধ্যানের মাধ্যমে এই চেতনার বিকাশের চেষ্টা করেন। তবে এ পথ অত্যন্ত গুরুগম্ভীর। কেবল বই পড়ে বা কৌতূহলবশত এ পথে প্রবেশ করা উচিত নয়।

শিষ্য: কেন গুরুদেব?

গুরু: কারণ আধ্যাত্মিক সাধনা কখনো খেলার বিষয় নয়। একজন যোগ্য ও অভিজ্ঞ গুরুর নির্দেশ ছাড়া গভীর সাধনায় প্রবেশ করলে মানসিক ও শারীরিক উভয় বিপর্যয় ঘটতে পারে। তাই শাস্ত্র সর্বদা গুরু-পরম্পরার উপর গুরুত্ব দিয়েছে।

শিষ্য: গুরুদেব, চন্দনের তিলক ধারণের বাস্তব উপকারিতা কী?

গুরু: চন্দন স্বভাবতই শীতল। তাই কপালে চন্দনের প্রলেপ দিলে প্রশান্তির অনুভূতি হয়। এর সুগন্ধ মনকে শান্ত করে, উদ্বেগ কমাতে সাহায্য করে এবং ধ্যান বা প্রার্থনার পরিবেশকে আরও একাগ্র করে তোলে। অনেক আয়ুর্বেদীয় গ্রন্থে চন্দনের শীতল ও প্রশমক গুণের উল্লেখ রয়েছে। যদিও নানা অলৌকিক দাবি করা হয়, সেগুলির সবকটির বৈজ্ঞানিক প্রমাণ সমানভাবে প্রতিষ্ঠিত নয়। তাই বিশ্বাস ও চিকিৎসাবিজ্ঞানের ক্ষেত্রকে আলাদা করে বোঝা উচিত।

শিষ্য: গুরুদেব, বিভিন্ন দেবতার পূজায় কি বিভিন্ন রঙের চন্দন ব্যবহৃত হয়?

গুরু: হ্যাঁ, বহু প্রাচীন আচারেই এমন রীতি দেখা যায়। ভগবান বিষ্ণু ও তাঁর অবতারদের পূজায় সাধারণত সাদা বা হলুদ চন্দন ব্যবহৃত হয়।

দেবী দুর্গার উপাসনায় লাল চন্দনের বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে।

সরস্বতী, লক্ষ্মী ও গায়ত্রী মন্ত্রের জপে সাদা চন্দনের মালা ব্যবহারকেও বহু আচার্য শুভ বলে বর্ণনা করেছেন। শিবের পূজায় চন্দনের পাশাপাশি ভস্মেরও বিশেষ মাহাত্ম্য রয়েছে।

শিষ্য: গুরুদেব, অনেকে বলেন চন্দন ঘরে শুভশক্তি নিয়ে আসে।

গুরু: দেখ, যেখানে পরিচ্ছন্নতা, সুগন্ধ, ভক্তি ও নিয়মিত উপাসনা থাকে, সেখানে মানুষের মনও শান্ত থাকে। চন্দনের সুগন্ধ সেই পরিবেশকে আরও পবিত্র ও স্নিগ্ধ করে তোলে। তাই বহু পরিবারে আজও পূজার সময় চন্দনের ধূপ, তিলক বা প্রলেপের ব্যবহার চলে আসছে।

তবে মনে রেখ, শুভশক্তির সবচেয়ে বড় উৎস কোন বস্তু নয়—মানুষের নির্মল মন, সৎকর্ম এবং ঈশ্বরের প্রতি আন্তরিক ভক্তি।

শিষ্য: গুরুদেব, লোকমুখে তো আরও নানা কথা শোনা যায়—চন্দন নাকি গ্রহদোষ দূর করে, সংসারের অশান্তি কমায়, ধন-সম্পদ বৃদ্ধি করে। এই কথাগুলোর মধ্যে কতখানি সত্য?

গুরু: বৎস, মানুষের বিশ্বাস, শাস্ত্রের ব্যাখ্যা এবং বাস্তব অভিজ্ঞতা—এই তিনকে কখনো এক করে ফেলবে না।

চন্দনের কিছু গুণ প্রকৃতিগত—তার শীতলতা, তার সুগন্ধ, তার স্নিগ্ধতা। আবার কিছু বিষয় আছে, যা যুগ যুগ ধরে ধর্মীয় আচার, লোকবিশ্বাস ও জ্যোতিষশাস্ত্রের সঙ্গে জড়িয়ে এসেছে। সেই বিশ্বাসকে সম্মান করা যায়, কিন্তু অন্ধভাবে গ্রহণ করা উচিত নয়।

শিষ্য: তাহলে শাস্ত্রে চন্দনের ব্যবহার কেন এত বেশি?

গুরু: কারণ চন্দন মানুষের মনকে ঈশ্বরমুখী করে। যখন তুমি নিজের হাতে চন্দন ঘষো, তখন তোমার মধ্যে ধৈর্য জন্মায়। যখন দেবতার শ্রীঅঙ্গে তা নিবেদন করো, তখন অহংকার কমে। যখন নিজের কপালে তিলক পর, তখন মনে পড়ে—আমি শুধু দেহ নই, আমি চৈতন্যের সন্তান। এই স্মরণই মানুষের সবচেয়ে বড় আশীর্বাদ।

 জ্যোতিষশাস্ত্রে অনেকেই মনে করেন, বিভিন্ন গ্রহের সঙ্গে বিভিন্ন উপাদানের এক প্রতীকী সম্পর্ক রয়েছে। সেই কারণেই কোথাও লাল চন্দন, কোথাও সাদা চন্দন, কোথাও আবার কেশর মিশ্রিত চন্দনের ব্যবহার দেখা যায়। কিন্তু মনে রেখ—কোনো বস্তুই মানুষের কর্মের বিকল্প হতে পারে না।

শিষ্য: অর্থাৎ শুধু চন্দন ব্যবহার করলেই ভাগ্য বদলে যাবে—এমন কথা বলা ঠিক নয়?

গুরুদেব স্নিগ্ধ হাসলেন।
গুরু: যদি তাই হত, তবে চন্দনের বনে জন্মানো প্রতিটি মানুষই মহাপুরুষ হয়ে উঠত।
ভাগ্য পরিবর্তনের মূল ভিত্তি তিনটি—সৎকর্ম, সৎচিন্তা এবং ঈশ্বরের প্রতি আন্তরিক সমর্পণ। চন্দন সেই সাধনার একটি পবিত্র সহায়ক মাত্র।

শিষ্য: গুরুদেব, অনেকেই বলেন ঘরে প্রতিদিন চন্দনের ধূপ জ্বালালে অশুভ শক্তি দূরে থাকে।

গুরু: ধূপের সুগন্ধ পরিবেশকে নির্মল ও মনোরম করে। পরিচ্ছন্ন গৃহ, সুগন্ধময় পরিবেশ এবং নিয়মিত প্রার্থনা মানুষের মনে ইতিবাচক প্রভাব ফেলে। সেই কারণেই বহু প্রাচীনকাল থেকে ধূপ, দীপ ও চন্দনের ব্যবহার চলে আসছে।

কিন্তু যদি ঘরে মিথ্যা, লোভ, হিংসা ও অহংকার বাস করে, তবে কেবল সুগন্ধ দিয়ে সেই অশুভ শক্তিকে দূর করা যায় না।

শিষ্য: গুরুদেব, তাহলে প্রকৃত শুভশক্তি কোথায়?

গুরুদেব দূরের অস্তমিত সূর্যের  দিকে তাকিয়ে দিলেন উত্তর: যেখানে সত্য আছে, সেখানেই শুভশক্তি। যেখানে করুণা আছে, সেখানেই দেবত্ব।
যেখানে ক্ষমা আছে, সেখানেই লক্ষ্মীর বাস। আর যেখানে মানুষের হৃদয় চন্দনের মত শীতল ও সুগন্ধময়, সেখানে ঈশ্বর স্বয়ং অবস্থান করেন।

শিষ্যের চোখে এক অদ্ভুত আলো ফুটে উঠল। সে অনুভব করল—এতদিন সে চন্দনের গন্ধ চিনত, আজ সে চন্দনের দর্শন উপলব্ধি করতে শুরু করেছে।
গুরুদেব এবার আসন ত্যাগ করে আশ্রমের প্রাচীন চন্দনগাছটির দিকে এগিয়ে গেলেন। গাছের কাণ্ডে স্নেহভরে হাত রেখে তিনি শিষ্যকে বললেন, “বৎস, চন্দনের সবচেয়ে বড় শিক্ষা জানো কী?
কুঠারের আঘাতে যে তাকে কেটে ফেলে, সেই কুঠারের ফলাকেও সে নিজের সুগন্ধে ভরিয়ে দেয়।

এই পৃথিবীতে তুমিও তেমন মানুষ হও। যে তোমায় আঘাত করবে, তার প্রতিও বিদ্বেষ নয়—নিজের চরিত্রের সুগন্ধই দান করবে। সেই দিনই বুঝবে, চন্দনের প্রকৃত তিলক কপালে নয়, মানুষের অন্তরে ধারণ করতে হয়।”

শিষ্য গভীর শ্রদ্ধায় গুরুদেবের দিকে তাকিয়ে রইল। সন্ধ্যার বাতাসে চন্দনের সুগন্ধ আরও যেন স্পষ্ট হয়ে উঠল। তার মনে হলো—আজ সে কেবল চন্দনের কথা শুনল না, নিজের অন্তরের শুদ্ধতার পথেরও পাঠ গ্রহণ করছে।

(আগামী সংখ্যায় শেষ)

(এরকমভাবে প্রশ্নোত্তরের মাধ্যমে আধ্যাত্মিক জগতের বিশেষ সকল তত্ত্ব ও তথ্য  আরো বেশী ভালোভাবে জানতে পড়ুন লেখকের অনন্তের জিজ্ঞাসা ৫ খণ্ড। Whatsapp করুন জয় মা তারা পাবলিশার্স 9153391909)

#Chandan #ChandanMahatmya #SanatanDharma #Hinduism #Spirituality #Mahadev #Bhakti #harharmahadev

Sunday, 14 June 2026

পুরুষোত্তম মাসের শেষ অমাবস্যা: আমাদের কি করা উচিৎ?

পুরুষোত্তম মাসের শেষ অমাবস্যা: আমাদের কি করা উচিৎ?

আগামীকাল সোমবার পুরুষোত্তম মাসের শেষ অমাবস্যা পড়েছে। এই অমাবস্যা বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ, কারণ এটি তিন বছর অন্তর আগত পুরুষোত্তম মাসের অমাবস্যা এবং সোমবারে পড়ায় একে সোমবতী অমাবস্যাও বলা হয়। এই তিথিতে পূর্বপুরুষদের আশীর্বাদ লাভের বিশেষ সুযোগ রয়েছে।
    হিন্দু ধর্মে প্রতিটি তিথি ও প্রতিটি দিন কোনো না কোনো দেবদেবীর উদ্দেশে নিবেদিত। অমাবস্যা তিথির অধিষ্ঠাতা হলেন পিতৃদেবতা। তাই এই দিনটি পিতৃস্মরণ, পিতৃপূজা ও পিতৃতর্পণের জন্য অত্যন্ত শুভ বলে বিবেচিত।
     শাস্ত্রমতে, যদি পূর্বপুরুষরা সন্তুষ্ট না হন, তবে জীবনের বহু ক্ষেত্রে বাধা সৃষ্টি হতে পারে। তাই অমাবস্যার দিনে তাঁদের স্মরণ করা, আশীর্বাদ প্রার্থনা করা, দান-পুণ্য করা, তাঁদের ছবি বা স্মৃতির সামনে শ্রদ্ধা নিবেদন করা এবং তিল-তর্পণ করা বিশেষ ফলদায়ক বলে মানা হয়।
     অনেকেই তাঁদের প্রিয় খাদ্য রান্না করে নিবেদন করেন এবং পরে কাক, গরু, পাখি বা পিঁপড়েদের খাদ্য দেন। বিশ্বাস করা হয়, এইসব প্রাণীর মাধ্যমে পিতৃলোকের আত্মারা সেই অর্ঘ্য গ্রহণ করেন।
     কেউ কেউ মনে করেন অমাবস্যা পালন করা উচিত নয়, আবার কারও বাড়িতে প্রবীণদের নিজস্ব নিয়ম থাকে। পরিবারের বড়দের মতামতকে সম্মান করেই চলা উচিত। তবে অমাবস্যার দিনে দান, তর্পণ ও পূর্বপুরুষদের স্মরণ করা সর্বদাই শুভ বলে শাস্ত্রে উল্লেখ রয়েছে।
     শাস্ত্র অনুযায়ী, এই দিনে যজ্ঞ, ব্রত, অনুষ্টান ও সংকল্প অত্যন্ত শুভ ফল প্রদান করে। অমাবস্যাকে কেবল পিতৃপক্ষের সঙ্গে যুক্ত করে দেখলে ভুল হবে। এই তিথির সঙ্গে মহালক্ষ্মীরও গভীর সম্পর্ক রয়েছে। ধন, ঐশ্বর্য, যশ, স্থায়ী সমৃদ্ধি এবং সংসারে লক্ষ্মীর কৃপা লাভের জন্যও এই দিনটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
দীপাবলির মতো মহাশুভ লক্ষ্মীপূজাও অমাবস্যাতেই অনুষ্ঠিত হয়। তাই অমাবস্যাকে কখনও অশুভ ভেবে অবহেলা করা উচিত নয়।
      এই দিনে সম্পূর্ণ কালো উড়দ ডাল, কম্বল ইত্যাদি দান শুভ বলে মনে করা হয়। এর ফলে পিতৃলোকের আত্মারা তৃপ্ত হন এবং রাহু-কেতুর অশুভ প্রভাবও প্রশমিত হয় বলে বিশ্বাস।
      পাখিদের খাদ্যদান বিশেষ পুণ্যজনক বলে বিবেচিত। কাককে ক্ষীর বা পনিরজাতীয় খাদ্য নিবেদন করাও বহু স্থানে প্রচলিত, কারণ ধর্মীয় বিশ্বাস অনুযায়ী পূর্বপুরুষরা কাকের রূপে এসে সেই অন্ন গ্রহণ করেন। এর মাধ্যমে পরিবারে সুখ, সমৃদ্ধি, যশ ও সাফল্য বৃদ্ধি পায় বলে মনে করা হয়।
বিশেষ করে এই অমাবস্যায় জলাভিষেক, অশ্বত্থ গাছে কাঁচা দুধ অর্পণ, কালো তিল নিবেদন, প্রদীপ প্রজ্বলন, দান-পুণ্য, পিতৃস্মরণ এবং তাঁদের ছবির সামনে সর্ষের তেলের চারমুখী প্রদীপ জ্বালানো শুভ বলে উল্লেখ করা হয়েছে। সাদা ফুল নিবেদন, অশ্বত্থ বৃক্ষরোপণ ও পূজা, হোম-যজ্ঞ এবং পূর্বপুরুষদের প্রিয় খাদ্য দান করাও বিশেষ ফলদায়ক বলে ধরা হয়।
     যাঁরা কালসর্প দোষের প্রতিকার করতে চান, তাঁদের জন্য নাগ-নাগিনের বিধিবদ্ধ পূজা করে গঙ্গা বা যমুনায় বিসর্জনের কথাও বলা হয়।
অমাবস্যার রাতে মহালক্ষ্মীর মন্ত্রজপ, গোলাপ ফুল নিবেদন এবং রাত্রিজাগরণ করে পূজা করাও শুভ বলে বিবেচিত।
     রাহু-কেতুর কষ্ট থেকে মুক্তির উদ্দেশ্যে জুতো, ছাতা, উড়দ ডাল, সর্ষের তেল, কালো রঙের চটি, চা-পাতা, কম্বল ও বেগুন দান করার কথাও বলা হয়েছে। দরিদ্র মানুষের মধ্যে খাদ্যশস্য, চাল, তেল ও ঋতুভিত্তিক বস্ত্র বিতরণ, গোশালায় দান, গরুকে সবুজ ঘাস, গুড় ও খাদ্য প্রদান এবং ঘি দান করাও পুণ্যস্বরূপ বিবেচিত।
    যদি সম্ভব হয়, এই দিনে গঙ্গাস্নান বা গঙ্গায় ডুব দেওয়া অত্যন্ত শুভ বলে বিশ্বাস করা হয় এবং বহু বছরের দুঃখ-কষ্ট দূর হয় বলে লোকবিশ্বাস রয়েছে।
     পুরুষোত্তম মাসের সমাপ্তি উপলক্ষে যাঁরা এই মাসে কিছু খাদ্য বা ব্যবহার্য বস্তু ত্যাগ করেছিলেন, তাঁদের সেই বস্তুগুলি দান করার পরামর্শ দেওয়া হয়। যেমন—চটি, ছাতা, বেগুন, চা-পাতা, কম্বল কিংবা যে খাদ্যসামগ্রী ত্যাগ করা হয়েছিল, তা দরিদ্রদের মধ্যে বিতরণ করা। বিশেষভাবে খিচুড়ি বিতরণ এবং ক্ষীর রান্না করে পূর্বপুরুষ ও মহালক্ষ্মীকে নিবেদন করারও পরামর্শ দেওয়া হয়। পিতৃঅর্ঘ্যের জন্য সাধারণ সাদা ক্ষীর এবং মহালক্ষ্মীর নিবেদনের জন্য কেশর মিশ্রিত ক্ষীর অর্পণের কথাও বলা হয়েছে।
     সোমবার হওয়ায় মহাদেবের পূজাও এই দিনে বিশেষ ফলদায়ক বলে ধরা হয়। শিবলিঙ্গে দুধ, দই, মধু, চিনি ও ঘি নিবেদন করা শুভ।
এছাড়া সমগ্র গৃহে ঘণ্টা ও শঙ্খধ্বনি করা, লোবানের ধোঁয়া দেওয়া, সমস্ত আলো জ্বালানো, ঘর পরিষ্কার করা, গঙ্গাজল ও গোলাপজল মিশিয়ে মেঝে মোছা, প্রবেশদ্বারে তোরণ ও আমপাতা সাজানো—এসবকেও সৌভাগ্য ও সমৃদ্ধির প্রতীক হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে।
    সবশেষে সকল পূর্বপুরুষের প্রতি শ্রদ্ধা ও প্রণাম নিবেদন করে তাঁদের আশীর্বাদ কামনা করা হয়েছে, যাতে জীবনে সুখ, সমৃদ্ধি, যশ, সাফল্য এবং কোনো কিছুর অভাব না থাকে।
 #অমাবস্যা #spirituality #spiritualgrowth  #spiritualjourney #spiritualawakening

Thursday, 28 May 2026

মন্ত্র জপ কিভাবে করতে হয়? তারাশিস গঙ্গোপাধ্যায়

মন্ত্র জপ কিভাবে করতে হয়?
 তারাশিস গঙ্গোপাধ্যায়

রাতের অন্ধকার ঘরে যদি একটি ছোট প্রদীপও না জ্বলে, তবে চারপাশে যত মূল্যবান জিনিসই থাকুক, কিছুই চোখে পড়ে না। ঠিক তেমনি, মন্ত্রের ভিতরে যদি চৈতন্যের আলো না জাগে, তবে বছরের পর বছর জপ করেও তার আসল ফল অনুভব করা যায় না। নামের ক্ষেত্রে এর প্রয়োজন না হলেও বীজের ক্ষেত্রে এর দরকার পড়ে।
   আজকাল অনেকেই দেখা যায় মালা হাতে জপ করেন, ঠোঁট নড়ে, শব্দ উচ্চারিত হয়—কিন্তু অন্তরে কোনো কম্পন জাগে না। কারণ অধিকাংশ মানুষ জানেনই না, মন্ত্র শুধু কয়েকটি অক্ষরের সমষ্টি নয়; তারও একটি প্রাণ আছে, একটি সুপ্ত শক্তি আছে। সেই শক্তির কেন্দ্র লুকিয়ে রয়েছে মানুষের নিজের শরীরেই—মণিপুর চক্রে।
   শাস্ত্রে বলা হয়েছে, মন্ত্রকে জাগাতে না পারলে সে নিস্তব্ধ বীজের মতো পড়ে থাকে। আর অবোধ, অচৈতন্য মন্ত্র যতই জপ করা হোক না কেন, তার পূর্ণ শক্তি প্রকাশ পায় না। এই জন্যে স্বামী নিগমানন্দ আমাদের জন্যে বলে গেছেন সেই পথ। তাঁর দেখানো পথ কিছুটা সহজ করে বলছি সবার জন্যে।
____________________

মন্ত্র চৈতন্য কিভাবে করতে হয়?
_________________

মানুষের শরীর শুধু রক্ত-মাংসের দেহ নয়; এর ভিতরে আছে সূক্ষ্ম শক্তির বহু কেন্দ্র। তাদের মধ্যেই অন্যতম মণিপুর চক্র—অগ্নির কেন্দ্র, তেজের কেন্দ্র। তন্ত্র ও যোগশাস্ত্রে বলা হয়, সাধক যখন বীজ মন্ত্রজপের আগে মণিপুর চক্রে নিজের ইষ্টমন্ত্রের দীপ্ত রূপ কল্পনা করেন, তখন ধীরে ধীরে মন্ত্রে প্রাণ জাগতে শুরু করে। এই প্রক্রিয়াকেই বলা হয় “মন্ত্রচৈতন্য”।
  কিন্তু এই রহস্য আজ প্রায় হারিয়ে গেছে। উপযুক্ত গুরু না থাকায় অধিকাংশ মানুষ শুধু শব্দ জপ করেই জীবন কাটিয়ে দেন। যোগী ও সন্ন্যাসীদের মধ্যেও খুব কম মানুষ আছেন, যারা এই জপ রহস্যের প্রকৃত ক্রিয়া জানেন।
   এখন জপ রহস্য কেন প্রয়োজন? শুধু মালা ঘোরানোই বা কর জপই জপ নয়। শাস্ত্রে জপের আগে ও পরে কিছু বিশেষ আচার এবং মানসিক প্রস্তুতির কথা বলা হয়েছে, যেগুলোকে একত্রে বলা হয় “জপ রহস্য”। এর মধ্যে রয়েছে—
কুল্লুকা
সেতু
মহাসেতু
মুখশোধন
করশোধন
চক্রাসন
প্রাণায়াম
ধ্যান
জপ সমর্পণ
ইত্যাদি।
এই প্রতিটি ধাপের উদ্দেশ্য একটাই—সাধকের শরীর, মন, বাক্‌ এবং প্রাণকে এমনভাবে প্রস্তুত করা, যাতে মন্ত্রের শক্তি তার ভিতরে জেগে উঠতে পারে।
    সবার আগে জানতে হয় কুল্লুকা কী? এই “কুল্লুকা” হল এক ধরনের সূক্ষ্ম রক্ষাকবচ। জপের আগে সাধক নিজের চারপাশে এক অদৃশ্য শক্তিবলয় কল্পনা করেন। গুরুপ্রদত্ত মন্ত্র ও ধ্যানের মাধ্যমে তিনি অনুভব করেন, যেন চারদিক থেকে এক আলোকবৃত্ত তাকে রক্ষা করছে। এর ফলে বাইরের অশান্ত ভাবনা, নেতিবাচক শক্তি বা মানসিক অস্থিরতা সহজে জপে বাধা দিতে পারে না।
   এবার জানতে হবে সেতু কী?
“সেতু” মানে সংযোগ। জপের আগে নিজের মন, গুরু, ইষ্টদেবতা ও মন্ত্রের মধ্যে এক অভ্যন্তরীণ যোগ স্থাপন করাকেই সেতু বলা হয়।
কারণ মন যদি চারদিকে ছড়িয়ে থাকে, তবে জপ কেবল শব্দেই সীমাবদ্ধ থাকে। সেতুর মাধ্যমে মন ধীরে ধীরে একাগ্র হয়ে ইষ্টের দিকে প্রবাহিত হয়।
   এবার জানতে হবে মহাসেতু কী? মহাসেতু হল আরও গভীর অবস্থা। এখানে সাধক অনুভব করতে শুরু করেন—তিনি আলাদা কেউ নন; মন্ত্র, ইষ্ট ও তাঁর নিজের চেতনা যেন একসূত্রে মিশে যাচ্ছে। তখন আর মনে হয় না “আমি জপ করছি”; বরং মনে হয়, মন্ত্র নিজেই ভিতরে জেগে উঠে নিজেকে জপ করছে।
   এবার জানত হবে করশোধন কী? করশোধন মানে হাতের শুদ্ধি। কারণ তন্ত্রমতে হাত শুধু শরীরের অঙ্গ নয়—এ শক্তির বাহন। জপ, পূজা বা ন্যাসের আগে হাত ধুয়ে, নির্দিষ্ট মুদ্রা ও মন্ত্রস্মরণের মাধ্যমে হাতকে পবিত্র ও শক্তিময় করা হয়।
এর উদ্দেশ্য হল, সাধকের স্পর্শ যেন সাধারণ স্পর্শ না থেকে সাধনার অংশ হয়ে ওঠে।
    মুখশোধনের প্রয়োজন
মন্ত্র উচ্চারণের প্রধান মাধ্যম হল বাক্‌শক্তি। তাই জপের আগে মুখশোধন করা হয়।
আচমন, প্রণব স্মরণ ও বাক্‌দেবীর ধ্যানের মাধ্যমে সাধক নিজের বাক্যকে শুদ্ধ করার চেষ্টা করেন, যেন মুখ থেকে বের হওয়া প্রতিটি মন্ত্রশব্দ শক্তিতে পূর্ণ হয়।
   আর জানতে হবে জপ সমর্পণ কেন জরুরি!
অনেকেই জপ করেন, কিন্তু শেষে সেই জপ ঈশ্বরকে সমর্পণ করেন না। ফলে জপের শক্তি ধীরে ধীরে অহংকার বা ব্যক্তিগত কামনায় ক্ষয় হয়ে যায়।
   শাস্ত্রে বলা হয়েছে, জপ শেষে বিনম্রচিত্তে সমস্ত সাধনাফল ঈশ্বরের চরণে অর্পণ করতে হয়। তখনই জপ নিষ্কাম হয়, শান্ত হয়, গভীর হয়।
   সাধকের করণীয়
তিনি শাক্ত হোন বা বৈষ্ণব—সব সাধকেরই উচিত জপের আগে অন্তর ও চেতনার প্রস্তুতি নেওয়া।
  কুল্লুকা, সেতু, মহাসেতু, মুখশোধন, করশোধন—এই সমস্ত জপ রহস্যের ধাপ শাস্ত্রীয় নিয়মে সম্পন্ন করে, পরে ভক্তিভরে জপ সমর্পণ করতে হয়। কারণ মন্ত্র কেবল শব্দ নয়। মন্ত্র এক জীবন্ত শক্তি। যে মুহূর্তে সেই শক্তি জেগে ওঠে, সেই মুহূর্তে জপ আর ঠোঁটের কাজ থাকে না—তা হয়ে ওঠে আত্মার যাত্রা।

#মন্ত্র_চৈতন্য
#জপ_রহস্য
#তন্ত্রসাধনা
#মণিপুর_চক্র
#SpiritualAwakening
#KundaliniAwakening
#MantraPower
#Meditation
#SanatanDharma
#MysticIndia

Friday, 22 May 2026

কৃপা কাকে বলে? তারাশিস গঙ্গোপাধ্যায়

সত্যকার কৃপা মানুষের ইচ্ছাপূরণের মধ্যে লুকিয়ে থাকে না। আমরা সাধারণ মানুষ, তাই জীবনের অধিকাংশ সময় ব্যয় করি প্রাপ্তির পেছনে ছুটে—অর্থ, প্রতিষ্ঠা, যশ, বৈভব, সুখস্বাচ্ছন্দ্য। মনে করি, যেদিন জীবনের সমস্ত অভাব পূর্ণ হবে, সেদিনই বুঝি ঈশ্বরের কৃপা আমাদের উপর নেমে আসবে। কিন্তু এ এক গভীর ভুল। কারণ ধনসম্পদ, যশ বা ভোগের প্রাচুর্য কখনও কৃপা হতে পারে না। ইতিহাসে কত অসুর, কত নিষ্ঠুর মানুষও তো অপরিসীম ঐশ্বর্যের অধিকারী হয়েছে। পূর্বজন্মের সুকৃতি, কর্মফলের অদৃশ্য সঞ্চয় তাদের হাতে সেই প্রাপ্তি এনে দিয়েছে। কিন্তু তাকে কৃপা বলা যায় না। কৃপা হল অন্য এক জিনিস—অন্তরের ভূমিতে এক নীরব বিপ্লব।

ভগবান যখন মানুষের প্রতি সত্যকার অনুগ্রহ করেন, তখন তিনি প্রথমে মানুষের জীবনে এনে দেন সৎসঙ্গ। কারণ অন্ধকারের মধ্যে দাঁড়িয়ে মানুষ কখনও আলোকে চিনতে পারে না; আলোকে জানতে হলে আলোর সংস্পর্শ প্রয়োজন। মহাত্মাদের সান্নিধ্য, শুভ চিন্তার পরশ, পবিত্র নামের ধ্বনি—এই সবই মানুষের অন্তরে প্রথম জাগিয়ে তোলে এক অদ্ভুত অস্থিরতা। সে বুঝতে শেখে, এতদিন যাকে জীবন ভেবেছিল, তা কেবল জীবনের বহিরঙ্গের আবরণ। এর নেপথ্যে আরও এক গভীর সত্য আছে।

কিন্তু সৎসঙ্গের পরেই আসে দ্বিতীয় দান—প্রতিকূলতা। এবং এই প্রতিকূলতাই হল ঈশ্বরের সবচেয়ে গুপ্ত কৃপা।
মানুষ সাধারণত যা চায়, জীবন ঠিক তার উল্টো পথেই তাকে নিয়ে যায়। আমরা চাই নিশ্চিন্ত সুখ, অথচ হঠাৎ চারদিক অশান্ত হয়ে ওঠে। আমরা চাই প্রিয়জনের অবিচল স্নেহ, অথচ সম্পর্কের ভিতরে দেখা দেয় ভাঙন। আমরা চাই নিরাপত্তা, অথচ জীবন হঠাৎ অনিশ্চয়তার ঝড় তোলে। তখন বিস্মিত হয়ে মানুষ প্রশ্ন করে—সংসার এত অনিত্য? এত ছলনা, এত অবিচার, এত মিথ্যা এর বুকে লুকিয়ে আছে?এই প্রশ্নের মধ্য দিয়েই শুরু হয় জাগরণ।

যতদিন মানুষ ভোগের মোহে ডুবে থাকে, ততদিন তার চেতনা বহির্মুখী থাকে। সুখের অবিরল প্রবাহ মানুষকে নিদ্রিত করে রাখে। সে ভুলে যায় মৃত্যুকে, ভুলে যায় নশ্বরতাকে, ভুলে যায় নিজের আত্মার প্রকৃত ক্ষুধাকে। তাই প্রতিকূলতা না এলে বৈরাগ্যের জন্ম হয় না। দুঃখই প্রথম মানুষকে শেখায়—এই পৃথিবী চিরআশ্রয় নয়। এই উপলব্ধির মুহূর্তেই মানুষ অন্তরে অন্তরে আশ্রয় খুঁজতে শুরু করে এমন এক সত্তার, যিনি পরিবর্তনের অতীত, যিনি ভাঙনের অতীত, যিনি মৃত্যুর অতীত।

সেই আশ্রয়ের নামই ঈশ্বর।
এইজন্যেই দেখা যায়, পৃথিবীর প্রায় সকল মহাত্মার জীবনেই আলোর আহ্বানের আগে নেমে এসেছে গভীর অন্ধকার। প্রতিকূলতা তাদের ভেঙে দেয়নি; বরং সমস্ত বাহ্যিক নির্ভরতা ভেঙে দিয়ে তাদের ঠেলে দিয়েছে অন্তরের দিকে। দুঃখ তখন আর অভিশাপ থাকে না, হয়ে ওঠে পথপ্রদর্শক। যে মানুষ একদিন সংসারের ক্ষণস্থায়ী সুখকে চরম সত্য বলে জেনেছিল, সেই মানুষই প্রতিকূলতার আগুনে দগ্ধ হয়ে উপলব্ধি করে—স্থায়ী শান্তি কেবল ঈশ্বরের সান্নিধ্যেই।

তাই জীবনে যখন প্রতিকূলতা আসে, তখন তাকে কেবল দুর্ভাগ্য বলে ভয় পেও না। কখনও কখনও সেই অন্ধকারের মধ্যেই ঈশ্বর মানুষের জন্য খুলে দেন আলোর দ্বার। তিনি মানুষকে নিজের দিকে ফিরিয়ে আনার জন্যই ভেঙে দেন তার মায়ার আশ্রয়। কারণ যে হৃদয় ভাঙে না, সে হৃদয়ে অনেক সময় আলোও প্রবেশ করতে পারে না।

সংসারে থেক, সংসারের কর্তব্য পালন কর, আপনজনকে ভালোবাসো—কিন্তু অন্তরের গভীরে সংসারী হয়ে থেকো না। বাইরের জীবন চলুক স্বাভাবিক নিয়মে, অথচ ভিতরের দৃষ্টি ধীরে ধীরে ঘুরে যাক নশ্বর থেকে অবিনশ্বরের দিকে। মানুষের চিন্তাধারাই তাঁর প্রকৃত বাসস্থান। সেই চিন্তা যদি কেবল ক্ষণস্থায়ী লাভ-লোকসানের মধ্যে আবদ্ধ থাকে, তবে আত্মা ক্রমশ সংকীর্ণ হয়ে পড়ে। আর যদি সেই চিন্তা ঈশ্বরমুখী হয়, তবে জীবন ধীরে ধীরে এক অন্য আলোয় উদ্ভাসিত হয়।
তাই তারাশিস গঙ্গোপাধ্যায় বলে, ঈশ্বরকে ভালোবাসতে হয় কোনও প্রাপ্তির আশায় নয়। অধিকাংশ মানুষ ঈশ্বরের কাছে যায় চাওয়ার ঝুলি নিয়ে—সুখ চাই, সম্পদ চাই, বিপদমুক্তি চাই। কিন্তু সত্যকার ভক্তি সেখানে জন্মায়, যেখানে মানুষ বলে—“আমি তোমাকেই চাই, তোমার দান নয়।”

যেমন ধর, কেউ রাধানাম জপ করছে। শুধু ঠোঁটে উচ্চারিত “রাধা রাধা” শব্দই জপ নয়। জপ তখনই সত্য হয়, যখন সমগ্র সত্তা নামের মধ্যে ডুবে যেতে শুরু করে। বাইরে যেদিকে চোখ যায়, মনে হয় যেন বাতাসের বুকে অদৃশ্য অক্ষরে লেখা আছে—রাধা। চারদিকের সমস্ত শব্দধারার মধ্যে যেন শোনা যায় সেই এক নামের অনুরণন। আর অন্তরের গভীরে, হৃদয়ের নীরবতম স্তরে, অবিরাম প্রবাহিত হতে থাকে সেই জপ।
যখন বাইরের বিশ্ব, অন্তরের অনুভব এবং নামের ধ্বনি একাকার হয়ে যায়—তখনই জন্ম নেয় সত্য জপ। তখন নাম আর কেবল শব্দ থাকে না; হয়ে ওঠে অস্তিত্বের স্পন্দন। মানুষ তখন আর আলাদা সত্তা হয়ে থাকে না—সে ধীরে ধীরে বিলীন হতে থাকে সেই চিরন্তন প্রেমের সাগরে, যেখানে সমস্ত দুঃখ, সমস্ত প্রতিকূলতা, সমস্ত অহংকার অবশেষে শান্ত হয়ে আসে সন্ধ্যার শেষ আলোর মত।

#Spirituality
#DivineGrace
#ঈশ্বরের_কৃপা
#আত্মজাগরণ
#বৈরাগ্য
#আধ্যাত্মিকতা
#সৎসঙ্গ

Thursday, 10 July 2025

শ্বাসের অন্তর্লীন রহস্য

 

মানুষের জীবনে কিছু বিষয় আছে—অতি নীরব, অতি সাধারণ—তবু তাদের গভীরতা অনন্ত। শ্বাস-প্রশ্বাস তেমনই এক বিস্ময়। জন্মের মুহূর্তে প্রথম যে ক্রিয়াটি আমরা করি, মৃত্যুর আগে শেষ যে কাজটি আমাদের ছেড়ে যায়—তা এই শ্বাস। অথচ সারাজীবন আমরা তার দিকে প্রায় দৃষ্টিই দিই না।
কখনো ভেবে দেখেছি কি—একজন সাধারণ মানুষ আর একজন মহাপুরুষের মধ্যে প্রকৃত পার্থক্য কোথায়? বাহ্যিক আচরণে নয়, বিদ্যাবুদ্ধিতেও নয়—বরং এই অতি সূক্ষ্ম, নীরব শ্বাসের মধ্যেই যেন তার গুপ্ত সংকেত লুকিয়ে আছে।
প্রাচীন তান্ত্রিক গ্রন্থ বিজ্ঞান ভৈরব তন্ত্র-এ এক অপূর্ব তত্ত্বের উল্লেখ পাওয়া যায়। বলা হয়েছে—শ্বাস গ্রহণ ও ত্যাগের মাঝখানে যে ক্ষুদ্রতম বিরতি, সেই ক্ষণিক স্থিতিই ‘ভৈরবী স্থিতি’। এই বিরতি এত সূক্ষ্ম যে সাধারণ মন তা টেরই পায় না, কিন্তু যোগীরা বলেন—এই স্থিরতার মধ্যেই আছে চেতনার গভীরতম দরজা।
গ্রামের ভোরবেলায় যেমন কুয়াশার আবরণ ধীরে ধীরে সরে গিয়ে প্রকৃতির আসল রূপটি প্রকাশিত হয়, তেমনি মনও যখন শ্বাসের এই সূক্ষ্ম ছন্দে স্থির হয়, তখন তার অন্তর্লীন প্রকৃতি ধীরে ধীরে উন্মোচিত হতে থাকে।
শিবের প্রাচীন উপদেশে “সোহম” মন্ত্রের উল্লেখ পাওয়া যায়—
শ্বাস গ্রহণে “সো”, ত্যাগে “হম”।
এ যেন প্রকৃতির নিজস্ব সঙ্গীত, যা মানুষের শরীরেই প্রতিনিয়ত বাজছে, অথচ আমরা তার সুর শুনতে পাই না।
এই “সোহম” কেবল কোনো শব্দ নয়, এটি এক অনুভব—
আমি এই বিশ্ব থেকে আলাদা নই, আমি সেই বিশ্ব-চেতনারই অংশ। অদ্বৈত বেদান্তের ভাষায়—“অহং ব্রহ্মাস্মি”—এই উপলব্ধিই ধীরে ধীরে মনকে প্রসারিত করে, সীমাবদ্ধতা ভেঙে দেয়।
মানুষের শরীরে তিনটি প্রধান নাড়ীর কথা বলা হয়—ইড়া, পিঙ্গলা ও সুষুম্না। এগুলো কোনো দৃশ্যমান শিরা নয়, বরং এক ধরনের সূক্ষ্ম শক্তিপথের ধারণা। সাধারণ অবস্থায় আমাদের চেতনা ইড়া ও পিঙ্গলার দ্বৈত প্রবাহে আবদ্ধ থাকে—কখনো ভাবনা, কখনো কর্ম, কখনো দ্বন্দ্ব। কিন্তু যখন শ্বাসের ছন্দ গভীর ও সমান হয়, তখন এই দুই প্রবাহের মিলনে সুষুম্নার পথ উন্মুক্ত হয়—মন তখন এক অদ্ভুত শান্তিতে স্থির হয়ে পড়ে।
এই অবস্থাকে অনেকেই অলৌকিক বলে বর্ণনা করেন। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে এটি কোনো জাদু নয়—এ এক গভীর মনস্তাত্ত্বিক ও শারীরিক প্রক্রিয়া। ধীর, গভীর শ্বাস আমাদের স্নায়ুতন্ত্রকে শান্ত করে, মনোযোগকে কেন্দ্রীভূত করে, এবং চেতনার স্তরকে সূক্ষ্মতর করে তোলে।
তবে একটি বিষয় এখানে বিশেষভাবে লক্ষণীয়—এই প্রক্রিয়াকে কেবল “ইচ্ছাপূরণের যন্ত্র” বা অলৌকিক ক্ষমতা অর্জনের উপায় হিসেবে দেখলে ভুল হবে। প্রাচীন সাধকেরা কখনোই এই সাধনাকে বাহ্যিক লাভের জন্য ব্যবহার করতে বলেননি। তাদের লক্ষ্য ছিল অন্তরের স্বচ্ছতা, স্থিরতা, এবং আত্ম-উপলব্ধি।
আজকের ব্যস্ত জীবনে মানুষ নানা দুশ্চিন্তা, ক্লান্তি ও অস্থিরতার মধ্যে ঘেরা। এই অবস্থায় যদি কেউ প্রতিদিন কিছু সময় নীরবে বসে নিজের শ্বাসের দিকে মন দেয়—তার ভেতরে এক অদ্ভুত পরিবর্তন আসতে বাধ্য।
শ্বাস তখন আর শুধু বেঁচে থাকার উপায় থাকে না—
সে হয়ে ওঠে এক সেতু,
যা বাহ্য জগতের কোলাহল থেকে অন্তরের নীরবতার দিকে নিয়ে যায়।
শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটা খুব সহজ—
আমরা কি কখনো নিজের শ্বাসকে সত্যিই অনুভব করেছি?
হয়তো উত্তরটি খুঁজতে খুব দূরে যেতে হবে না—
নিজের মধ্যেই,
প্রতিটি নিঃশ্বাসের গভীরে,
নীরবে সে অপেক্ষা করে আছে।

Sunday, 5 May 2024

একাদশীর উপবাস পালন কি সবার জন্যেই বাধ্যতামূলক? আর একাদশী করলে সধবাদের ক্ষতি হয় এটা কি সত্যি? লিখছেন তারাশিস গঙ্গোপাধ্যায়।

লেখকের website -  https://www.tarashisgangopadhyay.in/


প্রশ্ন - একাদশীর উপবাস পালন কি সবার জন্যেই বাধ্যতামূলক? আর একাদশী করলে সধবাদের ক্ষতি হয় এটা কি সত্যি?

    তারাশিস গঙ্গোপাধ্যায় : এটি এক দীর্ঘ আলোচনার বিষয়। এই ক্ষেত্রে প্রথমেই বলব - উপবাস মানে কি? সাধারণ ভাবে আমরা উপবাস বলতে বুঝি অনশন। কিন্তু প্রাচীন
শাস্ত্র অর্থাৎ শতপথ ব্রাহ্মণ, ঐতরেয় ব্রাহ্মণ প্রভৃতি গ্রন্থে উপবাস শব্দের অর্থ ছিল 'নিকটে বাস'। (যেহেতু উপ শব্দের অর্থ হল নিকট।)
অর্থাৎ নিয়ম পালনপূর্বক শুদ্ধ বস্ত্র পরে ঈশ্বরস্তুতি করতে করতে যজ্ঞের অগ্নির কাছে বাস করাটাই ছিল উপবাস। এখানে কিন্তু উপবাস শব্দের
অর্থ অনশন বা অনাহার ছিল না। কারণ, ব্রতোপযোগী আহারের ব্যবস্থার কথা এসব গ্রন্থে দেয়া আছে। তবে আহারের সাথে যেহেতু মলমূত্র ত্যাগের সম্বন্ধ রয়েছে তাই কিছু না খেয়ে সাত্বিকভাবে পূজায় অংশগ্রহণ করাই ছিল বিধি। 
      কিন্তু পরে পৌরাণিক যুগে এই উপবাসের অর্থ বদলে যায়। ভবিষ্যপূরানে বলছে - সমস্তরকমের পাপকাজ তথা ইন্দ্রিয়ভোগ্য বিষয় থেকে নিজেকে সরিয়ে নিয়ে আহারের প্রতি আসক্তি ত্যাগ করে সাত্ত্বিক গুণ ধারণ করে ব্রত পালনই হল উপবাস। রামায়ণের অযোধ্যাকাণ্ডের ২৬তম অধ্যায়েও এই ব্রত উপবাসের উল্লেখ আছে। 
   এবার দেখা যাক - শাস্ত্র কি? শাস্ত্র হল স্মৃতি, শ্রুতি,তন্ত্র ও পুরাণ। স্মৃতি হল সমাজশাস্ত্র এবং শ্রুতি হল ধর্মশাস্ত্র। শাস্ত্র বিধান বলে - শ্রুতি  আর স্মৃতি শাস্ত্রে বিরোধ দেখা দিলে শ্রুতিই (বেদ) মানতে হয়। আবার স্মৃতি ও পুরাণে বিরোধ দেখা দিলে স্মৃতি মানতে হয়।
 আমরা আগেই দেখেছি যে বেদ, গীতা এবং সংহিতার কোথাও কিন্তু একাদশী নিয়ে উল্লেখ নেই।  
    এবার আসা যাক একাদশীর বিষয়ে। আমরা দেখেছি - মহাভারতে একাদশী তিথির উল্লেখ রয়েছে। সেই একাদশী কিন্তু স্ত্রী পুরুষ সধবা বিধবা সবার জন্যেই করতে বলা আছে। কিন্তু একাদশী বিষয়ে সবচেয়ে authentic 'একাদশী মাহাত্ম্য' বইয়ে এই প্রসঙ্গে যে সব নিয়মের উল্লেখ মেলে এবং শ্রীকৃষ্ণ ও যুধিষ্ঠিরের মধ্যে প্রত্যেক একাদশী নিয়ে যে আলোচনা পাওয়া যায়, সেগুলো মহাভারতে নেই। এছাড়া কোন বেদান্ত, উপনিষদ, গীতাসহ কোন বৈদিক শাস্ত্রে এই ব্রত পালনের প্রমাণ পাওয়া যায় না। একটি মত আছে - বৈষ্ণবদের  ক্রিয়াযোগসারে যে হরিবাসরের উল্লেখ আমরা পাই, সেটিই সম্ভবত সময়ের সাথে সাথে একাদশীর উপবাসে পরিনত হয়েছে। সেখানে বিধবাদের জন্যে   ইন্দ্রিয় ও মনের সংযম রাখার জন্যে অবশ্য পালনীয় একাদশীর কথা লেখা আছে। সেখান থেকেই সম্ভবত এই একাদশীর উদ্ভব। বিষ্ণু সংহিতা গ্রন্থেও আছে একাদশী তিথির উল্লেখ। তাই দেখা যাচ্ছে শ্রুতিতে একাদশীর উল্লেখ না থাকলেও বিভিন্ন স্মৃতিশাস্ত্রে একাদশী ব্রতের উল্লেখ মেলে। 
    এখন দেখা যাক একাদশী মানে কি? একাদশী একটি চান্দ্র তিথি। প্রতি মাসে কৃষ্ণ ও শুক্ল পক্ষে দুবার একাদশী তিথি পর্যায়ক্রমে আসে। শ্রীচৈতন্যমহাপ্রভু লীলাবিলাসের সময় একাদশী উপবাসের ব্রত প্রবর্তন করেন। সেদিক থেকে এটি একটি বৈষ্ণব প্রথা। হরিভক্তিবিলাসে শ্রীরূপ গোস্বামী একাদশীর মহিমা তুলে ধরেছেন। আর মহাপ্রভু যে ব্রত করতে বলেছেন তা পালন করা প্রতিটি বৈষ্ণবেরই অবশ্য কর্তব্য। 
  কিন্তু এখানে প্রশ্ন আসে - মূল একাদশী কি? পঞ্চ কর্মেন্দ্রিয় পঞ্চ জ্ঞানেন্দ্রিয় এবং এদের মূল চালিকাশক্তি মন - এই একাদশ ইন্দ্রিয় দমনের নাম হল একাদশী। একাদশী মানে শুধু না খেয়ে থাকা নয়। এই একাদশ ইন্দ্রিয় দমন হল প্রকৃত একাদশী। এই একাদশ ইন্দ্রিয় দমন না হলে স্থূল উপবাস শুধু করলে সব পাপ মোচন হবে এমনটা ভেবে নেয়া ভুল। তবে এটা বলা যায় যে একাদশী এই ইন্দ্রিয় দমনে সাহায্য করে। অবশ্যই যদি উপবাসের সাথে এই একাদশী নিষ্কাম জপের মাধ্যমে কাটানো যায়।
    একাদশীর নিয়মাবলী যদি দেখা যায় সেখানে বলা আছে - এই উপবাস নির্জলা পালন করতে হবে এবং সারা রাত জেগে হরিনাম করতে হবে। কিন্তু গীতায় রয়েছে শ্রীভগবানের উবাচ - অধিক নিরাহার ও অধিক রাত্রি জাগরণ যাঁরা করেন তাঁদের যোগসাধন হয় না। এছাড়া বিজ্ঞানের মত ধরলেও অনাহার ও রাত জাগরণ স্বাস্থ্যের পক্ষে ক্ষতিকর।
   আবার পৌরাণিক শাস্ত্র বলে  - একাদশীতে অন্নতে পাপ বিরাজ করে। তাই ওদিন অন্নসহ পঞ্চশস্য গ্রহণ করতে নিষেধ আছে। অন্নভোজন না করে অনুকল্প প্রসাদ গ্রহণ করা যায় যেমন জল,ফল, ইত্যাদি। আবার
স্কন্দপুরাণে বলা আছে 
একাদশীতে যে অন্নভোজন করে সে পিতা, মাতা , ভ্রাতা ও গুরু হত্যাকারী।
   এমন মন্তব্যের সমর্থন  কিন্তু কোন বৈদিক শাস্ত্রে নেই। বরং বৈদিক শাস্ত্রে অন্নকে ব্রহ্ম বলা হয়েছে। আর ব্রহ্মে পাপের প্রবেশ কিভাবে হয় এই সম্বন্ধে কোন মত আমার অন্তত জানা নেই। তাই এটিকে লোকাচার মেনে নেয়াই শ্রেয়। আর আমি ধর্মভীতিতে বিশ্বাসী নই। আমার লক্ষ্য মানুষের মনে জাগুক ধর্মপ্রীতি।
    তবে এটাও সত্যি যে ব্রত পালনের মাধ্যমে সংযম হয়। সংযমের ফলে একটা দিন ভালো কাজ করা হয় তথা খারাপ কাজ থেকে দূরে থাকা যায়। 
    আবার দেখ, এরকম পুরাণে আবার বলছে - সধবা নারীর শুধু একাদশী নয়, স্বামী জীবিত থাকলে যে কোন উপবাসব্রত করা শাস্ত্রে নিষেধ আছে। যেমন- 
  "পতৌ জীবতি যা নারী উপবাসব্রতং আচরেৎ,
 আয়ুষ্বংহরতেভর্তুর্মৃতানরকামিচ্ছতি।।
(পদ্মপুরাণ। সৃষ্টিখণ্ড।৩৪/৭৪)
অনুবাদ- যে স্ত্রী স্বামী জীবিত থাকতে উপবাস ব্রতের আচরন করে, সে স্বামীর আয়ু হরণ করে ও মৃত্যুর পর নরক গমন করে। একই নিষেধ অত্রি সংহিতার ১৩৬ নং শ্লোকেও বলা হয়েছে। কিন্তু আবার সেই মত ধরলে সধবাদের নীল ষষ্ঠীর উপবাস, কালীপূজার উপবাস, শিবরাত্রির উপবাস এবং দুর্গা অষ্টমীর উপবাস করা চলে না। অথচ এই ব্রত তো বহু মানুষ করছেন এবং তার সুফলও তাঁরা পাচ্ছেন। আসলে নানা পুরাণের নানা মত। যুগে যুগে মানুষের মুখে মুখে ফিরতে ফিরতে এমন কত কাহিনী যোগ হয়েছে।
    তবে এর একটা প্রতিকারের কথাও বলা আছে একাদশীর ক্ষেত্রে। যেখানে স্বামী স্ত্রী উভয়ে মিলে একাদশী করেন সেখানে কিন্তু একাদশী দুজনকেই শুভ ফল প্রদান করে। সেখানে কারোর দুর্ভাগ্য নেমে আসে না কিন্তু।
   আবার দেখ, একই পদ্মপুরানের উত্তরখণ্ডে মেলে একাদশী ব্রতের স্তুতি -
  "দুর্ভাগা যা করোত্যেনাং সা স্ত্রী সৌভাগ্যমাপ্নুয়াৎ।
লোকানাঞ্চৈব সর্ব্বোষাং ভুক্তিমুক্তিপ্রদায়িনী।।"
[ পদ্মপুরাণ, উত্তরখন্ড, ৪৮।৪ ]
  অর্থাৎ যে দুর্ভাগা স্ত্রী একাদশী ব্রত আচরণ করেন, তিনি সৌভাগ্য লাভ করেন। এই একাদশী ব্রত সর্বলোকের ভুক্তিমুক্তিপ্রদায়িনী, সর্ব্বপাপহারিণী ও গর্ভবাসনিবারিণী। 
  তাই এটা নিঃসন্দেহে বলা যায় যে একাদশী ব্রত মানুষের ভিতরের সংযম আনতে সাহায্য করে। তাই একাদশী না করার যুক্তির চেয়ে একাদশী করারই যুক্তি শ্রেয়। আর যদি একান্ত একাদশী ব্রত পালন না করা যায় কোন কারণে তাহলে পঞ্চ মহাযজ্ঞ করলেও একই ফল হবে।
     এখন দেখা যাক এই পঞ্চ মহাযজ্ঞ কি? 
     পঞ্চমহাযজ্ঞ হল আত্মার উত্তরণের বৈদিক পথ। এর মধ্যে প্রথম হল ব্রহ্মযজ্ঞ। 
ব্রহ্মযজ্ঞ হল ব্রহ্মকে জানার প্রচেষ্টা। এই ব্রহ্মকে জানলেই যে  জন্মমৃত্যুর চক্র থেকে মুক্তিরূপ মোক্ষের দিকে এগোনো সম্ভব। ব্রহ্মকে জানার যেকোন প্রচেষ্টাই ব্রহ্মযজ্ঞ যেমন যোগ, প্রাণায়াম, স্বাধ্যায় [শাস্ত্র ও ধর্মগ্রন্থ অধ্যয়ন], অধ্যাপনা, ঈশ্বরের স্তুতি, প্রার্থনা, উপাসনা।
      দ্বিতীয় যজ্ঞ হল দেবযজ্ঞ।
নিত্য অগ্নিহোত্রসহ সকল যজ্ঞ, প্রকৃতির পরিশুদ্ধির জন্যে হবি অর্পণ, বিদ্বানগণের সংসর্গ লাভ ও সেবা করাই দেবযজ্ঞ। গীতায় আছে বিশেষ তিথিতে কাঠ, নানা শস্যদ্রব্য, ঘি, সুগন্ধি মশলা, কেশর, জাফরান, ফুল প্রভৃতি দিয়ে যজ্ঞ করলে বায়ু বিশুদ্ধ ও নিরোগ থাকে।
       তৃতীয় যজ্ঞ  হল পিতৃযজ্ঞ। এমনিতে আমাদের প্রপিতামহ-প্রপিতামহী, পিতামহ-পিতামহী, মাতা- পিতা, স্বগোত্রীয় কোনো বয়োজ্যেষ্ঠ, গুরু আচার্য বা অন্য যেকোনো বিদ্বান্ ও শিক্ষিত ব্যক্তি যাঁরা  মান-সম্মান পাওয়ার যোগ্য তাঁদের 'পিতর' বলা হয়। তাদের যথাযথভাবে সন্মান প্রদর্শন, তাঁদের সাথে ভালো আচরণ ও তাঁদের শ্রদ্ধা করাই হল পিতৃযজ্ঞ। অর্থাৎ গৃহস্থ ব্যক্তি অন্নাদি ভোজ্য পদার্থ এবং জল, দুধ, কন্দমূল, ফল ইত্যাদি দ্বারা পিতরদের প্রসন্নতার জন্য প্রতিদিন শ্রদ্ধা সহকারে পিতামাতার সেবা-সৎকার করবে। এখানে ভগবান্ মনু স্পষ্টভাবে জীবিত পিতরদের সেবা করার জন্য বিধান দিয়েছেন এবং সেটি প্রতিদিন করতে বলেছেন। প্রসঙ্গত অন্ত্যেষ্টি কর্ম ছাড়া পৃথক কোনো কর্ম মৃতের জন্য দ্বিতীয়বার কর্তব্য নয়।   
      চতুর্থ যজ্ঞ হল ভূতযজ্ঞ।
ভূতযজ্ঞ হল জগতের সকল মানুষ ও পশুপাখির কল্যাণ কামনা ও তাদের সর্বদাই যথাসাধ্য সাহায্য করা। অসুস্থ মানুষের সেবা, দুঃস্থদের সাহায্য, ক্ষুধার্তকে খাদ্য দান, অবলা প্রাণীর জন্য আহার, আশ্রয়ের ব্যবস্থা এসবই ভূতযজ্ঞ। 
     পঞ্চম হল অতিথিযজ্ঞ। অর্থাৎ অতিথিদের যথাযথ সেবা। এখন কে অতিথি? অথর্ব ভেদ বলছে - যিনি পূর্ণ বিদ্বান, পরোপকারী, জিতেন্দ্রিয়, ধার্মিক, সত্যবাদী, ছল-কপট-রহিত, নিত্য ভ্রমণকারী মানুষ তিনিই 'অতিথি'।  কারো ঘরে যখন এসব গুণযুক্ত যোগ্য অতিথি আসেন তখন তাঁর সেবা করাই গৃহস্থর যজ্ঞ। কেউ একাদশী না করে এই পঞ্চ যজ্ঞ করলেও তাঁর আত্মিক উত্তরণ হবে।
     এতো গেল একাদশীর বিকল্পের কথা। তবে এই প্রসঙ্গে বলি - একাদশী কিন্তু বিজ্ঞানসম্মত।  ২০১৬ সালে নোবেল পুরস্কার পেয়েছিলেন জাপানের গবেষক ইয়োশিনোরি ওহশোমি এই উপবাসের প্রক্রিয়া বিষয়ে গবেষণা করে। জীবদেহ কেমন করে ত্রুটিপূর্ণ কোষ ধ্বংস করে নিজের সুরক্ষা করে এবং কোষ কীভাবে নিজের আবর্জনা প্রক্রিয়াজাত করে সুস্থ থাকে, সেই রহস্য বের করেন তিনি। বিজ্ঞানের ভাষায় একে  বলা হয় অটোফেজি। এটা হল শরীরের আভ্যন্তরীণ অঙ্গসমূহ পরিষ্কার করার  প্রক্রিয়া। এটি সম্পন্ন  হয় কোষীয় পর্যায়ে। আমরা জানি - শরীরের বিভিন্ন কাজ করার জন্য প্রতিনিয়ত প্রোটিন তৈরি হয় এবং প্রোটিনের কাজটি সঠিকভাবে সম্পন্ন করার জন্য প্রোটিনের গঠনটি অ্যামিনো অ্যাসিডের মাধ্যমে ত্রিমাত্রিক হতে হয়। যদি ত্রিমাত্রিক না হয় তবে প্রোটিনটি শরীরের জন্য ক্ষতিকারক হয় ও নানা রোগ সৃষ্টি করে। তাই উপবাস  থাকতে হয় প্রায় ১৩-১৫ ঘন্টা। এই সময় জল ছাড়া অন্য সকল খাবার বাদ দিতে হয়। গবেষণায় দেখা গেছে যে, ১৩ তম ঘণ্টা থেকে ১৮তম ঘণ্টার মধ্যে অটোফেজি সক্রিয় হয়। তখন কোষের আবর্জনা ও ক্ষয়ে যাওয়া কোষ রিসাইক্লিং হয় এবং সেইসাথে হয় নতুন কোষাণু তৈরি ও শক্তি উৎপাদন। কিন্তু এই সময়  সম্পূর্ণ অনাহারে থাকতে নেই - প্রচুর জলপান করা বিধেয়। তাই দেখা যাচ্ছে - অতীতে যা আমাদের কাছে ছিল একাদশী ব্রত তা মাসে দুবার পালন করলে শরীর ভালই থাকে। তবে ব্রত নির্জলা করলে অসুস্থ হয়ে পড়ার সম্ভাবনা থাকে। তাই এই ব্রতের সাথে বেশী জলপান প্রয়োজন।
   সব মিলিয়ে দেখতে গেলে একাদশী পালন করলে কোন ক্ষতি নেই। বরং লাভ আছে। একাদশী পালন করলে পুণ্যলাভ হয়। যদিও গীতার মত মানলে  ফলের আশা করে কর্ম করা ঠিক নয়, তবে সাধারণ মানুষজন তো ফলের জন্যেই কর্ম করে। আর যেকোনো ব্রত উপাসনা শ্রদ্ধার সাথে সম্পন্ন করলে তাতে পুণ্য সঞ্চয় অবশ্যই হয়। তবে যেহেতু একাদশী ব্রতর কোন উল্লেখ বেদ তথা স্মৃতি শাস্ত্রে নেই, তাই এটি পালন না করলে পাপ হবে এটাও বলা যায় না। 
   এক কথায় বলব, সবার এই প্রসঙ্গে আপন আপন গুরুর সিদ্ধান্ত অনুসরণ করাই ঠিক হবে। ভক্ত যদি বৈষ্ণব হন অবশ্যই একাদশী করবেন। আর যদি শাক্ত হন নাও করতে পারেন। এখানে পাপ পুণ্যের কোন জায়গা নেই। নিজের মানসিক সন্তোষ হল আসল।  তাই একাদশী করার জন্যে কাউকে যেমন জোর  করা উচিত নয় তেমনিই না করার জন্যেও জোর করা ঠিক নয়। সকলের ব্যক্তিগত অভিমতের উপরেই এই একাদশী পালন ছেড়ে দেয়া সমীচীন আমার মতে।

#booklover 
#books
#booknow
#ভক্ত
#জয়_মা_তারা_পবলিশার্স
#spiritualgrowth
#spirituality
#spiritualjourney
#spiritualbooks
#devotionalbook
#devotion
#devotional
#virals
#viralpost
#publisherstory
#publishing
#combo
#offers
#readers
#readerscommunity
#grow
#soul
#development
#journey
#jaymatarapublishers

Tuesday, 30 April 2024

৮৪ লক্ষ যোনি কিভাবে আমাদের পেরোতে হয়? প্রবচন তারাশিস গঙ্গোপাধ্যায়।

লেখকের website -  https://www.tarashisgangopadhyay.in/


প্রশ্ন : শাস্ত্রে আছে প্রতিটি জীবকে ৮৪ লক্ষ যোনি ভ্রমণ করতে হয়। শাস্ত্রে কি এর কোন এভিডেন্স মেলে?

তারাশিস গঙ্গোপাধ্যায় : অবশ্যই মেলে। প্রতিটি জীবকেই এই ৮৪ লক্ষ যোনি ভ্রমণ করতে হয়।  বিষ্ণু পুরাণ এই বিষয়ে লিখছে -

স্থাবর ত্রিংশলক্ষশ্চ জলযোনবলক্ষকঃ।।                          কৃমিয়োদশলক্ষশ্চ রুদ্রলক্ষশ্চ পক্ষিনৌ।
পাশবো বিংশলক্ষশ্চ চতুর্লক্ষশ্চ মানবাঃ।।
 এতেসু  ভ্রমনং কৃত্বা ভ্রদ্ধিজত্বমৃপজায়তে।
মনুষ্য দুর্লভং জন্ম যদিস্যাৎ কৃষ্ণসাধকঃ ।।  (বিষ্ণু পুরাণ)

এই তথ্য একটু  বিস্তারিতভাবে আলোচনা করা যাক। প্রথমে তিরিশ লক্ষ বার গাছ রূপে জন্ম নিতে হয়। এই বৃক্ষ জন্ম শেষ হয় একমাত্র তুলসী গাছ হয়ে জন্মানোর পর। তারপর বৃক্ষ যোনি থেকে মুক্তি ঘটে। (সম্ভবত বিষ্ণুপুরান অনুসারে এই শ্লোক আমরা পেলাম বলে এখানে আমরা তুলসীর নাম দেখতে পাচ্ছি। একই বিষয়ের উপর লেখা শ্লোক শিবপুরানে যদি আমরা পেতাম সেখানে হয়তো বেলপাতার নামও থাকতে পারত।)

এরপর নয় লক্ষ বার জলজ প্রাণী রূপে জীবের জন্ম হয়। এই জন্ম থেকে মুক্তি মেলে শঙ্খ রূপে জন্মর পর। এই রূপে ভগবানের পূজা অর্চনায় ব্যবহারের পর জলজ জীব জন্ম থেকে মুক্তি ঘটে।

এরপর দশ লক্ষ বার কৃমি ও কীট রূপে জন্ম হয়। এই জন্ম থেকে মুক্তি মেলে
মৌমাছি রূপে জন্ম হবার পর। মৌমাছির তৈরি মৌচাকের মধু ভগবানের পূজা অর্চনায় ব্যবহৃত হবার পর কীটপতঙ্গ যোনি থেকে মুক্তিলাভ ঘটে।

 এরপর এগারো লক্ষ বার পক্ষী কুলে জন্ম নিতে হয়। এই যোনি থেকে মুক্তি মেলে ময়ূর রূপে জন্মলাভের পর। কথিত আছে ময়ূরের পালক ভগবানের মাথার চূড়ায় বা তাঁর পূজা অর্চনায় ব্যবহৃত হলে এই যোনি থেকে উদ্ধার হয়।

এরপর কুড়ি লক্ষ বার পশু যোনিতে জন্ম নিতে হয়। বাঘ, সিংহ, কুকুর, বিড়াল, হায়না, শিয়াল প্রভৃতি জন্ম পার হয়ে যখন গাভী রূপে জন্ম লাভ হয় এবং তার থেকে প্রাপ্ত  দুধ, মাখন, ঘি যখন ভগবানের সেবায়, ভোগে বা  পূজা অর্চনায় ব্যবহৃত হয় তারপর  পশু যোনি বা গর্ভ থেকে মুক্তি ঘটে। অর্থাৎ গো-যোনিতে জন্ম লাভ পশুযোনির শ্রেষ্ঠ জন্ম। এই গো জন্মের পর আর পশু যোনিতে জন্ম হয় না।

 পশু যোনি অতিক্রমের পর অবশেষে চার লক্ষ বার মানব যোনিতে জন্ম হয়। 
  এতে প্রথমে বন্য মানুষ রূপে জন্ম নিতে হয়। এরা বনের মধ্যে থেকে জীবনধারন করে এবং পশুদের মতই জীবন যাপন করে। এদের কোন আপন-পর জ্ঞান নেই।
   তারপর পাহাড়িয়া জাতির মধ্যে জন্ম হয়। যেমন নাগা, কুকি, সাঁওতাল ইত্যাদি।
     তারপর জন্ম হয় অধম নাস্তিক কুলে। তারা দেবধর্ম মানে না। নানারকম অপ কর্মের মধ্যে এদের জীবন কাটে।
    তারপর শূদ্রকুলে জন্ম হয়। এরা যেমন কর্ম করে তেমন নিজেই ভোগ করে। একমাত্র ভালো কর্ম এবং সম্মানিতদের সেবার মাধ্যমে তাঁদের উত্তরণ হয়।

 তারপর জন্ম হয় বৈশ্য জাতির মধ্যে। এখানেও কর্ম অনুযায়ী ফল ভোগ করে উত্তরণ হয়।

 তারপর জন্ম হয় ক্ষত্রিয় কুলে। এখানেও ঠিকমত কর্ম করলে তবেই উত্তরণ হয়।

 সবশেষে জীব ব্রাহ্মণকুলে জন্মায়। এই ব্রাহ্মণ জন্ম হল শ্রেষ্ঠ। এই জন্মে ব্রহ্মজ্ঞান অর্জন আবশ্যক। শুধু ব্রাহ্মণ কুলে জন্মালেই কিন্তু উদ্ধার হয় না। একমাত্র ব্রহ্মজ্ঞান অর্জন হলেই যথাযথ ব্রাহ্মণ হওয়া যায়। তবেই উদ্ধারের প্রশ্ন। আর যদি জীব  এই জ্ঞান লাভ করতে না পারে, তবে আবার তাকে  ৮৪ লক্ষ যোনি পথে ভ্রমণ করতে হয়। আর সেই সঙ্গে বারবার জন্ম নিয়ে কষ্ট ভোগ করতে হয়। এর থেকে উদ্ধার পাবার একমাত্র পথ হল ভগবানের শরণাগত হওয়া। 
   তবেই দেখছ কিভাবে সব মিলিয়ে চুরাশি লক্ষ (৩০+০৯+১০+১১+২০+৪) জন্ম হয়।

Saturday, 6 April 2024

ভক্তি বড় না জ্ঞান বড়? বলছেন তারাশিস গঙ্গোপাধ্যায়

প্রশ্ন :- আচ্ছা, প্রায়ই শুনতে পাই যে অনেকেই বলেন ভক্তি বড়। তাহলে জ্ঞান কি কোন কাজের কিছু নয়?

তারাশিস গঙ্গোপাধ্যায় : জ্ঞান ও ভক্তি দুই-ই হল ঈশ্বরের কাছে পৌঁছনোর দুটি মূল পথ। আর দুটিই সার্থক হয় যখন তা কর্মের সাথে যুক্ত হয়। আর সে কর্ম শুধু মৌখিক কর্ম হলে চলবে না। তাকে থিওরির ক্ষেত্র ছেড়ে practical এর সঙ্গে মিশতে হবে। জ্ঞান বল বা ভক্তি বল তা তখনই যথাযথ হবে।
   এমনিতে এটা সত্যি যে জ্ঞানের পথের লোক বলেন - ভক্তি বস্তুটা আদৌ কোন কাজের কিছু নয়। আবার ভক্তির পথের মানুষরাও অনেকেই মনে করেন যে জ্ঞান ক্ষতিকারক ভক্তির পক্ষে। তাঁরা কারণ হিসেবে বলেন যে মহাপ্রভু বলে গেছেন জ্ঞান নয় ভক্তি শ্রেষ্ঠ।কিন্তু আজকের যুগে দাঁড়িয়ে আমাদের বুঝতে হবে - নিজে জ্ঞানের চূড়ায় পৌঁছেও কেন বলেছেন তিনি এ কথা?
  এর উত্তর একটাই - তিনি আলোর দিশা উন্মুক্ত করে দিয়েছেন সমাজের সকল স্তরের মানুষের জন্যে। কলিযুগে সাধারণ মানুষের জ্ঞানের পথে যাওয়ার মত ব্যক্তিত্ব,সহ্যশক্তি ,ধৈর্য কিছুই নেই। তাই তিনি বুঝেছিলেন যে এদের জ্ঞানের পথে পাঠালে কিছুই পারবে না। বরং ভক্তির পথে গিয়ে যদি শুধু ঠাকুরের শ্রীচরণ স্মরণ করে তাঁর শরণ নিয়ে থাকে তবে ঠাকুর নিজেই এসে উৎরে দেবেন। ভক্তি হল নির্ভরতার সাধনা আর জ্ঞান হল পুরুষকারের সাধনা।আমাদের আজকের যুগে পুরুষকার আছে কি? যা আছে শুধুই অপরের উপর নির্ভরতা। তাই মহাপ্রভূ দেখলেন - সামাজিক জীব যদি এই পরনির্ভরতার ভাবটা মানুষের পরিবর্তে ঈশ্বরের উপরে রাখতে পারে তবে তো ঠাকুর নিজে নেমে এসে কোলে তুলে নেবেন। তাই তিনি জ্ঞানের পরিবর্তে সাধারণের জন্যে ভক্তির পথ দেখালেন। কিন্তু তাই বলে জ্ঞান ফেলনা নয়। এই পথে চলার জণ্যে অনেক কষ্ট করতে হয়। শঙ্করাচার্য, মধ্যাচার্য, রমণ মহর্ষি বা স্বামী বিবেকানন্দ কিন্তু এমনি এমনি হওয়া যায় না। অনেক সাধনার প্রয়োজন হয়। তাই কথায় কথায় জ্ঞানকে ছোট করা মুর্খতার সামিল।
    আর মজার কথা কি জানো - যে জ্ঞান ও ভক্তির মধ্যে একটি পথের শেষ ঠিকানায় পৌঁছতে পারে তার মধ্যে অপরটিও ঠাকুরের কৃপায় আপনা থেকেই জেগে যায়। সত্যিকারের জ্ঞানী তখন হয়ে ওঠেন বড় ভক্ত। আর সত্যিকারের ভক্ত হয়ে ওঠেন ত্রিকালজ্ঞ জ্ঞানী। কারণ দুটি পথ ভিন্ন মতের হলেও অন্তিমে যে সবই মিলেমিশে হয় জয় একাকার।
   ভালো থেকো। জয় গোপাল।

লেখকের website -  https://www.tarashisgangopadhyay.in/

Saturday, 30 March 2024

পূজা বলতে আমরা মানুষরা কি বুঝি? বলছেন তারাশিস গঙ্গোপাধ্যায়।

প্রশ্ন - পূজা বলতে আমরা মানুষরা কি বুঝি? ইষ্ট বা গুরুর সামনে মাথা নোয়ানোকে কি পূজা বলে?

  তারাশিস গঙ্গোপাধ্যায় - ইষ্ট বা গুরুর সামনে মাথা নোয়ানো, তাঁদের পায়ে ফুল দেয়া, যজ্ঞে সমিধ দিয়ে তাঁদের নাম উচ্চারণ করা, তাঁদের সামনে মন্ত্র পাঠ ও তাঁদের স্তুতি করা - একে সাধারণ মানুষ পূজা বলে জানে। অনেকে আবার পূজা করতে করতে চোখের জলে ভাসে। কিন্তু এটা হল আবেগ। এটা আদৌ পূজা নয়। 
    পূজা হল শ্রদ্ধা ও ভক্তির মিশ্রণে সৃষ্টি এমন একটি ভাব যা কারোর মনে আপনা থেকে না জাগলে করা সম্ভব নয়। আর জাগলে না করে থাকাও সম্ভব নয়। পূজা হল অন্তরের শুভ বিচারের নাম, পূজা হল ভালো কর্মের নাম, পূজা হল অকাতরে জীবসেবার অন্য নাম - শুধু নিজের জন্যে না বেঁচে জগতের মঙ্গলের জন্যে বাঁচার নাম হল পূজা। আর সব থেকে বড় কথা হল - এসবের মাধ্যমে অপরকে না দেখিয়ে নিজের মনের গভীর শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা ইষ্ট গুরুকে সঙ্গোপনে জানানোই হল যথার্থ পূজা। এই পূজাই হল শ্রেষ্ঠ পূজা যা স্বয়ং ঈশ্বর সানন্দে গ্রহণ করেন। কিন্তু কত জন এই পূজা করেন সেটাই হল প্রশ্ন।
   #আধ্যাত্মিক #spiritual #banglareels  #tarashisgangopadhyay #tarashisauthor 

লেখকের website -  https://www.tarashisgangopadhyay.in/

Wednesday, 13 March 2024

" অপরের ব্যবহারে কেন দুঃখ পাও?"

" অপরের ব্যবহারে কেন দুঃখ পাও?" তারাশিস গঙ্গোপাধ্যায়

(অনন্তের জিজ্ঞাসা - ষষ্ঠ খন্ড।)
    - তারাশিস গঙ্গোপাধ্যায়।

প্রশ্ন - আমাদের জীবনে আশেপাশের মানুষদের খারাপ ব্যবহারের জন্যে প্রায়ই আমাদের দুঃখ পেতে হয়। এর থেকে উদ্ধারের পথ কি?

   তারাশিস গঙ্গোপাধ্যায় : কোন মানুষ যদি ভাবে যে তার দুঃখের কারণ অন্য কোন ব্যক্তি তবে তার পক্ষে জীবনে সুখ পাওয়া অসম্ভব। অপরের থেকে খারাপ ব্যবহার পাওয়ার কারণে কেউ যদি নিজেকে দুঃখী ভাবে তাহলে সেই দুঃখের থেকে পরিত্রাণের কোন পথ নেই। এর কারণ হল - প্রতিটি মানুষ নিজের কর্মফল ভোগ করে, সে এই জন্মের হোক বা পূর্ব জন্মের। সামনের মানুষটির থেকে পাওয়া খারাপ ব্যবহারও তার পূর্বের কর্মফলের জন্যেই হচ্ছে। তাই জীবনে যে অবস্থাই আসুক সেটা শান্তভাবে মেনে নিতে হয়। সেইসাথে তাকে বুঝতে হয় - মানুষ কখনোই তার আশেপাশের লোকজনদের স্বভাবের পরিবর্তন করতে পারে না। সেই শক্তি তার নেই। সে শুধু পারে নিজেকে পরিবর্তন করতে এবং পরিস্থিতির সঙ্গে মানিয়ে নিতে। সেটা করতে পারলেই অনেক খারাপ সময় পেরিয়ে যাওয়া যায়।

      প্রশ্ন - কিন্তু কোন অন্য মানুষ আমাদের দুঃখের কারণ কখন হয়? 

     তারাশিস গঙ্গোপাধ্যায় :  যখন আমরা অন্য কোন মানুষকে নিজের চেয়ে বেশী গুরুত্ব দিই তখনই যে আমরা আশা করি যে সামনের মানুষটিও আমাকে একইভাবে গুরুত্ব দেবে। আর সেটা না দিলেই আসে হতাশা। তখনই একমাত্র সামনের মানুষটির ব্যবহার দুঃখ আনে মনে। এর একমাত্র উপায় - এরকম মানুষদের গুরুত্ব দেয়া বন্ধ করতে হয় এবং তাদের ব্যবহারের যে পরিবর্তন হবে না সেটা ধরে নিয়েই নিস্পৃহভাবে তাদের সাথে সংযোগ করতে হয়। তাহলে আর তাদের ব্যবহারের জন্যে দুঃখ পেতে হয় না। জানবে অন্য কারোর কাছে কোন বিষয়ে আশা রাখলেই আসে দুঃখ। তাই আশা না রেখে নিস্পৃহ হয়ে থাকতে পারলে সামনের মানুষটির দুর্ব্যবহার সত্বেও দুঃখ পেতে হবে না।

লেখকের website -  https://www.tarashisgangopadhyay.in/