Ami Tarashis Bolchi

Ami Tarashis Bolchi
The blog of Tarashis Gangopadhyay (click the photo to reach our website)

Friday, 10 July 2026

অস্ত গ্রহের রহস্য — গুরু ও শিষ্যের সংলাপ (প্রথম পর্ব) mystery of the combust planets

"আপনার কুণ্ডলীতে কি এমন কোনও অস্ত গ্রহ আছে, যা নীরবে আপনার চাকরি, অর্থ, বিবাহ আর ভাগ্যকে আটকে রেখেছে? লেখক আজ জানাচ্ছেন সেই গোপন রহস্য ও তার কার্যকর প্রতিকার!"
________________________


অস্ত গ্রহের রহস্য — গুরু ও শিষ্যের সংলাপ
(প্রথম পর্ব)
  - তারাশিস গঙ্গোপাধ্যায়


ভোরের নীরবতা তখনও পুরোপুরি ভাঙেনি। আশ্রমের প্রাচীন অশ্বত্থ গাছের নিচে আসন গ্রহণ করে বসে আছেন গুরুদেব। তাঁর মুখে প্রশান্তির আভা। পায়ের কাছে বসে আছে একজন শিষ্য। শিষ্যের মনে উদয় হয়েছে কিছু প্রশ্ন।

শিষ্য: গুরুদেব, বহু মানুষের জীবনেই দেখি অশান্তি লেগেই থাকে। অর্থের জন্য সারাজীবন সংগ্রাম করতে হয়, কর্মজীবনে স্থিতি আসে না, ব্যবসা হঠাৎ বন্ধ হয়ে যায়, বিয়ে হতে চায় না, একের পর এক রোগ-ব্যাধি পিছু ছাড়ে না। অনেকে বলেন, এর পেছনে কুণ্ডলীর অস্ত গ্রহ দায়ী। সত্যিই কি একটি অস্ত গ্রহ মানুষের জীবনকে এত গভীরভাবে প্রভাবিত করতে পারে?

গুরুদেব: অবশ্যই পারে। বড় বড় শুভ গ্রহও যদি অস্ত হয়ে যায়, তাহলে তারা নিজের স্বাভাবিক শক্তি হারিয়ে ফেলে। ফলে জীবনের বহু ক্ষেত্রে বাধা সৃষ্টি হয়। তবে ভয় পাওয়ার কিছু নেই। কারণ প্রতিকারও আছে, আর সেই প্রতিকার সঠিকভাবে করলে অনেকটাই উপকার পাওয়া সম্ভব।

শিষ্য: গুরুদেব, প্রথমেই জানতে চাই—অস্ত গ্রহ বলতে ঠিক কী বোঝায়? এর অর্থ কী? কেন এর কারণে মানুষের জীবনে এত সমস্যা ও মানসিক চাপ তৈরি হয়?

গুরুদেব: দেখ, সূর্য, রাহু ও কেতুকে বাদ দিলে প্রায় সব গ্রহই অস্ত হয়। সূর্যের খুব কাছে এলে, অর্থাৎ নির্দিষ্ট ডিগ্রির মধ্যে প্রবেশ করলে গ্রহ নিজের শক্তি হারায়।

বুধকে নিয়ে অবশ্য বিভিন্ন মত আছে। অনেক বিদ্বান বলেন, বুধ কেবল তখনই অস্ত হয় যখন সে সূর্যের একেবারে সমান ডিগ্রিতে চলে আসে। কিন্তু বর্তমানে যে জ্যোতিষ সফটওয়্যারগুলি ব্যবহার করা হয়, সেগুলো সূর্য থেকে নির্দিষ্ট দূরত্বের মধ্যেই বুধকে অস্ত দেখায়।
তবে বাস্তব ফল বিচার করলে দেখা যায়, বুধ সবসময় সেইভাবে ফল দেয় না। প্রকৃত অর্থে সূর্যের সঙ্গে প্রায় এক জায়গায় চলে এলে তবেই বুধ অস্তের পূর্ণ ফল দেয়।

যেমন অমাবস্যার দিনে চন্দ্র অস্ত থাকে। অমাবস্যা ও শুক্লপক্ষের প্রতিপদে চন্দ্র সূর্যের খুব কাছে অবস্থান করে। সূর্য ও চন্দ্রের ডিগ্রি সমান হয়ে গেলে অমাবস্যা শেষ হয়।
জ্যোতিষশাস্ত্রে এই অবস্থাকে অধম যোগ বলা হয়।

এই যোগে জন্ম নেওয়া মানুষ যতই পরিশ্রমী, মেধাবী, সাহসী বা উচ্চাকাঙ্ক্ষী হোক না কেন, সে শতভাগ পরিশ্রম করলেও ফল সাধারণত পঁচাত্তর শতাংশের বেশি পায় না।

এইভাবেই চন্দ্র অস্ত হয়, মঙ্গল অস্ত হয়, বুধ, বৃহস্পতি, শুক্র এবং শনি—সব গ্রহই অস্ত হতে পারে। শুধু সূর্য, রাহু ও কেতু এর ব্যতিক্রম।

'লগ্ন চন্দ্রিকা' নামে একটি প্রামাণ্য জ্যোতিষ গ্রন্থে বলা হয়েছে—
“যার কুণ্ডলীতে তিনটি গ্রহ স্বরাশিতে থাকে, সে মন্ত্রীর পদ পায়। তিনটি গ্রহ উচ্চে থাকলে সে রাজসম মর্যাদা লাভ করে। তিনটি গ্রহ নীচস্থ হলে সে অন্যের সেবা করে জীবিকা নির্বাহ করে। আর তিনটি গ্রহ যদি অস্ত থাকে, তবে সেই ব্যক্তি জড়বুদ্ধিসম্পন্ন হয়ে পড়ে।”

অর্থাৎ তার বুদ্ধিবৃত্তিক ক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে দুর্বল হয়ে যায়। এর প্রভাব জীবনের সর্বত্র পড়ে।

তবে আমি দৃঢ়ভাবে বলতে পারি—যদি সঠিক উপায়ে প্রতিকার করা যায়, তাহলে শতভাগ নয়, কিন্তু নিরানব্বই শতাংশ ক্ষেত্রেই উপকার পাওয়া সম্ভব।

এই প্রতিকার নদীতে কিছু ভাসিয়ে দেওয়া, দান করা বা অন্য কোনও বাহ্যিক আচার নয়। আমার মতে আসল প্রতিকার হল মন্ত্রজপের মাধ্যমে শব্দশক্তিকে জাগ্রত করা।

যদি নিজের শরীরের মধ্যে সংশ্লিষ্ট গ্রহের শক্তিকে জাগিয়ে তোলা যায়, তাহলে অস্ত গ্রহের দুর্বলতাও অনেকটাই দূর হতে পারে।

শিষ্য: গুরুদেব, প্রত্যেক অস্ত গ্রহ কি শুধু অশুভ ফলই দেয়?

গুরুদেব: অস্ত মানে শক্তিহীন। যেমন একজন মানুষ মারা গেলে তার কাছ থেকে আর কোনও কাজের আশা করা যায় না, তেমনি অস্ত গ্রহও নিজের স্বাভাবিক শক্তি হারিয়ে ফেলে।

ধর কারও শুক্র অস্ত হয়েছে। তুমি জানো, শুক্র বিলাসিতা, দাম্পত্য, সৌন্দর্য, যৌনজীবন ও বৈবাহিক সুখের কারক।
তাই শুক্র অস্ত হলে এই ক্ষেত্রগুলিতে সমস্যা দেখা দিতে পারে। অনেকের ক্ষেত্রে বিয়েই দেরিতে হয়।
যদি পুরুষের কুণ্ডলীতে শুক্র অত্যন্ত দুর্বলভাবে অস্ত হয়, তবে শুক্রাণুর সংখ্যা মারাত্মকভাবে কমে যেতে পারে। নারীর ক্ষেত্রে ডিম্বস্ফোটন ও প্রজননক্ষমতা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

একইভাবে বৃহস্পতি অস্ত হলে শিক্ষা, ধর্মবোধ ও জ্ঞানলাভে বাধা আসে।

মঙ্গল অস্ত হলে মানুষ ভীরু, ভীতু ও হীনমন্য হয়ে পড়ে।

চন্দ্র অস্ত হলে পরিকল্পনা করার ক্ষমতা দুর্বল হয়ে যায়। এমন মানুষ একটি সাধারণ জামা কিনতেও বারবার অন্যের মতামত জানতে চায়। কারণ তার নিজের সিদ্ধান্তের ওপর আস্থা থাকে না।

শনি অস্ত হলে চাকরি, কর্মজীবন ও সেবার সুখে বাধা আসে। তাই গ্রহের অস্ত হওয়া নিঃসন্দেহে শুভ নয়।

কিন্তু ভয়েরও কিছু নেই।

সঠিক সাধনা ও উপায়ের মাধ্যমে এই গ্রহগুলিকে আবার সক্রিয় করা সম্ভব।

আমি তো বলি, যদি মানুষ নিষ্ঠার সঙ্গে এই উপায়গুলো পালন করে, তাহলে দুই থেকে আড়াই বছরের মধ্যেই তার কুণ্ডলীর অবস্থায় উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন দেখা যেতে পারে।

আগামী পর্বে আলোচনা করা হবে সেই উপায়। পরের লেখাটি যাঁরা পেতে আগ্রহী এখানে কমেন্ট সেকশনে জানাবেন কেমন লাগল।

(ক্রমশ)

#অস্ত_গ্রহ
#গুরুদেবের_উপদেশ
#জ্যোতিষশাস্ত্র
#কুণ্ডলী_বিশ্লেষণ
#SpiritualWisdom
#AstrologyTips
#VedicAstrology
#BanglaSpiritual

Thursday, 9 July 2026

হনুমান মন্ত্রের মাহাত্ম্য — তৃতীয় ও শেষ ভাগ the importance of the mantras of Hanumanji

 

হনুমান মন্ত্রের মাহাত্ম্য — তৃতীয় ও শেষ ভাগ
- তারাশিস গঙ্গোপাধ্যায়
(পূর্ব প্রকাশিতের পর)

আজ আমি এমন কয়েকটি হনুমান মন্ত্রের কথা বলব, যেগুলি শুধু শাস্ত্রেই উল্লেখিত নয়, বহু যুগ ধরে ভক্তদের সাধনায় বিশেষ স্থান দখল করে আছে। তবে তার আগে একটি কথা স্পষ্ট করে বলতে চাই—শুধু মন্ত্র মুখস্থ করলেই হবে না। মন্ত্রের সঙ্গে যদি চরিত্র, ভক্তি, শৃঙ্খলা ও বিশ্বাস যুক্ত না হয়, তাহলে তার প্রকৃত ফল অনুভব করা কঠিন।

প্রথমেই আসি হনুমান গায়ত্রী মন্ত্রে।
॥ ॐ आञ्जनेयाय विद्महे वायुपुत्राय धीमहि तन्नो हनुमान् प्रचोदयात् ॥
বাংলা উচ্চারণঃ
"ওঁ আঞ্জনেয়ায় বিদ্মহে। বায়ুপুত্রায় ধীমহি। তন্নো হনুমান প্রচোদয়াত্॥"
এই মন্ত্র বহু ভক্ত সন্তানের মঙ্গল, মনোবল বৃদ্ধি এবং জীবনের বাধা অতিক্রমের প্রার্থনায় জপ করে থাকেন। বিশেষ করে যাঁরা শনির সাড়ে-সাতি, ঢাইয়া বা জীবনের নানা প্রতিকূল সময়ের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছেন, তাঁদের কাছেও এই মন্ত্র অত্যন্ত জনপ্রিয়।
আমি বরাবরই মনে করি, সনাতন জীবনের কিছু নিয়ম যদি আমরা প্রতিদিন পালন করি, তাহলে তার সুফল আমাদের মন, শরীর ও আত্মা—তিন ক্ষেত্রেই অনুভব করা যায়। ভোরে জেগে ওঠা, স্নান করা, সূর্যকে অর্ঘ্য দেওয়া, প্রাণায়াম করা, গায়ত্রী মন্ত্র জপ করা এবং যাঁদের পক্ষে সম্ভব অগ্নিহোত্র করা—এসব শুধু ধর্মীয় আচরণ নয়, বরং একটি শৃঙ্খলাবদ্ধ জীবনের ভিত্তি।

এবার আসি আঞ্জনেয় মন্ত্রে—
॥ श्री वज्रदेहाय रामभक्ताय वायुपुत्राय नमोऽस्तुते ॥
এই মন্ত্র নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে আমার মনে পড়ে যায় হনুমানজীর সেই অনন্য চরিত্রের কথা।
তিনি যখন সীতামাতার সন্ধানে সমুদ্র পার হওয়ার পথে চলেছেন, তখন মৈনাক পর্বত উঠে এসে তাঁকে বিশ্রাম নিতে বলেছিল। কিন্তু হনুমানজী বলেছিলেন, "राम काज कीन्हे बिना मोहि कहाँ विश्राम।"
অর্থাৎ—"প্রভুর কাজ সম্পূর্ণ না করে আমার বিশ্রাম কোথায়?"
এই একটি বাক্যের মধ্যেই লুকিয়ে আছে জীবনের এক অমূল্য শিক্ষা।
আমরা প্রায়ই কাজ শুরু করি, কিন্তু মাঝপথে ক্লান্ত হয়ে থেমে যাই। হনুমানজী শেখান—যে কাজ শুরু করবে, তা সম্পূর্ণ না হওয়া পর্যন্ত অলসতা বা বিশ্রাম যেন তোমাকে স্পর্শ না করে।

এরপর যে শ্লোকটির কথা বলব, তা প্রায় প্রতিটি ভক্তেরই পরিচিত—
॥ मनोजवं मारुततुल्यवेगं जितेन्द्रियं बुद्धिमतां वरिष्ठम्। वातात्मजं वानरयूथमुख्यं श्रीरामदूतं शरणं प्रपद्ये ॥
বাংলা উচ্চারণঃ
"মনোজবং মারুততুল্যবেগং। জিতেন্দ্রিয়ং বুদ্ধিমতাং বরিষ্ঠম্। বাতাত্মজং বানরযূথমুখ্যং। শ্রীরামদূতং শরণং প্রপদ্যে॥"
এই শ্লোক নিয়মিত পাঠ করলে মন ধীরে ধীরে স্থির হয়, অযথা ভয় কমে, সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা বাড়ে এবং অহংকারও অনেকটাই প্রশমিত হয়। মানুষের হৃদয় ও বুদ্ধির মধ্যে যে দ্বন্দ্ব সৃষ্টি হয়, এই প্রার্থনা সেই ভারসাম্য ফিরিয়ে আনতে সাহায্য করে।

আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্র রয়েছে, যা সীতামাতার স্মরণের সঙ্গে যুক্ত—
॥ त्वमस्मिन् कार्यनिर्वाहे प्रमाणं हरिसत्तम। हनुमन् यत्नमास्थाय दुःखक्षयकरो भव ॥
যাঁদের বহুদিন ধরে কোনও কাজ আটকে রয়েছে, যাঁরা বিরোধিতা বা প্রতিবন্ধকতার মধ্যে দিয়ে এগোচ্ছেন, তাঁরা এই মন্ত্র জপ করে ঈশ্বরের আশীর্বাদ প্রার্থনা করতে পারেন।

এরপর আসে মঙ্গলের জন্য এক সুন্দর প্রার্থনা—
॥ अञ्जनीगर्भसम्भूतं कपीन्द्रसचिवोत्तमम्। रामप्रियं नमस्तुभ्यं हनुमन् रक्ष सर्वदा ॥
অনেক ভক্ত বিশ্বাস করেন, এই মন্ত্র জপ করলে মঙ্গলের অশুভ প্রভাব প্রশমিত হয়, উদ্বেগ, মানসিক চাপ ও অকারণ ভয়ও অনেকটাই কমে আসে।

এরপর যে মন্ত্রটির কথা বলছি, সেটি হল—
॥ ॐ नमो भगवते आञ्जनेयाय महाबलाय स्वाहा ॥
অনেক সাধক এই মন্ত্রে ১০৮ আহুতি দিয়ে হোম করেন। তাঁদের বিশ্বাস, এতে গৃহের নেতিবাচক পরিবেশ দূর হয় এবং মনেও এক বিশেষ শান্তির সঞ্চার ঘটে। এমনকি অনেকে বলেন, এই মন্ত্র শুধু জপ নয়, শ্রবণ করলেও মন অনেকটা প্রশান্ত হয় এবং ঘুমও ভালো আসে।

আরও একটি প্রসিদ্ধ মন্ত্র হল—
॥ ॐ नमो हनुमते रुद्रावताराय सर्वशत्रुसंहारणाय सर्वरोगहराय रामदूताय स्वाहा ॥
এই মন্ত্র বহু ভক্ত রোগমুক্তি, সাহস এবং জীবনের প্রতিকূলতার সময় ঈশ্বরের কৃপা লাভের উদ্দেশ্যে জপ করেন।

এবার আসি মন্ত্রজপের নিয়মে।
আমি সবসময় বলি—অনেকগুলো মন্ত্র একসঙ্গে জপ করার চেয়ে একটি মন্ত্র বেছে নিয়ে নিষ্ঠার সঙ্গে জপ করা অনেক বেশি ফলদায়ক।

ভোরে উঠে স্নান করে শুচি হয়ে, সূর্যকে অর্ঘ্য দিয়ে, প্রাণায়াম করার পর পরিষ্কার আসনে পূর্বমুখে অথবা উত্তরমুখে বসুন। প্রথমে হনুমানজীর ধ্যান করুন। তারপর একটি মন্ত্র নির্বাচন করে অন্তত চব্বিশ মিনিট একাগ্রচিত্তে জপ করুন।

রুদ্রাক্ষ, তুলসী অথবা প্রবালের (মূঙ্গা) মালা ব্যবহার করা যেতে পারে।
জপের সময় সাত্ত্বিক আহার, সংযম এবং পবিত্র জীবনযাপন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ সাধনার ক্ষেত্রে ব্রহ্মচর্যের কথাও শাস্ত্রে উল্লেখ রয়েছে।

আর একটি বিষয় অবশ্যই মনে রাখবেন—মন্ত্র কখনও উচ্চস্বরে নয়; মৃদুস্বরে বা মানসিকভাবে জপ করাই অধিক প্রশস্ত।

জপের সময় যতটা সম্ভব সাত্ত্বিক আহার গ্রহণ করুন। বিশেষ সাধনার ক্ষেত্রে ব্রহ্মচর্য পালন করার কথাও শাস্ত্রে বলা হয়েছে। আর মন্ত্র কখনও উচ্চস্বরে নয়—মৃদুস্বরে বা মানসিকভাবে জপ করাই অধিক ফলদায়ক।

সবশেষে আমি আবারও সেই কথাটাই স্মরণ করিয়ে দিতে চাই, যা আমার কাছে হনুমানজীর উপাসনার মূলমন্ত্র। শুধু মন্ত্র মুখস্থ করলেই হবে না। হনুমানজীর বিনয়কে গ্রহণ করতে হবে। তাঁর নিঃস্বার্থ সেবাভাবকে জীবনে আনতে হবে। তাঁর কর্তব্যনিষ্ঠা, তাঁর নির্ভীকতা, তাঁর আত্মসমর্পণ এবং শ্রীরামের প্রতি অটল ভক্তিকে নিজের চরিত্রের অংশ করে তুলতে হবে।
কারণ মন্ত্র আমাদের ঈশ্বরের কাছে নিয়ে যায়, কিন্তু চরিত্রই আমাদের ঈশ্বরের কৃপা গ্রহণের যোগ্য করে তোলে।

এই কারণেই আমি বিশ্বাস করি, যে মানুষ হনুমানজীর গুণগুলোকে নিজের জীবনে ধারণ করতে পারে, তাঁর কাছে জীবনের সবচেয়ে বড় বাধাও একদিন ছোট হয়ে যায়।
জয় শ্রী রাম।
জয় বজরংবলী।
জয় হনুমানজী।

পুরো লেখাটি পড়ে ভাল লাগলে লেখাটি অবশ্যই শেয়ার করে ছড়িয়ে দেবেন বন্ধুদের মাঝে আর কমেন্ট সেকশনে লিখবেন "জয় বজরংবলী।"
#হনুমানজী

#HanumanJi
#হনুমানমন্ত্র
#HanumanMantra
#SanatanDharma
#RamNaam
#SpiritualWisdom
#AstrologyIndia

Wednesday, 8 July 2026

দ্বিতীয় ভাগ - হনুমানজীর বীজমন্ত্র ও তার মহিমা - beejmantra of Hanumanji

 দ্বিতীয় ভাগ - হনুমানজীর বীজমন্ত্র ও তার মহিমা


দ্বিতীয় ভাগ - হনুমানজীর বীজমন্ত্র ও তার মহিমা
আপনারা কি জানেন, হনুমানজীর এমন একটি বীজমন্ত্র আছে যা সাহস, আত্মবিশ্বাস ও ইতিবাচক শক্তি জাগিয়ে তোলে? কেন মাত্র ২৪ মিনিট হনুমানজীর এই মন্ত্র জপ করার কথা বলা হয়? এর পেছনের আধ্যাত্মিক রহস্য শুনলে অবাক হবেন।
আজ প্রথমেই আসুন, হনুমানজীর বীজমন্ত্র নিয়ে কথা বলি। অনেকেই জানতে চান, হনুমানজীর প্রকৃত বীজমন্ত্র কী? কেন এই মন্ত্র জপ করা উচিত? আর কীভাবেই বা জপ করলে তার প্রকৃত ফল লাভ করা যায়?
________________________

আমি যে কথাগুলি এখন বলছি, সেগুলি মন দিয়ে শুনুন।

হনুমানজীর বীজমন্ত্র হল—
"हं" (হং)
যেমন—
সরস্বতীর বীজমন্ত্র — ऐं (ঐং)
দুর্গার বীজমন্ত্র — ह्रीं (হ্রীং)
কালীর বীজমন্ত্র — क्लीं (ক্লীং)
শিবের বীজমন্ত্র — हौं (হৌঁ)
গণেশের বীজমন্ত্র — गं (গং)
অগ্নির বীজমন্ত্র — रं (রং)

ঠিক তেমনই হনুমানজীর বীজ হল "হং"।
এবার আসি হনুমানজীর প্রধান বীজমন্ত্রে। ॐ हं हनुमते नमः
বাংলা উচ্চারণ—
"ওঁ হং হনুমতয়ে নমঃ"

এই মন্ত্র যদি নিয়মিত জপ করা যায়, তাহলে একাগ্রতা বৃদ্ধি পায়। শারীরিক শক্তি বাড়ে। শরীরে ইতিবাচক শক্তির সঞ্চার হয়। আত্মবিশ্বাস বৃদ্ধি পায়। সহনশক্তি বাড়ে। নেতিবাচক শক্তি দূরে থাকে। বিশেষ করে যাঁদের শনির সাড়ে-সাতি, ঢাইয়া অথবা শনির মহাদশা চলছে, তাঁরা যদি আন্তরিকভাবে হনুমানজীর উপাসনা করেন, তাহলে শনির অশুভ প্রভাব অনেকটাই প্রশমিত হয়। তবে সিদ্ধ গুরুর থেকে না নিয়ে এই মন্ত্র জপে ফল আসে না।
অনেকে আমাকে জিজ্ঞেস করেন—এই মন্ত্র কখন জপ করা উচিত?
আমি বলি, সূর্যোদয়ের সময় এই মন্ত্র জপ করা সর্বোত্তম। পূর্বদিকে মুখ করে প্রতিদিন ১০৮ বার জপ করলে বিশেষ উপকার পাওয়া যায়।
বিশেষ করে যাঁদের জন্মকুণ্ডলীতে মঙ্গল দুর্বল, যাঁরা অকারণ ভয় পান, অন্ধকারে একা যেতে পারেন না, কিংবা সব সময় অজানা আশঙ্কায় ভোগেন—তাঁদের জন্য এই মন্ত্র অত্যন্ত উপকারী। কারণ মঙ্গল সাহস, পরাক্রম ও আত্মবিশ্বাসের কারক গ্রহ। আর হনুমানজী মঙ্গলের অধিষ্ঠাত্রী দেবতা।

এবার আর-একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রের কথা বলি।
শ্রী হনুমতয়ে নমঃ
"श्री हनुमते नमः"
এই মন্ত্র জীবনের নানা বাধা দূর করতে সাহায্য করে।
যদি বারবার ব্যর্থতা আসে, কাজে বাধা পড়ে, সংসারে অশান্তি থাকে, চাকরি বা ব্যবসায় সমস্যা হয়, পড়াশোনায় মন না বসে, অথবা শারীরিক কিংবা মানসিক কষ্ট থাকে—তাহলে এই মন্ত্র জপ করা যেতে পারে। অবশ্যই কোন গুরুর থেকে নিয়ে। 
এখানে একটি বিষয় বিশেষভাবে মনে রাখা দরকার।
অনেকে মনে করেন, এক মালা জপ করলেই অলৌকিক ফল মিলবে। কিন্তু বাস্তব বিষয়টি তা নয়। যে কোনও মন্ত্র কমপক্ষে চব্বিশ মিনিট একাগ্রচিত্তে জপ করতে হবে। এর কম সময় জপ করলে মনের স্থিরতাই আসে না। চব্বিশ মিনিট ধরে নিরবচ্ছিন্ন জপ করলে শরীরের বাহাত্তর হাজার নাড়িতে ইতিবাচক স্পন্দন সৃষ্টি হয়। আটচল্লিশ মিনিট জপ করলে আরও ভালো ফল পাওয়া যায়। ষাট মিনিট হলে তার থেকেও উত্তম। আর তারও বেশী সময় জপ করতে পারলে কল্যাণ আরও বৃদ্ধি পায়।

তবে শুধু জপ করলেই হবে না। রোখ চাই। পার্বতী মা শিবকে লাভ করার জন্য বারো হাজার বছর তপস্যা করেছিলেন। শুকনো বেলপাতা খেয়ে জীবন কাটিয়েছেন। তারপরও তিনি প্রতিজ্ঞা করেছিলেন, "কোটি জন্ম লাগলেও শিবকেই স্বামীরূপে লাভ করব, নইলে অবিবাহিতই থাকব।"
তাহলে আমরা যদি ভাবি—একশো আটবার মন্ত্র জপ করেই সবকিছু পেয়ে যাব, সেটি বাস্তবসম্মত নয়। সাধনায় দরকার—ধৈর্য, নিষ্ঠা, ত্যাগ ও সমর্পণ।
এবার শনিদেব ও হনুমানজীর একটি সুন্দর পৌরাণিক কাহিনি শোনাই।
রাবণ ছিলেন অত্যন্ত শক্তিশালী এবং বহু বরপ্রাপ্ত। তাঁর পুত্র ইন্দ্রজিৎ জন্মানোর সময় তিনি সমস্ত গ্রহকে নিজের পায়ের নীচে চেপে রেখেছিলেন, যাতে সন্তান সর্বশ্রেষ্ঠ যোগ নিয়ে জন্মায়।
দেবতারা তখন গভীর চিন্তায় পড়ে গেলেন। সেই সময় শনিদেব বললেন, "আমি চাইলে এই পরিকল্পনা ভেস্তে দিতে পারি।"

সেই পরিকল্পনা অনুসারে দেবর্ষি নারদ তখন রাবণের কাছে গিয়ে বললেন,
"তুমি গ্রহদের পিঠে পা দিয়ে দাঁড়িয়ে আছো—এতে কী গৌরব? সত্যিকারের বিজয়ী হলে তাদের বুকের ওপর প রেখে দাঁড়াও।"
রাবণ অহংকারে সেই কথাই মেনে নিলেন। তিনি গ্রহদের উল্টে দিলেন। ঠিক সেই মুহূর্তে শনিদেব তাঁর দৃষ্টি রাবণের মুখে নিক্ষেপ করলেন। সেই থেকেই রাবণের দুর্ভাগ্যের সূচনা হল। অবশ্য ক্রুদ্ধ রাবণ সঙ্গে সঙ্গে শনিদেবকে বন্দি করে কারাগারে নিক্ষেপ করকেন।
পরে যখন হনুমানজী সীতামাতার সন্ধানে লঙ্কায় প্রবেশ করেন, তখন সেই কারাগার থেকে শনিদেবের আর্তনাদ তাঁর কানে আসে।
তিনি এক মুহূর্তও দেরি করেননি। কারাগার ভেঙে শনিদেবকে মুক্ত করেছিলেন।
আরেকটি প্রাচীন কাহিনিতে বলা হয়, হনুমানজী শনিদেবকে এমনভাবে মুক্ত করেন যে, তাঁর দৃষ্টি লঙ্কার দিকে পড়ে। শনিদেবের দৃষ্টি পড়তেই লঙ্কা ধ্বংসের পথে এগিয়ে যায়। তাই 
মুক্তি পাওয়ার পর শনিদেব কৃতজ্ঞ চিত্তে হনুমানজীকে বললেন, "আজ থেকে আমি প্রতিজ্ঞা করছি, তোমার সত্যিকারের ভক্তদের অকারণে কষ্ট দেব না।"
এই কারণেই আজও বিশ্বাস করা হয়, শনিদেবের কষ্ট থেকে মুক্তির জন্য হনুমানজীর উপাসনা বিশেষ ফলদায়ক।

পরবর্তী ও শেষ পর্বে আমি আলোচনা করব—হনুমান গায়ত্রী মন্ত্র, অঞ্জনেয় মন্ত্র,  বিভিন্ন বিশেষ মন্ত্র, লাঙ্গুল স্তোত্র এবং মন্ত্রজপের সম্পূর্ণ বিধি। যাঁরা আগ্রহী সঙ্গে থাকবেন।
(ক্রমশ)
#হনুমানজী
#HanumanJi
#হনুমানমন্ত্র
#HanumanMantra
#SanatanDharma
#RamNaam
#SpiritualWisdom
#AstrologyIndia
উপরের পোস্টটি যাঁরা পড়েছেন পোস্টটি ভাল লাগল শেয়ার করবেন আর কমেন্টে লিখবেন 
"জয় শ্রীরাম, জয় হনুমানজী।

শ্রীহনুমানজীর কৃপা আজও ঘটে তারাশিস গঙ্গোপাধ্যায় - Hanumanjir kripa aajo ghore part 1

 " জানেন কি শুধু 'রাম' নাম উচ্চারণ করলেই হনুমানজী আপনার পাশে এসে দাঁড়ান?  জানেন কি কোন মন্ত্রে দূর হয় ভয়, শনি দোষ ও জীবনের বাধা? শাস্ত্রসম্মত ব্যাখ্যা ও বিরল কাহিনি জানুন এই বিশেষ আলোচনায়।"

_____________________


শ্রীহনুমানজীর কৃপা আজও ঘটে
  তারাশিস গঙ্গোপাধ্যায়


আমি প্রায়ই একটি কথা বলি—ভারতবর্ষে প্রতিদিন হনুমানজী তাঁর ভক্তদের সাহায্য করতে আবির্ভূত হন। কথাটা শুনে অনেকেরই বিস্ময় জাগবে। কিন্তু একটু নিজের জীবনের দিকে তাকিয়ে দেখুন তো। হয়তো কোনও একদিন আপনি ভীষণ বিপদে পড়েছিলেন। চারপাশে সাহায্য করার মতো কেউ ছিল না। ঠিক সেই সময় কোথা থেকে যেন একজন বৃদ্ধ এসে আপনাকে সাহায্য করলেন। কখনও হয়তো একজন যুবক, কখনও বা একেবারেই অচেনা কোনও মহিলা। আপনার কাজ শেষ হতেই তিনি যেন হাওয়ায় মিলিয়ে গেলেন। আপনি আর তাঁকে খুঁজে পেলেন না।


আমি বিশ্বাস করি, আমাদের জীবনে এমন অনেক ঘটনা ঘটে, অথচ আমরা বুঝতেই পারি না—তিনি আর কেউ নন, স্বয়ং হনুমানজীই অন্য কোনও রূপ ধারণ করে আমাদের সাহায্য করে চলে গেছেন। বিশেষ করে যদি কখনও নির্জন স্থানে, অসহায় অবস্থায়, হৃদয়ের সমস্ত আকুতি দিয়ে আপনি হনুমানজীকে ডাকেন, তাহলে তাঁর কৃপা কোনও না কোনও রূপে আপনার কাছে পৌঁছবেই। তিনি কীভাবে আসবেন, কোন রূপে আসবেন, তা আমরা জানি না। কিন্তু তাঁর কৃপা কখনও ব্যর্থ হয় না।


এই প্রসঙ্গে আমি একটি কাহিনী বলছি আজ। ঘটনাটি জড়িয়ে আছে গোস্বামী তুলসীদাসজীর জীবনের সঙ্গে।


যখন গোস্বামী তুলসীদাসজী সাতাত্তর বছর বয়সে রামচরিতমানস রচনা করেছিলেন, সেই সময় একদিন তিনি ভক্তদের সামনে শ্রীরামকথা বলছিলেন। অসংখ্য মানুষ মুগ্ধ হয়ে তাঁর মুখ থেকে শ্রীরামের লীলা শুনছিলেন। চারদিকে এক অপূর্ব ভক্তিময় পরিবেশ।


হঠাৎ সেই সময় এক অত্যন্ত সুন্দরী নারী ঘোড়ার গাড়ি থেকে নেমে এসে সকলের সামনে উচ্চস্বরে বলে উঠলেন, “পণ্ডিতজী! এতদিন কোথায় ছিলেন? অনেকদিন আমাদের কোঠায় আসছেন না!”


কথাটি শুনে উপস্থিত মানুষের মধ্যে গুঞ্জন শুরু হয়ে গেল। অনেকে মনে মনে ভাবল—তাহলে তুলসীদাসজী বুঝি পতিতালয়েও যেতেন! মুহূর্তের মধ্যেই অর্ধেক শ্রোতা সভা ছেড়ে চলে গেলেন।


কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়, তুলসীদাসজীর মুখে কোনও পরিবর্তন এল না। তিনি যেন কিছুই শোনেননি। সম্পূর্ণ নির্বিকারভাবে তিনি শ্রীরামকথা বলে যেতে লাগলেন।


পরের দিনও যথারীতি তিনি শ্রীরামকথা বলতে বসেছেন। ভক্তরাও আবার জড়ো হয়েছেন। এমন সময় একজন মদ বিক্রেতা সেখানে এসে তাঁকে প্রণাম করে বলল,

“মহারাজ, আজকাল আর আমাদের দোকানে আসেন না কেন? আপনার কাছে এখনও কিছু টাকা পাওনাও আছে।”


এই কথা শুনে আরও অনেকের মনে সন্দেহ জন্মাল। তারা ভাবল—তাহলে ইনি মদও পান করেন! আরও অনেক মানুষ সভা ছেড়ে চলে গেলেন। কিন্তু তুলসীদাসজী তখনও নির্বিকার। তাঁর কণ্ঠে শুধু রামকথার ধারা প্রবাহিত হতে লাগল।


তৃতীয় দিনের ঘটনাটি আরও আশ্চর্য। সেদিনও তিনি যথারীতি রামকথা বলছেন। ঠিক তখনই একজন ব্যক্তি কয়েকটি ছাগল নিয়ে সেই পথ দিয়ে যাচ্ছিল। তুলসীদাসজীকে দেখে সে হেসে বলল, “মহারাজ, অনেকদিন হলো আপনি আর মাংস নেন না। আপনার সেবা করার সুযোগই হচ্ছে না!”


এবার উপস্থিত প্রায় সবাই এক সিদ্ধান্তে পৌঁছে গেল। তারা ভাবল—এই ব্যক্তি তো পতিতালয়ে যায়, মদও খায়, আবার মাংসও খায়! একে একে সবাই সভা ছেড়ে চলে গেল।


শেষ পর্যন্ত সভায় মাত্র একজন মানুষ বসে রইলেন।তুলসীদাসজী শান্তভাবে তাঁর দিকে তাকিয়ে বললেন,“সবাই চলে গেল, আপনি এখনও বসে আছেন কেন? আপনিও যান।”


লোকটি মৃদু হেসে বলল, “আমি কেন যাব? এই কাহিনি তো আমার জন্যই হচ্ছে।”


তুলসীদাসজী বিস্মিত হয়ে তাঁর দিকে তাকিয়ে রইলেন।


তারপর সেই ব্যক্তি নিজের প্রকৃত পরিচয় দিলেন। তিনি বললেন, “আমি শ্রীরামভক্ত হনুমান।”


এরপর তিনি তুলসীদাসজীকে বললেন, “এগুলো ছিল কলিযুগের তিনটি রূপ—কাম, মদ ও ভোগের মোহ। আজ আমি তোমাকে একটি বর দিচ্ছি। যেখানে তোমার শ্রীরামকথা হবে, সেখানে কলিযুগ কখনও প্রবেশ করতে পারবে না।”


এই কারণেই আজও বিশ্বাস করা হয়, যেখানে ভক্তিভরে শ্রীরামকথা হয়, সেখানে হনুমানজী স্বয়ং উপস্থিত থাকেন এবং কোনও অশুভ শক্তি সেই স্থানে প্রবেশ করতে পারে না।


 হনুমানজী মন্ত্রের জন্য ততটা ব্যাকুল নন, তার থেকেও অনেক বেশি ব্যাকুল শ্রীরামের নাম শোনার জন্য। আপনি যদি একান্ত আন্তরিকতার সঙ্গে শুধু বলেন—“রাম... রাম...” তাহলেই হনুমানজী আপনার প্রতি আকৃষ্ট হবেন। যেমন “রাধা রাধা” শুনলে শ্রীকৃষ্ণ ছুটে আসেন, তেমনই “রাম রাম” শুনলে হনুমানজী ছুটে আসেন।


তবুও শাস্ত্রে হনুমানজীর বহু শক্তিশালী মন্ত্রের উল্লেখ রয়েছে। তাদের মধ্যে একটি প্রধান বীজমন্ত্র হল—


ॐ हं हनुमते नमः


বাংলা উচ্চারণ—


“ওঁ হং হনুমতয়ে নমঃ।”


এই মন্ত্র যদি নিয়মিত জপ করা যায়, তাহলে মানুষের জীবনে বহু পরিবর্তন আসে। জীবনে বিনয় আসে। সাহস বৃদ্ধি পায়। প্রতিকূল পরিস্থিতিতেও বিজয়ী হওয়ার শক্তি লাভ হয়। ভূত-প্রেত, অশুভ শক্তি এবং নেতিবাচক চিন্তা দূরে সরে যায়। রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি পায়। শরীরে ইতিবাচক শক্তির সঞ্চার হয়। আত্মবিশ্বাস বাড়ে। দীর্ঘায়ু লাভ হয়। শনি, রাহু, মঙ্গল ও কেতুর অশুভ প্রভাব অনেকটাই প্রশমিত হয়। ঋণ, কষ্ট এবং মানসিক দুশ্চিন্তাও ধীরে ধীরে কমতে শুরু করে।


তবে এখানে একটি বিষয় অবশ্যই মনে রাখতে হবে। শুধু মন্ত্র জপ করলেই হবে না। হনুমানজীর উপাসনা করতে হলে নিজের চরিত্রও শুদ্ধ রাখতে হবে।


আমি বলছি না যে আপনাকে সংসার ছেড়ে সন্ন্যাস নিতে হবে। আমি শুধু বলছি, সংসারে থেকেই যদি শাস্ত্রসম্মত, নৈতিক এবং সংযমী জীবনযাপন করতে পারেন, তাহলে হনুমানজীর কৃপা সর্বদা আপনার ওপর বিরাজ করবে। তিনি গৃহত্যাগ চান না। তিনি চান—সৎ চরিত্র, সত্যবাদিতা, সংযম এবং শ্রীরামের প্রতি অটল ভক্তি।


এই চারটি গুণ যদি জীবনে ধারণ করতে পারেন, তাহলে বিশ্বাস রাখুন, হনুমানজীর কৃপা কোনও না কোনও রূপে আপনার জীবনকে স্পর্শ করবেই।


লেখাটি ভালো লাগলে কমেন্ট সেকশনে লিখবেন -- "জয় হনুমানজী।" আর মন চাইলে ভক্ত বন্ধুদের জন্যে শেয়ার করতে পারেন)


ক্রমশ


(পরের ভাগে থাকবে—হনুমানজীর বীজমন্ত্রের বিস্তারিত ব্যাখ্যা, সূর্যোদয়ে জপের নিয়ম, মূল মন্ত্র "শ্রী হনুমতয়ে নমঃ" ২৪ মিনিট জপের গুরুত্ব এবং শনিদেব ও হনুমানজীর বিখ্যাত কাহিনি।)


#HanumanJi

#JaiShriRam

#হনুমানমন্ত্র

#Bajrangbali

#SanatanDharma

#SpiritualWisdom

#Bhakti

#তারাশিসগঙ্গোপাধ্যায়

Monday, 6 July 2026

সিরাজ: সিংহাসন ও সত্যের মাঝখানে।Siraj between the facts and truth.


"সিরাজ: সিংহাসন ও সত্যের মাঝখানে"
একজন স্বাধীনতা সংগ্রামী ও এক সাংবাদিকের সংলাপ

(উত্তর কলকাতার এক প্রাচীন বাড়ির ছায়াঘেরা বারান্দায়। পাশে রেকর্ডার রেখে বসে আছে তরুণ সাংবাদিক রোহন। তার সামনে বসে আছেন প্রবীণ স্বাধীনতা সংগ্রামী আনন্দ চন্দ্র—যাঁর চোখে ধরা আছে ব্রিটিশ শাসনের অবসান এবং স্বাধীনতার পরের বিভ্রান্ত সময়ের স্মৃতি।)

সাংবাদিক (রোহন):

দাদু, ইদানীং সামাজিক মাধ্যমে সিরাজউদ্দৌলাকে নিয়ে প্রবল বিতর্ক চলছে। অনেকে বলছেন, তাঁকে আমরা যেভাবে বীর হিসেবে জেনেছি, তিনি আদৌ তেমন ছিলেন না। তাঁরা বিদ্যাসাগর, গোলাম হোসেন, এমনকি ফরাসি লেখক জ্যাঁ ল'-এর মতো সমসাময়িকদের উদ্ধৃতি দিচ্ছেন। আপনার কী মত? সিরাজ কি সত্যিই দেশপ্রেমিক ছিলেন, নাকি আর পাঁচজন অত্যাচারী শাসকের মতোই একজন শাসক?

স্বাধীনতা সংগ্রামী (আনন্দ চন্দ্র):

(ধীরে হেলান দিয়ে)

ইতিহাস, বাবা, যুদ্ধ শেষ হওয়ার বহু পরে ফেলে যাওয়া এক রণক্ষেত্রের মতো—ধোঁয়া তখনও পুরো কাটে না। যে যেমন দেখতে চায়, তেমনই দেখে। তবে এটুকু বলতে পারি, স্কুলে আমরা যে ইতিহাস পড়েছি, তা পুরো সত্য ছিল না।

রোহন:

তাহলে... আপনি বলতে চাইছেন, পাঠ্যবই আমাদের ভুল শিখিয়েছে?

আনন্দ চন্দ্র:

ভুল নয়—সরলীকরণ করেছে। আমাদের যৌবনে অধিকাংশ ইতিহাসই ব্রিটিশদের লেখা ছিল। পরে জাতীয়তাবাদী ইতিহাসকাররা বিদেশি শাসনের বিরুদ্ধে প্রতিরোধের প্রতীক হিসেবে কিছু বীরের সন্ধান করলেন। ইংরেজদের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো এক তরুণ নবাব—সিরাজ—তাই হয়ে উঠলেন উপযুক্ত প্রতীক। কিন্তু সেই প্রতীকের আড়ালে যে মানুষটি ছিলেন, তিনি মোটেও আদর্শ ছিলেন না।

রোহন:

আপনি কি বিদ্যাসাগরের বর্ণনার কথা বলছেন?

আনন্দ চন্দ্র:

হ্যাঁ। বিদ্যাসাগর লিখেছিলেন, সিরাজ তাঁর দাদার বিশ্বস্ত কর্মচারীদের অপসারণ করে চারপাশে চাটুকার ও দুর্নীতিবাজদের জড়ো করেছিলেন। তাঁর শাসনে মানুষের সম্পদ ও সম্মান কোনোটাই নিরাপদ ছিল না। এমনকি গঙ্গায় স্নান করতে যাওয়া নারীরাও তাঁর কুদৃষ্টির ভয়ে আতঙ্কিত থাকতেন। এমন শাসককে আদর্শ বলা কঠিন।

রোহন:

তাহলে আজও অনেকে তাঁকে বীর বলে কেন?

আনন্দ চন্দ্র:

কারণ আমরা বিভ্রান্ত উত্তরাধিকার বহন করছি। উপনিবেশিক অপমানের ক্ষত আমাদের এমন কিছু প্রতীক খুঁজতে বাধ্য করেছিল, যাদের ঘিরে আত্মমর্যাদা গড়ে তোলা যায়। তাই অনেক সময় নিষ্ঠুর মানুষকেও দেশপ্রেমের রঙে রাঙানো হয়েছে। কিন্তু বিভ্রমের ওপর দাঁড়ানো গৌরব কখনও স্থায়ী হয় না।

রোহন:

(দ্রুত নোট নিতে নিতে)

গোলাম হোসেন তাঁর সিয়ার-উল-মুতাখখিরীন গ্রন্থেও সিরাজকে নিষ্ঠুর ও নারীলোলুপ বলেছেন, তাই না?

আনন্দ চন্দ্র:

হ্যাঁ। তাঁর সমসাময়িকদের অনেকেই—যেমন গোলাম হোসেন—সিরাজকে লোভী, নিষ্ঠুর ও কামুক শাসক হিসেবে বর্ণনা করেছেন।

রোহন:

কিন্তু আমরা তো ছোটবেলা থেকে শুনেছি, তিনি ছিলেন প্রজাদরদী নবাব!

আনন্দ চন্দ্র:

সেই ধারণাটাই দীর্ঘদিন প্রচারিত হয়েছে। কিন্তু সমসাময়িক বিবরণে দেখা যায়, তাঁর নিষ্ঠুরতার ভয়ে অনেক দরবারীও আতঙ্কে থাকতেন। অভিযোগ রয়েছে, তিনি কারণ ছাড়াই মানুষের সম্পদ কেড়ে নিতেন এবং নারীদের ওপর জোরজবরদস্তি করতেন। ব্রিটিশ কামান গর্জে ওঠার আগেই বাংলার সমাজ নানা সংকটে জর্জরিত ছিল।

রোহন:

মোহনলালের বোন—মাধবীকে নিয়ে একটা কাহিনি পড়েছিলাম...

আনন্দ চন্দ্র:

হ্যাঁ, এমন একটি কাহিনি বিভিন্ন পরবর্তী লেখায় উল্লেখ করা হয়েছে। সেখানে বলা হয়, মোহনলালের বোন মাধবী (কোথাও হীরা নামেও উল্লেখিত) সিরাজের দ্বারা নির্যাতিত হন। তবে এই ঘটনার ঐতিহাসিক সত্যতা নিয়ে গবেষকদের মধ্যে যথেষ্ট মতভেদ রয়েছে, এবং নির্ভরযোগ্য সমসাময়িক প্রমাণও সীমিত। তাই এ ধরনের বর্ণনা সতর্কতার সঙ্গে বিচার করা উচিত।

রোহন:

রানি ভবানীর আত্মীয়া তারাসুন্দরী সম্পর্কেও কিছু লেখা আছে...

আনন্দ চন্দ্র:

হ্যাঁ, এমন কাহিনিও প্রচলিত আছে যে সিরাজ তাঁর প্রতি আকৃষ্ট হয়ে তাঁকে অনুসরণ করান। তবে এই ঘটনাটিও বিতর্কিত এবং ইতিহাসবিদদের মধ্যে সর্বসম্মতভাবে স্বীকৃত নয়। ইতিহাসে লোককথা, পরবর্তী রচনা ও সমসাময়িক নথির মধ্যে পার্থক্য করা জরুরি।

রোহন:

তবুও তাঁকে বাংলার শহীদ বলা হয়!

আনন্দ চন্দ্র:

(মৃদু হাসি)

কোনো শাসক বিদেশি শক্তির বিরুদ্ধে লড়েছেন বলেই তাঁর সব কাজ ন্যায়সঙ্গত হয়ে যায় না। আবার ব্যক্তিগত ত্রুটি থাকলেই তাঁর রাজনৈতিক অবস্থান সম্পূর্ণ অস্বীকারও করা যায় না। ইতিহাস এতটা সাদা-কালো নয়।

রোহন:

গঙ্গা থেকে নারীদের ধরে এনে নবাবের সামনে হাজির করার গল্পও কি আছে?

আনন্দ চন্দ্র:

ফরাসি কর্মকর্তা জ্যাঁ ল'-এর স্মৃতিকথায় সিরাজ সম্পর্কে নানা সমালোচনামূলক মন্তব্য রয়েছে। তবে তাঁর বিবরণও ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা, রাজনৈতিক অবস্থান এবং সমসাময়িক গুজবের প্রভাবমুক্ত ছিল না—এ কথাও মনে রাখতে হবে। তাই একক কোনো সূত্রকে চূড়ান্ত সত্য বলে ধরা উচিত নয়।

রোহন:

এত কিছু যদি লেখা থাকে, তাহলে আমাদের পড়ানো হয়নি কেন?

আনন্দ চন্দ্র:

কারণ ইতিহাস প্রায়ই সময়ের প্রয়োজন অনুযায়ী ব্যাখ্যা করা হয়। কখনও নায়ক তৈরি হয়, কখনও খলনায়ক। কিন্তু একজন সত্যসন্ধানীর কাজ হলো—বিভিন্ন সূত্র পড়া, তাদের তুলনা করা এবং প্রমাণের ওজন বিচার করা।

রোহন:

তাহলে যখন আমরা বলি, মীর জাফর বাংলার সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেছিলেন...

আনন্দ চন্দ্র:

(ধীরে থামিয়ে দিয়ে)

মীর জাফরের ভূমিকা নিয়ে ইতিহাসে নানা ব্যাখ্যা আছে। কেউ তাঁকে বিশ্বাসঘাতক বলেন, কেউ বলেন তিনি নিজের স্বার্থ দেখেছিলেন, আবার কেউ বলেন রাজনৈতিক পরিস্থিতি ছিল অত্যন্ত জটিল। ইতিহাসকে এক বাক্যে বিচার করা কঠিন।

রোহন:

তাহলে পলাশীর যুদ্ধ কি শুধু পরাধীনতার শুরু ছিল না?

আনন্দ চন্দ্র:

পলাশীর যুদ্ধ ছিল এক গুরুত্বপূর্ণ মোড়। তার ফলেই ধীরে ধীরে ব্রিটিশ প্রভাব ও শাসন প্রতিষ্ঠিত হয়। তবে বাংলার অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব, ক্ষমতার লড়াই এবং প্রশাসনিক দুর্বলতাও সেই পরিবর্তনের পেছনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল।

রোহন:

ভাবতে কষ্ট হয়।

আনন্দ চন্দ্র:

কষ্টের হলেও সত্যের সন্ধান সেখানেই। স্বাধীনতা শুধু বিদেশি শাসনের অবসান নয়—নিজেদের ইতিহাসকে সততার সঙ্গে দেখার ক্ষমতাও স্বাধীনতার অংশ।

রোহন:

তাহলে নতুন প্রজন্মের কী করা উচিত?

আনন্দ চন্দ্র:

শুধু অনুমোদিত ইতিহাস নয়—বিভিন্ন মত পড়ো। প্রশ্ন করো। তোমার পাঠ্যবইকে প্রশ্ন করো, আমাকেও প্রশ্ন করো। তবেই ইতিহাসের কুয়াশা কিছুটা সরবে।

রোহন:

(কিছুক্ষণ নীরব থেকে)

তাহলে সিরাজ না সম্পূর্ণ নায়ক, না সম্পূর্ণ খলনায়ক—বরং তাঁর সময়েরই এক প্রতিচ্ছবি?

আনন্দ চন্দ্র:

ঠিক তাই। তাঁর জীবন আমাদের শেখায়—অভ্যন্তরীণ দুর্বলতা, নৈতিক অবক্ষয় ও রাজনৈতিক বিভাজন একটি দেশকে বাইরের শক্তির কাছে দুর্বল করে তোলে।

রোহন:

(ধীরে নোটবুক বন্ধ করে)

ধন্যবাদ, দাদু। আপনি আমাকে এমন এক দৃষ্টিভঙ্গি দিলেন, যা কোনো পাঠ্যবই দেয়নি।

আনন্দ চন্দ্র:

(মৃদু হাসলেন)

তাহলে সত্যনিষ্ঠভাবেই লিখো, রোহন। ইতিহাসকে ভালোবাসতে হলে তাকে প্রশ্ন করতে জানতে হয়। কোনো মানুষকে অন্ধভাবে পূজা বা ঘৃণা নয়—প্রমাণের আলোয় বিচার করাই ইতিহাসচর্চার আসল পথ।

Gosaiteertha Shantipur o Babla

  গোঁসাইতীর্থ শান্তিপুর ও বাবলা শ্রীপাট দর্শন ও সাধুসঙ্গ 

তারাশিস গঙ্গোপাধ্যায়

(পূর্ব প্রকাশিতের পর)


আমি বলতে থাকি,

"অবশেষে আকাশগঙ্গা পাহাড়ে দেখা হল তাঁর ইষ্টনির্দিষ্ট গুরু ব্রহ্মানন্দ স্বামীর সাথে। পরমহংসজী নামেই তিনি পরিচিত ছিলেন সাধনমহলে। তিনিই শ্রীবিজয়কৃষ্ণকে দীক্ষা দেন। আর তাঁর কৃপাতেই সিদ্ধিলাভ করেন শ্রীবিজয়কৃষ্ণ। সেই সময় থেকেই ধীরে ধীরে গোস্বামীজী বা গোঁসাইজী নামেই তিনি পরিচিত হয়ে ওঠেন জনমানসে। তখন আকাশগঙ্গা পাহাড়ের একটি গুহাতেই তিনি নিবিষ্ট হয়ে থাকতেন কঠোর সাধনায়।

গোস্বামীজী যোগীদের অলৌকিক শক্তি বা যোগবিভূতিতে বিশ্বাস করতেন না। কিন্তু পরমহংসজীর যৌগিক বিভূতি দেখে তাঁরও প্রত্যয় হল। আর তারপরই তিনি মনোনিবেশ করলেন যোগে। কঠোর সাধনায় লাভ করলেন অষ্টসিদ্ধি।

শ্রীত্রৈলঙ্গস্বামী, শ্রীভোলাগিরি মহারাজ, শ্রীরঘুবরদাস বাবাজী, শ্রীলোকনাথ ব্রহ্মচারী, শ্রীভাষ্করানন্দ, শ্রীবিশুদ্ধানন্দ পরমহংস, শ্রীদ্বারকানাথ বাবাজী প্রভৃতি মহাত্মারা সকলেই ছিলেন তাঁর প্রশংসায় পঞ্চ মুখ। অতএব ধীরে ধীরে তাঁর নাম ছড়িয়ে পড়তে থাকে। শিষ্যভক্তও হয় প্রচুর। মূলতঃ তাঁদের উৎসাহেই গড়ে ওঠে গোস্বামীজীর গেণ্ডারিয়ার আশ্রম। সেই আশ্রমকে কেন্দ্র করে দিকে দিকে শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর মতই অকাতরে প্রেম বিলিয়ে যেতে থাকেন গোস্বামীজী। তাঁর হরিসংকীর্তন ও জীবে প্রেম স্বয়ং শ্রীচৈতন্যের মতই বিরাট আলোড়ন তোলে ভক্তজনমানসে।

বৃন্দাবনে গোস্বামীজীর একটি অপার্থিব অভিজ্ঞতার কথা বলছি। একদিন তিনি গিরি গোবর্দ্ধনে থাকাকালীন সহসা একটি গুহার সামনে একটি কংকালমূর্তিকে দেখতে পেলেন। দীর্ঘ এই কংকালমূর্তির দেহে কোথাও কোন রক্তমাংস নেই; কেবলমাত্র চোখের কোটরে আছে দুটি উজ্জ্বল চোখ ও মুখের মধ্যে জিভমাত্র। গোস্বামীজী কাছে যেতেই কংকালটি তাঁকে ভূমিষ্ঠ হয়ে প্রণাম করলেন এবং বললেন, 'ভগবানের লীলা দর্শন ও হরিনাম করিবার বাসনা এখনও আছে। সেইজন্য চক্ষু ও জিহ্বা রহিয়াছে, ভগবান যশোদানন্দনের কৃপায় অদ্য আমার একটি বাসনা পূর্ণ হইল।' তিনি আরো জানালেন যে তাঁর বয়স চারশো বছরেরও বেশী। তিনি এই বৃন্দাবনে শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু ও শ্রীনিত্যানন্দ প্রভুকেও দর্শন করেছেন। এবার মহাপ্রভুর এই নবতম রূপকেও দর্শন করলেন।

সাধনজগতে কথিত আছে- ভগবানের এক অবতার থেকে আরেক অবতার হওয়া পর্যন্ত পূর্ণ অবতারের একজন করে লীলা পার্ষদ সেই দেহেই বিরাজ করেন। যেমন ত্রেতায় শ্রীরামচন্দ্রের মুখ্য পার্ষদ মহাবীর হনুমানজী শ্রীকৃষ্ণকে দর্শন করেছেন দ্বাপরে, আবার দ্বাপরে শ্রীকৃষ্ণের সখা শ্রীদাম শ্রীচৈতন্যের মরলোকে আগমন পর্যন্ত ভাণ্ডীর বনে একটি গুহায় সমাধিস্থ ছিলেন এবং শ্রীচৈতন্যের আবির্ভাবের পর নবদ্বীপে গিয়ে শ্রীচৈতন্যদেবকে দর্শন করে এসেছেন। তেমনভাবেই এই কংকালরূপী মহাত্মাও শ্রীচৈতন্যদেবের নব কলেবররূপী মহাত্মা শ্রীবিজয়কৃষ্ণ গোস্বামীজীকে দর্শন করলেন। পরবর্তীকালে মহাত্মা অর্জুন দাসও গোস্বামীজীর সম্বন্ধে বলেছেন, 'সাক্ষাৎ শ্রীকৃষ্ণচৈতন্য মহাপ্রভু হ্যায়।'

গোস্বামীজী অনেক তীর্থদর্শনও করেছেন। মূলতঃ কাশী, বৃন্দাবন প্রভৃতি মহাতীর্থে অপার্থিব সব উপলব্ধি অর্জনের পর অবশেষে তিনি আসেন নীলাচলে। দারুব্রহ্ম জগন্নাথদেবকে দর্শনের পর তিনি প্রেমের মোহন আবেশে আবিষ্ট হয়ে যান। তাঁর কীর্তনের মাধ্যমে গৌড়ীয় বৈষ্ণবদের মধ্যে আবার প্রেমভক্তির বান দেখা যায়। কৌপীনধারী, জটাজুটসমন্বিত এই মহাত্মাকে উৎকলবাসীরা 'জটিয়া বাবা' নামে ডাকতে থাকে। ধীরে ধীরে বছর খানেকের মধ্যেই স্থানীয় ভক্তসমাজের মধ্যমণি হয়ে ওঠেন তিনি।

ভক্তজনমানসে গোস্বামীজীর প্রতিপত্তি দেখে স্থানীয় পাণ্ডাগণ এবং কিছু বৈষ্ণব মঠের মোহন্ত ঈর্ষান্বিত হয়ে পড়েন। তারপর তাঁরাই তৎপর হয়ে ওঠেন গোস্বামীজীর প্রাণনাশের জন্য। একদিন ভোরবেলায় গোস্বামীজী অন্য ভক্তদের নিয়ে বসে আছেন ভক্ত নীলমণি বর্মণের বাড়িতে। এমন সময়ে জগন্নাথদেবের প্রসাদী নাড়ুর ঝাঁপি নিয়ে কিছু পাণ্ডা এসে দাঁড়ালেন তাঁর সামনে। বললেন, 'জগন্নাথ মহাপ্রভুর মহাপ্রসাদ এনেছি আপনার জন্য।' তারপর গোস্বামীজীর হাতে তুলে দিলেন সেই নাড়ু। অষ্টসিদ্ধি সম্পন্ন গোস্বামীজী দিব্যদৃষ্টিতে জগন্নাথদেবের কৃপায় স্পষ্ট দেখলেন এতে বিষ মেশানো আছে। কিন্তু গোস্বামীজী তাসত্বেও সেই প্রসাদী নাড়ু ফেলতে পারলেন না। এ যে মহাপ্রসাদ। অতএব জেনে বুঝেও সেই বিষ তিনি খেলেন মহাপ্রসাদের সম্মানরক্ষার জন্য। তারপরই তাঁর শরীরে বিষক্রিয়া শুরু হয়ে যায়। তিনি অচেতন হয়ে পড়েন। চিকিৎসকের চেষ্টায় যদিও বা জ্ঞান ফিরল কিন্তু শরীর বিধবস্ত হয়ে গেল। যে বিষপান করলে মানুষ তৎক্ষণাৎ মারা যায় সেই বিষ তাঁকে মারতে পারল না ঠিকই কিন্তু মাসখানেক ধরে তাঁর শরীরের উপর এই ভয়ংকর বিষের ক্রিয়া চলতে লাগল। দীর্ঘ এক মাস ধরে এই বিষের যন্ত্রণায় জ্বলতে হল তাঁকে।

শোনা যায় - অষ্টসিদ্ধিসম্পন্ন গোস্বামীজী প্রায়ই এই অবস্থায় বিষের দহনজ্বালা থেকে ক্ষণিকের নিস্তারের জন্য স্থূলদেহ ছেড়ে রেখে সূক্ষ্মদেহে ঊর্দ্ধলোকে ভ্রমণ করতেন। কিন্তু তাও তিনি নিজের যোগবিভূতি কখনো ব্যবহার করেননি নিজের যন্ত্রণা নিরাময়ের জন্য। আসলে যোগবিভূতি যে পার্থিব কারণে ব্যয় করতে নেই। এই ঐশ্বর্য্য ধরে রেখে অগ্রসর হতে হয় সাধনপথে। নাহলে শক্তি নাশ হয়ে যায় আর তাতেই ঘটে যোগীর পতন। তাই গোস্বামীজীও এই বিষয়ে সেই সনাতন পন্থাই অনুসরণ করেছেন।

অবশেষে বাংলা ১৩০৬ সালের ২২শে জ্যৈষ্ঠ বিষে জর্জরিত এই স্থূলশরীর ত্যাগ করে গোস্বামীজী চলে যান অমৃতলোকে। কিন্তু তাঁর মহাজীবনী ও মহাবাণী তিনি রেখে গেছেন আমাদের আলোর পথ দেখানোর জন্য। এবার সেই মহাত্মার গৃহদেবতা শ্যামসুন্দরের মন্দিরেই আমরা যাব।"

দেখতে দেখতে আমাদের গাড়ি এসে থামল একটি বড় বাড়ির সামনে। বুঝলাম আমরা এসে গেছি সেই সদাজাগ্রত শ্যামসুন্দরের মন্দিরের সামনে। তাই সানন্দেই আমরা গাড়ি থেকে নামলাম। এক সময়ে এখানে আতাবন ছিল বলে এই বাড়ির নাম আতাবুনিয়া গোঁসাই বাড়ি। গেরুয়া সাদায় মেলানো এই বাড়ির রঙ। বাড়ির সদর দরজা দিয়ে প্রবেশ করলাম ভিতরে। ঢুকতেই সবুজ ঘাসের গালিচা দেয়া আঙিনা। ডানদিকে গেরুয়া রঙের একতলা ঘর, আর সামনে শ্বেতশুভ্র একতলা মন্দির। তবে মন্দিরের উপরে কোন চূড়া নেই- রয়েছে বসতবাড়ির একতলা ছাদ। মন্দিরের বারান্দায় একটি দোলনাও আছে। গর্ভগৃহে শ্রীবিজয়কৃষ্ণ গোস্বামীপ্রভু পুজিত শ্যামসুন্দর ও রাধারাণী বিরাজ করছেন। সানন্দে তাঁদের দর্শন করলাম। আনুমানিক পঞ্চদশ শতাব্দীর মাঝামাঝি বা শেষভাগে বলরাম মিশ্রের চতুর্থ পুত্র শ্রীদেবকীনন্দন গোস্বামী এই শ্রীবিগ্রহ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। শ্যামসুন্দরের কি অপূর্ব রূপ! যে রূপের বাহার একদিন গোস্বামীপ্রভুকে ভুলিয়ে নাস্তির দুনিয়া থেকে অস্তির জগতে নিয়ে এসেছিল সেই রূপ দর্শন করে আমরাও ধন্য হয়ে গেলাম। একপাশে রয়েছে শ্রীবিজয়কৃষ্ণ গোস্বামী প্রভুর বিরাট প্রতিকৃতি আর অন্যপাশে রয়েছে শ্যামসুন্দর ও রাধারাণীর শয্যা। শ্যামসুন্দরের ঠিক পাশে হাসিমুখে উপবিষ্ট ছোট্ট গোপালসোনা। সবাইকেই আমরা জানালাম প্রাণের প্রণতি।


(ক্রমশ)




#spiritual #আধ্যাত্মিক #bijaykrishnogoswami #Gosai #bookstagram #booksbooksbooks

Sunday, 5 July 2026

জুলাই মাসে গ্রহের চলাচল, বিশেষ তিথি ও শুভদিন। Transit of planets in July 2026

 আজ আমরা জানব জুলাই মাসে কোন গ্রহ আপনার জন্য শুভ ফল দেবে, আর কোন গ্রহ আপনার সমস্যাকে আরও বাড়িয়ে তুলতে পারে—কোন কোন গ্রহের কৃপায় আপনি সাফল্যের সর্বোচ্চ শিখরে পৌঁছাতে পারেন—আবার কোন গ্রহ আপনাকে আকাশচুম্বী অবস্থান থেকে মাটিতে নামিয়ে আনতে পারে—জুলাই মাসে কোন রাশির ওপর কোন গ্রহের প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়বে, এবং কোন রাশি সবচেয়ে ভাগ্যবান হবে—এসব নিয়ে আলোচনা করব এখন।


তাহলে দেখা যাক জুলাই মাসে গ্রহদের সামগ্রিক অবস্থান কেমন থাকবে। জুলাই মাসে কোন গ্রহ রাশি পরিবর্তন করবে? কোন কোন গ্রহের যুগলবন্দী তৈরি হবে? এবং কোন কোন বিপজ্জনক যোগ সৃষ্টি হতে চলেছে?


 দেখুন, জুলাই মাসে গ্রহদের চলাচল খুবই সক্রিয় থাকবে।

৪ জুলাই শুক্র সিংহ রাশিতে প্রবেশ করবে। 


৭ জুলাই বক্রী বুধ মিথুন রাশিতে প্রবেশ করবে। 


১৬ জুলাই সূর্যদেব কর্কট রাশিতে প্রবেশ করবেন।


২৪ জুলাই বুধ বক্রী অবস্থা থেকে মার্গী হয়ে যাবে। ২৫ জুলাই পর্যন্ত বুধ অস্ত থাকবে।


২৭ জুলাই শনি মীন রাশিতে বক্রী হয়ে যাবে। 


মঙ্গল আগে থেকেই বৃষ রাশিতে অবস্থান করছে। 


বৃহস্পতি আগে থেকেই কর্কট রাশিতে অবস্থান করছে।

তবে ১৫ জুলাই থেকে টানা ২৮ দিনের জন্য বৃহস্পতি অস্ত থাকবে।


শনি এ বছর রাশি পরিবর্তন করছে না। কিন্তু ২৭ জুলাই থেকে টানা ১৩৮ দিনের জন্য শনি বক্রী হয়ে যাবে।


এবার জেনে নেওয়া যাক জুলাই মাসের ব্রত ও উৎসবগুলো। এর মধ্যে ১০ জুলাই, শুক্রবার—যোগিনী একাদশী।


১২ জুলাই, রবিবার—রোহিণী ব্রত এবং রবি প্রদোষ ব্রত।


১৪ জুলাই, মঙ্গলবার—আষাঢ় অমাবস্যা।


১৫ জুলাই, বুধবার থেকে গুপ্ত নবরাত্রি শুরু হবে।


১৬ জুলাই, বৃহস্পতিবার—সূর্য কর্কট রাশিতে প্রবেশ করবেন।

সেদিন কর্কট সংক্রান্তিও হবে।

একই দিনে জগন্নাথদেবের রথযাত্রারও সূচনা হবে।


১৯ জুলাই, রবিবার—স্কন্দ ষষ্ঠী।


২৫ জুলাই, শনিবার—দেবশয়নী একাদশী। এই দিন থেকেই ভগবান শ্রীহরি বিষ্ণু যোগনিদ্রায় প্রবেশ করেন।


২৬ জুলাই, রবিবার—রবি প্রদোষ ব্রত।


২৯ জুলাই, বুধবার—গুরু পূর্ণিমা।


৩০ জুলাই, বৃহস্পতিবার—শ্রাবণ মাসের সূচনা হবে।


 এবার জেনে নেওয়া যাক জুলাই মাসের বিভিন্ন শুভ মুহূর্ত। যদি আপনি বাগদান, বিবাহ, গৃহপ্রবেশ করতে চান—

অথবা গাড়ি, জমি বা সোনা কিনতে চান—তাহলে কোন দিনটি আপনার জন্য সবচেয়ে শুভ হবে?


এর মধ্যে গাড়ি কেনার জন্য শুভ দিন—

২, ৩, ৫, ৮, ১২, ১৯, ২৪, ২৯ ও ৩০ জুলাই।


বিবাহের জন্য শুভ দিন—

১, ৬, ৭, ১১ ও ১২ জুলাই।


সম্পত্তি কেনার জন্য শুভ দিন—

১৬, ১৭, ২৩ ও ২৪ জুলাই।


গৃহপ্রবেশের জন্য শুভ দিন—

১, ২ ও ৬ জুলাই।


নামকরণ অনুষ্ঠানের জন্য শুভ দিন—

৩, ৭, ১১, ১৪, ১৭, ২১, ২৫ ও ২৯ জুলাই।


নতুন ব্যবসা শুরু করার জন্য শুভ দিন—


১০, ১৬ ও ২৩ জুলাই।


মুণ্ডন সংস্কারের জন্য শুভ দিন—

২, ৩, ৯, ১৫ ও ২০ জুলাই।


অন্নপ্রাশনের জন্য শুভ দিন —

১৫, ২০, ২৪ ও ২৯ জুলাই।


উপনয়ন অনুষ্ঠানের জন্য শুভ দিন—

১, ২, ৪, ৫, ১৬, ১৭, ১৮, ২৪, ২৬, ৩০ ও ৩১ জুলাই।


এরপরের পোস্টে আসা যাবে মেষ রাশি প্রসঙ্গে।

ক্রমশ

স্বর্গ বা নরক আছে কোথায়?

স্বর্গ বা নরক আছে কোথায়? আমাদের মাঝেই -- আমাদের মনের ভিতরে।দুটিই আমাদের মানসিক অবস্থা। মন যখন নানা জাগতিক সমস্যায় জড়িয়ে নিজে পুড়তে থাকে সেটাই নরক যন্ত্রণা। আর যখন সে আনন্দের সাথে সব কাজ করে যেতে থাকে সেবা রূপে সেটাই স্বর্গের সুখ।
   যখন জীবনে নরক যন্ত্রণা আসে তখন তার বীজ খুঁজে বের করতে হয়। তাহলে দেখা যায় বীজ ছিল আমাদের কোন কর্মের মাঝে। তখন শান্ত হয়ে আত্মায় আত্মস্থ হলে ঠিক তার থেকে বেরনোর পথ খুঁজে বের করা যায়।
    মনের স্বর্গকে গড়ে তোলার জন্য চিন্তার পারে যেতে হয়। তাই তারাশিস গঙ্গোপাধ্যায় বলে,যত জীবনকে বাইরের দিকে চিনতে চাইব ততই বাড়বে চিন্তা। তাই চিন্তার চিতা সাজিয়ে মনের মাঝে স্বর্গের আনন্দে থাকব। বাইরের পৃথিবীর আঘাতের সাধ্য কি সেখানে পৌঁছয়।

#spirituality  #spiritualgrowth  #spiritualawakening  #আধ্যাত্মিক  #tarashisauthor

Monday, 15 June 2026

ওঙ্কার সাধনা কিভাবে করতে হয়?

‘ওঁ’কার সাধনা কিভাবে করতে হয়?
 - তারাশিস গঙ্গোপাধ্যায়

আমাদের মধ্যে অনেকেই ‘ওঁ’ জপ করে থাকেন। কিন্তু আপনি কি জানেন, ওঁ জপ করার একটি নির্দিষ্ট সময়, সঠিক দিক এবং সঠিক পদ্ধতি রয়েছে? কখন, কোথায় এবং কোন দিকে মুখ করে ‘ওঁ’ জপ করলে চার গুণ ফল পাওয়া যায়? যার মাধ্যমে এই শক্তিশালী মন্ত্রের চার গুণ শুভ ফল পাওয়া যেতে পারে। এছাড়াও, ওঁ জপ করার সময় এমন ২০টি ভুল আছে, যা কখনোই করা উচিত নয়। জানতে চাইলে পড়ুন এই ধারাবাহিক লেখা।
_________________________

শিষ্য: গুরুদেব, ‘ওঁ’ কে বলা হয় আমাদের সকলের জন্য শক্তির এক বিশাল উৎস। এটা কি সত্যি? ‘ওঁ’-এর বৈজ্ঞানিক দিক কী? এবং ‘ওঁ’-এর জপ আমাদের শরীরের বিভিন্ন অঙ্গ-প্রত্যঙ্গে কীভাবে ইতিবাচক প্রভাব ফেলে?

গুরুদেব: দেখ, ‘ওঁ’ তিনটি অক্ষর নিয়ে গঠিত—অ, উ এবং ম। অ + উ + ম মিলেই ‘ওঁ’ হয়।
‘ওঁ’ কোন মানুষ, কোন ঋষি-মুনি বা কোন দেবতার সৃষ্টি করা মন্ত্র নয়। এই মন্ত্র স্বয়ংপ্রকাশিত। এটি নিজে থেকেই প্রকাশিত হয়েছে।
এই ধ্বনির উৎস হলো অনাহত নাদ। এই অনাহত নাদের উৎপত্তি নাভি থেকে। সেখান থেকেই ওঁ-এর ধ্বনি বেরিয়ে আসে। 

ওঁ হল এক আদিম ও মৌলিক ধ্বনি। এটি উচ্চারণ করার সময়
শরীর ও মস্তিষ্কে এক বিশেষ কম্পনের সৃষ্টি হয়। ‘অ’ ধ্বনি পেট ও বুকে অনুরণন সৃষ্টি করে। ‘উ’ ধ্বনি গলা ও কণ্ঠদেশে পৌঁছয়। আর ‘ম’ ধ্বনি মাথা ও মস্তিষ্কে কম্পন সৃষ্টি করে।

এই কম্পন আমাদের স্নায়ুতন্ত্রকে শান্ত করে। মানসিক চাপ কমায়। তাই ওঁ উচ্চারণ করলে মানসিক শান্তি আসে।
রাগ, বিরক্তি ও অস্থিরতা কমে।
মনোযোগ ও একাগ্রতা বৃদ্ধি পায়।

অনেক বিজ্ঞানীর মতে,
ওঁ ধ্বনির প্রাকৃতিক কম্পাঙ্ক প্রায় ৪৩২ হার্টজ। যা প্রকৃতির নানা স্বাভাবিক শব্দের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। যেমন—
পাখির ডাক, বাতাসের সোঁ সোঁ শব্দ, এবং প্রকৃতির আরও নানা কম্পন।

তাই ওঁ ধ্বনি শুনলে ও উচ্চারণ করলে আমাদের শরীর ও প্রকৃতি যেন একই ছন্দে মিলিত হয়। এর ফলে শরীরের ভারসাম্য বজায় থাকে। মন শান্ত থাকে এবং প্রকৃতির সঙ্গে এক গভীর সংযোগ তৈরি হয়।

হিন্দি বা সংস্কৃতের সমস্ত বর্ণমালার মূল উৎসও এই ওঁ। ক থেকে ক্ষ পর্যন্ত, অ থেকে ঔ পর্যন্ত—সব ধ্বনির মূল উৎস এই ওঁ। কোন ঋষি বা মানুষ এগুলো সৃষ্টি করেননি, এগুলো স্বয়ংপ্রকাশিত।

এ প্রসঙ্গে বলা যায় ভারতে রাধাস্বামী সম্প্রদায় নামে একটি সম্প্রদায় আছে। তাদের প্রধান সাধনাই হলো অনাহত নাদের সাধনা।

শিষ্য : অনাহত নাদের সাধনা বলতে কী বোঝায়?

গুরুদেব : যখন তোমার শরীর সম্পূর্ণ শূন্যতার অবস্থায় স্থির হয়ে যাবে, ইন্দ্রিয়গুলো অন্তর্মুখী হয়ে যাবে, মনও অন্তর্মুখী হয়ে যাবে, আর তোমার চিত্ত সম্পূর্ণ শান্ত হয়ে যাবে -  যাকে বলা হয় ‘কাষ্ঠ-মৌন’ তখন ভিতর থেকে যে নাদ শোনা যায় এ হল অনাহত নাদ।

শিষ্য : এই কাষ্ঠ-মৌন বলতে বোঝায়?

গুরুদেব: যেমন একটি কাঠ কোথাও রেখে দিলে তার নিজের কোন ক্রিয়া থাকে না,
ঠিক তেমনি শরীর, মন ও ইন্দ্রিয় সম্পূর্ণ নিস্তব্ধ ও নিষ্ক্রিয় হয়ে যাবে। কোন চিন্তা থাকবে না। এই অবস্থাকেই কাষ্ঠ-মৌন বলা হয়। তখন নাভির মধ্যে যে ‘ওঁ’-এর ধ্বনি অনবরত ধ্বনিত হচ্ছে, তা নিজের এই কান দিয়েই শোনা যেতে শুরু করবে।
আর এই অবস্থাই ব্রহ্মপ্রাপ্তি। এই অবস্থাই ঈশ্বরপ্রাপ্তি। এই ‘ওঁ’-এর ধ্বনি শুনতে পাওয়াই ঈশ্বরকে উপলব্ধি করা।
এটাই ঈশ্বরের প্রত্যক্ষ বোধ।
এককথায় বলা যায় - যখন মানুষের মন, ইন্দ্রিয় এবং চিত্ত সম্পূর্ণ অন্তর্মুখী হয়ে যায় এবং গভীর নীরব অবস্থায় পৌঁছায়, তখন নাভির সেই ওঁ-ধ্বনি নিজের কানেই শোনা যায়। এটিকেই বলা হয় ঈশ্বর-প্রাপ্তি বা ব্রহ্মজ্ঞান। 

গীতায় একটি শ্লোক আছে—
"এতদ্ দ্বয়মক্ষরং জ্ঞাত্বা ব্রহ্মলোকে মহীয়তে।"
অর্থাৎ, যে এই ‘ওঁ’ শব্দের প্রকৃত জ্ঞান লাভ করে, সে ব্রহ্মকে উপলব্ধি করতে পারে। সে ব্রহ্মের স্বরূপ জানতে পারে। আগেই বলেছি -  আমাদের যত অক্ষর ও যত স্বরচিহ্ন আছে, সবকিছুর উৎপত্তিই এই ‘ওঁ’ থেকে। ‘ওঁ’ অনাহত নাদ থেকে স্বয়ং প্রকাশিত হয়েছে। এবং এই ‘ওঁ’ প্রত্যেক মানুষের মধ্যেই বিদ্যমান। প্রত্যেক নারী ও পুরুষের মধ্যেই এটি রয়েছে।
যে কোন নারী বা পুরুষ যদি ধ্যান ও সাধনার অবস্থায় বসে,
এক-দুই ঘণ্টা নীরব থাকার অভ্যাস করেন, এবং নিজের মন ও ইন্দ্রিয়কে অন্তর্মুখী করার চেষ্টা করেন, তাহলে সাধনার মাধ্যমে তিনি এই ‘ওঁ’-এর ধ্বনি শুনতে পারবেন। ‘ওঁ’-এর ধ্বনি সত্যিই শোনা যায়। তবে এর জন্য কঠোর সাধনার প্রয়োজন।"

শিষ্য: এই ধ্বনি শোনার কোন সহজ উপায় নেই?

গুরুদেব: আরেকটি উপায়ও আছে। বিজয়পুরে রাজা বাবা নামে এক সিদ্ধপুরুষ থাকতেন। শোনা যায়, তিনি নেপালের রাজপরিবারের সদস্য ছিলেন।
ভবঘুরের মতো ঘুরতে ঘুরতে তিনি বিন্ধ্যাচলে এসে পৌঁছেছিলেন। মাত্র ১২-১৩ বছর বয়স থেকেই তিনি সেখানে বহুদিন ছিলেন।
পরে বিজয়পুরের পাহাড়ে নিজের আশ্রম স্থাপন করেন। আজও সেই স্থান ‘রাজা বাবার বাখুলি’ নামে পরিচিত।
রাজা বাবা তাঁর এক বইয়ে লিখেছেন— যদি প্রতিদিন ১২ হাজার বার ‘ওঁ’-এর অজপা জপ করা যায়, এবং টানা এক বছর তা পালন করা যায়,
তাহলে মানুষের হৃদয়ের মধ্যেই ঈশ্বরের দর্শন ঘটে।

শিষ্য: এই অজপা জপ বলতে কি বোঝায়?

গুরুদেব: শ্বাস নেওয়ার সময় মনে মনে ‘ও...’ আর শ্বাস ছাড়ার সময় মনে মনে ‘ম...’ উচ্চারণ। অর্থাৎ— ‘ও... ম...’ ‘ও... ম...’ এইভাবে শ্বাস-প্রশ্বাসের সঙ্গেই জপ চলতে থাকবে। এভাবে প্রতিদিন ১২ হাজার বার জপ করতে হবে। দিনে মাত্র একবার আহার করতে হবে। সেটাও অল্প পরিমাণে। কারও সঙ্গে অপ্রয়োজনীয় মেলামেশা করা যাবে না। নির্জনে থাকতে হবে।
সম্পূর্ণ শুচিতা ও পবিত্রতা বজায় রাখতে হবে। এবং টানা এক বছর এই নিয়ম পালন করতে হবে। তাহলে তাঁর বইয়ের বর্ণনা অনুযায়ী,
মানুষের হৃদয়ের মধ্যেই ঈশ্বরের জ্যোতি প্রকাশিত হবে।

শিষ্য: এখন ১২ হাজার অজপা জপ করতে কত সময় লাগতে পারে?

গুরুদেব: একজন স্বাভাবিক মানুষ গড়ে প্রতি মিনিটে ১৫ বার শ্বাস প্রশ্বাস নেয়। অর্থাৎ এক ঘণ্টায় একজন মানুষের প্রায় ৯০০ বার শ্বাস-প্রশ্বাস হয়।
এর চেয়ে বেশি হলে আয়ু কমে যায়। আর এর চেয়ে কম হলে আয়ু বাড়ে। কারণ শাস্ত্র মতে মানুষের আয়ু শ্বাসের সংখ্যার উপর নির্ভরশীল। তাই আমাদের শাস্ত্রে প্রাণায়ামের উপর এত জোর দেওয়া হয়েছে।

প্রাণায়াম করলে মানুষ দীর্ঘক্ষণ শ্বাস ধরে রাখতে পারে। শ্বাস যত সঞ্চয় হবে, আয়ুও তত বৃদ্ধি পাবে। ৯০০ শ্বাসের হিসাবে যদি ১২,০০০ বার জপের হিসাব করা হয়, তাহলে ১০ ঘণ্টায় প্রায় ৯,০০০ বার সম্পন্ন হবে।
আর বাকি ৩,০০০ বার করতে আরও প্রায় ৪ ঘণ্টা লাগবে।
অর্থাৎ, মোটামুটি ১৪ ঘণ্টার সাধনায় ১২,০০০ বার ওঁ জপ সম্পূর্ণ হতে পারে। যে ব্যক্তি প্রতিদিন ১৪ ঘণ্টা ধরে ওঁ-এর সাধনা করবে, সে যদি এক বছরের মধ্যে ঈশ্বরকে না পায়, তাহলে আর কে পাবে? আমার বিশ্বাস -- অবশ্যই সে ঈশ্বরপ্রাপ্ত হবে। এটাই রাজা বাবার মত।

(চলবে)
(পরের সব অংশ ফেসবুকেনামার প্রোফাইলে পেয়ে যাবেন)

#ওঁকার_সাধনা
#প্রণব_ধ্যান
#অনাহত_নাদের_সন্ধানে
#ওঁকারের_মহাশক্তি
#ব্রহ্মমুহূর্ত_সাধনা
#আত্মজাগরণের_পথে
#অন্তর্নিহিত_দিব্যশক্তি
#spirituality #spiritualawakening

চন্দনের মাহাত্ম্য (প্রথম পর্ব)

চন্দনের গন্ধ শুধু শরীরকে শীতল করে না… বদলে দিতে পারে মানুষের অন্তরও।
এক নির্জন আশ্রমে এক শিষ্যের একটি মাত্র প্রশ্ন—
“গুরুদেব, চন্দনের প্রকৃত মাহাত্ম্য কী?”
তারপর শুরু হয় এমন এক কথোপকথন, যেখানে উঠে আসে— চন্দনের শাস্ত্রীয় রহস্য,  তৃতীয় নয়নের প্রকৃত অর্থ,  আজ্ঞা চক্রের গভীর তাৎপর্য,
কেন দেবতার অঙ্গে চন্দন নিবেদন করা হয়, আর কেন চন্দনের মতো মানুষ হওয়াই জীবনের সর্বশ্রেষ্ঠ সাধনা।
______________________

চন্দনের মাহাত্ম্য (প্রথম পর্ব)

সন্ধ্যার নরম আলো ক্রমশ আশ্রমের বটগাছের পাতায় পাতায় মিশে যাচ্ছে। দূরে ধূপের সুগন্ধ, মন্দিরের ঘণ্টাধ্বনি আর বেদপাঠের ক্ষীণ ধ্বনি পরিবেশকে এক অপার্থিব প্রশান্তিতে ভরিয়ে তুলেছে। সেই সময় শিষ্য গুরুদেবের চরণে প্রণাম করে নতস্বরে প্রশ্ন করল।

শিষ্য: গুরুদেব, বহুদিন ধরে আমার মনে একটি প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে। আমরা প্রতিদিন পূজায় চন্দন ব্যবহার করি, দেবমূর্তিতে চন্দন নিবেদন করি, কপালে চন্দনের তিলক ধারণ করি। কিন্তু এর প্রকৃত মাহাত্ম্য কী?

গুরুদেব স্নিগ্ধ হেসে শিষ্যের মাথায় হাত রাখলেন। তারপর বললেন: বৎস, চন্দন কেবল একটি সুগন্ধি কাঠ নয়। এটি শীতলতার প্রতীক, পবিত্রতার প্রতীক, আবার আত্মসংযম ও ঈশ্বরস্মরণেরও প্রতীক।

সনাতন ধর্মে যখনই কোনো পূজা বা যজ্ঞ শুরু হয়,  মন্ত্রোচ্চারণের মাধ্যমে বলা হয় যে চন্দন পবিত্রকারী, পাপ নাশকারী এবং লক্ষ্মীর কৃপা আনয়নকারী। এরপর হাতে রক্ষাসূত্র বাঁধা হয় এবং তারপর পূজার মূল প্রক্রিয়া শুরু হয়। চন্দন মানুষের উপর অশুভ শক্তির প্রভাব দূর করে এবং রক্ষাসূত্র দশ দিক থেকে সুরক্ষা দেয়—এমন বিশ্বাস রয়েছে। তাই সনাতন ধর্মে পূজার সূচনাতেই এই আচার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মন্দিরে ধূপ, দীপ ও সুগন্ধি দ্রব্য ব্যবহারের ফলে পরিবেশে এক পবিত্র ও শান্ত আবহ সৃষ্টি হয়। এর ফলে মন ভালো থাকে এবং নেতিবাচক চিন্তা দূরে থাকে—এমন ধারণা প্রচলিত। 

 মহামৃত্যুঞ্জয় মন্ত্রে একটি শব্দ আছে—"সুগন্ধিম্ পুষ্টিবর্ধনম্"। অর্থাৎ সুগন্ধ এমন এক শক্তি, যা পুষ্টি ও বিকাশ ঘটায়। চন্দনের মধ্যেও সেই সুগন্ধ বিদ্যমান। কারণ, মানুষের বাহ্যিক পরিচ্ছন্নতার পাশাপাশি অন্তরের পবিত্রতার কথাও শাস্ত্র স্মরণ করিয়ে দেয়। তাই আচমন ও প্রাণায়ামের পর যখন যজমানকে পবিত্র করা হয়, তখন কপালে চন্দনের তিলক পরানো হয়।

শিষ্য: গুরুদেব, শুধু একটি তিলকই কি এত বড় তাৎপর্য বহন করে?

গুরু: অবশ্যই। শাস্ত্রে বলা হয়েছে, চন্দন পাপক্ষয়কারী, মনকে নির্মলকারী এবং শুভশক্তির আহ্বানকারী। চন্দন ব্যবহারে মস্তিষ্ক ও চোখের শক্তি বৃদ্ধি পায়—এমন বিশ্বাস রয়েছে। চন্দনের সুগন্ধ মানসিক চাপ, উদ্বেগ এবং হরমোনের ভারসাম্য রক্ষায় সহায়ক বলে অনেকে মনে করেন। কপালে চন্দনের তিলক লাগালে মন শান্ত থাকে এবং শীতল অনুভূতি হয়। এর ফলে মানসিক ক্লান্তি কমে এবং মাথাব্যথাও হ্রাস পেতে পারে। তাই চন্দন অত্যন্ত উপকারী বস্তু। চন্দনের তিলক কেবল কপালে একটুকরো চিহ্ন নয়—এ যেন নিজের চিত্তকে ঈশ্বরের শরণে সমর্পণের এক নীরব অঙ্গীকার।

শিষ্য: গুরুদেব, মলয়গিরির চন্দনের কথা প্রায়ই শুনি। তার কি আলাদা মাহাত্ম্য আছে?

গুরু: মলয়গিরির চন্দনকে বহু প্রাচীনকাল থেকেই সর্বোৎকৃষ্ট বলে মানা হয়েছে। তার সুগন্ধ গভীর, তার প্রকৃতি অত্যন্ত শীতল। বর্তমানে এর দাম অত্যন্ত বেশি এবং বাজারে নকল চন্দনের ব্যবসাও প্রচুর চলছে। তবে যদি খাঁটি চন্দনের সঙ্গে কেশর মিশিয়ে দেবতাদের নিবেদন করা হয় এবং পরে প্রসাদ হিসেবে গ্রহণ করা হয়, তবে তা অত্যন্ত শুভ বলে ধরা হয়।

তাই প্রাচীন কবিরা বলেছেন—
"চন্দন বিষ ব্যাপত নহি, লিপটে রহত ভুজঙ্গ।"অর্থাৎ বিষধর সাপ চন্দনগাছে জড়িয়ে থাকলেও চন্দন নিজের স্বভাব হারায় না। এ শুধু গাছের কথা নয়, মানুষের জীবনেও এক গভীর শিক্ষা—অশুভের সংস্পর্শে এসেও যে নিজের শুভ গুণ অটুট রাখতে পারে, সেই প্রকৃত চন্দনের মত।

শিষ্য: গুরুদেব, দেবতা ও মানুষের ব্যবহৃত চন্দনের মধ্যেও কি কোন পার্থক্য আছে?

গুরু: পুরাণে এমন উল্লেখ পাওয়া যায়। দেবতাদের নিবেদিত চন্দনকে হরিচন্দন এবং মানুষের ব্যবহৃত চন্দনকে শ্রীচন্দন বলা হয়েছে। আবার সংস্কৃত ভাষায় চন্দনের আর-এক নাম ‘শ্রীখণ্ড’।

শিষ্য: কপালে চন্দন ধারণের বিশেষ কারণ কী?

গুরু: যেখানে মানুষ তিলক ধারণ করে, যোগশাস্ত্রে সেই স্থানকেই আজ্ঞা চক্র বলা হয়। এটি জ্ঞান, বিবেক ও অন্তর্দৃষ্টির প্রতীক। তাই বহু সাধক বিশ্বাস করেন, এই স্থানে চন্দন ধারণ করলে মন শান্ত হয়, চিন্তা নির্মল হয় এবং ঈশ্বরচিন্তার প্রতি মন স্বাভাবিকভাবেই আকৃষ্ট হয়।

শিষ্য: তাহলে কি সব সম্প্রদায়ের মানুষেরই চন্দন ধারণ করা উচিত?

গুরু: প্রাচীন সনাতন প্রথায় বলা হয়েছে, ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয় ও বৈশ্য—এই তিন জাতির মানুষের কপালে তিলক থাকা উচিত। যে যেমন সম্প্রদায়ের, সে তেমন রীতিতে তিলক ধারণ করবে। বৈষ্ণব হলে ঊর্ধ্বপুণ্ড্র, শৈব হলে ত্রিপুণ্ড্র এবং শাক্ত হলে নিজ নিজ প্রথা অনুযায়ী তিলক ধারণ করা উচিত। তাই বৈষ্ণব, শৈব, শাক্ত—সকলেই নিজ নিজ আচার অনুযায়ী তিলক ধারণ করেন। উদ্দেশ্য একটাই—নিজেকে সর্বদা ঈশ্বরস্মরণে স্থিত রাখা।

শিষ্য: ভস্মের কথাও তো শুনেছি, গুরুদেব।

গুরু: হ্যাঁ। শৈব সাধনায় ভস্মের বিশেষ মাহাত্ম্য আছে।ঐতিহ্যগত পদ্ধতিতে গোময় থেকে বিশেষ প্রক্রিয়ায় ভস্ম প্রস্তুত করা হয় এবং তাতে সুগন্ধি মেশানো হয়। এই ভস্মই ভগবান শিবের অঙ্গে লেপন করা হয় এবং শিবলিঙ্গেও নিবেদন করা হয়। উজ্জয়িনীর মহাকালেশ্বর মন্দিরের বিখ্যাত ভস্ম আরতিতেও ভস্মের বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। এর মধ্যেও রয়েছে অনিত্য জগতের শিক্ষা—একদিন সবই ভস্মে পরিণত হবে, তাই অহংকার নয়, ভক্তিই মানুষের প্রকৃত অলঙ্কার।

শিষ্য: গুরুদেব, আপনি আজ্ঞা চক্রের কথা বললেন। অনেকে বলেন, চন্দন ধারণ করলে তৃতীয় নয়ন জাগ্রত হয়। এর অর্থ কী?

গুরুদেব কিছুক্ষণ নীরব রইলেন। তারপর শান্ত কণ্ঠে বললেন গুরু: বৎস, তৃতীয় নয়নকে অনেকে ভুল বোঝে। 
এটি কোনো সাধারণ চোখ নয়, আবার অলৌকিক প্রদর্শনের বিষয়ও নয়। এর প্রকৃত অর্থ অন্তর্দৃষ্টি—যে দৃষ্টি বাহ্য জগতের আড়ালে সত্যকে উপলব্ধি করতে শেখায়।

যেখানে ভগবান শিবের তৃতীয় নেত্রের প্রতীক ধরা হয়, সেই স্থানেই কপালে চন্দন ধারণ করা হয়। নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সকলেই সেই স্থানে চন্দন ধারণ করতে পারেন। এই স্থানকে অধ্যাত্ম জগতে আজ্ঞা চক্রের প্রতীক হিসেবে মানা হয় এবং এটিকে অন্তর্দৃষ্টি ও আধ্যাত্মিক জ্ঞানের কেন্দ্র বলে বিবেচনা করা হয়। যোগসাধনায় অনেকেই এই আজ্ঞা চক্র জাগ্রত করার চেষ্টা করেন এবং এর সঙ্গে গভীর আধ্যাত্মিক সাধনার সম্পর্ক রয়েছে।

 অনেকেই মনে করেন শিবের তৃতীয় নয়ন মানেই রুদ্ররূপ বা ধ্বংসের প্রতীক। কিন্তু এর আরও গভীর একটি অর্থ রয়েছে। তৃতীয় নয়ন বলতে বোঝায় এমন এক অন্তর্দৃষ্টি, যার মাধ্যমে অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যতের সূক্ষ্ম উপলব্ধি লাভ করা যায়। এই অন্তর্দৃষ্টিকেই প্রাচীন সাধকেরা ‘অন্তর্চক্ষু’ বলে অভিহিত করেছেন।

অন্তর্চক্ষুর অর্থ হল দিব্যজ্ঞান দ্বারা সত্যকে উপলব্ধি করা। বাহ্যিক চোখে যা দেখা যায় না, অন্তরের জ্ঞান সেই অদৃশ্য সত্যকেও অনুভব করতে পারে।

যখন কোন সাধক গভীর সাধনায় প্রবৃত্ত হন, তখন তাঁর অন্যতম লক্ষ্য থাকে আজ্ঞা চক্রকে জাগ্রত করা। এই আজ্ঞা চক্র সেই স্থানেই অবস্থিত, যেখানে নারীরা টিপ পরেন এবং পুরুষেরা চন্দনের তিলক ধারণ করেন।

যোগশাস্ত্রে বলা হয়েছে, এই আজ্ঞা চক্রের দ্বিদল পদ্মে শিবের ধ্যান করা হয়। এটি কেবল শরীরের একটি স্থান নয়, বরং চেতনার এক উচ্চতর স্তরের প্রতীক।

কুণ্ডলিনী শক্তি যখন আজ্ঞা চক্রে পৌঁছয়, তখন সেই অবস্থাকে অত্যন্ত সূক্ষ্ম ও গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হয়। তাই এই সাধনায় সামান্য অসাবধানতাও বিপজ্জনক হতে পারে বলে বহু আধ্যাত্মিক ধারায় সতর্ক করা হয়েছে। সেই কারণেই প্রকৃত গুরুর দীক্ষা ও তত্ত্বাবধানকে অপরিহার্য বলে গণ্য করা হয়।

একজন সিদ্ধ গুরু প্রয়োজনে বিশুদ্ধ চক্র থেকে সেই শক্তিকে সহস্রার পর্যন্ত পরিচালিত করতে পারেন বলে যোগশাস্ত্রে বর্ণনা রয়েছে।

সনাতন দর্শনের একটি ব্যাখ্যা অনুযায়ী, কুণ্ডলিনী শক্তির অবস্থান দুই স্তরে কল্পনা করা হয়। একটি মূলাধার চক্রে এবং অন্যটি সহস্রারে। এই শক্তিকে ত্রিবলয়াকারে কুণ্ডলী পাকানো সাপের প্রতীক হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়।

মূলাধারে অবস্থিত কুণ্ডলিনীর মুখ নিম্নদিকে এবং সহস্রারের শক্তি ঊর্ধ্বমুখী—এমন প্রতীকী বর্ণনাও বহু প্রাচীন গ্রন্থে পাওয়া যায়।

কুণ্ডলিনী জাগরণের সময় শক্তির প্রবাহ অত্যন্ত দ্রুত ও শক্তিশালী বলে বিবেচিত হয়। যদি সুষুম্না নাড়ি জাগ্রত না থাকে এবং সেই শক্তি ইড়া বা পিঙ্গলা নাড়ির পথে প্রবাহিত হয়, তবে আধ্যাত্মিক ভারসাম্য নষ্ট হতে পারে—এমন বিশ্বাস যোগতত্ত্বে প্রচলিত রয়েছে।
আবার এমনও বলা হয়, যদি কুণ্ডলিনী মূলাধারেই আবদ্ধ থেকে যায় এবং ঊর্ধ্বগামী না হয়, তবে মানুষের চেতনা নিম্ন প্রবৃত্তির দিকে আকৃষ্ট হতে পারে এবং আধ্যাত্মিক উন্নতির পথ বাধাগ্রস্ত হতে পারে।

তাই সুষুম্না নাড়ি জাগ্রত হয়েছে কি না, কুণ্ডলিনী সাধনার উপযুক্ত সময় এসেছে কি না—এসব নির্ণয় কেবলমাত্র একজন যোগসিদ্ধ ও অভিজ্ঞ গুরুই করতে পারেন।

যেমন ‘রাম’ নামটি উচ্চারণ করে দেখ। ‘রা’ ধ্বনিতে মুখ উন্মুক্ত থাকে এবং শব্দ উপরের দিকে অনুরণিত হয়। ‘ম’ উচ্চারণের সময় ঠোঁট বন্ধ হয়ে যায় এবং শরীরের ভিতরে এক সূক্ষ্ম কম্পনের অনুভূতি জাগে। এই ধ্বনির মধ্যেও যোগতত্ত্বের এক গভীর আধ্যাত্মিক তাৎপর্য নিহিত রয়েছে।

তাই দেখা যাচ্ছে যে কপালে চন্দনের তিলক ধারণ শুধুমাত্র একটি ধর্মীয় চিহ্ন নয়। এটি আজ্ঞা চক্র, অন্তর্দৃষ্টি, আত্মসংযম এবং ঈশ্বরস্মরণের এক পবিত্র প্রতীক। তবে মনে রেখ, প্রকৃত জাগরণ কখনো বাহ্যিক চিহ্নে নয়—তা ঘটে মানুষের অন্তরের পবিত্রতা, সাধনা এবং সত্য উপলব্ধির মধ্য দিয়ে। মানুষ যখন নিজের মনকে শুদ্ধ করে, ইন্দ্রিয়কে সংযত করে এবং ঈশ্বরচিন্তায় নিমগ্ন হয়, তখন তার অন্তরে সেই জ্ঞানের আলো জ্বলতে শুরু করে।

শিষ্য: তাহলে সাধকরা কেন আজ্ঞা চক্র জাগ্রত করার কথা বলেন?

গুরু: যোগশাস্ত্রে মানুষের শরীরে বিভিন্ন চক্রের কথা বলা হয়েছে। তাদের মধ্যে আজ্ঞা চক্র বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। বহু সাধক ধ্যানের মাধ্যমে এই চেতনার বিকাশের চেষ্টা করেন। তবে এ পথ অত্যন্ত গুরুগম্ভীর। কেবল বই পড়ে বা কৌতূহলবশত এ পথে প্রবেশ করা উচিত নয়।

শিষ্য: কেন গুরুদেব?

গুরু: কারণ আধ্যাত্মিক সাধনা কখনো খেলার বিষয় নয়। একজন যোগ্য ও অভিজ্ঞ গুরুর নির্দেশ ছাড়া গভীর সাধনায় প্রবেশ করলে মানসিক ও শারীরিক উভয় বিপর্যয় ঘটতে পারে। তাই শাস্ত্র সর্বদা গুরু-পরম্পরার উপর গুরুত্ব দিয়েছে।

শিষ্য: গুরুদেব, চন্দনের তিলক ধারণের বাস্তব উপকারিতা কী?

গুরু: চন্দন স্বভাবতই শীতল। তাই কপালে চন্দনের প্রলেপ দিলে প্রশান্তির অনুভূতি হয়। এর সুগন্ধ মনকে শান্ত করে, উদ্বেগ কমাতে সাহায্য করে এবং ধ্যান বা প্রার্থনার পরিবেশকে আরও একাগ্র করে তোলে। অনেক আয়ুর্বেদীয় গ্রন্থে চন্দনের শীতল ও প্রশমক গুণের উল্লেখ রয়েছে। যদিও নানা অলৌকিক দাবি করা হয়, সেগুলির সবকটির বৈজ্ঞানিক প্রমাণ সমানভাবে প্রতিষ্ঠিত নয়। তাই বিশ্বাস ও চিকিৎসাবিজ্ঞানের ক্ষেত্রকে আলাদা করে বোঝা উচিত।

শিষ্য: গুরুদেব, বিভিন্ন দেবতার পূজায় কি বিভিন্ন রঙের চন্দন ব্যবহৃত হয়?

গুরু: হ্যাঁ, বহু প্রাচীন আচারেই এমন রীতি দেখা যায়। ভগবান বিষ্ণু ও তাঁর অবতারদের পূজায় সাধারণত সাদা বা হলুদ চন্দন ব্যবহৃত হয়।

দেবী দুর্গার উপাসনায় লাল চন্দনের বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে।

সরস্বতী, লক্ষ্মী ও গায়ত্রী মন্ত্রের জপে সাদা চন্দনের মালা ব্যবহারকেও বহু আচার্য শুভ বলে বর্ণনা করেছেন। শিবের পূজায় চন্দনের পাশাপাশি ভস্মেরও বিশেষ মাহাত্ম্য রয়েছে।

শিষ্য: গুরুদেব, অনেকে বলেন চন্দন ঘরে শুভশক্তি নিয়ে আসে।

গুরু: দেখ, যেখানে পরিচ্ছন্নতা, সুগন্ধ, ভক্তি ও নিয়মিত উপাসনা থাকে, সেখানে মানুষের মনও শান্ত থাকে। চন্দনের সুগন্ধ সেই পরিবেশকে আরও পবিত্র ও স্নিগ্ধ করে তোলে। তাই বহু পরিবারে আজও পূজার সময় চন্দনের ধূপ, তিলক বা প্রলেপের ব্যবহার চলে আসছে।

তবে মনে রেখ, শুভশক্তির সবচেয়ে বড় উৎস কোন বস্তু নয়—মানুষের নির্মল মন, সৎকর্ম এবং ঈশ্বরের প্রতি আন্তরিক ভক্তি।

শিষ্য: গুরুদেব, লোকমুখে তো আরও নানা কথা শোনা যায়—চন্দন নাকি গ্রহদোষ দূর করে, সংসারের অশান্তি কমায়, ধন-সম্পদ বৃদ্ধি করে। এই কথাগুলোর মধ্যে কতখানি সত্য?

গুরু: বৎস, মানুষের বিশ্বাস, শাস্ত্রের ব্যাখ্যা এবং বাস্তব অভিজ্ঞতা—এই তিনকে কখনো এক করে ফেলবে না।

চন্দনের কিছু গুণ প্রকৃতিগত—তার শীতলতা, তার সুগন্ধ, তার স্নিগ্ধতা। আবার কিছু বিষয় আছে, যা যুগ যুগ ধরে ধর্মীয় আচার, লোকবিশ্বাস ও জ্যোতিষশাস্ত্রের সঙ্গে জড়িয়ে এসেছে। সেই বিশ্বাসকে সম্মান করা যায়, কিন্তু অন্ধভাবে গ্রহণ করা উচিত নয়।

শিষ্য: তাহলে শাস্ত্রে চন্দনের ব্যবহার কেন এত বেশি?

গুরু: কারণ চন্দন মানুষের মনকে ঈশ্বরমুখী করে। যখন তুমি নিজের হাতে চন্দন ঘষো, তখন তোমার মধ্যে ধৈর্য জন্মায়। যখন দেবতার শ্রীঅঙ্গে তা নিবেদন করো, তখন অহংকার কমে। যখন নিজের কপালে তিলক পর, তখন মনে পড়ে—আমি শুধু দেহ নই, আমি চৈতন্যের সন্তান। এই স্মরণই মানুষের সবচেয়ে বড় আশীর্বাদ।

 জ্যোতিষশাস্ত্রে অনেকেই মনে করেন, বিভিন্ন গ্রহের সঙ্গে বিভিন্ন উপাদানের এক প্রতীকী সম্পর্ক রয়েছে। সেই কারণেই কোথাও লাল চন্দন, কোথাও সাদা চন্দন, কোথাও আবার কেশর মিশ্রিত চন্দনের ব্যবহার দেখা যায়। কিন্তু মনে রেখ—কোনো বস্তুই মানুষের কর্মের বিকল্প হতে পারে না।

শিষ্য: অর্থাৎ শুধু চন্দন ব্যবহার করলেই ভাগ্য বদলে যাবে—এমন কথা বলা ঠিক নয়?

গুরুদেব স্নিগ্ধ হাসলেন।
গুরু: যদি তাই হত, তবে চন্দনের বনে জন্মানো প্রতিটি মানুষই মহাপুরুষ হয়ে উঠত।
ভাগ্য পরিবর্তনের মূল ভিত্তি তিনটি—সৎকর্ম, সৎচিন্তা এবং ঈশ্বরের প্রতি আন্তরিক সমর্পণ। চন্দন সেই সাধনার একটি পবিত্র সহায়ক মাত্র।

শিষ্য: গুরুদেব, অনেকেই বলেন ঘরে প্রতিদিন চন্দনের ধূপ জ্বালালে অশুভ শক্তি দূরে থাকে।

গুরু: ধূপের সুগন্ধ পরিবেশকে নির্মল ও মনোরম করে। পরিচ্ছন্ন গৃহ, সুগন্ধময় পরিবেশ এবং নিয়মিত প্রার্থনা মানুষের মনে ইতিবাচক প্রভাব ফেলে। সেই কারণেই বহু প্রাচীনকাল থেকে ধূপ, দীপ ও চন্দনের ব্যবহার চলে আসছে।

কিন্তু যদি ঘরে মিথ্যা, লোভ, হিংসা ও অহংকার বাস করে, তবে কেবল সুগন্ধ দিয়ে সেই অশুভ শক্তিকে দূর করা যায় না।

শিষ্য: গুরুদেব, তাহলে প্রকৃত শুভশক্তি কোথায়?

গুরুদেব দূরের অস্তমিত সূর্যের  দিকে তাকিয়ে দিলেন উত্তর: যেখানে সত্য আছে, সেখানেই শুভশক্তি। যেখানে করুণা আছে, সেখানেই দেবত্ব।
যেখানে ক্ষমা আছে, সেখানেই লক্ষ্মীর বাস। আর যেখানে মানুষের হৃদয় চন্দনের মত শীতল ও সুগন্ধময়, সেখানে ঈশ্বর স্বয়ং অবস্থান করেন।

শিষ্যের চোখে এক অদ্ভুত আলো ফুটে উঠল। সে অনুভব করল—এতদিন সে চন্দনের গন্ধ চিনত, আজ সে চন্দনের দর্শন উপলব্ধি করতে শুরু করেছে।
গুরুদেব এবার আসন ত্যাগ করে আশ্রমের প্রাচীন চন্দনগাছটির দিকে এগিয়ে গেলেন। গাছের কাণ্ডে স্নেহভরে হাত রেখে তিনি শিষ্যকে বললেন, “বৎস, চন্দনের সবচেয়ে বড় শিক্ষা জানো কী?
কুঠারের আঘাতে যে তাকে কেটে ফেলে, সেই কুঠারের ফলাকেও সে নিজের সুগন্ধে ভরিয়ে দেয়।

এই পৃথিবীতে তুমিও তেমন মানুষ হও। যে তোমায় আঘাত করবে, তার প্রতিও বিদ্বেষ নয়—নিজের চরিত্রের সুগন্ধই দান করবে। সেই দিনই বুঝবে, চন্দনের প্রকৃত তিলক কপালে নয়, মানুষের অন্তরে ধারণ করতে হয়।”

শিষ্য গভীর শ্রদ্ধায় গুরুদেবের দিকে তাকিয়ে রইল। সন্ধ্যার বাতাসে চন্দনের সুগন্ধ আরও যেন স্পষ্ট হয়ে উঠল। তার মনে হলো—আজ সে কেবল চন্দনের কথা শুনল না, নিজের অন্তরের শুদ্ধতার পথেরও পাঠ গ্রহণ করছে।

(আগামী সংখ্যায় শেষ)

(এরকমভাবে প্রশ্নোত্তরের মাধ্যমে আধ্যাত্মিক জগতের বিশেষ সকল তত্ত্ব ও তথ্য  আরো বেশী ভালোভাবে জানতে পড়ুন লেখকের অনন্তের জিজ্ঞাসা ৫ খণ্ড। Whatsapp করুন জয় মা তারা পাবলিশার্স 9153391909)

#Chandan #ChandanMahatmya #SanatanDharma #Hinduism #Spirituality #Mahadev #Bhakti #harharmahadev