Ami Tarashis Bolchi

Ami Tarashis Bolchi
The blog of Tarashis Gangopadhyay (click the photo to reach our website)

Monday, 6 July 2026

সিরাজ: সিংহাসন ও সত্যের মাঝখানে।Siraj between the facts and truth.


"সিরাজ: সিংহাসন ও সত্যের মাঝখানে"
একজন স্বাধীনতা সংগ্রামী ও এক সাংবাদিকের সংলাপ

(উত্তর কলকাতার এক প্রাচীন বাড়ির ছায়াঘেরা বারান্দায়। পাশে রেকর্ডার রেখে বসে আছে তরুণ সাংবাদিক রোহন। তার সামনে বসে আছেন প্রবীণ স্বাধীনতা সংগ্রামী আনন্দ চন্দ্র—যাঁর চোখে ধরা আছে ব্রিটিশ শাসনের অবসান এবং স্বাধীনতার পরের বিভ্রান্ত সময়ের স্মৃতি।)

সাংবাদিক (রোহন):

দাদু, ইদানীং সামাজিক মাধ্যমে সিরাজউদ্দৌলাকে নিয়ে প্রবল বিতর্ক চলছে। অনেকে বলছেন, তাঁকে আমরা যেভাবে বীর হিসেবে জেনেছি, তিনি আদৌ তেমন ছিলেন না। তাঁরা বিদ্যাসাগর, গোলাম হোসেন, এমনকি ফরাসি লেখক জ্যাঁ ল'-এর মতো সমসাময়িকদের উদ্ধৃতি দিচ্ছেন। আপনার কী মত? সিরাজ কি সত্যিই দেশপ্রেমিক ছিলেন, নাকি আর পাঁচজন অত্যাচারী শাসকের মতোই একজন শাসক?

স্বাধীনতা সংগ্রামী (আনন্দ চন্দ্র):

(ধীরে হেলান দিয়ে)

ইতিহাস, বাবা, যুদ্ধ শেষ হওয়ার বহু পরে ফেলে যাওয়া এক রণক্ষেত্রের মতো—ধোঁয়া তখনও পুরো কাটে না। যে যেমন দেখতে চায়, তেমনই দেখে। তবে এটুকু বলতে পারি, স্কুলে আমরা যে ইতিহাস পড়েছি, তা পুরো সত্য ছিল না।

রোহন:

তাহলে... আপনি বলতে চাইছেন, পাঠ্যবই আমাদের ভুল শিখিয়েছে?

আনন্দ চন্দ্র:

ভুল নয়—সরলীকরণ করেছে। আমাদের যৌবনে অধিকাংশ ইতিহাসই ব্রিটিশদের লেখা ছিল। পরে জাতীয়তাবাদী ইতিহাসকাররা বিদেশি শাসনের বিরুদ্ধে প্রতিরোধের প্রতীক হিসেবে কিছু বীরের সন্ধান করলেন। ইংরেজদের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো এক তরুণ নবাব—সিরাজ—তাই হয়ে উঠলেন উপযুক্ত প্রতীক। কিন্তু সেই প্রতীকের আড়ালে যে মানুষটি ছিলেন, তিনি মোটেও আদর্শ ছিলেন না।

রোহন:

আপনি কি বিদ্যাসাগরের বর্ণনার কথা বলছেন?

আনন্দ চন্দ্র:

হ্যাঁ। বিদ্যাসাগর লিখেছিলেন, সিরাজ তাঁর দাদার বিশ্বস্ত কর্মচারীদের অপসারণ করে চারপাশে চাটুকার ও দুর্নীতিবাজদের জড়ো করেছিলেন। তাঁর শাসনে মানুষের সম্পদ ও সম্মান কোনোটাই নিরাপদ ছিল না। এমনকি গঙ্গায় স্নান করতে যাওয়া নারীরাও তাঁর কুদৃষ্টির ভয়ে আতঙ্কিত থাকতেন। এমন শাসককে আদর্শ বলা কঠিন।

রোহন:

তাহলে আজও অনেকে তাঁকে বীর বলে কেন?

আনন্দ চন্দ্র:

কারণ আমরা বিভ্রান্ত উত্তরাধিকার বহন করছি। উপনিবেশিক অপমানের ক্ষত আমাদের এমন কিছু প্রতীক খুঁজতে বাধ্য করেছিল, যাদের ঘিরে আত্মমর্যাদা গড়ে তোলা যায়। তাই অনেক সময় নিষ্ঠুর মানুষকেও দেশপ্রেমের রঙে রাঙানো হয়েছে। কিন্তু বিভ্রমের ওপর দাঁড়ানো গৌরব কখনও স্থায়ী হয় না।

রোহন:

(দ্রুত নোট নিতে নিতে)

গোলাম হোসেন তাঁর সিয়ার-উল-মুতাখখিরীন গ্রন্থেও সিরাজকে নিষ্ঠুর ও নারীলোলুপ বলেছেন, তাই না?

আনন্দ চন্দ্র:

হ্যাঁ। তাঁর সমসাময়িকদের অনেকেই—যেমন গোলাম হোসেন—সিরাজকে লোভী, নিষ্ঠুর ও কামুক শাসক হিসেবে বর্ণনা করেছেন।

রোহন:

কিন্তু আমরা তো ছোটবেলা থেকে শুনেছি, তিনি ছিলেন প্রজাদরদী নবাব!

আনন্দ চন্দ্র:

সেই ধারণাটাই দীর্ঘদিন প্রচারিত হয়েছে। কিন্তু সমসাময়িক বিবরণে দেখা যায়, তাঁর নিষ্ঠুরতার ভয়ে অনেক দরবারীও আতঙ্কে থাকতেন। অভিযোগ রয়েছে, তিনি কারণ ছাড়াই মানুষের সম্পদ কেড়ে নিতেন এবং নারীদের ওপর জোরজবরদস্তি করতেন। ব্রিটিশ কামান গর্জে ওঠার আগেই বাংলার সমাজ নানা সংকটে জর্জরিত ছিল।

রোহন:

মোহনলালের বোন—মাধবীকে নিয়ে একটা কাহিনি পড়েছিলাম...

আনন্দ চন্দ্র:

হ্যাঁ, এমন একটি কাহিনি বিভিন্ন পরবর্তী লেখায় উল্লেখ করা হয়েছে। সেখানে বলা হয়, মোহনলালের বোন মাধবী (কোথাও হীরা নামেও উল্লেখিত) সিরাজের দ্বারা নির্যাতিত হন। তবে এই ঘটনার ঐতিহাসিক সত্যতা নিয়ে গবেষকদের মধ্যে যথেষ্ট মতভেদ রয়েছে, এবং নির্ভরযোগ্য সমসাময়িক প্রমাণও সীমিত। তাই এ ধরনের বর্ণনা সতর্কতার সঙ্গে বিচার করা উচিত।

রোহন:

রানি ভবানীর আত্মীয়া তারাসুন্দরী সম্পর্কেও কিছু লেখা আছে...

আনন্দ চন্দ্র:

হ্যাঁ, এমন কাহিনিও প্রচলিত আছে যে সিরাজ তাঁর প্রতি আকৃষ্ট হয়ে তাঁকে অনুসরণ করান। তবে এই ঘটনাটিও বিতর্কিত এবং ইতিহাসবিদদের মধ্যে সর্বসম্মতভাবে স্বীকৃত নয়। ইতিহাসে লোককথা, পরবর্তী রচনা ও সমসাময়িক নথির মধ্যে পার্থক্য করা জরুরি।

রোহন:

তবুও তাঁকে বাংলার শহীদ বলা হয়!

আনন্দ চন্দ্র:

(মৃদু হাসি)

কোনো শাসক বিদেশি শক্তির বিরুদ্ধে লড়েছেন বলেই তাঁর সব কাজ ন্যায়সঙ্গত হয়ে যায় না। আবার ব্যক্তিগত ত্রুটি থাকলেই তাঁর রাজনৈতিক অবস্থান সম্পূর্ণ অস্বীকারও করা যায় না। ইতিহাস এতটা সাদা-কালো নয়।

রোহন:

গঙ্গা থেকে নারীদের ধরে এনে নবাবের সামনে হাজির করার গল্পও কি আছে?

আনন্দ চন্দ্র:

ফরাসি কর্মকর্তা জ্যাঁ ল'-এর স্মৃতিকথায় সিরাজ সম্পর্কে নানা সমালোচনামূলক মন্তব্য রয়েছে। তবে তাঁর বিবরণও ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা, রাজনৈতিক অবস্থান এবং সমসাময়িক গুজবের প্রভাবমুক্ত ছিল না—এ কথাও মনে রাখতে হবে। তাই একক কোনো সূত্রকে চূড়ান্ত সত্য বলে ধরা উচিত নয়।

রোহন:

এত কিছু যদি লেখা থাকে, তাহলে আমাদের পড়ানো হয়নি কেন?

আনন্দ চন্দ্র:

কারণ ইতিহাস প্রায়ই সময়ের প্রয়োজন অনুযায়ী ব্যাখ্যা করা হয়। কখনও নায়ক তৈরি হয়, কখনও খলনায়ক। কিন্তু একজন সত্যসন্ধানীর কাজ হলো—বিভিন্ন সূত্র পড়া, তাদের তুলনা করা এবং প্রমাণের ওজন বিচার করা।

রোহন:

তাহলে যখন আমরা বলি, মীর জাফর বাংলার সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেছিলেন...

আনন্দ চন্দ্র:

(ধীরে থামিয়ে দিয়ে)

মীর জাফরের ভূমিকা নিয়ে ইতিহাসে নানা ব্যাখ্যা আছে। কেউ তাঁকে বিশ্বাসঘাতক বলেন, কেউ বলেন তিনি নিজের স্বার্থ দেখেছিলেন, আবার কেউ বলেন রাজনৈতিক পরিস্থিতি ছিল অত্যন্ত জটিল। ইতিহাসকে এক বাক্যে বিচার করা কঠিন।

রোহন:

তাহলে পলাশীর যুদ্ধ কি শুধু পরাধীনতার শুরু ছিল না?

আনন্দ চন্দ্র:

পলাশীর যুদ্ধ ছিল এক গুরুত্বপূর্ণ মোড়। তার ফলেই ধীরে ধীরে ব্রিটিশ প্রভাব ও শাসন প্রতিষ্ঠিত হয়। তবে বাংলার অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব, ক্ষমতার লড়াই এবং প্রশাসনিক দুর্বলতাও সেই পরিবর্তনের পেছনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল।

রোহন:

ভাবতে কষ্ট হয়।

আনন্দ চন্দ্র:

কষ্টের হলেও সত্যের সন্ধান সেখানেই। স্বাধীনতা শুধু বিদেশি শাসনের অবসান নয়—নিজেদের ইতিহাসকে সততার সঙ্গে দেখার ক্ষমতাও স্বাধীনতার অংশ।

রোহন:

তাহলে নতুন প্রজন্মের কী করা উচিত?

আনন্দ চন্দ্র:

শুধু অনুমোদিত ইতিহাস নয়—বিভিন্ন মত পড়ো। প্রশ্ন করো। তোমার পাঠ্যবইকে প্রশ্ন করো, আমাকেও প্রশ্ন করো। তবেই ইতিহাসের কুয়াশা কিছুটা সরবে।

রোহন:

(কিছুক্ষণ নীরব থেকে)

তাহলে সিরাজ না সম্পূর্ণ নায়ক, না সম্পূর্ণ খলনায়ক—বরং তাঁর সময়েরই এক প্রতিচ্ছবি?

আনন্দ চন্দ্র:

ঠিক তাই। তাঁর জীবন আমাদের শেখায়—অভ্যন্তরীণ দুর্বলতা, নৈতিক অবক্ষয় ও রাজনৈতিক বিভাজন একটি দেশকে বাইরের শক্তির কাছে দুর্বল করে তোলে।

রোহন:

(ধীরে নোটবুক বন্ধ করে)

ধন্যবাদ, দাদু। আপনি আমাকে এমন এক দৃষ্টিভঙ্গি দিলেন, যা কোনো পাঠ্যবই দেয়নি।

আনন্দ চন্দ্র:

(মৃদু হাসলেন)

তাহলে সত্যনিষ্ঠভাবেই লিখো, রোহন। ইতিহাসকে ভালোবাসতে হলে তাকে প্রশ্ন করতে জানতে হয়। কোনো মানুষকে অন্ধভাবে পূজা বা ঘৃণা নয়—প্রমাণের আলোয় বিচার করাই ইতিহাসচর্চার আসল পথ।

Gosaiteertha Shantipur o Babla

  গোঁসাইতীর্থ শান্তিপুর ও বাবলা শ্রীপাট দর্শন ও সাধুসঙ্গ 

তারাশিস গঙ্গোপাধ্যায়

(পূর্ব প্রকাশিতের পর)


আমি বলতে থাকি,

"অবশেষে আকাশগঙ্গা পাহাড়ে দেখা হল তাঁর ইষ্টনির্দিষ্ট গুরু ব্রহ্মানন্দ স্বামীর সাথে। পরমহংসজী নামেই তিনি পরিচিত ছিলেন সাধনমহলে। তিনিই শ্রীবিজয়কৃষ্ণকে দীক্ষা দেন। আর তাঁর কৃপাতেই সিদ্ধিলাভ করেন শ্রীবিজয়কৃষ্ণ। সেই সময় থেকেই ধীরে ধীরে গোস্বামীজী বা গোঁসাইজী নামেই তিনি পরিচিত হয়ে ওঠেন জনমানসে। তখন আকাশগঙ্গা পাহাড়ের একটি গুহাতেই তিনি নিবিষ্ট হয়ে থাকতেন কঠোর সাধনায়।

গোস্বামীজী যোগীদের অলৌকিক শক্তি বা যোগবিভূতিতে বিশ্বাস করতেন না। কিন্তু পরমহংসজীর যৌগিক বিভূতি দেখে তাঁরও প্রত্যয় হল। আর তারপরই তিনি মনোনিবেশ করলেন যোগে। কঠোর সাধনায় লাভ করলেন অষ্টসিদ্ধি।

শ্রীত্রৈলঙ্গস্বামী, শ্রীভোলাগিরি মহারাজ, শ্রীরঘুবরদাস বাবাজী, শ্রীলোকনাথ ব্রহ্মচারী, শ্রীভাষ্করানন্দ, শ্রীবিশুদ্ধানন্দ পরমহংস, শ্রীদ্বারকানাথ বাবাজী প্রভৃতি মহাত্মারা সকলেই ছিলেন তাঁর প্রশংসায় পঞ্চ মুখ। অতএব ধীরে ধীরে তাঁর নাম ছড়িয়ে পড়তে থাকে। শিষ্যভক্তও হয় প্রচুর। মূলতঃ তাঁদের উৎসাহেই গড়ে ওঠে গোস্বামীজীর গেণ্ডারিয়ার আশ্রম। সেই আশ্রমকে কেন্দ্র করে দিকে দিকে শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর মতই অকাতরে প্রেম বিলিয়ে যেতে থাকেন গোস্বামীজী। তাঁর হরিসংকীর্তন ও জীবে প্রেম স্বয়ং শ্রীচৈতন্যের মতই বিরাট আলোড়ন তোলে ভক্তজনমানসে।

বৃন্দাবনে গোস্বামীজীর একটি অপার্থিব অভিজ্ঞতার কথা বলছি। একদিন তিনি গিরি গোবর্দ্ধনে থাকাকালীন সহসা একটি গুহার সামনে একটি কংকালমূর্তিকে দেখতে পেলেন। দীর্ঘ এই কংকালমূর্তির দেহে কোথাও কোন রক্তমাংস নেই; কেবলমাত্র চোখের কোটরে আছে দুটি উজ্জ্বল চোখ ও মুখের মধ্যে জিভমাত্র। গোস্বামীজী কাছে যেতেই কংকালটি তাঁকে ভূমিষ্ঠ হয়ে প্রণাম করলেন এবং বললেন, 'ভগবানের লীলা দর্শন ও হরিনাম করিবার বাসনা এখনও আছে। সেইজন্য চক্ষু ও জিহ্বা রহিয়াছে, ভগবান যশোদানন্দনের কৃপায় অদ্য আমার একটি বাসনা পূর্ণ হইল।' তিনি আরো জানালেন যে তাঁর বয়স চারশো বছরেরও বেশী। তিনি এই বৃন্দাবনে শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু ও শ্রীনিত্যানন্দ প্রভুকেও দর্শন করেছেন। এবার মহাপ্রভুর এই নবতম রূপকেও দর্শন করলেন।

সাধনজগতে কথিত আছে- ভগবানের এক অবতার থেকে আরেক অবতার হওয়া পর্যন্ত পূর্ণ অবতারের একজন করে লীলা পার্ষদ সেই দেহেই বিরাজ করেন। যেমন ত্রেতায় শ্রীরামচন্দ্রের মুখ্য পার্ষদ মহাবীর হনুমানজী শ্রীকৃষ্ণকে দর্শন করেছেন দ্বাপরে, আবার দ্বাপরে শ্রীকৃষ্ণের সখা শ্রীদাম শ্রীচৈতন্যের মরলোকে আগমন পর্যন্ত ভাণ্ডীর বনে একটি গুহায় সমাধিস্থ ছিলেন এবং শ্রীচৈতন্যের আবির্ভাবের পর নবদ্বীপে গিয়ে শ্রীচৈতন্যদেবকে দর্শন করে এসেছেন। তেমনভাবেই এই কংকালরূপী মহাত্মাও শ্রীচৈতন্যদেবের নব কলেবররূপী মহাত্মা শ্রীবিজয়কৃষ্ণ গোস্বামীজীকে দর্শন করলেন। পরবর্তীকালে মহাত্মা অর্জুন দাসও গোস্বামীজীর সম্বন্ধে বলেছেন, 'সাক্ষাৎ শ্রীকৃষ্ণচৈতন্য মহাপ্রভু হ্যায়।'

গোস্বামীজী অনেক তীর্থদর্শনও করেছেন। মূলতঃ কাশী, বৃন্দাবন প্রভৃতি মহাতীর্থে অপার্থিব সব উপলব্ধি অর্জনের পর অবশেষে তিনি আসেন নীলাচলে। দারুব্রহ্ম জগন্নাথদেবকে দর্শনের পর তিনি প্রেমের মোহন আবেশে আবিষ্ট হয়ে যান। তাঁর কীর্তনের মাধ্যমে গৌড়ীয় বৈষ্ণবদের মধ্যে আবার প্রেমভক্তির বান দেখা যায়। কৌপীনধারী, জটাজুটসমন্বিত এই মহাত্মাকে উৎকলবাসীরা 'জটিয়া বাবা' নামে ডাকতে থাকে। ধীরে ধীরে বছর খানেকের মধ্যেই স্থানীয় ভক্তসমাজের মধ্যমণি হয়ে ওঠেন তিনি।

ভক্তজনমানসে গোস্বামীজীর প্রতিপত্তি দেখে স্থানীয় পাণ্ডাগণ এবং কিছু বৈষ্ণব মঠের মোহন্ত ঈর্ষান্বিত হয়ে পড়েন। তারপর তাঁরাই তৎপর হয়ে ওঠেন গোস্বামীজীর প্রাণনাশের জন্য। একদিন ভোরবেলায় গোস্বামীজী অন্য ভক্তদের নিয়ে বসে আছেন ভক্ত নীলমণি বর্মণের বাড়িতে। এমন সময়ে জগন্নাথদেবের প্রসাদী নাড়ুর ঝাঁপি নিয়ে কিছু পাণ্ডা এসে দাঁড়ালেন তাঁর সামনে। বললেন, 'জগন্নাথ মহাপ্রভুর মহাপ্রসাদ এনেছি আপনার জন্য।' তারপর গোস্বামীজীর হাতে তুলে দিলেন সেই নাড়ু। অষ্টসিদ্ধি সম্পন্ন গোস্বামীজী দিব্যদৃষ্টিতে জগন্নাথদেবের কৃপায় স্পষ্ট দেখলেন এতে বিষ মেশানো আছে। কিন্তু গোস্বামীজী তাসত্বেও সেই প্রসাদী নাড়ু ফেলতে পারলেন না। এ যে মহাপ্রসাদ। অতএব জেনে বুঝেও সেই বিষ তিনি খেলেন মহাপ্রসাদের সম্মানরক্ষার জন্য। তারপরই তাঁর শরীরে বিষক্রিয়া শুরু হয়ে যায়। তিনি অচেতন হয়ে পড়েন। চিকিৎসকের চেষ্টায় যদিও বা জ্ঞান ফিরল কিন্তু শরীর বিধবস্ত হয়ে গেল। যে বিষপান করলে মানুষ তৎক্ষণাৎ মারা যায় সেই বিষ তাঁকে মারতে পারল না ঠিকই কিন্তু মাসখানেক ধরে তাঁর শরীরের উপর এই ভয়ংকর বিষের ক্রিয়া চলতে লাগল। দীর্ঘ এক মাস ধরে এই বিষের যন্ত্রণায় জ্বলতে হল তাঁকে।

শোনা যায় - অষ্টসিদ্ধিসম্পন্ন গোস্বামীজী প্রায়ই এই অবস্থায় বিষের দহনজ্বালা থেকে ক্ষণিকের নিস্তারের জন্য স্থূলদেহ ছেড়ে রেখে সূক্ষ্মদেহে ঊর্দ্ধলোকে ভ্রমণ করতেন। কিন্তু তাও তিনি নিজের যোগবিভূতি কখনো ব্যবহার করেননি নিজের যন্ত্রণা নিরাময়ের জন্য। আসলে যোগবিভূতি যে পার্থিব কারণে ব্যয় করতে নেই। এই ঐশ্বর্য্য ধরে রেখে অগ্রসর হতে হয় সাধনপথে। নাহলে শক্তি নাশ হয়ে যায় আর তাতেই ঘটে যোগীর পতন। তাই গোস্বামীজীও এই বিষয়ে সেই সনাতন পন্থাই অনুসরণ করেছেন।

অবশেষে বাংলা ১৩০৬ সালের ২২শে জ্যৈষ্ঠ বিষে জর্জরিত এই স্থূলশরীর ত্যাগ করে গোস্বামীজী চলে যান অমৃতলোকে। কিন্তু তাঁর মহাজীবনী ও মহাবাণী তিনি রেখে গেছেন আমাদের আলোর পথ দেখানোর জন্য। এবার সেই মহাত্মার গৃহদেবতা শ্যামসুন্দরের মন্দিরেই আমরা যাব।"

দেখতে দেখতে আমাদের গাড়ি এসে থামল একটি বড় বাড়ির সামনে। বুঝলাম আমরা এসে গেছি সেই সদাজাগ্রত শ্যামসুন্দরের মন্দিরের সামনে। তাই সানন্দেই আমরা গাড়ি থেকে নামলাম। এক সময়ে এখানে আতাবন ছিল বলে এই বাড়ির নাম আতাবুনিয়া গোঁসাই বাড়ি। গেরুয়া সাদায় মেলানো এই বাড়ির রঙ। বাড়ির সদর দরজা দিয়ে প্রবেশ করলাম ভিতরে। ঢুকতেই সবুজ ঘাসের গালিচা দেয়া আঙিনা। ডানদিকে গেরুয়া রঙের একতলা ঘর, আর সামনে শ্বেতশুভ্র একতলা মন্দির। তবে মন্দিরের উপরে কোন চূড়া নেই- রয়েছে বসতবাড়ির একতলা ছাদ। মন্দিরের বারান্দায় একটি দোলনাও আছে। গর্ভগৃহে শ্রীবিজয়কৃষ্ণ গোস্বামীপ্রভু পুজিত শ্যামসুন্দর ও রাধারাণী বিরাজ করছেন। সানন্দে তাঁদের দর্শন করলাম। আনুমানিক পঞ্চদশ শতাব্দীর মাঝামাঝি বা শেষভাগে বলরাম মিশ্রের চতুর্থ পুত্র শ্রীদেবকীনন্দন গোস্বামী এই শ্রীবিগ্রহ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। শ্যামসুন্দরের কি অপূর্ব রূপ! যে রূপের বাহার একদিন গোস্বামীপ্রভুকে ভুলিয়ে নাস্তির দুনিয়া থেকে অস্তির জগতে নিয়ে এসেছিল সেই রূপ দর্শন করে আমরাও ধন্য হয়ে গেলাম। একপাশে রয়েছে শ্রীবিজয়কৃষ্ণ গোস্বামী প্রভুর বিরাট প্রতিকৃতি আর অন্যপাশে রয়েছে শ্যামসুন্দর ও রাধারাণীর শয্যা। শ্যামসুন্দরের ঠিক পাশে হাসিমুখে উপবিষ্ট ছোট্ট গোপালসোনা। সবাইকেই আমরা জানালাম প্রাণের প্রণতি।


(ক্রমশ)




#spiritual #আধ্যাত্মিক #bijaykrishnogoswami #Gosai #bookstagram #booksbooksbooks

Sunday, 5 July 2026

জুলাই মাসে গ্রহের চলাচল, বিশেষ তিথি ও শুভদিন। Transit of planets in July 2026

 আজ আমরা জানব জুলাই মাসে কোন গ্রহ আপনার জন্য শুভ ফল দেবে, আর কোন গ্রহ আপনার সমস্যাকে আরও বাড়িয়ে তুলতে পারে—কোন কোন গ্রহের কৃপায় আপনি সাফল্যের সর্বোচ্চ শিখরে পৌঁছাতে পারেন—আবার কোন গ্রহ আপনাকে আকাশচুম্বী অবস্থান থেকে মাটিতে নামিয়ে আনতে পারে—জুলাই মাসে কোন রাশির ওপর কোন গ্রহের প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়বে, এবং কোন রাশি সবচেয়ে ভাগ্যবান হবে—এসব নিয়ে আলোচনা করব এখন।


তাহলে দেখা যাক জুলাই মাসে গ্রহদের সামগ্রিক অবস্থান কেমন থাকবে। জুলাই মাসে কোন গ্রহ রাশি পরিবর্তন করবে? কোন কোন গ্রহের যুগলবন্দী তৈরি হবে? এবং কোন কোন বিপজ্জনক যোগ সৃষ্টি হতে চলেছে?


 দেখুন, জুলাই মাসে গ্রহদের চলাচল খুবই সক্রিয় থাকবে।

৪ জুলাই শুক্র সিংহ রাশিতে প্রবেশ করবে। 


৭ জুলাই বক্রী বুধ মিথুন রাশিতে প্রবেশ করবে। 


১৬ জুলাই সূর্যদেব কর্কট রাশিতে প্রবেশ করবেন।


২৪ জুলাই বুধ বক্রী অবস্থা থেকে মার্গী হয়ে যাবে। ২৫ জুলাই পর্যন্ত বুধ অস্ত থাকবে।


২৭ জুলাই শনি মীন রাশিতে বক্রী হয়ে যাবে। 


মঙ্গল আগে থেকেই বৃষ রাশিতে অবস্থান করছে। 


বৃহস্পতি আগে থেকেই কর্কট রাশিতে অবস্থান করছে।

তবে ১৫ জুলাই থেকে টানা ২৮ দিনের জন্য বৃহস্পতি অস্ত থাকবে।


শনি এ বছর রাশি পরিবর্তন করছে না। কিন্তু ২৭ জুলাই থেকে টানা ১৩৮ দিনের জন্য শনি বক্রী হয়ে যাবে।


এবার জেনে নেওয়া যাক জুলাই মাসের ব্রত ও উৎসবগুলো। এর মধ্যে ১০ জুলাই, শুক্রবার—যোগিনী একাদশী।


১২ জুলাই, রবিবার—রোহিণী ব্রত এবং রবি প্রদোষ ব্রত।


১৪ জুলাই, মঙ্গলবার—আষাঢ় অমাবস্যা।


১৫ জুলাই, বুধবার থেকে গুপ্ত নবরাত্রি শুরু হবে।


১৬ জুলাই, বৃহস্পতিবার—সূর্য কর্কট রাশিতে প্রবেশ করবেন।

সেদিন কর্কট সংক্রান্তিও হবে।

একই দিনে জগন্নাথদেবের রথযাত্রারও সূচনা হবে।


১৯ জুলাই, রবিবার—স্কন্দ ষষ্ঠী।


২৫ জুলাই, শনিবার—দেবশয়নী একাদশী। এই দিন থেকেই ভগবান শ্রীহরি বিষ্ণু যোগনিদ্রায় প্রবেশ করেন।


২৬ জুলাই, রবিবার—রবি প্রদোষ ব্রত।


২৯ জুলাই, বুধবার—গুরু পূর্ণিমা।


৩০ জুলাই, বৃহস্পতিবার—শ্রাবণ মাসের সূচনা হবে।


 এবার জেনে নেওয়া যাক জুলাই মাসের বিভিন্ন শুভ মুহূর্ত। যদি আপনি বাগদান, বিবাহ, গৃহপ্রবেশ করতে চান—

অথবা গাড়ি, জমি বা সোনা কিনতে চান—তাহলে কোন দিনটি আপনার জন্য সবচেয়ে শুভ হবে?


এর মধ্যে গাড়ি কেনার জন্য শুভ দিন—

২, ৩, ৫, ৮, ১২, ১৯, ২৪, ২৯ ও ৩০ জুলাই।


বিবাহের জন্য শুভ দিন—

১, ৬, ৭, ১১ ও ১২ জুলাই।


সম্পত্তি কেনার জন্য শুভ দিন—

১৬, ১৭, ২৩ ও ২৪ জুলাই।


গৃহপ্রবেশের জন্য শুভ দিন—

১, ২ ও ৬ জুলাই।


নামকরণ অনুষ্ঠানের জন্য শুভ দিন—

৩, ৭, ১১, ১৪, ১৭, ২১, ২৫ ও ২৯ জুলাই।


নতুন ব্যবসা শুরু করার জন্য শুভ দিন—


১০, ১৬ ও ২৩ জুলাই।


মুণ্ডন সংস্কারের জন্য শুভ দিন—

২, ৩, ৯, ১৫ ও ২০ জুলাই।


অন্নপ্রাশনের জন্য শুভ দিন —

১৫, ২০, ২৪ ও ২৯ জুলাই।


উপনয়ন অনুষ্ঠানের জন্য শুভ দিন—

১, ২, ৪, ৫, ১৬, ১৭, ১৮, ২৪, ২৬, ৩০ ও ৩১ জুলাই।


এরপরের পোস্টে আসা যাবে মেষ রাশি প্রসঙ্গে।

ক্রমশ

স্বর্গ বা নরক আছে কোথায়?

স্বর্গ বা নরক আছে কোথায়? আমাদের মাঝেই -- আমাদের মনের ভিতরে।দুটিই আমাদের মানসিক অবস্থা। মন যখন নানা জাগতিক সমস্যায় জড়িয়ে নিজে পুড়তে থাকে সেটাই নরক যন্ত্রণা। আর যখন সে আনন্দের সাথে সব কাজ করে যেতে থাকে সেবা রূপে সেটাই স্বর্গের সুখ।
   যখন জীবনে নরক যন্ত্রণা আসে তখন তার বীজ খুঁজে বের করতে হয়। তাহলে দেখা যায় বীজ ছিল আমাদের কোন কর্মের মাঝে। তখন শান্ত হয়ে আত্মায় আত্মস্থ হলে ঠিক তার থেকে বেরনোর পথ খুঁজে বের করা যায়।
    মনের স্বর্গকে গড়ে তোলার জন্য চিন্তার পারে যেতে হয়। তাই তারাশিস গঙ্গোপাধ্যায় বলে,যত জীবনকে বাইরের দিকে চিনতে চাইব ততই বাড়বে চিন্তা। তাই চিন্তার চিতা সাজিয়ে মনের মাঝে স্বর্গের আনন্দে থাকব। বাইরের পৃথিবীর আঘাতের সাধ্য কি সেখানে পৌঁছয়।

#spirituality  #spiritualgrowth  #spiritualawakening  #আধ্যাত্মিক  #tarashisauthor

Monday, 15 June 2026

ওঙ্কার সাধনা কিভাবে করতে হয়?

‘ওঁ’কার সাধনা কিভাবে করতে হয়?
 - তারাশিস গঙ্গোপাধ্যায়

আমাদের মধ্যে অনেকেই ‘ওঁ’ জপ করে থাকেন। কিন্তু আপনি কি জানেন, ওঁ জপ করার একটি নির্দিষ্ট সময়, সঠিক দিক এবং সঠিক পদ্ধতি রয়েছে? কখন, কোথায় এবং কোন দিকে মুখ করে ‘ওঁ’ জপ করলে চার গুণ ফল পাওয়া যায়? যার মাধ্যমে এই শক্তিশালী মন্ত্রের চার গুণ শুভ ফল পাওয়া যেতে পারে। এছাড়াও, ওঁ জপ করার সময় এমন ২০টি ভুল আছে, যা কখনোই করা উচিত নয়। জানতে চাইলে পড়ুন এই ধারাবাহিক লেখা।
_________________________

শিষ্য: গুরুদেব, ‘ওঁ’ কে বলা হয় আমাদের সকলের জন্য শক্তির এক বিশাল উৎস। এটা কি সত্যি? ‘ওঁ’-এর বৈজ্ঞানিক দিক কী? এবং ‘ওঁ’-এর জপ আমাদের শরীরের বিভিন্ন অঙ্গ-প্রত্যঙ্গে কীভাবে ইতিবাচক প্রভাব ফেলে?

গুরুদেব: দেখ, ‘ওঁ’ তিনটি অক্ষর নিয়ে গঠিত—অ, উ এবং ম। অ + উ + ম মিলেই ‘ওঁ’ হয়।
‘ওঁ’ কোন মানুষ, কোন ঋষি-মুনি বা কোন দেবতার সৃষ্টি করা মন্ত্র নয়। এই মন্ত্র স্বয়ংপ্রকাশিত। এটি নিজে থেকেই প্রকাশিত হয়েছে।
এই ধ্বনির উৎস হলো অনাহত নাদ। এই অনাহত নাদের উৎপত্তি নাভি থেকে। সেখান থেকেই ওঁ-এর ধ্বনি বেরিয়ে আসে। 

ওঁ হল এক আদিম ও মৌলিক ধ্বনি। এটি উচ্চারণ করার সময়
শরীর ও মস্তিষ্কে এক বিশেষ কম্পনের সৃষ্টি হয়। ‘অ’ ধ্বনি পেট ও বুকে অনুরণন সৃষ্টি করে। ‘উ’ ধ্বনি গলা ও কণ্ঠদেশে পৌঁছয়। আর ‘ম’ ধ্বনি মাথা ও মস্তিষ্কে কম্পন সৃষ্টি করে।

এই কম্পন আমাদের স্নায়ুতন্ত্রকে শান্ত করে। মানসিক চাপ কমায়। তাই ওঁ উচ্চারণ করলে মানসিক শান্তি আসে।
রাগ, বিরক্তি ও অস্থিরতা কমে।
মনোযোগ ও একাগ্রতা বৃদ্ধি পায়।

অনেক বিজ্ঞানীর মতে,
ওঁ ধ্বনির প্রাকৃতিক কম্পাঙ্ক প্রায় ৪৩২ হার্টজ। যা প্রকৃতির নানা স্বাভাবিক শব্দের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। যেমন—
পাখির ডাক, বাতাসের সোঁ সোঁ শব্দ, এবং প্রকৃতির আরও নানা কম্পন।

তাই ওঁ ধ্বনি শুনলে ও উচ্চারণ করলে আমাদের শরীর ও প্রকৃতি যেন একই ছন্দে মিলিত হয়। এর ফলে শরীরের ভারসাম্য বজায় থাকে। মন শান্ত থাকে এবং প্রকৃতির সঙ্গে এক গভীর সংযোগ তৈরি হয়।

হিন্দি বা সংস্কৃতের সমস্ত বর্ণমালার মূল উৎসও এই ওঁ। ক থেকে ক্ষ পর্যন্ত, অ থেকে ঔ পর্যন্ত—সব ধ্বনির মূল উৎস এই ওঁ। কোন ঋষি বা মানুষ এগুলো সৃষ্টি করেননি, এগুলো স্বয়ংপ্রকাশিত।

এ প্রসঙ্গে বলা যায় ভারতে রাধাস্বামী সম্প্রদায় নামে একটি সম্প্রদায় আছে। তাদের প্রধান সাধনাই হলো অনাহত নাদের সাধনা।

শিষ্য : অনাহত নাদের সাধনা বলতে কী বোঝায়?

গুরুদেব : যখন তোমার শরীর সম্পূর্ণ শূন্যতার অবস্থায় স্থির হয়ে যাবে, ইন্দ্রিয়গুলো অন্তর্মুখী হয়ে যাবে, মনও অন্তর্মুখী হয়ে যাবে, আর তোমার চিত্ত সম্পূর্ণ শান্ত হয়ে যাবে -  যাকে বলা হয় ‘কাষ্ঠ-মৌন’ তখন ভিতর থেকে যে নাদ শোনা যায় এ হল অনাহত নাদ।

শিষ্য : এই কাষ্ঠ-মৌন বলতে বোঝায়?

গুরুদেব: যেমন একটি কাঠ কোথাও রেখে দিলে তার নিজের কোন ক্রিয়া থাকে না,
ঠিক তেমনি শরীর, মন ও ইন্দ্রিয় সম্পূর্ণ নিস্তব্ধ ও নিষ্ক্রিয় হয়ে যাবে। কোন চিন্তা থাকবে না। এই অবস্থাকেই কাষ্ঠ-মৌন বলা হয়। তখন নাভির মধ্যে যে ‘ওঁ’-এর ধ্বনি অনবরত ধ্বনিত হচ্ছে, তা নিজের এই কান দিয়েই শোনা যেতে শুরু করবে।
আর এই অবস্থাই ব্রহ্মপ্রাপ্তি। এই অবস্থাই ঈশ্বরপ্রাপ্তি। এই ‘ওঁ’-এর ধ্বনি শুনতে পাওয়াই ঈশ্বরকে উপলব্ধি করা।
এটাই ঈশ্বরের প্রত্যক্ষ বোধ।
এককথায় বলা যায় - যখন মানুষের মন, ইন্দ্রিয় এবং চিত্ত সম্পূর্ণ অন্তর্মুখী হয়ে যায় এবং গভীর নীরব অবস্থায় পৌঁছায়, তখন নাভির সেই ওঁ-ধ্বনি নিজের কানেই শোনা যায়। এটিকেই বলা হয় ঈশ্বর-প্রাপ্তি বা ব্রহ্মজ্ঞান। 

গীতায় একটি শ্লোক আছে—
"এতদ্ দ্বয়মক্ষরং জ্ঞাত্বা ব্রহ্মলোকে মহীয়তে।"
অর্থাৎ, যে এই ‘ওঁ’ শব্দের প্রকৃত জ্ঞান লাভ করে, সে ব্রহ্মকে উপলব্ধি করতে পারে। সে ব্রহ্মের স্বরূপ জানতে পারে। আগেই বলেছি -  আমাদের যত অক্ষর ও যত স্বরচিহ্ন আছে, সবকিছুর উৎপত্তিই এই ‘ওঁ’ থেকে। ‘ওঁ’ অনাহত নাদ থেকে স্বয়ং প্রকাশিত হয়েছে। এবং এই ‘ওঁ’ প্রত্যেক মানুষের মধ্যেই বিদ্যমান। প্রত্যেক নারী ও পুরুষের মধ্যেই এটি রয়েছে।
যে কোন নারী বা পুরুষ যদি ধ্যান ও সাধনার অবস্থায় বসে,
এক-দুই ঘণ্টা নীরব থাকার অভ্যাস করেন, এবং নিজের মন ও ইন্দ্রিয়কে অন্তর্মুখী করার চেষ্টা করেন, তাহলে সাধনার মাধ্যমে তিনি এই ‘ওঁ’-এর ধ্বনি শুনতে পারবেন। ‘ওঁ’-এর ধ্বনি সত্যিই শোনা যায়। তবে এর জন্য কঠোর সাধনার প্রয়োজন।"

শিষ্য: এই ধ্বনি শোনার কোন সহজ উপায় নেই?

গুরুদেব: আরেকটি উপায়ও আছে। বিজয়পুরে রাজা বাবা নামে এক সিদ্ধপুরুষ থাকতেন। শোনা যায়, তিনি নেপালের রাজপরিবারের সদস্য ছিলেন।
ভবঘুরের মতো ঘুরতে ঘুরতে তিনি বিন্ধ্যাচলে এসে পৌঁছেছিলেন। মাত্র ১২-১৩ বছর বয়স থেকেই তিনি সেখানে বহুদিন ছিলেন।
পরে বিজয়পুরের পাহাড়ে নিজের আশ্রম স্থাপন করেন। আজও সেই স্থান ‘রাজা বাবার বাখুলি’ নামে পরিচিত।
রাজা বাবা তাঁর এক বইয়ে লিখেছেন— যদি প্রতিদিন ১২ হাজার বার ‘ওঁ’-এর অজপা জপ করা যায়, এবং টানা এক বছর তা পালন করা যায়,
তাহলে মানুষের হৃদয়ের মধ্যেই ঈশ্বরের দর্শন ঘটে।

শিষ্য: এই অজপা জপ বলতে কি বোঝায়?

গুরুদেব: শ্বাস নেওয়ার সময় মনে মনে ‘ও...’ আর শ্বাস ছাড়ার সময় মনে মনে ‘ম...’ উচ্চারণ। অর্থাৎ— ‘ও... ম...’ ‘ও... ম...’ এইভাবে শ্বাস-প্রশ্বাসের সঙ্গেই জপ চলতে থাকবে। এভাবে প্রতিদিন ১২ হাজার বার জপ করতে হবে। দিনে মাত্র একবার আহার করতে হবে। সেটাও অল্প পরিমাণে। কারও সঙ্গে অপ্রয়োজনীয় মেলামেশা করা যাবে না। নির্জনে থাকতে হবে।
সম্পূর্ণ শুচিতা ও পবিত্রতা বজায় রাখতে হবে। এবং টানা এক বছর এই নিয়ম পালন করতে হবে। তাহলে তাঁর বইয়ের বর্ণনা অনুযায়ী,
মানুষের হৃদয়ের মধ্যেই ঈশ্বরের জ্যোতি প্রকাশিত হবে।

শিষ্য: এখন ১২ হাজার অজপা জপ করতে কত সময় লাগতে পারে?

গুরুদেব: একজন স্বাভাবিক মানুষ গড়ে প্রতি মিনিটে ১৫ বার শ্বাস প্রশ্বাস নেয়। অর্থাৎ এক ঘণ্টায় একজন মানুষের প্রায় ৯০০ বার শ্বাস-প্রশ্বাস হয়।
এর চেয়ে বেশি হলে আয়ু কমে যায়। আর এর চেয়ে কম হলে আয়ু বাড়ে। কারণ শাস্ত্র মতে মানুষের আয়ু শ্বাসের সংখ্যার উপর নির্ভরশীল। তাই আমাদের শাস্ত্রে প্রাণায়ামের উপর এত জোর দেওয়া হয়েছে।

প্রাণায়াম করলে মানুষ দীর্ঘক্ষণ শ্বাস ধরে রাখতে পারে। শ্বাস যত সঞ্চয় হবে, আয়ুও তত বৃদ্ধি পাবে। ৯০০ শ্বাসের হিসাবে যদি ১২,০০০ বার জপের হিসাব করা হয়, তাহলে ১০ ঘণ্টায় প্রায় ৯,০০০ বার সম্পন্ন হবে।
আর বাকি ৩,০০০ বার করতে আরও প্রায় ৪ ঘণ্টা লাগবে।
অর্থাৎ, মোটামুটি ১৪ ঘণ্টার সাধনায় ১২,০০০ বার ওঁ জপ সম্পূর্ণ হতে পারে। যে ব্যক্তি প্রতিদিন ১৪ ঘণ্টা ধরে ওঁ-এর সাধনা করবে, সে যদি এক বছরের মধ্যে ঈশ্বরকে না পায়, তাহলে আর কে পাবে? আমার বিশ্বাস -- অবশ্যই সে ঈশ্বরপ্রাপ্ত হবে। এটাই রাজা বাবার মত।

(চলবে)
(পরের সব অংশ ফেসবুকেনামার প্রোফাইলে পেয়ে যাবেন)

#ওঁকার_সাধনা
#প্রণব_ধ্যান
#অনাহত_নাদের_সন্ধানে
#ওঁকারের_মহাশক্তি
#ব্রহ্মমুহূর্ত_সাধনা
#আত্মজাগরণের_পথে
#অন্তর্নিহিত_দিব্যশক্তি
#spirituality #spiritualawakening

চন্দনের মাহাত্ম্য (দ্বিতীয় পর্ব)

চন্দন শুধু কপালের তিলক নয়—এ এক জীবনদর্শন।

গুরু শেষবারের মতো শিষ্যকে বললেন—
"কপালে চন্দন মাখার আগে হৃদয়টাকে পবিত্র করো। কারণ ঈশ্বর সুগন্ধ নয়, সত্যকে গ্রহণ করেন।"

 শেষ পর্বে উঠে এসেছে—
প্রকৃত তিলকের রহস্য, বাহ্যিক আচার বনাম অন্তরের ধর্ম,  কিভাবে চন্দনের মত মানুষের জীবনও অন্যকে সুগন্ধে ভরিয়ে তুলতে পারে,
 আর সেই শিক্ষা, যা হয়তো আপনার জীবন দেখার দৃষ্টিভঙ্গিই বদলে দেবে।

শেষ পর্যন্ত না পড়লে, চন্দনের প্রকৃত মাহাত্ম্য হয়তো অধরাই থেকে যাবে।
_________________________

গুরু ও শিষ্যের সংলাপ : চন্দনের মাহাত্ম্য (শেষ পর্ব)

তখন গোধূলির সূর্য ধীরে ধীরে পশ্চিমাভিমুখে ঝুঁকছে। আশ্রমের প্রাচীন অশ্বত্থের ছায়ায় গুরুদেব বসে আছেন। চারিদিকে নিস্তব্ধতা, কেবল দূরের মন্দির থেকে ভেসে আসছে ঘণ্টাধ্বনি। শিষ্য নীরবে এসে গুরুদেবের চরণে প্রণাম করে বসল।

কিছুক্ষণ নীরব থেকে শিষ্য মৃদুস্বরে বলল : গুরুদেব,   আপনি চন্দনের আধ্যাত্মিক তাৎপর্য বড় সুন্দর ভাবে বোঝালেন। কিন্তু মানুষের জীবনে তো সংসারও আছে—অভাব, অশান্তি, রোগ, দুঃখ, বিবাদ, উদ্বেগ। অনেকেই বলেন, চন্দনের দ্বারা এই সব দোষও দূর হতে পারে। এই বিশ্বাসের ভিত্তি কী?

গুরুদেব কিছুক্ষণ আকাশের দিকে তাকিয়ে রইলেন। তারপর ধীর কণ্ঠে বলতে শুরু করলেন: বৎস, মনে রেখ, কোনো বস্তু অলৌকিকভাবে মানুষের ভাগ্য পরিবর্তন করে না। কিন্তু কোন কোন বস্তু মানুষের মনে এমন এক শুভ সংস্কার জাগিয়ে তোলে, যা তার জীবনকেই পরিবর্তন করে দেয়। চন্দন তারই একটি উৎকৃষ্ট উদাহরণ।
যে ব্যক্তি প্রতিদিন স্নানশেষে ঈশ্বরস্মরণ করে কপালে চন্দনের তিলক ধারণ করে, সে অন্তত কয়েক মুহূর্ত নিজের মনকে সংযত করে। সেই কয়েক মুহূর্তের সংযমই ধীরে ধীরে তার চরিত্রে রূপ নেয়।

শিষ্য: কিন্তু গুরুদেব, লোকমুখে তো আরও নানা প্রতিকারের কথা শোনা যায়।

গুরু: হ্যাঁ, বহু প্রাচীন আচার-অনুষ্ঠানে নানা প্রতীকী প্রথা রয়েছে। যেমন—কেউ বলেন মঙ্গলবার লাল চন্দন শুভ, কেউ বলেন সোমবার সাদা চন্দন, কেউ আবার বিশেষ পূজায় কেশর-মিশ্রিত চন্দন ব্যবহার করেন। এসবের পেছনে রয়েছে ভক্তি, প্রতীক এবং সংস্কারের ঐতিহ্য। এগুলিকে সেই দৃষ্টিতেই দেখা উচিত।

শিষ্য: তবে কি মানুষের বিশ্বাসও শক্তি সৃষ্টি করে?

গুরুদেব মৃদু হাসলেন। বললেন: অবশ্যই। যদি বিশ্বাস মানুষকে সৎপথে নিয়ে যায়, তবে সেই বিশ্বাসই শক্তি। যদি বিশ্বাস তাকে সত্যবাদী করে, নম্র করে, সংযমী করে, তবে সেই বিশ্বাসই আশীর্বাদ। কিন্তু যদি বিশ্বাস তাকে অন্ধ করে দেয়, কর্মহীন করে দেয়, তবে তা আর ধর্ম নয়—তা কেবল মোহ।

শিষ্য গভীর মনোযোগে শুনছিল। কিছুক্ষণ পরে সে আবার জিজ্ঞাসা করল: গুরুদেব, গৃহে চন্দনের ধূপ জ্বালানোর কথাও তো বহু জায়গায় বলা হয়।

গুরু: সুগন্ধ মানুষের মনের উপর গভীর প্রভাব ফেলে। পরিচ্ছন্ন গৃহ, নির্মল পরিবেশ, প্রদীপের আলো, ধূপের সুগন্ধ—এসব মিলিয়ে মানুষের অন্তরেও শান্তি নেমে আসে। তাই বহু যুগ ধরে পূজায় চন্দন, ধূপ ও দীপের ব্যবহার চলে আসছে।
তবে মনে রেখ, যে ঘরে প্রতিদিন মিথ্যা বলা হয়, যেখানে ক্রোধ, লোভ ও হিংসা বাস করে, সেখানে কেবল ধূপের ধোঁয়ায় শান্তি নেমে আসে না। ঘরের প্রকৃত পবিত্রতা শুরু হয় মানুষের হৃদয় থেকে।

শিষ্য: গুরুদেব, সংসারে সুখ প্রতিষ্ঠার সবচেয়ে বড় উপায় কী?

গুরুদেব শিষ্যের দিকে গভীর দৃষ্টিতে তাকিয়ে বললেন : তিনটি বিষয় কখনো ভুলো না।
প্রথম—ভোজনের আগে ঈশ্বরকে কৃতজ্ঞতা জানাতে। দ্বিতীয়—কথা বলার আগে বিবেচনা করে তবেই বলতে।
তৃতীয়—কর্ম করার আগে বিবেককে অনুসরণ করতে।
যে পরিবারে ঈশ্বরের প্রতি কৃতজ্ঞতা আছে, পরস্পরের প্রতি সম্মান আছে এবং সত্যের প্রতি শ্রদ্ধা আছে, সেখানে মা লক্ষ্মীর আগমন ঠেকানোর ক্ষমতা কারও নেই। চন্দন সেখানে কেবল সেই শুভ পরিবেশের  অগ্রদূতমাত্র।

শিষ্য: গুরুদেব, আজকাল অনেক পিতা-মাতা সন্তানদের জন্য বিপুল সম্পদ সঞ্চয় করেন, কিন্তু তাদের চরিত্র গঠনের দিকে তেমন মনোযোগ দেন না।

গুরুদেবের মুখে এক গম্ভীর ছায়া নেমে এল। তিনি ধীরে ধীরে বললেন: বৎস, সন্তানের জন্য সোনাদানা রেখে যাওয়ার চেয়ে সৎ চরিত্র রেখে যাওয়া অনেক বড় উত্তরাধিকার। বাড়ি, জমি, ধন—এসব একদিন হারিয়েও যেতে পারে। কিন্তু সত্যবাদিতা, নম্রতা, ভক্তি, শৃঙ্খলা ও করুণার শিক্ষা যদি শিশুর হৃদয়ে রোপণ করা যায়, তবে সে পৃথিবীর যেখানেই যাক না কেন, কখনো প্রকৃত অর্থে নিঃস্ব হবে না।

শিশুকে ছোটবেলা থেকেই ঈশ্বরকে প্রণাম করতে শেখাও।
ভোজনের আগে কৃতজ্ঞতা জানাতে শেখাও। অন্যের দুঃখে সহানুভূতি অনুভব করতে শেখাও। নিজের ভুল স্বীকার করতে শেখাও। এই শিক্ষাগুলোই জীবনের প্রকৃত সম্পদ।

জানবে কপালের চন্দন একদিন মুছে যাবে। কিন্তু যদি হৃদয়ে সত্য, করুণা ও ধর্মের চন্দন লেপন করতে পারো, তবে সেই সুগন্ধ মৃত্যুর পরেও মানুষের স্মৃতিতে অম্লান হয়ে থাকবে।”

শিষ্য মৃদুস্বরে বলল: গুরুদেব, এবার আমার শেষ প্রশ্ন।
মানুষের জীবনে সত্যিই সবচেয়ে মূল্যবান চন্দন কোনটি?

গুরুদেবের ঠোঁটে এক অপূর্ব মৃদু হাসি ফুটে উঠল।
তিনি বললেন: বৎস, জঙ্গলে জন্মানো চন্দন মূল্যবান, দেবমন্দিরে নিবেদিত চন্দন আরও পবিত্র; কিন্তু মানুষের অন্তরে যে চন্দন জন্মায়, তার মূল্য সর্বাধিক।

শিষ্য: অন্তরের চন্দন?

গুরু: হ্যাঁ। যে মানুষের হৃদয় শীতল, বাক্য মধুর, চরিত্র নির্মল, আচরণ স্নিগ্ধ এবং অন্যের কল্যাণে সদা নিবেদিত—সেই মানুষই জীবন্ত চন্দন।
চন্দনের গাছ নিজেকে সুগন্ধময় করে না; সে চারপাশকে সুগন্ধে ভরিয়ে তোলে। তেমনি একজন সত্যিকারের সাধক নিজের জন্য বাঁচেন না, অন্যের জীবনেও শান্তির সুবাস ছড়িয়ে দেন।

 মনে রেখ, কপালে তিলক ধারণ করলেই ধর্ম হয় না।
জপমালা হাতে নিলেই ভক্তি আসে না। মন্দিরে গেলেই ঈশ্বরলাভ হয় না। যদি হৃদয়ে অহংকার, ঈর্ষা, বিদ্বেষ ও প্রতারণা লুকিয়ে থাকে, তবে কপালের চন্দন কেবল বাহ্যিক অলঙ্কার মাত্র। আর যদি অন্তর সত্যে, দয়ায় ও প্রেমে পূর্ণ হয়, তবে তিলক না থাকলেও ঈশ্বর সেই হৃদয়ে অধিষ্ঠান করেন।

শিষ্য: গুরুদেব, তবে কি ধর্মের মূল আচার কিছুই নয়?

গুরু: আচার পথ, কিন্তু গন্তব্য নয়। আচার মানুষকে প্রস্তুত করে, শুদ্ধ করে, নিয়মানুবর্তিতা শেখায়। কিন্তু আচারের উদ্দেশ্য হল মানুষের অন্তরে ধর্মকে জাগিয়ে তোলা। যে কেবল আচারে আটকে থাকে, সে বাইরে ঘোরে। যে আচারের অন্তর্নিহিত সত্য উপলব্ধি করে, সে অন্তরে প্রবেশ করে।

কিছুক্ষণ নীরব থেকে গুরুদেব আশ্রমের মন্দিরের দিকে তাকিয়ে বললেন : জানো বৎস, পৃথিবীর সবচেয়ে বড় পূজা কোনটি? ক্ষুধার্তকে অন্ন দেওয়া। ভীত মানুষকে সাহস দেওয়া। অসুস্থের সেবা করা।
অসহায়ের চোখের জল মুছে দেওয়া। এবং নিজের অহংকারকে প্রতিদিন একটু একটু করে বিসর্জন দেওয়া।
এই পূজার চেয়ে বড় পূজা আর নেই।

শিষ্যের চোখ ভিজে উঠল।
সে ধীরে বলল: গুরুদেব, এবার আমি বুঝতে পারলাম কেন চন্দনকে শীতলতার প্রতীক বলা হয়।
গুরুদেব বললেন: ঠিক তাই।
যেখানে ক্রোধ আছে, সেখানে চন্দন হও। যেখানে বিদ্বেষ আছে, সেখানে সুগন্ধ হও।
যেখানে অন্ধকার আছে, সেখানে প্রদীপ হও। যেখানে হিংসা আছে, সেখানে করুণা হও। আর যেখানে অহংকার আছে, সেখানে বিনয় হয়ে দাঁড়াও। এই-ই প্রকৃত তিলক।
এই-ই প্রকৃত পূজা। এই-ই প্রকৃত সাধনা।

এবার গুরুদেব ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়ালেন। তিনি সামনের চন্দনগাছটির কাছে গিয়ে তার কাণ্ডে আলতো করে হাত রাখলেন। তারপর যেন নিজের মনেই উচ্চারণ করলেন,
“চন্দনকে কুঠার কেটে ফেলে, অথচ সেই কুঠারের ফলাতেও চন্দন নিজের সুগন্ধ রেখে যায়।
মানুষের জীবনও তেমনই হওয়া উচিত। যে তোমাকে আঘাত করেছে, তার প্রতি প্রতিশোধ নয়—তাকে নিজের চরিত্রের সুগন্ধ দাও। যে তোমাকে অপমান করেছে, তার প্রতি ঘৃণা নয়—নিজের মহত্ত্ব দাও। যে তোমাকে ভুল বুঝেছে, তাকে ক্রোধ নয়—নিজের সত্য দাও।
কারণ সুগন্ধ কখনো যুদ্ধ করে না, সে নিঃশব্দে চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে।”

চাঁদের আলো তখন আরও উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে। দূরের বাতাসে যেন সত্যিই চন্দনের মৃদু সুবাস ভেসে আসছে।

শিষ্য গুরুদেবের চরণে সম্পূর্ণ দেহ সমর্পণ করে প্রণাম করল।
তার মনে হল—আজ সে শুধু চন্দনের তত্ত্ব শেখে নি; আজ সে শিখেছে মানুষ হওয়ার বিদ্যা।

আর গুরুদেবের কণ্ঠে ধীরে ধীরে শেষ বাণী ধ্বনিত হল,
“বৎস, প্রতিদিন কপালে চন্দন ধারণ করার আগে একবার নিজের হৃদয়ে তাকিয়ে দেখো।
যদি সেখানে সত্য থাকে, তবে তিলক পূর্ণ। যদি সেখানে দয়া থাকে, তবে পূজা সম্পূর্ণ।
যদি সেখানে প্রেম থাকে, তবে ঈশ্বর ইতিমধ্যেই তোমার মধ্যে অধিষ্ঠিত।”

এরপর আশ্রম আবার নীরব হয়ে গেল। শুধু পূর্ণিমার আলোয়, প্রাচীন চন্দনবৃক্ষটি যেন যুগযুগান্তরের সাক্ষী হয়ে নীরবে দাঁড়িয়ে রইল—নিজের জন্য নয়, চারদিকে অনন্ত সুগন্ধ বিলিয়ে।

#Chandan #SanatanDharma #Mahadev #HarHarMahadev #SpiritualWisdom #HinduCulture #Bhakti #SpiritualJourney

চন্দনের মাহাত্ম্য (প্রথম পর্ব)

চন্দনের গন্ধ শুধু শরীরকে শীতল করে না… বদলে দিতে পারে মানুষের অন্তরও।
এক নির্জন আশ্রমে এক শিষ্যের একটি মাত্র প্রশ্ন—
“গুরুদেব, চন্দনের প্রকৃত মাহাত্ম্য কী?”
তারপর শুরু হয় এমন এক কথোপকথন, যেখানে উঠে আসে— চন্দনের শাস্ত্রীয় রহস্য,  তৃতীয় নয়নের প্রকৃত অর্থ,  আজ্ঞা চক্রের গভীর তাৎপর্য,
কেন দেবতার অঙ্গে চন্দন নিবেদন করা হয়, আর কেন চন্দনের মতো মানুষ হওয়াই জীবনের সর্বশ্রেষ্ঠ সাধনা।
______________________

চন্দনের মাহাত্ম্য (প্রথম পর্ব)

সন্ধ্যার নরম আলো ক্রমশ আশ্রমের বটগাছের পাতায় পাতায় মিশে যাচ্ছে। দূরে ধূপের সুগন্ধ, মন্দিরের ঘণ্টাধ্বনি আর বেদপাঠের ক্ষীণ ধ্বনি পরিবেশকে এক অপার্থিব প্রশান্তিতে ভরিয়ে তুলেছে। সেই সময় শিষ্য গুরুদেবের চরণে প্রণাম করে নতস্বরে প্রশ্ন করল।

শিষ্য: গুরুদেব, বহুদিন ধরে আমার মনে একটি প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে। আমরা প্রতিদিন পূজায় চন্দন ব্যবহার করি, দেবমূর্তিতে চন্দন নিবেদন করি, কপালে চন্দনের তিলক ধারণ করি। কিন্তু এর প্রকৃত মাহাত্ম্য কী?

গুরুদেব স্নিগ্ধ হেসে শিষ্যের মাথায় হাত রাখলেন। তারপর বললেন: বৎস, চন্দন কেবল একটি সুগন্ধি কাঠ নয়। এটি শীতলতার প্রতীক, পবিত্রতার প্রতীক, আবার আত্মসংযম ও ঈশ্বরস্মরণেরও প্রতীক।

সনাতন ধর্মে যখনই কোনো পূজা বা যজ্ঞ শুরু হয়,  মন্ত্রোচ্চারণের মাধ্যমে বলা হয় যে চন্দন পবিত্রকারী, পাপ নাশকারী এবং লক্ষ্মীর কৃপা আনয়নকারী। এরপর হাতে রক্ষাসূত্র বাঁধা হয় এবং তারপর পূজার মূল প্রক্রিয়া শুরু হয়। চন্দন মানুষের উপর অশুভ শক্তির প্রভাব দূর করে এবং রক্ষাসূত্র দশ দিক থেকে সুরক্ষা দেয়—এমন বিশ্বাস রয়েছে। তাই সনাতন ধর্মে পূজার সূচনাতেই এই আচার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মন্দিরে ধূপ, দীপ ও সুগন্ধি দ্রব্য ব্যবহারের ফলে পরিবেশে এক পবিত্র ও শান্ত আবহ সৃষ্টি হয়। এর ফলে মন ভালো থাকে এবং নেতিবাচক চিন্তা দূরে থাকে—এমন ধারণা প্রচলিত। 

 মহামৃত্যুঞ্জয় মন্ত্রে একটি শব্দ আছে—"সুগন্ধিম্ পুষ্টিবর্ধনম্"। অর্থাৎ সুগন্ধ এমন এক শক্তি, যা পুষ্টি ও বিকাশ ঘটায়। চন্দনের মধ্যেও সেই সুগন্ধ বিদ্যমান। কারণ, মানুষের বাহ্যিক পরিচ্ছন্নতার পাশাপাশি অন্তরের পবিত্রতার কথাও শাস্ত্র স্মরণ করিয়ে দেয়। তাই আচমন ও প্রাণায়ামের পর যখন যজমানকে পবিত্র করা হয়, তখন কপালে চন্দনের তিলক পরানো হয়।

শিষ্য: গুরুদেব, শুধু একটি তিলকই কি এত বড় তাৎপর্য বহন করে?

গুরু: অবশ্যই। শাস্ত্রে বলা হয়েছে, চন্দন পাপক্ষয়কারী, মনকে নির্মলকারী এবং শুভশক্তির আহ্বানকারী। চন্দন ব্যবহারে মস্তিষ্ক ও চোখের শক্তি বৃদ্ধি পায়—এমন বিশ্বাস রয়েছে। চন্দনের সুগন্ধ মানসিক চাপ, উদ্বেগ এবং হরমোনের ভারসাম্য রক্ষায় সহায়ক বলে অনেকে মনে করেন। কপালে চন্দনের তিলক লাগালে মন শান্ত থাকে এবং শীতল অনুভূতি হয়। এর ফলে মানসিক ক্লান্তি কমে এবং মাথাব্যথাও হ্রাস পেতে পারে। তাই চন্দন অত্যন্ত উপকারী বস্তু। চন্দনের তিলক কেবল কপালে একটুকরো চিহ্ন নয়—এ যেন নিজের চিত্তকে ঈশ্বরের শরণে সমর্পণের এক নীরব অঙ্গীকার।

শিষ্য: গুরুদেব, মলয়গিরির চন্দনের কথা প্রায়ই শুনি। তার কি আলাদা মাহাত্ম্য আছে?

গুরু: মলয়গিরির চন্দনকে বহু প্রাচীনকাল থেকেই সর্বোৎকৃষ্ট বলে মানা হয়েছে। তার সুগন্ধ গভীর, তার প্রকৃতি অত্যন্ত শীতল। বর্তমানে এর দাম অত্যন্ত বেশি এবং বাজারে নকল চন্দনের ব্যবসাও প্রচুর চলছে। তবে যদি খাঁটি চন্দনের সঙ্গে কেশর মিশিয়ে দেবতাদের নিবেদন করা হয় এবং পরে প্রসাদ হিসেবে গ্রহণ করা হয়, তবে তা অত্যন্ত শুভ বলে ধরা হয়।

তাই প্রাচীন কবিরা বলেছেন—
"চন্দন বিষ ব্যাপত নহি, লিপটে রহত ভুজঙ্গ।"অর্থাৎ বিষধর সাপ চন্দনগাছে জড়িয়ে থাকলেও চন্দন নিজের স্বভাব হারায় না। এ শুধু গাছের কথা নয়, মানুষের জীবনেও এক গভীর শিক্ষা—অশুভের সংস্পর্শে এসেও যে নিজের শুভ গুণ অটুট রাখতে পারে, সেই প্রকৃত চন্দনের মত।

শিষ্য: গুরুদেব, দেবতা ও মানুষের ব্যবহৃত চন্দনের মধ্যেও কি কোন পার্থক্য আছে?

গুরু: পুরাণে এমন উল্লেখ পাওয়া যায়। দেবতাদের নিবেদিত চন্দনকে হরিচন্দন এবং মানুষের ব্যবহৃত চন্দনকে শ্রীচন্দন বলা হয়েছে। আবার সংস্কৃত ভাষায় চন্দনের আর-এক নাম ‘শ্রীখণ্ড’।

শিষ্য: কপালে চন্দন ধারণের বিশেষ কারণ কী?

গুরু: যেখানে মানুষ তিলক ধারণ করে, যোগশাস্ত্রে সেই স্থানকেই আজ্ঞা চক্র বলা হয়। এটি জ্ঞান, বিবেক ও অন্তর্দৃষ্টির প্রতীক। তাই বহু সাধক বিশ্বাস করেন, এই স্থানে চন্দন ধারণ করলে মন শান্ত হয়, চিন্তা নির্মল হয় এবং ঈশ্বরচিন্তার প্রতি মন স্বাভাবিকভাবেই আকৃষ্ট হয়।

শিষ্য: তাহলে কি সব সম্প্রদায়ের মানুষেরই চন্দন ধারণ করা উচিত?

গুরু: প্রাচীন সনাতন প্রথায় বলা হয়েছে, ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয় ও বৈশ্য—এই তিন জাতির মানুষের কপালে তিলক থাকা উচিত। যে যেমন সম্প্রদায়ের, সে তেমন রীতিতে তিলক ধারণ করবে। বৈষ্ণব হলে ঊর্ধ্বপুণ্ড্র, শৈব হলে ত্রিপুণ্ড্র এবং শাক্ত হলে নিজ নিজ প্রথা অনুযায়ী তিলক ধারণ করা উচিত। তাই বৈষ্ণব, শৈব, শাক্ত—সকলেই নিজ নিজ আচার অনুযায়ী তিলক ধারণ করেন। উদ্দেশ্য একটাই—নিজেকে সর্বদা ঈশ্বরস্মরণে স্থিত রাখা।

শিষ্য: ভস্মের কথাও তো শুনেছি, গুরুদেব।

গুরু: হ্যাঁ। শৈব সাধনায় ভস্মের বিশেষ মাহাত্ম্য আছে।ঐতিহ্যগত পদ্ধতিতে গোময় থেকে বিশেষ প্রক্রিয়ায় ভস্ম প্রস্তুত করা হয় এবং তাতে সুগন্ধি মেশানো হয়। এই ভস্মই ভগবান শিবের অঙ্গে লেপন করা হয় এবং শিবলিঙ্গেও নিবেদন করা হয়। উজ্জয়িনীর মহাকালেশ্বর মন্দিরের বিখ্যাত ভস্ম আরতিতেও ভস্মের বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। এর মধ্যেও রয়েছে অনিত্য জগতের শিক্ষা—একদিন সবই ভস্মে পরিণত হবে, তাই অহংকার নয়, ভক্তিই মানুষের প্রকৃত অলঙ্কার।

শিষ্য: গুরুদেব, আপনি আজ্ঞা চক্রের কথা বললেন। অনেকে বলেন, চন্দন ধারণ করলে তৃতীয় নয়ন জাগ্রত হয়। এর অর্থ কী?

গুরুদেব কিছুক্ষণ নীরব রইলেন। তারপর শান্ত কণ্ঠে বললেন গুরু: বৎস, তৃতীয় নয়নকে অনেকে ভুল বোঝে। 
এটি কোনো সাধারণ চোখ নয়, আবার অলৌকিক প্রদর্শনের বিষয়ও নয়। এর প্রকৃত অর্থ অন্তর্দৃষ্টি—যে দৃষ্টি বাহ্য জগতের আড়ালে সত্যকে উপলব্ধি করতে শেখায়।

যেখানে ভগবান শিবের তৃতীয় নেত্রের প্রতীক ধরা হয়, সেই স্থানেই কপালে চন্দন ধারণ করা হয়। নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সকলেই সেই স্থানে চন্দন ধারণ করতে পারেন। এই স্থানকে অধ্যাত্ম জগতে আজ্ঞা চক্রের প্রতীক হিসেবে মানা হয় এবং এটিকে অন্তর্দৃষ্টি ও আধ্যাত্মিক জ্ঞানের কেন্দ্র বলে বিবেচনা করা হয়। যোগসাধনায় অনেকেই এই আজ্ঞা চক্র জাগ্রত করার চেষ্টা করেন এবং এর সঙ্গে গভীর আধ্যাত্মিক সাধনার সম্পর্ক রয়েছে।

 অনেকেই মনে করেন শিবের তৃতীয় নয়ন মানেই রুদ্ররূপ বা ধ্বংসের প্রতীক। কিন্তু এর আরও গভীর একটি অর্থ রয়েছে। তৃতীয় নয়ন বলতে বোঝায় এমন এক অন্তর্দৃষ্টি, যার মাধ্যমে অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যতের সূক্ষ্ম উপলব্ধি লাভ করা যায়। এই অন্তর্দৃষ্টিকেই প্রাচীন সাধকেরা ‘অন্তর্চক্ষু’ বলে অভিহিত করেছেন।

অন্তর্চক্ষুর অর্থ হল দিব্যজ্ঞান দ্বারা সত্যকে উপলব্ধি করা। বাহ্যিক চোখে যা দেখা যায় না, অন্তরের জ্ঞান সেই অদৃশ্য সত্যকেও অনুভব করতে পারে।

যখন কোন সাধক গভীর সাধনায় প্রবৃত্ত হন, তখন তাঁর অন্যতম লক্ষ্য থাকে আজ্ঞা চক্রকে জাগ্রত করা। এই আজ্ঞা চক্র সেই স্থানেই অবস্থিত, যেখানে নারীরা টিপ পরেন এবং পুরুষেরা চন্দনের তিলক ধারণ করেন।

যোগশাস্ত্রে বলা হয়েছে, এই আজ্ঞা চক্রের দ্বিদল পদ্মে শিবের ধ্যান করা হয়। এটি কেবল শরীরের একটি স্থান নয়, বরং চেতনার এক উচ্চতর স্তরের প্রতীক।

কুণ্ডলিনী শক্তি যখন আজ্ঞা চক্রে পৌঁছয়, তখন সেই অবস্থাকে অত্যন্ত সূক্ষ্ম ও গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হয়। তাই এই সাধনায় সামান্য অসাবধানতাও বিপজ্জনক হতে পারে বলে বহু আধ্যাত্মিক ধারায় সতর্ক করা হয়েছে। সেই কারণেই প্রকৃত গুরুর দীক্ষা ও তত্ত্বাবধানকে অপরিহার্য বলে গণ্য করা হয়।

একজন সিদ্ধ গুরু প্রয়োজনে বিশুদ্ধ চক্র থেকে সেই শক্তিকে সহস্রার পর্যন্ত পরিচালিত করতে পারেন বলে যোগশাস্ত্রে বর্ণনা রয়েছে।

সনাতন দর্শনের একটি ব্যাখ্যা অনুযায়ী, কুণ্ডলিনী শক্তির অবস্থান দুই স্তরে কল্পনা করা হয়। একটি মূলাধার চক্রে এবং অন্যটি সহস্রারে। এই শক্তিকে ত্রিবলয়াকারে কুণ্ডলী পাকানো সাপের প্রতীক হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়।

মূলাধারে অবস্থিত কুণ্ডলিনীর মুখ নিম্নদিকে এবং সহস্রারের শক্তি ঊর্ধ্বমুখী—এমন প্রতীকী বর্ণনাও বহু প্রাচীন গ্রন্থে পাওয়া যায়।

কুণ্ডলিনী জাগরণের সময় শক্তির প্রবাহ অত্যন্ত দ্রুত ও শক্তিশালী বলে বিবেচিত হয়। যদি সুষুম্না নাড়ি জাগ্রত না থাকে এবং সেই শক্তি ইড়া বা পিঙ্গলা নাড়ির পথে প্রবাহিত হয়, তবে আধ্যাত্মিক ভারসাম্য নষ্ট হতে পারে—এমন বিশ্বাস যোগতত্ত্বে প্রচলিত রয়েছে।
আবার এমনও বলা হয়, যদি কুণ্ডলিনী মূলাধারেই আবদ্ধ থেকে যায় এবং ঊর্ধ্বগামী না হয়, তবে মানুষের চেতনা নিম্ন প্রবৃত্তির দিকে আকৃষ্ট হতে পারে এবং আধ্যাত্মিক উন্নতির পথ বাধাগ্রস্ত হতে পারে।

তাই সুষুম্না নাড়ি জাগ্রত হয়েছে কি না, কুণ্ডলিনী সাধনার উপযুক্ত সময় এসেছে কি না—এসব নির্ণয় কেবলমাত্র একজন যোগসিদ্ধ ও অভিজ্ঞ গুরুই করতে পারেন।

যেমন ‘রাম’ নামটি উচ্চারণ করে দেখ। ‘রা’ ধ্বনিতে মুখ উন্মুক্ত থাকে এবং শব্দ উপরের দিকে অনুরণিত হয়। ‘ম’ উচ্চারণের সময় ঠোঁট বন্ধ হয়ে যায় এবং শরীরের ভিতরে এক সূক্ষ্ম কম্পনের অনুভূতি জাগে। এই ধ্বনির মধ্যেও যোগতত্ত্বের এক গভীর আধ্যাত্মিক তাৎপর্য নিহিত রয়েছে।

তাই দেখা যাচ্ছে যে কপালে চন্দনের তিলক ধারণ শুধুমাত্র একটি ধর্মীয় চিহ্ন নয়। এটি আজ্ঞা চক্র, অন্তর্দৃষ্টি, আত্মসংযম এবং ঈশ্বরস্মরণের এক পবিত্র প্রতীক। তবে মনে রেখ, প্রকৃত জাগরণ কখনো বাহ্যিক চিহ্নে নয়—তা ঘটে মানুষের অন্তরের পবিত্রতা, সাধনা এবং সত্য উপলব্ধির মধ্য দিয়ে। মানুষ যখন নিজের মনকে শুদ্ধ করে, ইন্দ্রিয়কে সংযত করে এবং ঈশ্বরচিন্তায় নিমগ্ন হয়, তখন তার অন্তরে সেই জ্ঞানের আলো জ্বলতে শুরু করে।

শিষ্য: তাহলে সাধকরা কেন আজ্ঞা চক্র জাগ্রত করার কথা বলেন?

গুরু: যোগশাস্ত্রে মানুষের শরীরে বিভিন্ন চক্রের কথা বলা হয়েছে। তাদের মধ্যে আজ্ঞা চক্র বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। বহু সাধক ধ্যানের মাধ্যমে এই চেতনার বিকাশের চেষ্টা করেন। তবে এ পথ অত্যন্ত গুরুগম্ভীর। কেবল বই পড়ে বা কৌতূহলবশত এ পথে প্রবেশ করা উচিত নয়।

শিষ্য: কেন গুরুদেব?

গুরু: কারণ আধ্যাত্মিক সাধনা কখনো খেলার বিষয় নয়। একজন যোগ্য ও অভিজ্ঞ গুরুর নির্দেশ ছাড়া গভীর সাধনায় প্রবেশ করলে মানসিক ও শারীরিক উভয় বিপর্যয় ঘটতে পারে। তাই শাস্ত্র সর্বদা গুরু-পরম্পরার উপর গুরুত্ব দিয়েছে।

শিষ্য: গুরুদেব, চন্দনের তিলক ধারণের বাস্তব উপকারিতা কী?

গুরু: চন্দন স্বভাবতই শীতল। তাই কপালে চন্দনের প্রলেপ দিলে প্রশান্তির অনুভূতি হয়। এর সুগন্ধ মনকে শান্ত করে, উদ্বেগ কমাতে সাহায্য করে এবং ধ্যান বা প্রার্থনার পরিবেশকে আরও একাগ্র করে তোলে। অনেক আয়ুর্বেদীয় গ্রন্থে চন্দনের শীতল ও প্রশমক গুণের উল্লেখ রয়েছে। যদিও নানা অলৌকিক দাবি করা হয়, সেগুলির সবকটির বৈজ্ঞানিক প্রমাণ সমানভাবে প্রতিষ্ঠিত নয়। তাই বিশ্বাস ও চিকিৎসাবিজ্ঞানের ক্ষেত্রকে আলাদা করে বোঝা উচিত।

শিষ্য: গুরুদেব, বিভিন্ন দেবতার পূজায় কি বিভিন্ন রঙের চন্দন ব্যবহৃত হয়?

গুরু: হ্যাঁ, বহু প্রাচীন আচারেই এমন রীতি দেখা যায়। ভগবান বিষ্ণু ও তাঁর অবতারদের পূজায় সাধারণত সাদা বা হলুদ চন্দন ব্যবহৃত হয়।

দেবী দুর্গার উপাসনায় লাল চন্দনের বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে।

সরস্বতী, লক্ষ্মী ও গায়ত্রী মন্ত্রের জপে সাদা চন্দনের মালা ব্যবহারকেও বহু আচার্য শুভ বলে বর্ণনা করেছেন। শিবের পূজায় চন্দনের পাশাপাশি ভস্মেরও বিশেষ মাহাত্ম্য রয়েছে।

শিষ্য: গুরুদেব, অনেকে বলেন চন্দন ঘরে শুভশক্তি নিয়ে আসে।

গুরু: দেখ, যেখানে পরিচ্ছন্নতা, সুগন্ধ, ভক্তি ও নিয়মিত উপাসনা থাকে, সেখানে মানুষের মনও শান্ত থাকে। চন্দনের সুগন্ধ সেই পরিবেশকে আরও পবিত্র ও স্নিগ্ধ করে তোলে। তাই বহু পরিবারে আজও পূজার সময় চন্দনের ধূপ, তিলক বা প্রলেপের ব্যবহার চলে আসছে।

তবে মনে রেখ, শুভশক্তির সবচেয়ে বড় উৎস কোন বস্তু নয়—মানুষের নির্মল মন, সৎকর্ম এবং ঈশ্বরের প্রতি আন্তরিক ভক্তি।

শিষ্য: গুরুদেব, লোকমুখে তো আরও নানা কথা শোনা যায়—চন্দন নাকি গ্রহদোষ দূর করে, সংসারের অশান্তি কমায়, ধন-সম্পদ বৃদ্ধি করে। এই কথাগুলোর মধ্যে কতখানি সত্য?

গুরু: বৎস, মানুষের বিশ্বাস, শাস্ত্রের ব্যাখ্যা এবং বাস্তব অভিজ্ঞতা—এই তিনকে কখনো এক করে ফেলবে না।

চন্দনের কিছু গুণ প্রকৃতিগত—তার শীতলতা, তার সুগন্ধ, তার স্নিগ্ধতা। আবার কিছু বিষয় আছে, যা যুগ যুগ ধরে ধর্মীয় আচার, লোকবিশ্বাস ও জ্যোতিষশাস্ত্রের সঙ্গে জড়িয়ে এসেছে। সেই বিশ্বাসকে সম্মান করা যায়, কিন্তু অন্ধভাবে গ্রহণ করা উচিত নয়।

শিষ্য: তাহলে শাস্ত্রে চন্দনের ব্যবহার কেন এত বেশি?

গুরু: কারণ চন্দন মানুষের মনকে ঈশ্বরমুখী করে। যখন তুমি নিজের হাতে চন্দন ঘষো, তখন তোমার মধ্যে ধৈর্য জন্মায়। যখন দেবতার শ্রীঅঙ্গে তা নিবেদন করো, তখন অহংকার কমে। যখন নিজের কপালে তিলক পর, তখন মনে পড়ে—আমি শুধু দেহ নই, আমি চৈতন্যের সন্তান। এই স্মরণই মানুষের সবচেয়ে বড় আশীর্বাদ।

 জ্যোতিষশাস্ত্রে অনেকেই মনে করেন, বিভিন্ন গ্রহের সঙ্গে বিভিন্ন উপাদানের এক প্রতীকী সম্পর্ক রয়েছে। সেই কারণেই কোথাও লাল চন্দন, কোথাও সাদা চন্দন, কোথাও আবার কেশর মিশ্রিত চন্দনের ব্যবহার দেখা যায়। কিন্তু মনে রেখ—কোনো বস্তুই মানুষের কর্মের বিকল্প হতে পারে না।

শিষ্য: অর্থাৎ শুধু চন্দন ব্যবহার করলেই ভাগ্য বদলে যাবে—এমন কথা বলা ঠিক নয়?

গুরুদেব স্নিগ্ধ হাসলেন।
গুরু: যদি তাই হত, তবে চন্দনের বনে জন্মানো প্রতিটি মানুষই মহাপুরুষ হয়ে উঠত।
ভাগ্য পরিবর্তনের মূল ভিত্তি তিনটি—সৎকর্ম, সৎচিন্তা এবং ঈশ্বরের প্রতি আন্তরিক সমর্পণ। চন্দন সেই সাধনার একটি পবিত্র সহায়ক মাত্র।

শিষ্য: গুরুদেব, অনেকেই বলেন ঘরে প্রতিদিন চন্দনের ধূপ জ্বালালে অশুভ শক্তি দূরে থাকে।

গুরু: ধূপের সুগন্ধ পরিবেশকে নির্মল ও মনোরম করে। পরিচ্ছন্ন গৃহ, সুগন্ধময় পরিবেশ এবং নিয়মিত প্রার্থনা মানুষের মনে ইতিবাচক প্রভাব ফেলে। সেই কারণেই বহু প্রাচীনকাল থেকে ধূপ, দীপ ও চন্দনের ব্যবহার চলে আসছে।

কিন্তু যদি ঘরে মিথ্যা, লোভ, হিংসা ও অহংকার বাস করে, তবে কেবল সুগন্ধ দিয়ে সেই অশুভ শক্তিকে দূর করা যায় না।

শিষ্য: গুরুদেব, তাহলে প্রকৃত শুভশক্তি কোথায়?

গুরুদেব দূরের অস্তমিত সূর্যের  দিকে তাকিয়ে দিলেন উত্তর: যেখানে সত্য আছে, সেখানেই শুভশক্তি। যেখানে করুণা আছে, সেখানেই দেবত্ব।
যেখানে ক্ষমা আছে, সেখানেই লক্ষ্মীর বাস। আর যেখানে মানুষের হৃদয় চন্দনের মত শীতল ও সুগন্ধময়, সেখানে ঈশ্বর স্বয়ং অবস্থান করেন।

শিষ্যের চোখে এক অদ্ভুত আলো ফুটে উঠল। সে অনুভব করল—এতদিন সে চন্দনের গন্ধ চিনত, আজ সে চন্দনের দর্শন উপলব্ধি করতে শুরু করেছে।
গুরুদেব এবার আসন ত্যাগ করে আশ্রমের প্রাচীন চন্দনগাছটির দিকে এগিয়ে গেলেন। গাছের কাণ্ডে স্নেহভরে হাত রেখে তিনি শিষ্যকে বললেন, “বৎস, চন্দনের সবচেয়ে বড় শিক্ষা জানো কী?
কুঠারের আঘাতে যে তাকে কেটে ফেলে, সেই কুঠারের ফলাকেও সে নিজের সুগন্ধে ভরিয়ে দেয়।

এই পৃথিবীতে তুমিও তেমন মানুষ হও। যে তোমায় আঘাত করবে, তার প্রতিও বিদ্বেষ নয়—নিজের চরিত্রের সুগন্ধই দান করবে। সেই দিনই বুঝবে, চন্দনের প্রকৃত তিলক কপালে নয়, মানুষের অন্তরে ধারণ করতে হয়।”

শিষ্য গভীর শ্রদ্ধায় গুরুদেবের দিকে তাকিয়ে রইল। সন্ধ্যার বাতাসে চন্দনের সুগন্ধ আরও যেন স্পষ্ট হয়ে উঠল। তার মনে হলো—আজ সে কেবল চন্দনের কথা শুনল না, নিজের অন্তরের শুদ্ধতার পথেরও পাঠ গ্রহণ করছে।

(আগামী সংখ্যায় শেষ)

(এরকমভাবে প্রশ্নোত্তরের মাধ্যমে আধ্যাত্মিক জগতের বিশেষ সকল তত্ত্ব ও তথ্য  আরো বেশী ভালোভাবে জানতে পড়ুন লেখকের অনন্তের জিজ্ঞাসা ৫ খণ্ড। Whatsapp করুন জয় মা তারা পাবলিশার্স 9153391909)

#Chandan #ChandanMahatmya #SanatanDharma #Hinduism #Spirituality #Mahadev #Bhakti #harharmahadev

Sunday, 14 June 2026

পুরুষোত্তম মাসের শেষ অমাবস্যা: আমাদের কি করা উচিৎ?

পুরুষোত্তম মাসের শেষ অমাবস্যা: আমাদের কি করা উচিৎ?

আগামীকাল সোমবার পুরুষোত্তম মাসের শেষ অমাবস্যা পড়েছে। এই অমাবস্যা বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ, কারণ এটি তিন বছর অন্তর আগত পুরুষোত্তম মাসের অমাবস্যা এবং সোমবারে পড়ায় একে সোমবতী অমাবস্যাও বলা হয়। এই তিথিতে পূর্বপুরুষদের আশীর্বাদ লাভের বিশেষ সুযোগ রয়েছে।
    হিন্দু ধর্মে প্রতিটি তিথি ও প্রতিটি দিন কোনো না কোনো দেবদেবীর উদ্দেশে নিবেদিত। অমাবস্যা তিথির অধিষ্ঠাতা হলেন পিতৃদেবতা। তাই এই দিনটি পিতৃস্মরণ, পিতৃপূজা ও পিতৃতর্পণের জন্য অত্যন্ত শুভ বলে বিবেচিত।
     শাস্ত্রমতে, যদি পূর্বপুরুষরা সন্তুষ্ট না হন, তবে জীবনের বহু ক্ষেত্রে বাধা সৃষ্টি হতে পারে। তাই অমাবস্যার দিনে তাঁদের স্মরণ করা, আশীর্বাদ প্রার্থনা করা, দান-পুণ্য করা, তাঁদের ছবি বা স্মৃতির সামনে শ্রদ্ধা নিবেদন করা এবং তিল-তর্পণ করা বিশেষ ফলদায়ক বলে মানা হয়।
     অনেকেই তাঁদের প্রিয় খাদ্য রান্না করে নিবেদন করেন এবং পরে কাক, গরু, পাখি বা পিঁপড়েদের খাদ্য দেন। বিশ্বাস করা হয়, এইসব প্রাণীর মাধ্যমে পিতৃলোকের আত্মারা সেই অর্ঘ্য গ্রহণ করেন।
     কেউ কেউ মনে করেন অমাবস্যা পালন করা উচিত নয়, আবার কারও বাড়িতে প্রবীণদের নিজস্ব নিয়ম থাকে। পরিবারের বড়দের মতামতকে সম্মান করেই চলা উচিত। তবে অমাবস্যার দিনে দান, তর্পণ ও পূর্বপুরুষদের স্মরণ করা সর্বদাই শুভ বলে শাস্ত্রে উল্লেখ রয়েছে।
     শাস্ত্র অনুযায়ী, এই দিনে যজ্ঞ, ব্রত, অনুষ্টান ও সংকল্প অত্যন্ত শুভ ফল প্রদান করে। অমাবস্যাকে কেবল পিতৃপক্ষের সঙ্গে যুক্ত করে দেখলে ভুল হবে। এই তিথির সঙ্গে মহালক্ষ্মীরও গভীর সম্পর্ক রয়েছে। ধন, ঐশ্বর্য, যশ, স্থায়ী সমৃদ্ধি এবং সংসারে লক্ষ্মীর কৃপা লাভের জন্যও এই দিনটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
দীপাবলির মতো মহাশুভ লক্ষ্মীপূজাও অমাবস্যাতেই অনুষ্ঠিত হয়। তাই অমাবস্যাকে কখনও অশুভ ভেবে অবহেলা করা উচিত নয়।
      এই দিনে সম্পূর্ণ কালো উড়দ ডাল, কম্বল ইত্যাদি দান শুভ বলে মনে করা হয়। এর ফলে পিতৃলোকের আত্মারা তৃপ্ত হন এবং রাহু-কেতুর অশুভ প্রভাবও প্রশমিত হয় বলে বিশ্বাস।
      পাখিদের খাদ্যদান বিশেষ পুণ্যজনক বলে বিবেচিত। কাককে ক্ষীর বা পনিরজাতীয় খাদ্য নিবেদন করাও বহু স্থানে প্রচলিত, কারণ ধর্মীয় বিশ্বাস অনুযায়ী পূর্বপুরুষরা কাকের রূপে এসে সেই অন্ন গ্রহণ করেন। এর মাধ্যমে পরিবারে সুখ, সমৃদ্ধি, যশ ও সাফল্য বৃদ্ধি পায় বলে মনে করা হয়।
বিশেষ করে এই অমাবস্যায় জলাভিষেক, অশ্বত্থ গাছে কাঁচা দুধ অর্পণ, কালো তিল নিবেদন, প্রদীপ প্রজ্বলন, দান-পুণ্য, পিতৃস্মরণ এবং তাঁদের ছবির সামনে সর্ষের তেলের চারমুখী প্রদীপ জ্বালানো শুভ বলে উল্লেখ করা হয়েছে। সাদা ফুল নিবেদন, অশ্বত্থ বৃক্ষরোপণ ও পূজা, হোম-যজ্ঞ এবং পূর্বপুরুষদের প্রিয় খাদ্য দান করাও বিশেষ ফলদায়ক বলে ধরা হয়।
     যাঁরা কালসর্প দোষের প্রতিকার করতে চান, তাঁদের জন্য নাগ-নাগিনের বিধিবদ্ধ পূজা করে গঙ্গা বা যমুনায় বিসর্জনের কথাও বলা হয়।
অমাবস্যার রাতে মহালক্ষ্মীর মন্ত্রজপ, গোলাপ ফুল নিবেদন এবং রাত্রিজাগরণ করে পূজা করাও শুভ বলে বিবেচিত।
     রাহু-কেতুর কষ্ট থেকে মুক্তির উদ্দেশ্যে জুতো, ছাতা, উড়দ ডাল, সর্ষের তেল, কালো রঙের চটি, চা-পাতা, কম্বল ও বেগুন দান করার কথাও বলা হয়েছে। দরিদ্র মানুষের মধ্যে খাদ্যশস্য, চাল, তেল ও ঋতুভিত্তিক বস্ত্র বিতরণ, গোশালায় দান, গরুকে সবুজ ঘাস, গুড় ও খাদ্য প্রদান এবং ঘি দান করাও পুণ্যস্বরূপ বিবেচিত।
    যদি সম্ভব হয়, এই দিনে গঙ্গাস্নান বা গঙ্গায় ডুব দেওয়া অত্যন্ত শুভ বলে বিশ্বাস করা হয় এবং বহু বছরের দুঃখ-কষ্ট দূর হয় বলে লোকবিশ্বাস রয়েছে।
     পুরুষোত্তম মাসের সমাপ্তি উপলক্ষে যাঁরা এই মাসে কিছু খাদ্য বা ব্যবহার্য বস্তু ত্যাগ করেছিলেন, তাঁদের সেই বস্তুগুলি দান করার পরামর্শ দেওয়া হয়। যেমন—চটি, ছাতা, বেগুন, চা-পাতা, কম্বল কিংবা যে খাদ্যসামগ্রী ত্যাগ করা হয়েছিল, তা দরিদ্রদের মধ্যে বিতরণ করা। বিশেষভাবে খিচুড়ি বিতরণ এবং ক্ষীর রান্না করে পূর্বপুরুষ ও মহালক্ষ্মীকে নিবেদন করারও পরামর্শ দেওয়া হয়। পিতৃঅর্ঘ্যের জন্য সাধারণ সাদা ক্ষীর এবং মহালক্ষ্মীর নিবেদনের জন্য কেশর মিশ্রিত ক্ষীর অর্পণের কথাও বলা হয়েছে।
     সোমবার হওয়ায় মহাদেবের পূজাও এই দিনে বিশেষ ফলদায়ক বলে ধরা হয়। শিবলিঙ্গে দুধ, দই, মধু, চিনি ও ঘি নিবেদন করা শুভ।
এছাড়া সমগ্র গৃহে ঘণ্টা ও শঙ্খধ্বনি করা, লোবানের ধোঁয়া দেওয়া, সমস্ত আলো জ্বালানো, ঘর পরিষ্কার করা, গঙ্গাজল ও গোলাপজল মিশিয়ে মেঝে মোছা, প্রবেশদ্বারে তোরণ ও আমপাতা সাজানো—এসবকেও সৌভাগ্য ও সমৃদ্ধির প্রতীক হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে।
    সবশেষে সকল পূর্বপুরুষের প্রতি শ্রদ্ধা ও প্রণাম নিবেদন করে তাঁদের আশীর্বাদ কামনা করা হয়েছে, যাতে জীবনে সুখ, সমৃদ্ধি, যশ, সাফল্য এবং কোনো কিছুর অভাব না থাকে।
 #অমাবস্যা #spirituality #spiritualgrowth  #spiritualjourney #spiritualawakening

Thursday, 28 May 2026

মন্ত্র জপ কিভাবে করতে হয়? তারাশিস গঙ্গোপাধ্যায়

মন্ত্র জপ কিভাবে করতে হয়?
 তারাশিস গঙ্গোপাধ্যায়

রাতের অন্ধকার ঘরে যদি একটি ছোট প্রদীপও না জ্বলে, তবে চারপাশে যত মূল্যবান জিনিসই থাকুক, কিছুই চোখে পড়ে না। ঠিক তেমনি, মন্ত্রের ভিতরে যদি চৈতন্যের আলো না জাগে, তবে বছরের পর বছর জপ করেও তার আসল ফল অনুভব করা যায় না। নামের ক্ষেত্রে এর প্রয়োজন না হলেও বীজের ক্ষেত্রে এর দরকার পড়ে।
   আজকাল অনেকেই দেখা যায় মালা হাতে জপ করেন, ঠোঁট নড়ে, শব্দ উচ্চারিত হয়—কিন্তু অন্তরে কোনো কম্পন জাগে না। কারণ অধিকাংশ মানুষ জানেনই না, মন্ত্র শুধু কয়েকটি অক্ষরের সমষ্টি নয়; তারও একটি প্রাণ আছে, একটি সুপ্ত শক্তি আছে। সেই শক্তির কেন্দ্র লুকিয়ে রয়েছে মানুষের নিজের শরীরেই—মণিপুর চক্রে।
   শাস্ত্রে বলা হয়েছে, মন্ত্রকে জাগাতে না পারলে সে নিস্তব্ধ বীজের মতো পড়ে থাকে। আর অবোধ, অচৈতন্য মন্ত্র যতই জপ করা হোক না কেন, তার পূর্ণ শক্তি প্রকাশ পায় না। এই জন্যে স্বামী নিগমানন্দ আমাদের জন্যে বলে গেছেন সেই পথ। তাঁর দেখানো পথ কিছুটা সহজ করে বলছি সবার জন্যে।
____________________

মন্ত্র চৈতন্য কিভাবে করতে হয়?
_________________

মানুষের শরীর শুধু রক্ত-মাংসের দেহ নয়; এর ভিতরে আছে সূক্ষ্ম শক্তির বহু কেন্দ্র। তাদের মধ্যেই অন্যতম মণিপুর চক্র—অগ্নির কেন্দ্র, তেজের কেন্দ্র। তন্ত্র ও যোগশাস্ত্রে বলা হয়, সাধক যখন বীজ মন্ত্রজপের আগে মণিপুর চক্রে নিজের ইষ্টমন্ত্রের দীপ্ত রূপ কল্পনা করেন, তখন ধীরে ধীরে মন্ত্রে প্রাণ জাগতে শুরু করে। এই প্রক্রিয়াকেই বলা হয় “মন্ত্রচৈতন্য”।
  কিন্তু এই রহস্য আজ প্রায় হারিয়ে গেছে। উপযুক্ত গুরু না থাকায় অধিকাংশ মানুষ শুধু শব্দ জপ করেই জীবন কাটিয়ে দেন। যোগী ও সন্ন্যাসীদের মধ্যেও খুব কম মানুষ আছেন, যারা এই জপ রহস্যের প্রকৃত ক্রিয়া জানেন।
   এখন জপ রহস্য কেন প্রয়োজন? শুধু মালা ঘোরানোই বা কর জপই জপ নয়। শাস্ত্রে জপের আগে ও পরে কিছু বিশেষ আচার এবং মানসিক প্রস্তুতির কথা বলা হয়েছে, যেগুলোকে একত্রে বলা হয় “জপ রহস্য”। এর মধ্যে রয়েছে—
কুল্লুকা
সেতু
মহাসেতু
মুখশোধন
করশোধন
চক্রাসন
প্রাণায়াম
ধ্যান
জপ সমর্পণ
ইত্যাদি।
এই প্রতিটি ধাপের উদ্দেশ্য একটাই—সাধকের শরীর, মন, বাক্‌ এবং প্রাণকে এমনভাবে প্রস্তুত করা, যাতে মন্ত্রের শক্তি তার ভিতরে জেগে উঠতে পারে।
    সবার আগে জানতে হয় কুল্লুকা কী? এই “কুল্লুকা” হল এক ধরনের সূক্ষ্ম রক্ষাকবচ। জপের আগে সাধক নিজের চারপাশে এক অদৃশ্য শক্তিবলয় কল্পনা করেন। গুরুপ্রদত্ত মন্ত্র ও ধ্যানের মাধ্যমে তিনি অনুভব করেন, যেন চারদিক থেকে এক আলোকবৃত্ত তাকে রক্ষা করছে। এর ফলে বাইরের অশান্ত ভাবনা, নেতিবাচক শক্তি বা মানসিক অস্থিরতা সহজে জপে বাধা দিতে পারে না।
   এবার জানতে হবে সেতু কী?
“সেতু” মানে সংযোগ। জপের আগে নিজের মন, গুরু, ইষ্টদেবতা ও মন্ত্রের মধ্যে এক অভ্যন্তরীণ যোগ স্থাপন করাকেই সেতু বলা হয়।
কারণ মন যদি চারদিকে ছড়িয়ে থাকে, তবে জপ কেবল শব্দেই সীমাবদ্ধ থাকে। সেতুর মাধ্যমে মন ধীরে ধীরে একাগ্র হয়ে ইষ্টের দিকে প্রবাহিত হয়।
   এবার জানতে হবে মহাসেতু কী? মহাসেতু হল আরও গভীর অবস্থা। এখানে সাধক অনুভব করতে শুরু করেন—তিনি আলাদা কেউ নন; মন্ত্র, ইষ্ট ও তাঁর নিজের চেতনা যেন একসূত্রে মিশে যাচ্ছে। তখন আর মনে হয় না “আমি জপ করছি”; বরং মনে হয়, মন্ত্র নিজেই ভিতরে জেগে উঠে নিজেকে জপ করছে।
   এবার জানত হবে করশোধন কী? করশোধন মানে হাতের শুদ্ধি। কারণ তন্ত্রমতে হাত শুধু শরীরের অঙ্গ নয়—এ শক্তির বাহন। জপ, পূজা বা ন্যাসের আগে হাত ধুয়ে, নির্দিষ্ট মুদ্রা ও মন্ত্রস্মরণের মাধ্যমে হাতকে পবিত্র ও শক্তিময় করা হয়।
এর উদ্দেশ্য হল, সাধকের স্পর্শ যেন সাধারণ স্পর্শ না থেকে সাধনার অংশ হয়ে ওঠে।
    মুখশোধনের প্রয়োজন
মন্ত্র উচ্চারণের প্রধান মাধ্যম হল বাক্‌শক্তি। তাই জপের আগে মুখশোধন করা হয়।
আচমন, প্রণব স্মরণ ও বাক্‌দেবীর ধ্যানের মাধ্যমে সাধক নিজের বাক্যকে শুদ্ধ করার চেষ্টা করেন, যেন মুখ থেকে বের হওয়া প্রতিটি মন্ত্রশব্দ শক্তিতে পূর্ণ হয়।
   আর জানতে হবে জপ সমর্পণ কেন জরুরি!
অনেকেই জপ করেন, কিন্তু শেষে সেই জপ ঈশ্বরকে সমর্পণ করেন না। ফলে জপের শক্তি ধীরে ধীরে অহংকার বা ব্যক্তিগত কামনায় ক্ষয় হয়ে যায়।
   শাস্ত্রে বলা হয়েছে, জপ শেষে বিনম্রচিত্তে সমস্ত সাধনাফল ঈশ্বরের চরণে অর্পণ করতে হয়। তখনই জপ নিষ্কাম হয়, শান্ত হয়, গভীর হয়।
   সাধকের করণীয়
তিনি শাক্ত হোন বা বৈষ্ণব—সব সাধকেরই উচিত জপের আগে অন্তর ও চেতনার প্রস্তুতি নেওয়া।
  কুল্লুকা, সেতু, মহাসেতু, মুখশোধন, করশোধন—এই সমস্ত জপ রহস্যের ধাপ শাস্ত্রীয় নিয়মে সম্পন্ন করে, পরে ভক্তিভরে জপ সমর্পণ করতে হয়। কারণ মন্ত্র কেবল শব্দ নয়। মন্ত্র এক জীবন্ত শক্তি। যে মুহূর্তে সেই শক্তি জেগে ওঠে, সেই মুহূর্তে জপ আর ঠোঁটের কাজ থাকে না—তা হয়ে ওঠে আত্মার যাত্রা।

#মন্ত্র_চৈতন্য
#জপ_রহস্য
#তন্ত্রসাধনা
#মণিপুর_চক্র
#SpiritualAwakening
#KundaliniAwakening
#MantraPower
#Meditation
#SanatanDharma
#MysticIndia

Friday, 22 May 2026

কৃপা কাকে বলে? তারাশিস গঙ্গোপাধ্যায়

সত্যকার কৃপা মানুষের ইচ্ছাপূরণের মধ্যে লুকিয়ে থাকে না। আমরা সাধারণ মানুষ, তাই জীবনের অধিকাংশ সময় ব্যয় করি প্রাপ্তির পেছনে ছুটে—অর্থ, প্রতিষ্ঠা, যশ, বৈভব, সুখস্বাচ্ছন্দ্য। মনে করি, যেদিন জীবনের সমস্ত অভাব পূর্ণ হবে, সেদিনই বুঝি ঈশ্বরের কৃপা আমাদের উপর নেমে আসবে। কিন্তু এ এক গভীর ভুল। কারণ ধনসম্পদ, যশ বা ভোগের প্রাচুর্য কখনও কৃপা হতে পারে না। ইতিহাসে কত অসুর, কত নিষ্ঠুর মানুষও তো অপরিসীম ঐশ্বর্যের অধিকারী হয়েছে। পূর্বজন্মের সুকৃতি, কর্মফলের অদৃশ্য সঞ্চয় তাদের হাতে সেই প্রাপ্তি এনে দিয়েছে। কিন্তু তাকে কৃপা বলা যায় না। কৃপা হল অন্য এক জিনিস—অন্তরের ভূমিতে এক নীরব বিপ্লব।

ভগবান যখন মানুষের প্রতি সত্যকার অনুগ্রহ করেন, তখন তিনি প্রথমে মানুষের জীবনে এনে দেন সৎসঙ্গ। কারণ অন্ধকারের মধ্যে দাঁড়িয়ে মানুষ কখনও আলোকে চিনতে পারে না; আলোকে জানতে হলে আলোর সংস্পর্শ প্রয়োজন। মহাত্মাদের সান্নিধ্য, শুভ চিন্তার পরশ, পবিত্র নামের ধ্বনি—এই সবই মানুষের অন্তরে প্রথম জাগিয়ে তোলে এক অদ্ভুত অস্থিরতা। সে বুঝতে শেখে, এতদিন যাকে জীবন ভেবেছিল, তা কেবল জীবনের বহিরঙ্গের আবরণ। এর নেপথ্যে আরও এক গভীর সত্য আছে।

কিন্তু সৎসঙ্গের পরেই আসে দ্বিতীয় দান—প্রতিকূলতা। এবং এই প্রতিকূলতাই হল ঈশ্বরের সবচেয়ে গুপ্ত কৃপা।
মানুষ সাধারণত যা চায়, জীবন ঠিক তার উল্টো পথেই তাকে নিয়ে যায়। আমরা চাই নিশ্চিন্ত সুখ, অথচ হঠাৎ চারদিক অশান্ত হয়ে ওঠে। আমরা চাই প্রিয়জনের অবিচল স্নেহ, অথচ সম্পর্কের ভিতরে দেখা দেয় ভাঙন। আমরা চাই নিরাপত্তা, অথচ জীবন হঠাৎ অনিশ্চয়তার ঝড় তোলে। তখন বিস্মিত হয়ে মানুষ প্রশ্ন করে—সংসার এত অনিত্য? এত ছলনা, এত অবিচার, এত মিথ্যা এর বুকে লুকিয়ে আছে?এই প্রশ্নের মধ্য দিয়েই শুরু হয় জাগরণ।

যতদিন মানুষ ভোগের মোহে ডুবে থাকে, ততদিন তার চেতনা বহির্মুখী থাকে। সুখের অবিরল প্রবাহ মানুষকে নিদ্রিত করে রাখে। সে ভুলে যায় মৃত্যুকে, ভুলে যায় নশ্বরতাকে, ভুলে যায় নিজের আত্মার প্রকৃত ক্ষুধাকে। তাই প্রতিকূলতা না এলে বৈরাগ্যের জন্ম হয় না। দুঃখই প্রথম মানুষকে শেখায়—এই পৃথিবী চিরআশ্রয় নয়। এই উপলব্ধির মুহূর্তেই মানুষ অন্তরে অন্তরে আশ্রয় খুঁজতে শুরু করে এমন এক সত্তার, যিনি পরিবর্তনের অতীত, যিনি ভাঙনের অতীত, যিনি মৃত্যুর অতীত।

সেই আশ্রয়ের নামই ঈশ্বর।
এইজন্যেই দেখা যায়, পৃথিবীর প্রায় সকল মহাত্মার জীবনেই আলোর আহ্বানের আগে নেমে এসেছে গভীর অন্ধকার। প্রতিকূলতা তাদের ভেঙে দেয়নি; বরং সমস্ত বাহ্যিক নির্ভরতা ভেঙে দিয়ে তাদের ঠেলে দিয়েছে অন্তরের দিকে। দুঃখ তখন আর অভিশাপ থাকে না, হয়ে ওঠে পথপ্রদর্শক। যে মানুষ একদিন সংসারের ক্ষণস্থায়ী সুখকে চরম সত্য বলে জেনেছিল, সেই মানুষই প্রতিকূলতার আগুনে দগ্ধ হয়ে উপলব্ধি করে—স্থায়ী শান্তি কেবল ঈশ্বরের সান্নিধ্যেই।

তাই জীবনে যখন প্রতিকূলতা আসে, তখন তাকে কেবল দুর্ভাগ্য বলে ভয় পেও না। কখনও কখনও সেই অন্ধকারের মধ্যেই ঈশ্বর মানুষের জন্য খুলে দেন আলোর দ্বার। তিনি মানুষকে নিজের দিকে ফিরিয়ে আনার জন্যই ভেঙে দেন তার মায়ার আশ্রয়। কারণ যে হৃদয় ভাঙে না, সে হৃদয়ে অনেক সময় আলোও প্রবেশ করতে পারে না।

সংসারে থেক, সংসারের কর্তব্য পালন কর, আপনজনকে ভালোবাসো—কিন্তু অন্তরের গভীরে সংসারী হয়ে থেকো না। বাইরের জীবন চলুক স্বাভাবিক নিয়মে, অথচ ভিতরের দৃষ্টি ধীরে ধীরে ঘুরে যাক নশ্বর থেকে অবিনশ্বরের দিকে। মানুষের চিন্তাধারাই তাঁর প্রকৃত বাসস্থান। সেই চিন্তা যদি কেবল ক্ষণস্থায়ী লাভ-লোকসানের মধ্যে আবদ্ধ থাকে, তবে আত্মা ক্রমশ সংকীর্ণ হয়ে পড়ে। আর যদি সেই চিন্তা ঈশ্বরমুখী হয়, তবে জীবন ধীরে ধীরে এক অন্য আলোয় উদ্ভাসিত হয়।
তাই তারাশিস গঙ্গোপাধ্যায় বলে, ঈশ্বরকে ভালোবাসতে হয় কোনও প্রাপ্তির আশায় নয়। অধিকাংশ মানুষ ঈশ্বরের কাছে যায় চাওয়ার ঝুলি নিয়ে—সুখ চাই, সম্পদ চাই, বিপদমুক্তি চাই। কিন্তু সত্যকার ভক্তি সেখানে জন্মায়, যেখানে মানুষ বলে—“আমি তোমাকেই চাই, তোমার দান নয়।”

যেমন ধর, কেউ রাধানাম জপ করছে। শুধু ঠোঁটে উচ্চারিত “রাধা রাধা” শব্দই জপ নয়। জপ তখনই সত্য হয়, যখন সমগ্র সত্তা নামের মধ্যে ডুবে যেতে শুরু করে। বাইরে যেদিকে চোখ যায়, মনে হয় যেন বাতাসের বুকে অদৃশ্য অক্ষরে লেখা আছে—রাধা। চারদিকের সমস্ত শব্দধারার মধ্যে যেন শোনা যায় সেই এক নামের অনুরণন। আর অন্তরের গভীরে, হৃদয়ের নীরবতম স্তরে, অবিরাম প্রবাহিত হতে থাকে সেই জপ।
যখন বাইরের বিশ্ব, অন্তরের অনুভব এবং নামের ধ্বনি একাকার হয়ে যায়—তখনই জন্ম নেয় সত্য জপ। তখন নাম আর কেবল শব্দ থাকে না; হয়ে ওঠে অস্তিত্বের স্পন্দন। মানুষ তখন আর আলাদা সত্তা হয়ে থাকে না—সে ধীরে ধীরে বিলীন হতে থাকে সেই চিরন্তন প্রেমের সাগরে, যেখানে সমস্ত দুঃখ, সমস্ত প্রতিকূলতা, সমস্ত অহংকার অবশেষে শান্ত হয়ে আসে সন্ধ্যার শেষ আলোর মত।

#Spirituality
#DivineGrace
#ঈশ্বরের_কৃপা
#আত্মজাগরণ
#বৈরাগ্য
#আধ্যাত্মিকতা
#সৎসঙ্গ