Ami Tarashis Bolchi

Ami Tarashis Bolchi
The blog of Tarashis Gangopadhyay (click the photo to reach our website)

Monday, 13 July 2026

অস্ত বৃহস্পতি কি ফল দেয়? আর কি তার প্রতিকার ? Effects of combust jupiter

 পঞ্চম ভাগ: অস্ত বৃহস্পতি কি ফল দেয়? আর কি তার প্রতিকার ?
  তারাশিস গঙ্গোপাধ্যায়


(পূর্ব প্রকাশিতের পর)

________________________


শিষ্য: গুরুদেব, এবার  নবগ্রহের মধ্যে সর্বাধিক শুভ, কল্যাণদায়ক ও সুখপ্রদ গ্রহ—বৃহস্পতি (গুরু) সম্পর্কে জানতে চাইব। যদি জন্মকুণ্ডলীতে বৃহস্পতি অস্ত হয়ে যায়, তাহলে মানুষের জীবনে কী কী দুঃখ, বাধা ও রোগ আসতে পারে, তা একটু বলুন। গুরুদেব, বৃহস্পতিকে কেন  শুভ গ্রহ বলা হয়?


গুরু: জ্যোতিষশাস্ত্রে বৃহস্পতিকে ‘জীব’ বলা হয়। কারণ তিনিই জীবন, প্রাণশক্তি, জ্ঞান, ধর্ম ও সুখের প্রধান কারক। শাস্ত্রে বলা হয়েছে—“যস্য কেন্দ্রে বৃহস্পতি, কিম্ কুর্বন্তি অন্যে গ্রহাঃ।” অর্থাৎ যার কুণ্ডলীর কেন্দ্রস্থানে শক্তিশালী বৃহস্পতি অবস্থান করেন, তার অন্য অশুভ গ্রহরাও খুব বেশি ক্ষতি করতে পারে না। এতটাই কল্যাণময় এই গ্রহ।

শিষ্য: গুরুদেব, যদি সেই বৃহস্পতিই অস্ত হয়ে যায়?

গুরু: তখন সমস্যার শুরু হয়। সূর্যের অতিরিক্ত নিকটে এসে যদি বৃহস্পতি অস্ত হয়ে যায় এবং তার দশা বা অন্তর্দশা চলতে থাকে, তবে মানুষ লিভারের গুরুতর রোগ, লিভার সিরোসিস, পেটে জল জমে যাওয়ার মতো কঠিন অসুখে আক্রান্ত হতে পারে। এমন রোগ অনেক সময় মানুষকে মৃত্যুর খুব কাছাকাছি পর্যন্ত নিয়ে যায়।

শিষ্য: ছাত্রছাত্রীদের ক্ষেত্রেও কি এর প্রভাব পড়ে?

গুরু: অবশ্যই। কোনো ছাত্রের কুণ্ডলীতে যদি বৃহস্পতি অস্ত থাকে, তবে তার পড়াশোনার প্রতি আগ্রহ নষ্ট হয়ে যায়। শিক্ষা, ধর্ম, পূজা-পাঠ, সৎকর্ম—সবই তার কাছে বিরক্তিকর মনে হয়। স্বার্থপরতা বাড়ে, উচ্চ আদর্শের প্রতি আকর্ষণ কমে যায়।

শিষ্য: গুরুদেব, আর কী কী সমস্যা দেখা দেয়?

গুরু: অস্ত বৃহস্পতি ডায়াবেটিসের কারণ হতে পারে, সাইনাসের সমস্যাও সৃষ্টি করতে পারে। অস্বাভাবিক স্থূলতা দেখা দেয়—মানুষ শুধু মোটা হয় না, প্রায় হাতির মতো ভারী হয়ে পড়ে। আইনি জটিলতায় জড়িয়ে পড়ার সম্ভাবনাও বেড়ে যায়। সমাজে সম্মান কমে যায়, নিজের মানুষের সঙ্গে দূরত্ব বাড়ে। অনেক সময় পরিবারের কোনো প্রবীণ সদস্যের মৃত্যুও ঘটতে পারে। এমনকি বিয়ের পরেও অনৈতিক সম্পর্কের দিকে আকৃষ্ট হওয়ার প্রবণতা তৈরি হতে পারে।

শিষ্য: গুরুদেব, এই অশুভ প্রভাব থেকে মুক্তির উপায় কী?
গুরু: আমার মতে, সর্বোত্তম উপায় হল ভগবান শ্রীরাম ও শ্রীকৃষ্ণের উপাসনায় সম্পূর্ণভাবে আত্মনিয়োগ করা। যদি নিষ্ঠার সঙ্গে “ওঁ নমো ভগবতে বাসুদেবায়” এই মহামন্ত্রের ১২ লক্ষ জপ সম্পূর্ণ করতে পারো, তবে আমি দৃঢ়ভাবে বলছি—জীবন, সুখ কিংবা ধর্ম নিয়ে আর কোনো দুশ্চিন্তা থাকবে না।

শিষ্য: গুরুদেব, বারো লক্ষ জপ তো অনেক কঠিন!

গুরু: তাহলে আরেকটি সহজ পথ বলছি। প্রতিদিন “ওঁ ব্রীং বৃহস্পতয়ে নমঃ” এই মন্ত্র ১০,০০০ বার জপ করতে শুরু করো। চার মাসের মধ্যেই ১২ লক্ষ জপ সম্পূর্ণ হয়ে যাবে। প্রতিদিন দুই ঘণ্টারও কম সময় লাগবে। আমি এমন কোন উপায় বলছি না, যার জন্য তোমাকে হিমালয়ে গিয়ে সঞ্জীবনী আনতে হবে। আমি এমন সাধনার কথাই বলছি, যা তুমি ঘরে বসেই করতে পারবে, আর যা সত্যিই তোমার জীবন বদলে দিতে পারে। 

শিষ্য: গুরুদেব, আর কী কী প্রতিকার করা উচিত?

গুরু: প্রতি বৃহস্পতিবার ছোলার ডাল ও কলা লক্ষ্মী-নারায়ণের মন্দিরে নিবেদন করবে। বিষ্ণু চালিসা, নারায়ণ কবচ এবং বিষ্ণু সহস্রনাম পাঠ করতে পারো। নিজের কাছে একটি হলুদ রঙের রুমাল রাখবে। কপাল, নাভি ও জিহ্বায় কেশরের তিলক পরবে। প্রতিদিন কোন না কোন ধর্মস্থানে যাবে। অশ্বত্থ  গাছের নীচে প্রদীপ জ্বালাবে। বৃহস্পতিবার চুল বা কাপড় ধোবে না। ধর্মীয় স্থানে ভ্রমণ করবে। কখনও মিথ্যা বলবে না এবং মাংসাহার সম্পূর্ণরূপে ত্যাগ করবে।

শিষ্য: গুরুদেব, বৃহস্পতিকে আরও শক্তিশালী করার বিশেষ উপায় কি আছে?

গুরু: আছে। পাঁচমুখী রুদ্রাক্ষের সম্পূর্ণ একটি মালা ধারণ করতে পারো। যদি সেটি সোনায় মুড়ে ধারণ করা যায়, তবে তার শুভফল আরও বৃদ্ধি পায়। তবে যদি সত্যিই বৃহস্পতির অলৌকিক কৃপা পেতে চাও, তাহলে প্রতিদিন সকাল ও সন্ধ্যায় ২৪ মিনিট চোখ বন্ধ করে বাম চোখের উপরে হলুদ বর্ণের জ্যোতির্ময় বৃহস্পতিকে ধ্যান করবে এবং “ওঁ ব্রং বৃহস্পতয়ে নমঃ” মন্ত্র জপ করবে। এই সাধনা ছয় মাস নিষ্ঠার সঙ্গে করলে নিজের জীবনেই তার বিস্ময়কর পরিবর্তন প্রত্যক্ষ করবে।

শিষ্য: প্রণাম গুরুদেব। আজ আমি বুঝতে পারলাম, বৃহস্পতি শুধু ধন বা জ্ঞানের গ্রহ নন, তিনিই জীবন, ধর্ম, সুখ ও ঈশ্বরীয় কৃপা লাভের অন্যতম প্রধান আশ্রয়।

গুরু: আশীর্বাদ রইল। চেষ্টা করে যাও।


(ক্রমশ)


#Jupiter #jupitercombust 
#astrology  #astrologer  #astrologyposts  #জ্যোতিষ


অস্ত বুধ কি ফল দেয়? আর কি তার প্রতিকার? Effect of combust mercury and remedies

 চতুর্থ ভাগ - অস্ত বুধ কি ফল দেয়? আর কি তার প্রতিকার?
 - তারাশিস গঙ্গোপাধ্যায়
(পূর্ব প্রকাশিতের পর)


শিষ্য: গুরুদেব, আপনি চন্দ্র ও মঙ্গলের কথা বললেন। এবার কৃপা করে বলুন, কুণ্ডলীতে যদি বুধ গ্রহ অস্ত হয়ে যায়, বিশেষ করে তার অন্তর্দশা চলতে থাকে, তাহলে মানুষের জীবনে কী কী সমস্যা আসে?


গুরু: তাহলে শোন, কুণ্ডলীতে বুধ অস্ত হলে সর্বপ্রথম মানুষের নিজের উপর বিশ্বাস কমে যায়। সে কোনো সিদ্ধান্তই সময়মত নিতে পারে না; সামান্য বিষয়েও দ্বিধাগ্রস্ত হয়ে পড়ে। মনে রেখ, বুধ হল বাকশক্তি ও বুদ্ধির কারক গ্রহ। শাস্ত্রে বলা হয়েছে— “বুধেন বুদ্ধি...” অর্থাৎ বুধের সঙ্গে মানুষের বুদ্ধি, বিচারশক্তি ও প্রকাশক্ষমতার সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে। তাই যখন বুধ ও বৃহস্পতি উভয়েই শুভ ও শক্তিশালী অবস্থায় থাকে, তখন জ্যোতিষে তাকে প্রগল্ভ যোগ বলা হয়। এমন ব্যক্তির মুখে যখন কথা বেরোয়, তখন সমগ্র সভা নীরবে তা শ্রবণ করে; কারণ তার বাক্যে থাকে জ্ঞান, যুক্তি ও প্রভাব। কিন্তু যদি বুধ অস্ত হয়ে যায়, তবে মানুষ সবকিছু বুঝেও নিজের মনের কথা ঠিকভাবে প্রকাশ করতে পারে না। তার বাকশক্তি যেন তাকে মাঝপথেই ত্যাগ করে। আজকের ভাষায় এমন মানুষকে অন্তর্মুখী বা ইন্ট্রোভার্ট বলা হয়। সে নিজের ভেতরেই কষ্ট জমিয়ে রাখে, মানসিক চাপ ও অস্থিরতার মধ্যে জীবন কাটায়।


শিষ্য: গুরুদেব, শুধু মানসিক সমস্যাই কি হয়, নাকি শরীরেও এর প্রভাব পড়ে?


গুরু: অবশ্যই পড়ে, বৎস। বুধ অশুভ বা অস্ত হলে শরীরে নানা ধরনের রোগ দেখা দিতে পারে। শরীরে খিঁচুনি হওয়া, শ্বাসকষ্ট, ত্বকে অ্যালার্জি, ফোড়া হওয়া, এমনকি লিভারের সিরোসিসের মতো জটিল সমস্যারও সম্ভাবনা তৈরি হয়। কারণ বুধই ত্বকের প্রধান কারক গ্রহ। আবার যদি বুধ মৃত্যুভাবে অবস্থান করে এবং পাপগ্রহের প্রভাবে পড়ে, তবে মানুষ হাঁপানিতে আক্রান্ত হতে পারে, গভীর মানসিক অবসাদে ভুগতে পারে এবং আপনজনের মৃত্যুশোক দীর্ঘদিন ধরে বহন করতে হয়। আর যদি বুধ দ্বাদশ ভাব বা দ্বাদশেশের অশুভ প্রভাবে থাকে, তবে সে নেশার কবলে পড়তে পারে কিংবা দীর্ঘস্থায়ী কোনো রোগে আক্রান্ত হতে পারে।


শিষ্য: গুরুদেব, তাহলে এই অশুভ প্রভাব থেকে মুক্তির কোন উপায় কি শাস্ত্রে বলা আছে?


গুরু: নিশ্চয়ই আছে। আমাদের শাস্ত্রে বুধকে শুভ করার বহু প্রতিকার উল্লেখ রয়েছে। নিষ্ঠা, বিশ্বাস ও নিয়ম মেনে সেই প্রতিকারগুলি পালন করলে অবশ্যই উপকার লাভ করা যায়। এবার আমি তোমাকে সেই উপায়গুলিই একে একে বলছি। 


গুরু: শোন বৎস, এবার আমরা অস্ত বুধ নিয়ে আলোচনা করব। জন্মকুণ্ডলীতে যদি বুধগ্রহ অস্ত হয়ে যায় এবং সেই সময় তার অন্তর্দশাও চলে, তাহলে মানুষের জীবনে নানা ধরনের মানসিক, শারীরিক ও ব্যবহারিক সমস্যা দেখা দেয়। প্রথম লক্ষণই হলো—নিজের উপর বিশ্বাস কমে যায়। মানুষ সিদ্ধান্ত নিতে দ্বিধাগ্রস্ত হয়ে পড়ে, ছোট ছোট বিষয়েও দীর্ঘ সময় ধরে ভাবতে থাকে, অথচ সঠিক সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারে না। মনে রেখ, বুধ হল বুদ্ধি, বাকশক্তি, যুক্তি, বিশ্লেষণ ক্ষমতা এবং যোগাযোগের কারক গ্রহ। শাস্ত্রে বলা হয়েছে—“বুধেন বুদ্ধি।” অর্থাৎ বুধের সঙ্গেই মানুষের প্রখর বুদ্ধি ও বিচারশক্তির যোগ রয়েছে। তাই যখন জন্মকুণ্ডলীতে বুধ ও বৃহস্পতি উভয়েই শক্তিশালী অবস্থায় থাকে, তখন তাকে প্রগল্ভ যোগ বলা হয়। এমন ব্যক্তি যখন কথা বলেন, তখন সভার সকলেই নীরবে তাঁর কথা শোনে। তাঁর যুক্তি, জ্ঞান ও বাকচাতুর্য মানুষকে মুগ্ধ করে। 


কিন্তু যদি বুধ অস্ত হয়ে যায়, তখন ঠিক তার উল্টো ঘটনা ঘটে। মানুষ সবকিছু জেনেও নিজের মনের কথা প্রকাশ করতে পারে না। তার অনুভূতি মুখে আসে না, বাকশক্তি তাকে সহযোগিতা করে না। সে ধীরে ধীরে অন্তর্মুখী হয়ে যায়, নিজের মধ্যেই গুটিয়ে থাকে, অকারণ মানসিক চাপে ভোগে এবং সমাজ থেকে নিজেকে সরিয়ে নিতে শুরু করে।


শিষ্য: গুরুদেব, শুধু মানসিক সমস্যাই কি হয়, নাকি শরীরেও তার প্রভাব পড়ে?


গুরু: অবশ্যই পড়ে, বৎস। বুধ শরীরের ত্বক, স্নায়ু, শ্বাসপ্রশ্বাস ও সঞ্চালন ব্যবস্থার প্রধান কারক। তাই বুধ দুর্বল বা অস্ত হলে শরীরে টান ধরা, স্নায়ুর অস্বস্তি, শ্বাসকষ্ট, হাঁপানি, ত্বকে অ্যালার্জি, চর্মরোগ, এমনকি লিভারের সিরোসিসের মতো রোগের সম্ভাবনাও তৈরি হতে পারে। যদি অস্ত বুধ অষ্টমভাব বা মৃত্যুভাবের অশুভ প্রভাবে অবস্থান করে, তাহলে ব্যক্তি হাঁপানি, দীর্ঘস্থায়ী শ্বাসরোগ এবং মানসিক অবসাদে আক্রান্ত হতে পারে। জীবনে প্রিয়জনের মৃত্যুশোকও তাকে গভীরভাবে নাড়া দেয়। আবার যদি বুধ দ্বাদশভাবের প্রভাবে পড়ে, তাহলে মানুষ নেশায় আসক্ত হতে পারে অথবা দীর্ঘস্থায়ী রোগের কবলেও পড়তে পারে। তাই সময়মতো বুধের দোষের প্রতিকার করা অত্যন্ত প্রয়োজন। আমি এখন তোমাকে এমন কিছু উপায় বলব, যা শাস্ত্রে বহুদিন ধরে পরীক্ষিত এবং যথাযথভাবে পালন করলে অবশ্যই তার সুফল পাওয়া যায়।


শিষ্য: গুরুদেব, তাহলে সেই প্রতিকারগুলো আমাকে দয়া করে বিস্তারিতভাবে বলুন।


গুরু: মন দিয়ে শোন। বুধবার ভিজিয়ে রাখা গোটা মুগ পাখিদের খাওয়াবে। নিজের কাছে একটি সবুজ রঙের রুমাল রাখবে। বুধবার গরুকে গুড় মিশিয়ে রুটি খাওয়াবে। সেই দিন মা দুর্গার মন্দিরে গিয়ে ভক্তিভরে পূজা করবে। জীবনে কখনও পিসি, বোন, কন্যা বা গুরুমার প্রতি অন্যায় করবে না। 


সুযোগ থাকলে দুর্গাসপ্তশতী পাঠ করবে। বাড়ির পূজাঘরে রূপোর তৈরি মা দুর্গা, মা লক্ষ্মী ও গণেশের মূর্তি প্রতিষ্ঠা করবে। মায়ের জাগরণ আয়োজন করবে অথবা সেই জাগরণে সেবার মাধ্যমে অংশ নেবে। 


বুধবার ফিটকিরি দিয়ে দাঁত পরিষ্কার করা শুভ বলে মানা হয়। নারীদের ক্ষেত্রে বাম নাসিকা ছিদ্র করানোও শাস্ত্রে বুধের শুভতার জন্য উপকারী বলা হয়েছে।


শিষ্য: গুরুদেব, এর থেকেও কি আরও শক্তিশালী কোন প্রতিকার আছে?


গুরু: আছে, এবং এটিকে আমি সবচেয়ে কার্যকর প্রতিকার বলে মনে করি। গণেশ চতুর্থীর দিনে সাদা রঙের শ্রীগণেশের একটি মূর্তি বাড়িতে এনে বৈদিক নিয়মে পূজা করবে। 


এক বা দুইজন ব্রাহ্মণকে আহ্বান করবে। তারপর এক হাজারটি লাড্ডু এবং এক হাজারটি দুর্বা ঘাসের অগ্রভাগ প্রস্তুত রাখবে। একটি পিতলের বড় পাত্রের সামনে শ্রীগণেশকে প্রতিষ্ঠা করে তাঁর এক-একটি নাম উচ্চারণের সঙ্গে এক-একটি লাড্ডু ও এক-একটি দুর্বা নিবেদন করবে। এভাবে এক হাজার নামের সঙ্গে এক হাজার লাড্ডু ও এক হাজার দুর্বা অর্পণ করবে। বছরে মাত্র একবার এই সাধনা নিয়ম করে করলে ছাত্রজীবন, ব্যবসা, চাকরি বা জীবনের যে ক্ষেত্রেই থাকো না কেন, আশ্চর্য পরিবর্তন অনুভব করবে। যেমন শরীরে বিঁধে থাকা কাঁটা বেরিয়ে গেলে মুহূর্তে স্বস্তি আসে, তেমনি এই উপায়ও জীবনের বহু বাধা দূর করে দেয়। পরে সেই লাড্ডুগুলো আত্মীয়স্বজন, বন্ধু ও ভক্তদের মধ্যে প্রসাদ হিসেবে বিতরণ করবে।


শিষ্য: গুরুদেব, যদি কারও পক্ষে এত বড় আয়োজন করা সম্ভব না হয়?


গুরু: তাহলেও হতাশ হবে না। মনে রেখ, রোগ যেমন ভিন্ন ভিন্ন হয়, ওষুধও তেমন ভিন্ন হয়। সাধারণ জ্বরের ওষুধে যেমন ক্যান্সার ভালো হয় না, তেমনি বড় কর্মদোষের জন্য বড় সাধনাও প্রয়োজন হয়। অনেক সময় মানুষ ছোটখাটো প্রতিকার করে ফল না পেয়ে দেবদেবীর উপরই সন্দেহ করতে শুরু করে। কিন্তু প্রকৃত ফল তখনই আসে, যখন নিজের প্রারব্ধ অনুযায়ী নিষ্ঠা ও বিশ্বাস নিয়ে সাধনা করা হয়। যদি বড় আয়োজনের সামর্থ্য না থাকে, তবে প্রতিদিন সকাল পাঁচবার ও সন্ধ্যায় পাঁচবার রামরক্ষা স্তোত্র পাঠ করবে এবং শ্রীরাম দরবারের নিয়মিত পূজা করবে। এই সাধনা ছয় মাস নিষ্ঠার সঙ্গে পালন করলে জীবনেও শুভ পরিবর্তন আসতে শুরু করবে। 


(ক্রমশ)


#astrology  #astrologyposts  #জ্যোতিষ 

#astrologer

Sunday, 12 July 2026

তৃতীয় ভাগ - অস্ত মঙ্গল ও তার প্রতিকার - the effect of combust Mars

 "অস্ত মঙ্গল কি আপনার জীবনকে নীরবে ধ্বংস করছে? রাগ, দুর্ঘটনা, নেশা, মামলা আর ব্যর্থতার আসল কারণ কী—শিষ্যের জিজ্ঞাসায় গুরুদেবের এই ব্যাখ্যা শেষ পর্যন্ত পড়ুন।"


তৃতীয় ভাগ - অস্ত মঙ্গল ও তার প্রতিকার
- তারাশিস গঙ্গোপাধ্যায়


(পূর্ব প্রকাশিতের পর)


শিষ্য: এবার আসা যাক মঙ্গল গ্রহের কথায়। জন্মকুণ্ডলীতে  গুরুদেব, অস্ত মঙ্গল বলতে ঠিক কী বোঝায়?

গুরুদেব: প্রথমেই এটা জেনে রাখ, মঙ্গল ক্রোধ ও পরাক্রমের কারক গ্রহ। যে ব্যক্তি সাহসী, শৌর্যবান, যোদ্ধার মতো মানসিকতার অধিকারী, তার মঙ্গল সাধারণত শক্তিশালী হয়।
আর যে ব্যক্তি ভীরু, দুর্বলচিত্ত বা কাপুরুষ, তার মঙ্গল দুর্বল বলে ধরা হয়।
তবে মঙ্গল যদি অতিরিক্ত শক্তিশালী হয়ে যায়, তখন মানুষ অতিরিক্ত দুঃসাহসী হয়ে ওঠে। সে আইনকানুনের তোয়াক্কা করে না, নিজের জীবনেরও মূল্য দেয় না; মাথায় যা আসে তাই করে ফেলে।

এর একটি লক্ষণ হাতের বুড়ো আঙুলেও দেখা যায় বলে বলা হয়।বুড়ো আঙুলে তিনটি অংশ থাকে—নিচের অংশ কামশক্তির, মাঝের অংশ ইচ্ছাশক্তির, আর উপরের অংশ তর্কশক্তির প্রতীক। যদি মাঝের অংশ বেশি বড় হয় আর উপরের অংশ ছোট হয়, তবে এমন ব্যক্তির মধ্যে অপরাধপ্রবণতা ও হিংস্রতা দেখা দিতে পারে।
যার বুড়ো আঙুলের উপরের অংশ ছোট, গোলাকার এবং পেছনের দিকে সামান্যও বাঁকানো নয়, তাকে কঠোর ও হিংস্র প্রকৃতির বলা হয়।
এই লক্ষণগুলোকে মঙ্গলের সঙ্গে সম্পর্কিত বলে ধরা হয়।
তাই মানুষের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ার সময় তার স্বভাব-চরিত্র সম্পর্কে সতর্ক থাকা উচিত।
কুণ্ডলীতে অস্ত মঙ্গল থাকলে, বিশেষ করে তার অন্তর্দশায়, মানুষের মধ্যে অতিরিক্ত রাগ, স্নায়বিক ব্যথা, রক্তদূষণ, উচ্চ রক্তচাপ ও সুগারের সমস্যা দেখা দিতে পারে বলে মনে করা হয়।
অস্ত মঙ্গলের উপর রাহু বা কেতুর প্রভাব থাকলে দুর্ঘটনা, মামলা-মোকদ্দমা বা দীর্ঘস্থায়ী রোগের আশঙ্কা বাড়ে।

মঙ্গল যদি ষষ্ঠ ভাবের অশুভ প্রভাবে থাকে, তবে ব্যক্তি অসুস্থ, রক্তসংক্রান্ত জটিলতা বা আঘাতের শিকার হতে পারে। মঙ্গল তার মৃত্যুভাবের অধিপতি হয়ে অশুভ প্রভাবে থাকলে মানুষ দুর্নীতি বা প্রতারণামূলক কাজে জড়িয়ে পড়তে পারে।

দ্বাদশ ভাবের সঙ্গে অশুভ যোগ থাকলে নেশার দিকে ঝোঁক বাড়তে পারে।
দ্বিতীয় ভাবের উপর অশুভ দৃষ্টি থাকলে অল্প বয়স থেকেই ধূমপান বা নেশাজাতীয় দ্রব্যের প্রতি আসক্তি তৈরি হতে পারে।

শিষ্য : এর কি কোন প্রতিকার আছে?

গুরুদেব: অবশ্যই আছে। এবার প্রতিকারের কথা বলা যাক।
যদি মঙ্গল তোমার কুণ্ডলীতে লগ্ন, পঞ্চম, নবম বা চতুর্থ-নবম ভাবের অধিপতি হয়, তবে সোনা বসানো দেশি প্রবাল (মুঙ্গা) ডান হাতের অনামিকায় মঙ্গলবার শুক্লপক্ষে ধারণ করা যেতে পারে।

কিন্তু মঙ্গল যদি এই শুভ ভাবগুলির অধিপতি না হয়, তবে প্রবাল ধারণ করা উচিত নয়।
যতটা সম্ভব হনুমান চালিশা, বজরং বান, হনুমানাষ্টক ও সুন্দরকাণ্ড পাঠ করতে বলা হয়। ‘ওঁ হং হনুমতায় নমঃ’ মন্ত্র জপ করাও শুভ বলে মনে করা হয়।
মঙ্গলবার হনুমানজীর পূজা, মিষ্টি নিবেদন, কলা, ডালিম বা কেশরের লাড্ডু অর্পণ করার কথাও বলা হয়।

ভাই, শালা, জামাইবাবুর সঙ্গে সম্পর্ক ভালো রাখাও দরকার।
বানরকে গুড় ও ভাজা ছোলা খাওয়ানো, রক্তদান করা এবং রোগীদের ওষুধ দান করাও শুভকর্ম হিসেবে ধরা হয়।

এদের প্রতিদিন বাড়িতে রামায়ণ পাঠ করা শুভ হয়।
মঙ্গলবার মাটি কেনা বা গোবর দিয়ে লেপন না করার কথাও বলা হয়।

আরও একটি ধ্যানপদ্ধতির কথা বলা হয়েছে—চোখ বন্ধ করে নাভির উপর বা প্রয়োজনে মুলাধারের অঞ্চলে লাল বর্ণের গোলাকার এক গ্রহ কল্পনা করে ‘ওঁ অং অঙ্গারকায় নমঃ’ মন্ত্র জপ করা ভাল।এই ধ্যান সকাল-সন্ধ্যা ২৪ মিনিট করে করলে হজমের সমস্যা, কোষ্ঠকাঠিন্য, ভীরুতা ও মানসিক দুর্বলতা কমতে পারে—এমন বলা হয়।

শিষ্য: গুরুদেব, তাহলে কি মঙ্গলকে খুব ভীতিকারক নয়?

গুরু: না। কোন গ্রহকে ভয় নয়, বুঝতে শেখ। সৎকর্ম, সংযম, সাহস ও ঈশ্বরস্মরণ—এই চারটিই মানুষের প্রকৃত রক্ষাকবচ। এই কয়টির সাথে গ্রহের প্রতিকার ঠিকমত করলে কোন গ্রহকেই ভয়ের কারণ নেই।

(ক্রমশ)
#CombustMars
#MarsInAstrology
#VedicAstrology
#AstrologyTips
#Kundli
#HanumanBlessings
#SpiritualWisdom

গ্রহ অস্ত কিভাবে হয় আর অস্ত চন্দ্রের প্রতিকার ? Combustion of planets

 দ্বিতীয় ভাগ: গ্রহ অস্ত কিভাবে হয় আর অস্ত চন্দ্রেরকি প্রতিকার ?
তারাশিস গঙ্গোপাধ্যায়
(পূর্ব প্রকাশিতের পর)

শিষ্য: গুরুদেব, আপনি বলেছিলেন সূর্যের কাছে এলে গ্রহ অস্ত হয়ে যায়। কিন্তু কোন গ্রহ কতটা কাছে এলে তাকে অস্ত বলা হয়? এই নিয়মটা যদি একটু বিস্তারিত বলতেন।

গুরুদেব: শোন বৎস, সূর্য কেবল একটি গ্রহ নন, তিনি অক্ষয় শক্তির উৎস। তাঁর আলো ও তেজেই সমগ্র সৌরমণ্ডল প্রাণ পায়। সমস্ত গ্রহই তাঁর চারদিকে নিরন্তর পরিক্রমা করে।

শিষ্য: তাহলে কি সূর্যের কাছে গেলেই গ্রহের শক্তি কমে যায়?

গুরুদেব: ঠিক তাই। যখন কোনো গ্রহ সূর্যের অতিরিক্ত নিকটে চলে আসে, তখন সূর্যের অসীম তেজে তার নিজস্ব জ্যোতি যেন ম্লান হয়ে যায়। তখন সেই গ্রহ নিজের পূর্ণ শক্তিতে কাজ করতে পারে না। জ্যোতিষশাস্ত্রে এই অবস্থাকেই বলা হয় ‘অস্ত’।

শিষ্য: গুরুদেব, কোন গ্রহ কত ডিগ্রি কাছে এলে এই অবস্থা হয়?

গুরুদেব: মন দিয়ে শোন। প্রথমে চন্দ্রের কথা বলি। সূর্য থেকে প্রায় বারো ডিগ্রি বা তারও কম দূরত্বে এলে চন্দ্র অস্ত বলে গণ্য হয়।

শিষ্য: আর বৃহস্পতি?

গুরুদেব: বৃহস্পতি সূর্যের প্রায় এগারো ডিগ্রির মধ্যে এলে তার শক্তিও আচ্ছন্ন হয়ে পড়ে। তখন তাকে অস্ত বলা হয়।

শিষ্য: বুধের ক্ষেত্রেও কি একই নিয়ম?

গুরুদেব: বুধের ক্ষেত্রে কিছু মতভেদ আছে। অনেক আচার্যের মতে, সূর্য থেকে তেরো ডিগ্রির মধ্যে এলেই বুধ অস্ত হয়। আবার অন্য একদল পণ্ডিত বলেন, বুধ তখনই প্রকৃত অর্থে অস্ত হয়, যখন সে সূর্যের সঙ্গে একই ডিগ্রি, একই অংশ, একই কলা ও একই বিকলায় এসে মিলিত হয়।

শিষ্য: তাহলে কোন মতটি গ্রহণ করা উচিত?

গুরুদেব: উভয় মতই শাস্ত্রে উল্লেখ আছে। একজন জ্যোতিষীর উচিত নিজের অভিজ্ঞতা ও পর্যবেক্ষণের ভিত্তিতে বিচার করা। তবে আর-একটি বিষয় মনে রেখো—যদি বুধ বক্রী গতি নিয়ে চলতে থাকে, তাহলে সূর্যের প্রায় এগারো ডিগ্রির মধ্যেই তাকে অস্ত ধরা হয়।

শিষ্য: শুক্রের নিয়ম কী?

গুরুদেব: শুক্র সূর্যের প্রায় নয় ডিগ্রির মধ্যে এলে অস্ত হয়। কিন্তু যদি শুক্র বক্রী থাকে, তাহলে মাত্র সাত ডিগ্রির মধ্যেই তার অস্ত অবস্থা শুরু হয়ে যায়।

শিষ্য: শনি?

গুরুদেব: শনি সূর্যের প্রায় পনেরো ডিগ্রির মধ্যে এলে অস্ত বলে বিবেচিত হয়।

শিষ্য: আর মঙ্গল?

গুরুদেব: মঙ্গলের নিয়ম একটু ভিন্ন। সূর্যের প্রায় ষাট ডিগ্রির মধ্যে এলে মঙ্গলকেও অস্ত ধরা হয়।

শিষ্য: গুরুদেব, রাহু ও কেতুর ক্ষেত্রেও কি একই নিয়ম প্রযোজ্য?

গুরুদেব: না বৎস। রাহু ও কেতু ছায়াগ্রহ। এদের নিজস্ব কোনো দৃশ্যমান জ্যোতি নেই। তাই সূর্যের নিকটে এলেও এরা কখনও অস্ত হয় না। এই দুই গ্রহ সর্বদাই অস্তত্বের ঊর্ধ্বে।

শিষ্য: গুরুদেব, যদি কারও জন্মকুণ্ডলীতে চন্দ্র অস্ত হয়ে যায়, তাহলে তার জীবনে কী ঘটে?

অস্ত চন্দ্রের প্রভাব

গুরু: দেখ, যখন কারও কুণ্ডলীতে চন্দ্র অস্ত হয়, তখন তার জীবনে সব সময় অশান্তি লেগে থাকে।  আর জেনে রাখো, এমন মানুষের মন সর্বদাই নেতিবাচক চিন্তায় ভরে থাকে।  তার অন্তরে ইতিবাচক শক্তির প্রবাহ প্রায় থাকে না বললেই চলে।  তাই তার মুখমণ্ডলও সব সময় মলিন ও বিষণ্ন দেখায়।

শিষ্য: গুরুদেব, এর কারণ কী?

গুরু: একটি কথা মনে রেখ, মানুষের হৃদয়, মন আর চিন্তার যদি কোনো পর্দা বা আয়না থাকে, তবে সেটাই তার মুখ।
হৃদয়ে যেমন অনুভূতি জাগে, মনে যেমন চিন্তার জন্ম হয়—
ঠিক তেমনই সেই আলো কিংবা অন্ধকার তোমার মুখে ফুটে ওঠে। তাই শাস্ত্রে বলা হয়েছে— "মন প্রসন্ন হলে শরীর তেজস্বী হয়ে ওঠে, যেন পর্বতের রাজা দীপ্তিমান হয়ে দাঁড়িয়ে আছেন।"

শিষ্য: গুরুদেব, এই শ্লোকটি কার সম্পর্কে বলা হয়েছে?

গুরু: এই বর্ণনা ভগবান হনুমানজী কে উদ্দেশ্য করেই বলা হয়েছে।  যখন মানুষের মন আনন্দে ভরে থাকে—যখন হৃদয় সত্যিই প্রসন্ন থাকে— তখন তার মুখে স্বাভাবিকভাবেই এক অপূর্ব লালিমা ও জ্যোতি ফুটে ওঠে।
আর যখন মন গ্লানি, দুঃখ ও বিষাদে পূর্ণ হয়ে যায়— তখন সেই মুখে আর কোনো উজ্জ্বলতা থাকে না। বরং তাকে শুকিয়ে যাওয়া ফুলের মতো বিবর্ণ দেখায়।

শিষ্য: তাই বুঝি মানুষ কাউকে দেখে বলে, "আজ তোমাকে খুব মনমরা লাগছে?"

গুরু: হ্যাঁ। কারণ মুখমণ্ডলই হৃদয়ের দর্পণ। তুমি যতই অনুভূতি লুকিয়ে রাখার চেষ্টা করো— হৃদয়ের ভাব কখনও সম্পূর্ণ গোপন থাকে না।

শিষ্য: গুরুদেব, চন্দ্রের সঙ্গে মনের সম্পর্ক কেন এত গভীর?

গুরু: কারণ চন্দ্রই মনের কারক গ্রহ। বেদেও বলা হয়েছে— "চন্দ্রমা মনসো জাতঃ"—অর্থাৎ মনের উৎস চন্দ্র। আর মনই মানুষের সমস্ত পরিকল্পনার কেন্দ্র। তাই যখন চন্দ্র দুর্বল বা অস্ত হয়—তখন মানুষ ভালো পরিকল্পনা করতে পারে না।
যে কাজই শুরু করুক না কেন— কয়েক কদম এগোতেই সে হোঁচট খায়।

শিষ্য: গুরুদেব, চন্দ্র কি মায়েরও কারক?

গুরু: অবশ্যই। চন্দ্র মাতার কারক গ্রহ। তাই কুণ্ডলীতে চন্দ্র দুর্বল হলে মাতৃসুখ ব্যাহত হয়।
মা অসুস্থ হতে পারেন। মায়ের পূর্ণ স্নেহ ও আশীর্বাদও অনেক সময় পাওয়া যায় না। অনেক ক্ষেত্রে মাকে আজীবন কষ্ট ভোগ করতে হয়।

আবার মনে রেখো, চন্দ্র মনেরই কারক। তাই এমন মানুষ সঠিক পরিকল্পনাও করতে পারে না। চন্দ্র মানুষের উচ্চ চিন্তা ও মহান আদর্শেরও অধিপতি। তাই সেই উচ্চ ভাবনাও দুর্বল হয়ে পড়ে।
ফলে জীবনে অশান্তি স্থায়ী হয়ে যায়। মায়ের সঙ্গে সম্পর্কও ভালো থাকে না। মায়ের স্বাস্থ্যের ওপরও খারাপ প্রভাব পড়ে।
এমন মানুষ পৈতৃক সম্পত্তির পূর্ণ সুখও পায় না। সমাজ থেকেও প্রয়োজনীয় সহযোগিতা লাভ করতে পারে না।

শিষ্য: গুরুদেব, যদি অস্ত চন্দ্র মৃত্যুভাবে থাকে?

গুরু: তাহলে এমন ব্যক্তি দীর্ঘদিন ডিপ্রেশনে ভুগতে পারে। যদি চন্দ্র শনির সঙ্গে যুক্ত হয়—তবে বিষযোগ সৃষ্টি হয়।
যদি রাহুর সঙ্গে যুক্ত হয়— তাহলেও অশুভ ফল দেয়। এমন মানুষ সিদ্ধান্তই নিতে পারে না। আর যদি কেতুর সঙ্গে যুক্ত হয়—তখন গ্রহণযোগ সৃষ্টি হয়।

শিষ্য: গুরুদেব, অস্ত চন্দ্র কি নানা রোগও সৃষ্টি করে?

গুরু: হ্যাঁ বৎস, নানা ধরনের রোগ সৃষ্টি হতে পারে। সবাই মনে করে দীপাবলিই ভারতের সবচেয়ে শুভ দিন। দীপাবলি সম্পর্কে খারাপ কিছু বলার সুযোগ নেই। তাই মানুষ অধীর আগ্রহে দীপাবলির অপেক্ষা করে। কিন্তু আমি আমার অভিজ্ঞতা থেকে একটি কথা বলছি। যদি কোনো শিশুর জন্ম দীপাবলির দিন, অর্থাৎ অমাবস্যায় হয়— তবুও তার জীবন সংগ্রামে পূর্ণ হতে পারে।
কারণ সেই দিন চন্দ্র অস্ত অবস্থায় থাকে। এতে দীপাবলির মাহাত্ম্য কোনোভাবেই কমে না। সেই দিন মহালক্ষ্মীর আগমন হয়—এ কথা শাস্ত্রসম্মত। সেই দিনের পূজাও অত্যন্ত শুভফলদায়ক।
কিন্তু শুধু দীপাবলির দিনে জন্ম হয়েছে বলেই কেউ সারাজীবন লক্ষ্মীর বিশেষ কৃপাপ্রাপ্ত হবে— এমন ধারণা সঠিক নয়।

চন্দ্র দুর্বল হলে রক্তের রোগ হতে পারে। রক্তাল্পতা দেখা দিতে পারে। শরীরে রক্তের ঘাটতি হতে পারে। ফুসফুসের সমস্যাও হতে পারে। মানসিক চাপ বাড়তে পারে। হাঁপানিও দেখা দিতে পারে। আর সবচেয়ে বড় বিষয়—উদ্বেগ ও ডিপ্রেশনের মতো মানসিক রোগ সাধারণত দুর্বল চন্দ্রের সঙ্গেই সম্পর্কিত।

যতক্ষণ চন্দ্র দুর্বল না হয়— ততক্ষণ এমন গভীর উদ্বেগ সহজে জন্ম নেয় না। আর একটি কথা মনে রেখো।
চন্দ্রই সমস্ত গ্রহের বীজ। যেমন বীজের মধ্যে সমগ্র বৃক্ষ লুকিয়ে থাকে— তেমনই চন্দ্রের মধ্যে অন্যান্য গ্রহের শক্তির বীজ নিহিত থাকে।

যদি চন্দ্র কর্কট রাশিতে নিজের ঘরে থাকে—এবং নবাংশেও নিজের নবাংশে অবস্থান করে—
তবে সে দরিদ্র পরিবারে জন্মালেও—আজীবন কুবেরের মত ঐশ্বর্য লাভ করতে পারে।
তার জীবনে ধন-সম্পদের অভাব থাকে না। সে কম পরিশ্রম করুক কিংবা বেশি—
ভাগ্য সর্বদাই তার প্রতি সহায়ক থাকে। এটি বহু বছরের বাস্তব অভিজ্ঞতার কথা।

শিষ্য: গুরুদেব, যদি মনে হয় আমার চন্দ্র দুর্বল, মন সর্বদা অশান্ত থাকে, তাহলে তার প্রতিকার কী?

গুরু: প্রতিকার অবশ্যই আছে। তবে নিয়ম, নিষ্ঠা ও বিশ্বাসের সঙ্গে পালন করতে হবে।

যদি তোমার জন্মলগ্ন, পঞ্চম ভাব অথবা নবম ভাবের অধিপতি চন্দ্র হন, তাহলে শুদ্ধ শাস্ত্রবিধি মেনে সোমবার, শুক্লপক্ষে, রাত্রি আটটার সময় রূপোর আংটিতে বসানো একটি উৎকৃষ্ট মুক্তো ডান হাতের কনিষ্ঠ আঙুলে ধারণ করতে পারো।

কিন্তু যদি চন্দ্র এই শুভ ভাবগুলোর অধিপতি না হন, তবে প্রতিদিন শিবমন্দিরে গিয়ে শিবলিঙ্গে জল, দুধ, বেলপাতা নিবেদন করবে। ধূপ, দীপ, নৈবেদ্য অর্পণ করবে এবং কর্পূরের আরতি করবে। সম্ভব হলে প্রতিদিন মহামৃত্যুঞ্জয় মন্ত্র জপ করবে।

আর যদি সত্যিই চন্দ্রকে অত্যন্ত শক্তিশালী করতে চাও, তবে এমন একটি সাধনার কথা বলছি যা হয়তো কোনো শাস্ত্রে পড়োনি, কারও মুখেও শোনোনি। এটি আমার পঞ্চাশ বছরের সাধনা ও অভিজ্ঞতার ফল।

প্রতিদিন সকাল ও সন্ধ্যায় চব্বিশ মিনিট শান্ত হয়ে বসো। অনুভব করো—তোমার হৃদয়ের ওপর দিয়ে এক উজ্জ্বল, শীতল চন্দ্র ধীরে ধীরে বিচরণ করছে। সেই অনুভূতির সঙ্গে একাগ্রচিত্তে জপ করো—

"ওঁ সোম সোমায় নমঃ।"

বারবার এই মন্ত্র জপ করতে করতে চন্দ্রের শীতলতা হৃদয়ের গভীরে অনুভব করো। এই সাধনা যদি ছয় মাস নিয়মিত করতে পারো, তবে দেখবে জীবনের পরিবর্তন নিজেই অনুভব করবে।

এই শব্দশক্তি (সাউন্ড এনার্জি) এমনই যে, জন্মকুণ্ডলীতে চন্দ্র যেখানেই থাকুক না কেন, তার শুভ কম্পন তোমার হৃদয়ে জাগ্রত হবে। হৃদয়ে সেই শক্তি প্রতিষ্ঠিত হলে, যেন চন্দ্র তার উচ্চরাশি বৃষে প্রতিষ্ঠা লাভ করে। তখন তোমার পরিকল্পনা করার ক্ষমতা অসাধারণ হয়ে উঠবে। তুমি একজন দূরদর্শী পরিকল্পনাকারী হবে, আর তোমার রচিত পরিকল্পনা সহজে কেউ ভেঙে দিতে পারবে না।

তাই বলি, যদি মুক্তো ধারণ করেও আশানুরূপ ফল না পাও, যদি অন্য প্রতিকারেও নিরাশ হও, তবে "ওঁ সোম সোমায় নমঃ" অথবা "ওঁ নমঃ শিবায়" জপ করতে করতে হৃদয়ে বিচরণরত চন্দ্রের ধ্যান করো। কয়েকদিন নিষ্ঠার সঙ্গে এই সাধনা করলেই জীবনের পরিবর্তন অনুভব করবে।

অথবা শিবমন্দিরে শিবলিঙ্গের সান্নিধ্যে উত্তরমুখে বসে "ওঁ নমঃ শিবায়" মন্ত্র জপ করলেও আশ্চর্য ফল লাভ হতে পারে।

প্রতি সোমবার এক প্যাকেট দুধ, আধ কেজি চিনি এবং সামান্য চাল কোনো যোগ্য দরিদ্র বা অভাবী মানুষকে দান করো।

গলায় রূপোর চেন কিংবা হাতে রূপোর বালা ধারণ করতে পারো, তবে সেটি তখনই, যখন চন্দ্র প্রকৃতপক্ষে শুভ এবং লগ্ন, পঞ্চম বা নবম ভাবের অধিপতি। যদি চন্দ্র ষষ্ঠ, অষ্টম বা দ্বাদশ ভাবের অধিপতি হন, তাহলে এসব ধারণ করা উচিত নয়।

চন্দ্রের অশুভ প্রভাব হ্রাস করতে রূপোর গ্লাসে জল পান করতে পারো। দুধ ও দুধজাত খাদ্য বেশি করে গ্রহণ করাও উপকারী। তবে যদি জন্মকুণ্ডলীর দশম ভাবে চন্দ্র অবস্থান করেন, তাহলে রাত্রিবেলা দুধ পান করা উচিত নয়।

প্রতিদিন মা অথবা কোনো প্রবীণ নারীর চরণ স্পর্শ করে আশীর্বাদ গ্রহণ করো। পূর্ণিমার রাতে দেশি ঘিয়ের প্রদীপ জ্বালিয়ে চন্দ্রদেবকে অর্ঘ্য নিবেদন করো।

আর একটি কথা বলি—এটি খুব বড় প্রতিকার না হলেও ছোট শিশুদের ক্ষেত্রে উপকার দিতে পারে। যদি কোনো শিশুর চন্দ্র দুর্বল হয় এবং সে বারবার নিউমোনিয়া, সর্দি, কাশি বা অ্যালার্জিজনিত সমস্যায় ভোগে, তাহলে তাকে দ্বিমুখী রুদ্রাক্ষ ধারণ করানো যেতে পারে। অথবা খিরনি গাছের মূল সাদা রেশমি সুতোয় বেঁধে তার গলায় পরিয়ে দিলে অনেক সময় উপকার পাওয়া যায়।

(ক্রমশ)

#Astrology
#VedicAstrology
#GuruShishya
#Chandra
#SpiritualWisdom
#JyotishShastra
#SanatanDharma

(ক্রমশ)

Saturday, 11 July 2026

সাধুসঙ্গ তারাশিস গঙ্গোপাধ্যায় sadhusanga by Tarashis Gangopadhyay

 সাধুসঙ্গ
তারাশিস গঙ্গোপাধ্যায়

(পূর্ব প্রকাশিতের পর)


সন্ধ্যা তখন ধীরে ধীরে মন্দাকিনীর স্বচ্ছ জলে নেমে এসেছে। পাহাড়ের গা বেয়ে নেমে আসা শীতল বাতাস নদীর বুক ছুঁয়ে  ন্ন্যাসীর সামনে এসে থমকে দাঁড়িয়েছে। নদীর কলকল ধ্বনির সঙ্গে মিলেমিশে দূরে কোথাও ভেসে আসছে মন্দিরের ঘণ্টাধ্বনি। বিশাল এক শিলাখণ্ডের উপর পদ্মাসনে বসে আছেন এক বৃদ্ধ সাধু। তাঁর চোখে গভীর প্রশান্তি, মুখে এক অদ্ভুত করুণা।

হঠাৎ এক মধ্যবয়স্কা মহিলা কাঁদতে কাঁদতে এসে তাঁর চরণে প্রণাম করলেন।
“বাবা,” কাঁপা গলায় তিনি বললেন, “আমার ছেলেকে নিয়ে বড় কষ্টে আছি। সে ভুল পথে চলে গেছে। কোনো কথা শোনে না। সংসারে শান্তি নেই। আপনি পথ দেখান।”

সাধু কিছুক্ষণ নীরব রইলেন। যেন নদীর প্রবাহের ভেতরেই তিনি উত্তর খুঁজছিলেন। তারপর ধীরে ধীরে বললেন,
"প্রথমেই বলব মায়ের কাছে প্রার্থনা করুন যেন আপনার ছেলে সৎবুদ্ধি লাভ করে। মায়ের সৎ প্রার্থনা সবসময়ই সন্তানের মঙ্গল করে। সেইসাথে একটা উপায় বলছি। আপনি যদি এই উপায় শুরু করেন, তাহলে আমার পূর্ণ বিশ্বাস—প্রায় ১২৫ দিনের মধ্যে এর প্রভাব দেখা দিতে শুরু করবে এবং ছয় মাসের মধ্যে আপনার ছেলে সম্পূর্ণ সঠিক পথে ফিরে আসবে।

দেখুন, আমাদের সন্তান যদি বিপথে যায়, অকর্মণ্য হয়ে পড়ে বা কর্তব্যের পথ থেকে সরে যায়, তাহলে তার জন্য শুধু সন্তানের সংস্কারই দায়ী নয়। এর সঙ্গে তার বাবা মায়ের নিজের কর্মসংস্কারও জড়িত থাকে।

পূর্বজন্মে বাবা মা যেমন পুণ্য ও পাপ করেছে, সেই অনুযায়ী সুখ বা দুঃখ দেওয়ার জন্যই সন্তান জন্মগ্রহণ করে। কোথাও না কোথাও নিশ্চয়ই আপনার পুণ্য দুর্বল হয়েছে। তাই এরকম অবস্থা হয়েছে। আরেকটা জিনিস জানবেন -- কিছু সন্তান আসে সুখ দেওয়ার জন্য, আবার কিছু আসে দুঃখ দেওয়ার জন্য।

মহিলা জিজ্ঞাসা করলেন, "বাবা, কেন এমন হয়?"

সন্ন্যাসী বললেন, "যদি পূর্বজন্মের তপস্যা ভাল থাকে, তবে সন্তান সুখের কারণ হয়।
আর যদি তপস্যা কোন কারণে কলুষিত হয়, তবে সে দুঃখের কারণ হয়ে আসে।
আমি একটা ঘটনার কথা বলছি।

একবার দুজন যুবক বাড়ি থেকে পালিয়ে মুম্বই গিয়েছিল। দুজনে মিলে সেখানে ছোটখাটো কাজ শুরু করল। দুজনেই অত্যন্ত পরিশ্রমী ও বুদ্ধিমান ছিল। কয়েক বছরের মধ্যেই তারা একটি রেস্তোরাঁ খুলল। তারপর একটি কারখানাও গড়ে তুলল।

কিন্তু তখনই একজনের মনে লোভ জন্মাল। সে নিজের সঙ্গীকেই হত্যা করল। তারপর মৃতদেহ কোন এক গোপন জায়গায় সমাধিস্থ করে দিল। কেউ আর তার খোঁজ পেল না।
এরপর সে নিজের ব্যবসার আর বিস্তার ঘটাল। অনেক জমি কিনল, বাড়ি বানাল, মুম্বইতেও তার বিরাট নামডাক হল। 

তার উন্নতি দেখে সমাজের এক সম্মানিত ব্যক্তি নিজের মেয়ের সঙ্গে তার বিয়ে দিলেন। কিছুদিন পরে তাদের একটি অত্যন্ত সুন্দর পুত্রসন্তান জন্মাল। কিন্তু দুঃখের ব্যাপার, ছেলেটির বয়স যখন মাত্র পাঁচ বছর, তখন তার ক্যান্সার ধরা পড়ল।
 
সে তার সন্তানকে প্রাণ দিয়ে ভালবাসত। তাই সে ছেলের ভাল চিকিৎসা শুরু করল। দুই বছর ধরে ছেলের চিকিৎসা করাতে করাতে তার জমি বিক্রি হয়ে গেল। বাড়ি বিক্রি হয়ে গেল। মুম্বইয়ের রেস্তোরাঁ আর কারখানাও বিক্রি হয়ে গেল। এমনকি সবার র এক কোটি টাকারও বেশি ঋণ হয়ে গেল। কিন্তু তাও ছেলে ধীরে ধীরে মৃত্যুর মুখে প্রায় ঢলে পড়ল।

ছেলের মৃত্যুশয্যায় বসে তখন বাবা ছেলেকে কোলে নিয়ে কাঁদতে কাঁদতে বলে উঠল,
“বাবা, আজ তোর চিকিৎসার জন্যও আমার কাছে টাকা নেই। সব টাকা আমার শেষ হয়ে গেছে। তোকে বাঁচানোর জন্যে আমার আর কিছুই করার নেই রে বাবা।”
তখন সাত বছরের সেই ছেলে ক্লান্ত চোখে শুধু একটি কথাই বলল, “অথচ বন্ধু, এই টাকার জন্যই তো তুমি একদিন আমার প্রাণ নিয়েছিলে। আজ আমিও রইলাম না। টাকাও রইল না।” এইটুকু বলেই সে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করল। অর্থাৎ, যাকে সে হত্যা করেছিল, সেই বন্ধুই এই জন্মে তার ছেলে হয়ে ফিরে এসেছিল প্রতিশোধ নিতে।

তাই আমি বলি—যাদের সন্তান নিয়ে সমস্যা আছে, তারা যেন ভগবান শ্রীরামের শরণ নেন এবং প্রতিদিন সংকল্প করেন যে ১০৮ ‘সীতারাম’ নাম জপ না ক
রে আহার করবেন না। একমাত্র তাহলে তাদের জীবনে ভাল কোন পরিবর্তন আসতে পারে।
স্বামী-স্ত্রী দুজনেই যদি নিয়ম করে জপ করেন, তবে পূর্বজন্মের বহু কর্মফল ক্ষয় হতে শুরু করবে। যখন শুভ প্রারব্ধের উদয় হবে, তখন সন্তানের মধ্যেও ইতিবাচক পরিবর্তন দেখা দেবে। তাই আপনিও প্রতিদিন ভোরে উঠে নিয়ম করে ‘সীতারাম’ নাম জপ করুন। কর গুণে বা মালা দিয়েও জপ করতে পারেন।

তবে অবশ্যই এই অনুশীলন শুরু করুন।  প্রায় একশো দিনের মধ্যে পরিবর্তন অনুভব করবেন।
আর ষোলো মাস পরে আপনার জীবনই বদলে যেতে পারে।"

ভদ্রমহিলা সন্ন্যাসীর কথা শুনে অনেকটাই আশ্বস্ত হলেন। সন্ন্যাসীকে প্রণাম করে ধরলেন ফেরার পথ।
ক্রমশ
#Sitaram
#SpiritualStory
#Mandakini
#SanatanDharma
#GuruVani
#BhaktiKatha

Friday, 10 July 2026

অস্ত গ্রহের রহস্য — গুরু ও শিষ্যের সংলাপ (প্রথম পর্ব) mystery of the combust planets

"আপনার কুণ্ডলীতে কি এমন কোনও অস্ত গ্রহ আছে, যা নীরবে আপনার চাকরি, অর্থ, বিবাহ আর ভাগ্যকে আটকে রেখেছে? লেখক আজ জানাচ্ছেন সেই গোপন রহস্য ও তার কার্যকর প্রতিকার!"
________________________


অস্ত গ্রহের রহস্য — গুরু ও শিষ্যের সংলাপ
(প্রথম পর্ব)
  - তারাশিস গঙ্গোপাধ্যায়


ভোরের নীরবতা তখনও পুরোপুরি ভাঙেনি। আশ্রমের প্রাচীন অশ্বত্থ গাছের নিচে আসন গ্রহণ করে বসে আছেন গুরুদেব। তাঁর মুখে প্রশান্তির আভা। পায়ের কাছে বসে আছে একজন শিষ্য। শিষ্যের মনে উদয় হয়েছে কিছু প্রশ্ন।

শিষ্য: গুরুদেব, বহু মানুষের জীবনেই দেখি অশান্তি লেগেই থাকে। অর্থের জন্য সারাজীবন সংগ্রাম করতে হয়, কর্মজীবনে স্থিতি আসে না, ব্যবসা হঠাৎ বন্ধ হয়ে যায়, বিয়ে হতে চায় না, একের পর এক রোগ-ব্যাধি পিছু ছাড়ে না। অনেকে বলেন, এর পেছনে কুণ্ডলীর অস্ত গ্রহ দায়ী। সত্যিই কি একটি অস্ত গ্রহ মানুষের জীবনকে এত গভীরভাবে প্রভাবিত করতে পারে?

গুরুদেব: অবশ্যই পারে। বড় বড় শুভ গ্রহও যদি অস্ত হয়ে যায়, তাহলে তারা নিজের স্বাভাবিক শক্তি হারিয়ে ফেলে। ফলে জীবনের বহু ক্ষেত্রে বাধা সৃষ্টি হয়। তবে ভয় পাওয়ার কিছু নেই। কারণ প্রতিকারও আছে, আর সেই প্রতিকার সঠিকভাবে করলে অনেকটাই উপকার পাওয়া সম্ভব।

শিষ্য: গুরুদেব, প্রথমেই জানতে চাই—অস্ত গ্রহ বলতে ঠিক কী বোঝায়? এর অর্থ কী? কেন এর কারণে মানুষের জীবনে এত সমস্যা ও মানসিক চাপ তৈরি হয়?

গুরুদেব: দেখ, সূর্য, রাহু ও কেতুকে বাদ দিলে প্রায় সব গ্রহই অস্ত হয়। সূর্যের খুব কাছে এলে, অর্থাৎ নির্দিষ্ট ডিগ্রির মধ্যে প্রবেশ করলে গ্রহ নিজের শক্তি হারায়।

বুধকে নিয়ে অবশ্য বিভিন্ন মত আছে। অনেক বিদ্বান বলেন, বুধ কেবল তখনই অস্ত হয় যখন সে সূর্যের একেবারে সমান ডিগ্রিতে চলে আসে। কিন্তু বর্তমানে যে জ্যোতিষ সফটওয়্যারগুলি ব্যবহার করা হয়, সেগুলো সূর্য থেকে নির্দিষ্ট দূরত্বের মধ্যেই বুধকে অস্ত দেখায়।
তবে বাস্তব ফল বিচার করলে দেখা যায়, বুধ সবসময় সেইভাবে ফল দেয় না। প্রকৃত অর্থে সূর্যের সঙ্গে প্রায় এক জায়গায় চলে এলে তবেই বুধ অস্তের পূর্ণ ফল দেয়।

যেমন অমাবস্যার দিনে চন্দ্র অস্ত থাকে। অমাবস্যা ও শুক্লপক্ষের প্রতিপদে চন্দ্র সূর্যের খুব কাছে অবস্থান করে। সূর্য ও চন্দ্রের ডিগ্রি সমান হয়ে গেলে অমাবস্যা শেষ হয়।
জ্যোতিষশাস্ত্রে এই অবস্থাকে অধম যোগ বলা হয়।

এই যোগে জন্ম নেওয়া মানুষ যতই পরিশ্রমী, মেধাবী, সাহসী বা উচ্চাকাঙ্ক্ষী হোক না কেন, সে শতভাগ পরিশ্রম করলেও ফল সাধারণত পঁচাত্তর শতাংশের বেশি পায় না।

এইভাবেই চন্দ্র অস্ত হয়, মঙ্গল অস্ত হয়, বুধ, বৃহস্পতি, শুক্র এবং শনি—সব গ্রহই অস্ত হতে পারে। শুধু সূর্য, রাহু ও কেতু এর ব্যতিক্রম।

'লগ্ন চন্দ্রিকা' নামে একটি প্রামাণ্য জ্যোতিষ গ্রন্থে বলা হয়েছে—
“যার কুণ্ডলীতে তিনটি গ্রহ স্বরাশিতে থাকে, সে মন্ত্রীর পদ পায়। তিনটি গ্রহ উচ্চে থাকলে সে রাজসম মর্যাদা লাভ করে। তিনটি গ্রহ নীচস্থ হলে সে অন্যের সেবা করে জীবিকা নির্বাহ করে। আর তিনটি গ্রহ যদি অস্ত থাকে, তবে সেই ব্যক্তি জড়বুদ্ধিসম্পন্ন হয়ে পড়ে।”

অর্থাৎ তার বুদ্ধিবৃত্তিক ক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে দুর্বল হয়ে যায়। এর প্রভাব জীবনের সর্বত্র পড়ে।

তবে আমি দৃঢ়ভাবে বলতে পারি—যদি সঠিক উপায়ে প্রতিকার করা যায়, তাহলে শতভাগ নয়, কিন্তু নিরানব্বই শতাংশ ক্ষেত্রেই উপকার পাওয়া সম্ভব।

এই প্রতিকার নদীতে কিছু ভাসিয়ে দেওয়া, দান করা বা অন্য কোনও বাহ্যিক আচার নয়। আমার মতে আসল প্রতিকার হল মন্ত্রজপের মাধ্যমে শব্দশক্তিকে জাগ্রত করা।

যদি নিজের শরীরের মধ্যে সংশ্লিষ্ট গ্রহের শক্তিকে জাগিয়ে তোলা যায়, তাহলে অস্ত গ্রহের দুর্বলতাও অনেকটাই দূর হতে পারে।

শিষ্য: গুরুদেব, প্রত্যেক অস্ত গ্রহ কি শুধু অশুভ ফলই দেয়?

গুরুদেব: অস্ত মানে শক্তিহীন। যেমন একজন মানুষ মারা গেলে তার কাছ থেকে আর কোনও কাজের আশা করা যায় না, তেমনি অস্ত গ্রহও নিজের স্বাভাবিক শক্তি হারিয়ে ফেলে।

ধর কারও শুক্র অস্ত হয়েছে। তুমি জানো, শুক্র বিলাসিতা, দাম্পত্য, সৌন্দর্য, যৌনজীবন ও বৈবাহিক সুখের কারক।
তাই শুক্র অস্ত হলে এই ক্ষেত্রগুলিতে সমস্যা দেখা দিতে পারে। অনেকের ক্ষেত্রে বিয়েই দেরিতে হয়।
যদি পুরুষের কুণ্ডলীতে শুক্র অত্যন্ত দুর্বলভাবে অস্ত হয়, তবে শুক্রাণুর সংখ্যা মারাত্মকভাবে কমে যেতে পারে। নারীর ক্ষেত্রে ডিম্বস্ফোটন ও প্রজননক্ষমতা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

একইভাবে বৃহস্পতি অস্ত হলে শিক্ষা, ধর্মবোধ ও জ্ঞানলাভে বাধা আসে।

মঙ্গল অস্ত হলে মানুষ ভীরু, ভীতু ও হীনমন্য হয়ে পড়ে।

চন্দ্র অস্ত হলে পরিকল্পনা করার ক্ষমতা দুর্বল হয়ে যায়। এমন মানুষ একটি সাধারণ জামা কিনতেও বারবার অন্যের মতামত জানতে চায়। কারণ তার নিজের সিদ্ধান্তের ওপর আস্থা থাকে না।

শনি অস্ত হলে চাকরি, কর্মজীবন ও সেবার সুখে বাধা আসে। তাই গ্রহের অস্ত হওয়া নিঃসন্দেহে শুভ নয়।

কিন্তু ভয়েরও কিছু নেই।

সঠিক সাধনা ও উপায়ের মাধ্যমে এই গ্রহগুলিকে আবার সক্রিয় করা সম্ভব।

আমি তো বলি, যদি মানুষ নিষ্ঠার সঙ্গে এই উপায়গুলো পালন করে, তাহলে দুই থেকে আড়াই বছরের মধ্যেই তার কুণ্ডলীর অবস্থায় উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন দেখা যেতে পারে।

আগামী পর্বে আলোচনা করা হবে সেই উপায়। পরের লেখাটি যাঁরা পেতে আগ্রহী এখানে কমেন্ট সেকশনে জানাবেন কেমন লাগল।

(ক্রমশ)

#অস্ত_গ্রহ
#গুরুদেবের_উপদেশ
#জ্যোতিষশাস্ত্র
#কুণ্ডলী_বিশ্লেষণ
#SpiritualWisdom
#AstrologyTips
#VedicAstrology
#BanglaSpiritual

Thursday, 9 July 2026

হনুমান মন্ত্রের মাহাত্ম্য — তৃতীয় ও শেষ ভাগ the importance of the mantras of Hanumanji

 

হনুমান মন্ত্রের মাহাত্ম্য — তৃতীয় ও শেষ ভাগ
- তারাশিস গঙ্গোপাধ্যায়
(পূর্ব প্রকাশিতের পর)

আজ আমি এমন কয়েকটি হনুমান মন্ত্রের কথা বলব, যেগুলি শুধু শাস্ত্রেই উল্লেখিত নয়, বহু যুগ ধরে ভক্তদের সাধনায় বিশেষ স্থান দখল করে আছে। তবে তার আগে একটি কথা স্পষ্ট করে বলতে চাই—শুধু মন্ত্র মুখস্থ করলেই হবে না। মন্ত্রের সঙ্গে যদি চরিত্র, ভক্তি, শৃঙ্খলা ও বিশ্বাস যুক্ত না হয়, তাহলে তার প্রকৃত ফল অনুভব করা কঠিন।

প্রথমেই আসি হনুমান গায়ত্রী মন্ত্রে।
॥ ॐ आञ्जनेयाय विद्महे वायुपुत्राय धीमहि तन्नो हनुमान् प्रचोदयात् ॥
বাংলা উচ্চারণঃ
"ওঁ আঞ্জনেয়ায় বিদ্মহে। বায়ুপুত্রায় ধীমহি। তন্নো হনুমান প্রচোদয়াত্॥"
এই মন্ত্র বহু ভক্ত সন্তানের মঙ্গল, মনোবল বৃদ্ধি এবং জীবনের বাধা অতিক্রমের প্রার্থনায় জপ করে থাকেন। বিশেষ করে যাঁরা শনির সাড়ে-সাতি, ঢাইয়া বা জীবনের নানা প্রতিকূল সময়ের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছেন, তাঁদের কাছেও এই মন্ত্র অত্যন্ত জনপ্রিয়।
আমি বরাবরই মনে করি, সনাতন জীবনের কিছু নিয়ম যদি আমরা প্রতিদিন পালন করি, তাহলে তার সুফল আমাদের মন, শরীর ও আত্মা—তিন ক্ষেত্রেই অনুভব করা যায়। ভোরে জেগে ওঠা, স্নান করা, সূর্যকে অর্ঘ্য দেওয়া, প্রাণায়াম করা, গায়ত্রী মন্ত্র জপ করা এবং যাঁদের পক্ষে সম্ভব অগ্নিহোত্র করা—এসব শুধু ধর্মীয় আচরণ নয়, বরং একটি শৃঙ্খলাবদ্ধ জীবনের ভিত্তি।

এবার আসি আঞ্জনেয় মন্ত্রে—
॥ श्री वज्रदेहाय रामभक्ताय वायुपुत्राय नमोऽस्तुते ॥
এই মন্ত্র নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে আমার মনে পড়ে যায় হনুমানজীর সেই অনন্য চরিত্রের কথা।
তিনি যখন সীতামাতার সন্ধানে সমুদ্র পার হওয়ার পথে চলেছেন, তখন মৈনাক পর্বত উঠে এসে তাঁকে বিশ্রাম নিতে বলেছিল। কিন্তু হনুমানজী বলেছিলেন, "राम काज कीन्हे बिना मोहि कहाँ विश्राम।"
অর্থাৎ—"প্রভুর কাজ সম্পূর্ণ না করে আমার বিশ্রাম কোথায়?"
এই একটি বাক্যের মধ্যেই লুকিয়ে আছে জীবনের এক অমূল্য শিক্ষা।
আমরা প্রায়ই কাজ শুরু করি, কিন্তু মাঝপথে ক্লান্ত হয়ে থেমে যাই। হনুমানজী শেখান—যে কাজ শুরু করবে, তা সম্পূর্ণ না হওয়া পর্যন্ত অলসতা বা বিশ্রাম যেন তোমাকে স্পর্শ না করে।

এরপর যে শ্লোকটির কথা বলব, তা প্রায় প্রতিটি ভক্তেরই পরিচিত—
॥ मनोजवं मारुततुल्यवेगं जितेन्द्रियं बुद्धिमतां वरिष्ठम्। वातात्मजं वानरयूथमुख्यं श्रीरामदूतं शरणं प्रपद्ये ॥
বাংলা উচ্চারণঃ
"মনোজবং মারুততুল্যবেগং। জিতেন্দ্রিয়ং বুদ্ধিমতাং বরিষ্ঠম্। বাতাত্মজং বানরযূথমুখ্যং। শ্রীরামদূতং শরণং প্রপদ্যে॥"
এই শ্লোক নিয়মিত পাঠ করলে মন ধীরে ধীরে স্থির হয়, অযথা ভয় কমে, সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা বাড়ে এবং অহংকারও অনেকটাই প্রশমিত হয়। মানুষের হৃদয় ও বুদ্ধির মধ্যে যে দ্বন্দ্ব সৃষ্টি হয়, এই প্রার্থনা সেই ভারসাম্য ফিরিয়ে আনতে সাহায্য করে।

আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্র রয়েছে, যা সীতামাতার স্মরণের সঙ্গে যুক্ত—
॥ त्वमस्मिन् कार्यनिर्वाहे प्रमाणं हरिसत्तम। हनुमन् यत्नमास्थाय दुःखक्षयकरो भव ॥
যাঁদের বহুদিন ধরে কোনও কাজ আটকে রয়েছে, যাঁরা বিরোধিতা বা প্রতিবন্ধকতার মধ্যে দিয়ে এগোচ্ছেন, তাঁরা এই মন্ত্র জপ করে ঈশ্বরের আশীর্বাদ প্রার্থনা করতে পারেন।

এরপর আসে মঙ্গলের জন্য এক সুন্দর প্রার্থনা—
॥ अञ्जनीगर्भसम्भूतं कपीन्द्रसचिवोत्तमम्। रामप्रियं नमस्तुभ्यं हनुमन् रक्ष सर्वदा ॥
অনেক ভক্ত বিশ্বাস করেন, এই মন্ত্র জপ করলে মঙ্গলের অশুভ প্রভাব প্রশমিত হয়, উদ্বেগ, মানসিক চাপ ও অকারণ ভয়ও অনেকটাই কমে আসে।

এরপর যে মন্ত্রটির কথা বলছি, সেটি হল—
॥ ॐ नमो भगवते आञ्जनेयाय महाबलाय स्वाहा ॥
অনেক সাধক এই মন্ত্রে ১০৮ আহুতি দিয়ে হোম করেন। তাঁদের বিশ্বাস, এতে গৃহের নেতিবাচক পরিবেশ দূর হয় এবং মনেও এক বিশেষ শান্তির সঞ্চার ঘটে। এমনকি অনেকে বলেন, এই মন্ত্র শুধু জপ নয়, শ্রবণ করলেও মন অনেকটা প্রশান্ত হয় এবং ঘুমও ভালো আসে।

আরও একটি প্রসিদ্ধ মন্ত্র হল—
॥ ॐ नमो हनुमते रुद्रावताराय सर्वशत्रुसंहारणाय सर्वरोगहराय रामदूताय स्वाहा ॥
এই মন্ত্র বহু ভক্ত রোগমুক্তি, সাহস এবং জীবনের প্রতিকূলতার সময় ঈশ্বরের কৃপা লাভের উদ্দেশ্যে জপ করেন।

এবার আসি মন্ত্রজপের নিয়মে।
আমি সবসময় বলি—অনেকগুলো মন্ত্র একসঙ্গে জপ করার চেয়ে একটি মন্ত্র বেছে নিয়ে নিষ্ঠার সঙ্গে জপ করা অনেক বেশি ফলদায়ক।

ভোরে উঠে স্নান করে শুচি হয়ে, সূর্যকে অর্ঘ্য দিয়ে, প্রাণায়াম করার পর পরিষ্কার আসনে পূর্বমুখে অথবা উত্তরমুখে বসুন। প্রথমে হনুমানজীর ধ্যান করুন। তারপর একটি মন্ত্র নির্বাচন করে অন্তত চব্বিশ মিনিট একাগ্রচিত্তে জপ করুন।

রুদ্রাক্ষ, তুলসী অথবা প্রবালের (মূঙ্গা) মালা ব্যবহার করা যেতে পারে।
জপের সময় সাত্ত্বিক আহার, সংযম এবং পবিত্র জীবনযাপন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ সাধনার ক্ষেত্রে ব্রহ্মচর্যের কথাও শাস্ত্রে উল্লেখ রয়েছে।

আর একটি বিষয় অবশ্যই মনে রাখবেন—মন্ত্র কখনও উচ্চস্বরে নয়; মৃদুস্বরে বা মানসিকভাবে জপ করাই অধিক প্রশস্ত।

জপের সময় যতটা সম্ভব সাত্ত্বিক আহার গ্রহণ করুন। বিশেষ সাধনার ক্ষেত্রে ব্রহ্মচর্য পালন করার কথাও শাস্ত্রে বলা হয়েছে। আর মন্ত্র কখনও উচ্চস্বরে নয়—মৃদুস্বরে বা মানসিকভাবে জপ করাই অধিক ফলদায়ক।

সবশেষে আমি আবারও সেই কথাটাই স্মরণ করিয়ে দিতে চাই, যা আমার কাছে হনুমানজীর উপাসনার মূলমন্ত্র। শুধু মন্ত্র মুখস্থ করলেই হবে না। হনুমানজীর বিনয়কে গ্রহণ করতে হবে। তাঁর নিঃস্বার্থ সেবাভাবকে জীবনে আনতে হবে। তাঁর কর্তব্যনিষ্ঠা, তাঁর নির্ভীকতা, তাঁর আত্মসমর্পণ এবং শ্রীরামের প্রতি অটল ভক্তিকে নিজের চরিত্রের অংশ করে তুলতে হবে।
কারণ মন্ত্র আমাদের ঈশ্বরের কাছে নিয়ে যায়, কিন্তু চরিত্রই আমাদের ঈশ্বরের কৃপা গ্রহণের যোগ্য করে তোলে।

এই কারণেই আমি বিশ্বাস করি, যে মানুষ হনুমানজীর গুণগুলোকে নিজের জীবনে ধারণ করতে পারে, তাঁর কাছে জীবনের সবচেয়ে বড় বাধাও একদিন ছোট হয়ে যায়।
জয় শ্রী রাম।
জয় বজরংবলী।
জয় হনুমানজী।

পুরো লেখাটি পড়ে ভাল লাগলে লেখাটি অবশ্যই শেয়ার করে ছড়িয়ে দেবেন বন্ধুদের মাঝে আর কমেন্ট সেকশনে লিখবেন "জয় বজরংবলী।"
#হনুমানজী

#HanumanJi
#হনুমানমন্ত্র
#HanumanMantra
#SanatanDharma
#RamNaam
#SpiritualWisdom
#AstrologyIndia

Wednesday, 8 July 2026

দ্বিতীয় ভাগ - হনুমানজীর বীজমন্ত্র ও তার মহিমা - beejmantra of Hanumanji

 দ্বিতীয় ভাগ - হনুমানজীর বীজমন্ত্র ও তার মহিমা


দ্বিতীয় ভাগ - হনুমানজীর বীজমন্ত্র ও তার মহিমা
আপনারা কি জানেন, হনুমানজীর এমন একটি বীজমন্ত্র আছে যা সাহস, আত্মবিশ্বাস ও ইতিবাচক শক্তি জাগিয়ে তোলে? কেন মাত্র ২৪ মিনিট হনুমানজীর এই মন্ত্র জপ করার কথা বলা হয়? এর পেছনের আধ্যাত্মিক রহস্য শুনলে অবাক হবেন।
আজ প্রথমেই আসুন, হনুমানজীর বীজমন্ত্র নিয়ে কথা বলি। অনেকেই জানতে চান, হনুমানজীর প্রকৃত বীজমন্ত্র কী? কেন এই মন্ত্র জপ করা উচিত? আর কীভাবেই বা জপ করলে তার প্রকৃত ফল লাভ করা যায়?
________________________

আমি যে কথাগুলি এখন বলছি, সেগুলি মন দিয়ে শুনুন।

হনুমানজীর বীজমন্ত্র হল—
"हं" (হং)
যেমন—
সরস্বতীর বীজমন্ত্র — ऐं (ঐং)
দুর্গার বীজমন্ত্র — ह्रीं (হ্রীং)
কালীর বীজমন্ত্র — क्लीं (ক্লীং)
শিবের বীজমন্ত্র — हौं (হৌঁ)
গণেশের বীজমন্ত্র — गं (গং)
অগ্নির বীজমন্ত্র — रं (রং)

ঠিক তেমনই হনুমানজীর বীজ হল "হং"।
এবার আসি হনুমানজীর প্রধান বীজমন্ত্রে। ॐ हं हनुमते नमः
বাংলা উচ্চারণ—
"ওঁ হং হনুমতয়ে নমঃ"

এই মন্ত্র যদি নিয়মিত জপ করা যায়, তাহলে একাগ্রতা বৃদ্ধি পায়। শারীরিক শক্তি বাড়ে। শরীরে ইতিবাচক শক্তির সঞ্চার হয়। আত্মবিশ্বাস বৃদ্ধি পায়। সহনশক্তি বাড়ে। নেতিবাচক শক্তি দূরে থাকে। বিশেষ করে যাঁদের শনির সাড়ে-সাতি, ঢাইয়া অথবা শনির মহাদশা চলছে, তাঁরা যদি আন্তরিকভাবে হনুমানজীর উপাসনা করেন, তাহলে শনির অশুভ প্রভাব অনেকটাই প্রশমিত হয়। তবে সিদ্ধ গুরুর থেকে না নিয়ে এই মন্ত্র জপে ফল আসে না।
অনেকে আমাকে জিজ্ঞেস করেন—এই মন্ত্র কখন জপ করা উচিত?
আমি বলি, সূর্যোদয়ের সময় এই মন্ত্র জপ করা সর্বোত্তম। পূর্বদিকে মুখ করে প্রতিদিন ১০৮ বার জপ করলে বিশেষ উপকার পাওয়া যায়।
বিশেষ করে যাঁদের জন্মকুণ্ডলীতে মঙ্গল দুর্বল, যাঁরা অকারণ ভয় পান, অন্ধকারে একা যেতে পারেন না, কিংবা সব সময় অজানা আশঙ্কায় ভোগেন—তাঁদের জন্য এই মন্ত্র অত্যন্ত উপকারী। কারণ মঙ্গল সাহস, পরাক্রম ও আত্মবিশ্বাসের কারক গ্রহ। আর হনুমানজী মঙ্গলের অধিষ্ঠাত্রী দেবতা।

এবার আর-একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রের কথা বলি।
শ্রী হনুমতয়ে নমঃ
"श्री हनुमते नमः"
এই মন্ত্র জীবনের নানা বাধা দূর করতে সাহায্য করে।
যদি বারবার ব্যর্থতা আসে, কাজে বাধা পড়ে, সংসারে অশান্তি থাকে, চাকরি বা ব্যবসায় সমস্যা হয়, পড়াশোনায় মন না বসে, অথবা শারীরিক কিংবা মানসিক কষ্ট থাকে—তাহলে এই মন্ত্র জপ করা যেতে পারে। অবশ্যই কোন গুরুর থেকে নিয়ে। 
এখানে একটি বিষয় বিশেষভাবে মনে রাখা দরকার।
অনেকে মনে করেন, এক মালা জপ করলেই অলৌকিক ফল মিলবে। কিন্তু বাস্তব বিষয়টি তা নয়। যে কোনও মন্ত্র কমপক্ষে চব্বিশ মিনিট একাগ্রচিত্তে জপ করতে হবে। এর কম সময় জপ করলে মনের স্থিরতাই আসে না। চব্বিশ মিনিট ধরে নিরবচ্ছিন্ন জপ করলে শরীরের বাহাত্তর হাজার নাড়িতে ইতিবাচক স্পন্দন সৃষ্টি হয়। আটচল্লিশ মিনিট জপ করলে আরও ভালো ফল পাওয়া যায়। ষাট মিনিট হলে তার থেকেও উত্তম। আর তারও বেশী সময় জপ করতে পারলে কল্যাণ আরও বৃদ্ধি পায়।

তবে শুধু জপ করলেই হবে না। রোখ চাই। পার্বতী মা শিবকে লাভ করার জন্য বারো হাজার বছর তপস্যা করেছিলেন। শুকনো বেলপাতা খেয়ে জীবন কাটিয়েছেন। তারপরও তিনি প্রতিজ্ঞা করেছিলেন, "কোটি জন্ম লাগলেও শিবকেই স্বামীরূপে লাভ করব, নইলে অবিবাহিতই থাকব।"
তাহলে আমরা যদি ভাবি—একশো আটবার মন্ত্র জপ করেই সবকিছু পেয়ে যাব, সেটি বাস্তবসম্মত নয়। সাধনায় দরকার—ধৈর্য, নিষ্ঠা, ত্যাগ ও সমর্পণ।
এবার শনিদেব ও হনুমানজীর একটি সুন্দর পৌরাণিক কাহিনি শোনাই।
রাবণ ছিলেন অত্যন্ত শক্তিশালী এবং বহু বরপ্রাপ্ত। তাঁর পুত্র ইন্দ্রজিৎ জন্মানোর সময় তিনি সমস্ত গ্রহকে নিজের পায়ের নীচে চেপে রেখেছিলেন, যাতে সন্তান সর্বশ্রেষ্ঠ যোগ নিয়ে জন্মায়।
দেবতারা তখন গভীর চিন্তায় পড়ে গেলেন। সেই সময় শনিদেব বললেন, "আমি চাইলে এই পরিকল্পনা ভেস্তে দিতে পারি।"

সেই পরিকল্পনা অনুসারে দেবর্ষি নারদ তখন রাবণের কাছে গিয়ে বললেন,
"তুমি গ্রহদের পিঠে পা দিয়ে দাঁড়িয়ে আছো—এতে কী গৌরব? সত্যিকারের বিজয়ী হলে তাদের বুকের ওপর প রেখে দাঁড়াও।"
রাবণ অহংকারে সেই কথাই মেনে নিলেন। তিনি গ্রহদের উল্টে দিলেন। ঠিক সেই মুহূর্তে শনিদেব তাঁর দৃষ্টি রাবণের মুখে নিক্ষেপ করলেন। সেই থেকেই রাবণের দুর্ভাগ্যের সূচনা হল। অবশ্য ক্রুদ্ধ রাবণ সঙ্গে সঙ্গে শনিদেবকে বন্দি করে কারাগারে নিক্ষেপ করকেন।
পরে যখন হনুমানজী সীতামাতার সন্ধানে লঙ্কায় প্রবেশ করেন, তখন সেই কারাগার থেকে শনিদেবের আর্তনাদ তাঁর কানে আসে।
তিনি এক মুহূর্তও দেরি করেননি। কারাগার ভেঙে শনিদেবকে মুক্ত করেছিলেন।
আরেকটি প্রাচীন কাহিনিতে বলা হয়, হনুমানজী শনিদেবকে এমনভাবে মুক্ত করেন যে, তাঁর দৃষ্টি লঙ্কার দিকে পড়ে। শনিদেবের দৃষ্টি পড়তেই লঙ্কা ধ্বংসের পথে এগিয়ে যায়। তাই 
মুক্তি পাওয়ার পর শনিদেব কৃতজ্ঞ চিত্তে হনুমানজীকে বললেন, "আজ থেকে আমি প্রতিজ্ঞা করছি, তোমার সত্যিকারের ভক্তদের অকারণে কষ্ট দেব না।"
এই কারণেই আজও বিশ্বাস করা হয়, শনিদেবের কষ্ট থেকে মুক্তির জন্য হনুমানজীর উপাসনা বিশেষ ফলদায়ক।

পরবর্তী ও শেষ পর্বে আমি আলোচনা করব—হনুমান গায়ত্রী মন্ত্র, অঞ্জনেয় মন্ত্র,  বিভিন্ন বিশেষ মন্ত্র, লাঙ্গুল স্তোত্র এবং মন্ত্রজপের সম্পূর্ণ বিধি। যাঁরা আগ্রহী সঙ্গে থাকবেন।
(ক্রমশ)
#হনুমানজী
#HanumanJi
#হনুমানমন্ত্র
#HanumanMantra
#SanatanDharma
#RamNaam
#SpiritualWisdom
#AstrologyIndia
উপরের পোস্টটি যাঁরা পড়েছেন পোস্টটি ভাল লাগল শেয়ার করবেন আর কমেন্টে লিখবেন 
"জয় শ্রীরাম, জয় হনুমানজী।

শ্রীহনুমানজীর কৃপা আজও ঘটে তারাশিস গঙ্গোপাধ্যায় - Hanumanjir kripa aajo ghore part 1

 " জানেন কি শুধু 'রাম' নাম উচ্চারণ করলেই হনুমানজী আপনার পাশে এসে দাঁড়ান?  জানেন কি কোন মন্ত্রে দূর হয় ভয়, শনি দোষ ও জীবনের বাধা? শাস্ত্রসম্মত ব্যাখ্যা ও বিরল কাহিনি জানুন এই বিশেষ আলোচনায়।"

_____________________


শ্রীহনুমানজীর কৃপা আজও ঘটে
  তারাশিস গঙ্গোপাধ্যায়


আমি প্রায়ই একটি কথা বলি—ভারতবর্ষে প্রতিদিন হনুমানজী তাঁর ভক্তদের সাহায্য করতে আবির্ভূত হন। কথাটা শুনে অনেকেরই বিস্ময় জাগবে। কিন্তু একটু নিজের জীবনের দিকে তাকিয়ে দেখুন তো। হয়তো কোনও একদিন আপনি ভীষণ বিপদে পড়েছিলেন। চারপাশে সাহায্য করার মতো কেউ ছিল না। ঠিক সেই সময় কোথা থেকে যেন একজন বৃদ্ধ এসে আপনাকে সাহায্য করলেন। কখনও হয়তো একজন যুবক, কখনও বা একেবারেই অচেনা কোনও মহিলা। আপনার কাজ শেষ হতেই তিনি যেন হাওয়ায় মিলিয়ে গেলেন। আপনি আর তাঁকে খুঁজে পেলেন না।


আমি বিশ্বাস করি, আমাদের জীবনে এমন অনেক ঘটনা ঘটে, অথচ আমরা বুঝতেই পারি না—তিনি আর কেউ নন, স্বয়ং হনুমানজীই অন্য কোনও রূপ ধারণ করে আমাদের সাহায্য করে চলে গেছেন। বিশেষ করে যদি কখনও নির্জন স্থানে, অসহায় অবস্থায়, হৃদয়ের সমস্ত আকুতি দিয়ে আপনি হনুমানজীকে ডাকেন, তাহলে তাঁর কৃপা কোনও না কোনও রূপে আপনার কাছে পৌঁছবেই। তিনি কীভাবে আসবেন, কোন রূপে আসবেন, তা আমরা জানি না। কিন্তু তাঁর কৃপা কখনও ব্যর্থ হয় না।


এই প্রসঙ্গে আমি একটি কাহিনী বলছি আজ। ঘটনাটি জড়িয়ে আছে গোস্বামী তুলসীদাসজীর জীবনের সঙ্গে।


যখন গোস্বামী তুলসীদাসজী সাতাত্তর বছর বয়সে রামচরিতমানস রচনা করেছিলেন, সেই সময় একদিন তিনি ভক্তদের সামনে শ্রীরামকথা বলছিলেন। অসংখ্য মানুষ মুগ্ধ হয়ে তাঁর মুখ থেকে শ্রীরামের লীলা শুনছিলেন। চারদিকে এক অপূর্ব ভক্তিময় পরিবেশ।


হঠাৎ সেই সময় এক অত্যন্ত সুন্দরী নারী ঘোড়ার গাড়ি থেকে নেমে এসে সকলের সামনে উচ্চস্বরে বলে উঠলেন, “পণ্ডিতজী! এতদিন কোথায় ছিলেন? অনেকদিন আমাদের কোঠায় আসছেন না!”


কথাটি শুনে উপস্থিত মানুষের মধ্যে গুঞ্জন শুরু হয়ে গেল। অনেকে মনে মনে ভাবল—তাহলে তুলসীদাসজী বুঝি পতিতালয়েও যেতেন! মুহূর্তের মধ্যেই অর্ধেক শ্রোতা সভা ছেড়ে চলে গেলেন।


কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়, তুলসীদাসজীর মুখে কোনও পরিবর্তন এল না। তিনি যেন কিছুই শোনেননি। সম্পূর্ণ নির্বিকারভাবে তিনি শ্রীরামকথা বলে যেতে লাগলেন।


পরের দিনও যথারীতি তিনি শ্রীরামকথা বলতে বসেছেন। ভক্তরাও আবার জড়ো হয়েছেন। এমন সময় একজন মদ বিক্রেতা সেখানে এসে তাঁকে প্রণাম করে বলল,

“মহারাজ, আজকাল আর আমাদের দোকানে আসেন না কেন? আপনার কাছে এখনও কিছু টাকা পাওনাও আছে।”


এই কথা শুনে আরও অনেকের মনে সন্দেহ জন্মাল। তারা ভাবল—তাহলে ইনি মদও পান করেন! আরও অনেক মানুষ সভা ছেড়ে চলে গেলেন। কিন্তু তুলসীদাসজী তখনও নির্বিকার। তাঁর কণ্ঠে শুধু রামকথার ধারা প্রবাহিত হতে লাগল।


তৃতীয় দিনের ঘটনাটি আরও আশ্চর্য। সেদিনও তিনি যথারীতি রামকথা বলছেন। ঠিক তখনই একজন ব্যক্তি কয়েকটি ছাগল নিয়ে সেই পথ দিয়ে যাচ্ছিল। তুলসীদাসজীকে দেখে সে হেসে বলল, “মহারাজ, অনেকদিন হলো আপনি আর মাংস নেন না। আপনার সেবা করার সুযোগই হচ্ছে না!”


এবার উপস্থিত প্রায় সবাই এক সিদ্ধান্তে পৌঁছে গেল। তারা ভাবল—এই ব্যক্তি তো পতিতালয়ে যায়, মদও খায়, আবার মাংসও খায়! একে একে সবাই সভা ছেড়ে চলে গেল।


শেষ পর্যন্ত সভায় মাত্র একজন মানুষ বসে রইলেন।তুলসীদাসজী শান্তভাবে তাঁর দিকে তাকিয়ে বললেন,“সবাই চলে গেল, আপনি এখনও বসে আছেন কেন? আপনিও যান।”


লোকটি মৃদু হেসে বলল, “আমি কেন যাব? এই কাহিনি তো আমার জন্যই হচ্ছে।”


তুলসীদাসজী বিস্মিত হয়ে তাঁর দিকে তাকিয়ে রইলেন।


তারপর সেই ব্যক্তি নিজের প্রকৃত পরিচয় দিলেন। তিনি বললেন, “আমি শ্রীরামভক্ত হনুমান।”


এরপর তিনি তুলসীদাসজীকে বললেন, “এগুলো ছিল কলিযুগের তিনটি রূপ—কাম, মদ ও ভোগের মোহ। আজ আমি তোমাকে একটি বর দিচ্ছি। যেখানে তোমার শ্রীরামকথা হবে, সেখানে কলিযুগ কখনও প্রবেশ করতে পারবে না।”


এই কারণেই আজও বিশ্বাস করা হয়, যেখানে ভক্তিভরে শ্রীরামকথা হয়, সেখানে হনুমানজী স্বয়ং উপস্থিত থাকেন এবং কোনও অশুভ শক্তি সেই স্থানে প্রবেশ করতে পারে না।


 হনুমানজী মন্ত্রের জন্য ততটা ব্যাকুল নন, তার থেকেও অনেক বেশি ব্যাকুল শ্রীরামের নাম শোনার জন্য। আপনি যদি একান্ত আন্তরিকতার সঙ্গে শুধু বলেন—“রাম... রাম...” তাহলেই হনুমানজী আপনার প্রতি আকৃষ্ট হবেন। যেমন “রাধা রাধা” শুনলে শ্রীকৃষ্ণ ছুটে আসেন, তেমনই “রাম রাম” শুনলে হনুমানজী ছুটে আসেন।


তবুও শাস্ত্রে হনুমানজীর বহু শক্তিশালী মন্ত্রের উল্লেখ রয়েছে। তাদের মধ্যে একটি প্রধান বীজমন্ত্র হল—


ॐ हं हनुमते नमः


বাংলা উচ্চারণ—


“ওঁ হং হনুমতয়ে নমঃ।”


এই মন্ত্র যদি নিয়মিত জপ করা যায়, তাহলে মানুষের জীবনে বহু পরিবর্তন আসে। জীবনে বিনয় আসে। সাহস বৃদ্ধি পায়। প্রতিকূল পরিস্থিতিতেও বিজয়ী হওয়ার শক্তি লাভ হয়। ভূত-প্রেত, অশুভ শক্তি এবং নেতিবাচক চিন্তা দূরে সরে যায়। রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি পায়। শরীরে ইতিবাচক শক্তির সঞ্চার হয়। আত্মবিশ্বাস বাড়ে। দীর্ঘায়ু লাভ হয়। শনি, রাহু, মঙ্গল ও কেতুর অশুভ প্রভাব অনেকটাই প্রশমিত হয়। ঋণ, কষ্ট এবং মানসিক দুশ্চিন্তাও ধীরে ধীরে কমতে শুরু করে।


তবে এখানে একটি বিষয় অবশ্যই মনে রাখতে হবে। শুধু মন্ত্র জপ করলেই হবে না। হনুমানজীর উপাসনা করতে হলে নিজের চরিত্রও শুদ্ধ রাখতে হবে।


আমি বলছি না যে আপনাকে সংসার ছেড়ে সন্ন্যাস নিতে হবে। আমি শুধু বলছি, সংসারে থেকেই যদি শাস্ত্রসম্মত, নৈতিক এবং সংযমী জীবনযাপন করতে পারেন, তাহলে হনুমানজীর কৃপা সর্বদা আপনার ওপর বিরাজ করবে। তিনি গৃহত্যাগ চান না। তিনি চান—সৎ চরিত্র, সত্যবাদিতা, সংযম এবং শ্রীরামের প্রতি অটল ভক্তি।


এই চারটি গুণ যদি জীবনে ধারণ করতে পারেন, তাহলে বিশ্বাস রাখুন, হনুমানজীর কৃপা কোনও না কোনও রূপে আপনার জীবনকে স্পর্শ করবেই।


লেখাটি ভালো লাগলে কমেন্ট সেকশনে লিখবেন -- "জয় হনুমানজী।" আর মন চাইলে ভক্ত বন্ধুদের জন্যে শেয়ার করতে পারেন)


ক্রমশ


(পরের ভাগে থাকবে—হনুমানজীর বীজমন্ত্রের বিস্তারিত ব্যাখ্যা, সূর্যোদয়ে জপের নিয়ম, মূল মন্ত্র "শ্রী হনুমতয়ে নমঃ" ২৪ মিনিট জপের গুরুত্ব এবং শনিদেব ও হনুমানজীর বিখ্যাত কাহিনি।)


#HanumanJi

#JaiShriRam

#হনুমানমন্ত্র

#Bajrangbali

#SanatanDharma

#SpiritualWisdom

#Bhakti

#তারাশিসগঙ্গোপাধ্যায়

Monday, 6 July 2026

সিরাজ: সিংহাসন ও সত্যের মাঝখানে।Siraj between the facts and truth.


"সিরাজ: সিংহাসন ও সত্যের মাঝখানে"
একজন স্বাধীনতা সংগ্রামী ও এক সাংবাদিকের সংলাপ

(উত্তর কলকাতার এক প্রাচীন বাড়ির ছায়াঘেরা বারান্দায়। পাশে রেকর্ডার রেখে বসে আছে তরুণ সাংবাদিক রোহন। তার সামনে বসে আছেন প্রবীণ স্বাধীনতা সংগ্রামী আনন্দ চন্দ্র—যাঁর চোখে ধরা আছে ব্রিটিশ শাসনের অবসান এবং স্বাধীনতার পরের বিভ্রান্ত সময়ের স্মৃতি।)

সাংবাদিক (রোহন):

দাদু, ইদানীং সামাজিক মাধ্যমে সিরাজউদ্দৌলাকে নিয়ে প্রবল বিতর্ক চলছে। অনেকে বলছেন, তাঁকে আমরা যেভাবে বীর হিসেবে জেনেছি, তিনি আদৌ তেমন ছিলেন না। তাঁরা বিদ্যাসাগর, গোলাম হোসেন, এমনকি ফরাসি লেখক জ্যাঁ ল'-এর মতো সমসাময়িকদের উদ্ধৃতি দিচ্ছেন। আপনার কী মত? সিরাজ কি সত্যিই দেশপ্রেমিক ছিলেন, নাকি আর পাঁচজন অত্যাচারী শাসকের মতোই একজন শাসক?

স্বাধীনতা সংগ্রামী (আনন্দ চন্দ্র):

(ধীরে হেলান দিয়ে)

ইতিহাস, বাবা, যুদ্ধ শেষ হওয়ার বহু পরে ফেলে যাওয়া এক রণক্ষেত্রের মতো—ধোঁয়া তখনও পুরো কাটে না। যে যেমন দেখতে চায়, তেমনই দেখে। তবে এটুকু বলতে পারি, স্কুলে আমরা যে ইতিহাস পড়েছি, তা পুরো সত্য ছিল না।

রোহন:

তাহলে... আপনি বলতে চাইছেন, পাঠ্যবই আমাদের ভুল শিখিয়েছে?

আনন্দ চন্দ্র:

ভুল নয়—সরলীকরণ করেছে। আমাদের যৌবনে অধিকাংশ ইতিহাসই ব্রিটিশদের লেখা ছিল। পরে জাতীয়তাবাদী ইতিহাসকাররা বিদেশি শাসনের বিরুদ্ধে প্রতিরোধের প্রতীক হিসেবে কিছু বীরের সন্ধান করলেন। ইংরেজদের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো এক তরুণ নবাব—সিরাজ—তাই হয়ে উঠলেন উপযুক্ত প্রতীক। কিন্তু সেই প্রতীকের আড়ালে যে মানুষটি ছিলেন, তিনি মোটেও আদর্শ ছিলেন না।

রোহন:

আপনি কি বিদ্যাসাগরের বর্ণনার কথা বলছেন?

আনন্দ চন্দ্র:

হ্যাঁ। বিদ্যাসাগর লিখেছিলেন, সিরাজ তাঁর দাদার বিশ্বস্ত কর্মচারীদের অপসারণ করে চারপাশে চাটুকার ও দুর্নীতিবাজদের জড়ো করেছিলেন। তাঁর শাসনে মানুষের সম্পদ ও সম্মান কোনোটাই নিরাপদ ছিল না। এমনকি গঙ্গায় স্নান করতে যাওয়া নারীরাও তাঁর কুদৃষ্টির ভয়ে আতঙ্কিত থাকতেন। এমন শাসককে আদর্শ বলা কঠিন।

রোহন:

তাহলে আজও অনেকে তাঁকে বীর বলে কেন?

আনন্দ চন্দ্র:

কারণ আমরা বিভ্রান্ত উত্তরাধিকার বহন করছি। উপনিবেশিক অপমানের ক্ষত আমাদের এমন কিছু প্রতীক খুঁজতে বাধ্য করেছিল, যাদের ঘিরে আত্মমর্যাদা গড়ে তোলা যায়। তাই অনেক সময় নিষ্ঠুর মানুষকেও দেশপ্রেমের রঙে রাঙানো হয়েছে। কিন্তু বিভ্রমের ওপর দাঁড়ানো গৌরব কখনও স্থায়ী হয় না।

রোহন:

(দ্রুত নোট নিতে নিতে)

গোলাম হোসেন তাঁর সিয়ার-উল-মুতাখখিরীন গ্রন্থেও সিরাজকে নিষ্ঠুর ও নারীলোলুপ বলেছেন, তাই না?

আনন্দ চন্দ্র:

হ্যাঁ। তাঁর সমসাময়িকদের অনেকেই—যেমন গোলাম হোসেন—সিরাজকে লোভী, নিষ্ঠুর ও কামুক শাসক হিসেবে বর্ণনা করেছেন।

রোহন:

কিন্তু আমরা তো ছোটবেলা থেকে শুনেছি, তিনি ছিলেন প্রজাদরদী নবাব!

আনন্দ চন্দ্র:

সেই ধারণাটাই দীর্ঘদিন প্রচারিত হয়েছে। কিন্তু সমসাময়িক বিবরণে দেখা যায়, তাঁর নিষ্ঠুরতার ভয়ে অনেক দরবারীও আতঙ্কে থাকতেন। অভিযোগ রয়েছে, তিনি কারণ ছাড়াই মানুষের সম্পদ কেড়ে নিতেন এবং নারীদের ওপর জোরজবরদস্তি করতেন। ব্রিটিশ কামান গর্জে ওঠার আগেই বাংলার সমাজ নানা সংকটে জর্জরিত ছিল।

রোহন:

মোহনলালের বোন—মাধবীকে নিয়ে একটা কাহিনি পড়েছিলাম...

আনন্দ চন্দ্র:

হ্যাঁ, এমন একটি কাহিনি বিভিন্ন পরবর্তী লেখায় উল্লেখ করা হয়েছে। সেখানে বলা হয়, মোহনলালের বোন মাধবী (কোথাও হীরা নামেও উল্লেখিত) সিরাজের দ্বারা নির্যাতিত হন। তবে এই ঘটনার ঐতিহাসিক সত্যতা নিয়ে গবেষকদের মধ্যে যথেষ্ট মতভেদ রয়েছে, এবং নির্ভরযোগ্য সমসাময়িক প্রমাণও সীমিত। তাই এ ধরনের বর্ণনা সতর্কতার সঙ্গে বিচার করা উচিত।

রোহন:

রানি ভবানীর আত্মীয়া তারাসুন্দরী সম্পর্কেও কিছু লেখা আছে...

আনন্দ চন্দ্র:

হ্যাঁ, এমন কাহিনিও প্রচলিত আছে যে সিরাজ তাঁর প্রতি আকৃষ্ট হয়ে তাঁকে অনুসরণ করান। তবে এই ঘটনাটিও বিতর্কিত এবং ইতিহাসবিদদের মধ্যে সর্বসম্মতভাবে স্বীকৃত নয়। ইতিহাসে লোককথা, পরবর্তী রচনা ও সমসাময়িক নথির মধ্যে পার্থক্য করা জরুরি।

রোহন:

তবুও তাঁকে বাংলার শহীদ বলা হয়!

আনন্দ চন্দ্র:

(মৃদু হাসি)

কোনো শাসক বিদেশি শক্তির বিরুদ্ধে লড়েছেন বলেই তাঁর সব কাজ ন্যায়সঙ্গত হয়ে যায় না। আবার ব্যক্তিগত ত্রুটি থাকলেই তাঁর রাজনৈতিক অবস্থান সম্পূর্ণ অস্বীকারও করা যায় না। ইতিহাস এতটা সাদা-কালো নয়।

রোহন:

গঙ্গা থেকে নারীদের ধরে এনে নবাবের সামনে হাজির করার গল্পও কি আছে?

আনন্দ চন্দ্র:

ফরাসি কর্মকর্তা জ্যাঁ ল'-এর স্মৃতিকথায় সিরাজ সম্পর্কে নানা সমালোচনামূলক মন্তব্য রয়েছে। তবে তাঁর বিবরণও ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা, রাজনৈতিক অবস্থান এবং সমসাময়িক গুজবের প্রভাবমুক্ত ছিল না—এ কথাও মনে রাখতে হবে। তাই একক কোনো সূত্রকে চূড়ান্ত সত্য বলে ধরা উচিত নয়।

রোহন:

এত কিছু যদি লেখা থাকে, তাহলে আমাদের পড়ানো হয়নি কেন?

আনন্দ চন্দ্র:

কারণ ইতিহাস প্রায়ই সময়ের প্রয়োজন অনুযায়ী ব্যাখ্যা করা হয়। কখনও নায়ক তৈরি হয়, কখনও খলনায়ক। কিন্তু একজন সত্যসন্ধানীর কাজ হলো—বিভিন্ন সূত্র পড়া, তাদের তুলনা করা এবং প্রমাণের ওজন বিচার করা।

রোহন:

তাহলে যখন আমরা বলি, মীর জাফর বাংলার সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেছিলেন...

আনন্দ চন্দ্র:

(ধীরে থামিয়ে দিয়ে)

মীর জাফরের ভূমিকা নিয়ে ইতিহাসে নানা ব্যাখ্যা আছে। কেউ তাঁকে বিশ্বাসঘাতক বলেন, কেউ বলেন তিনি নিজের স্বার্থ দেখেছিলেন, আবার কেউ বলেন রাজনৈতিক পরিস্থিতি ছিল অত্যন্ত জটিল। ইতিহাসকে এক বাক্যে বিচার করা কঠিন।

রোহন:

তাহলে পলাশীর যুদ্ধ কি শুধু পরাধীনতার শুরু ছিল না?

আনন্দ চন্দ্র:

পলাশীর যুদ্ধ ছিল এক গুরুত্বপূর্ণ মোড়। তার ফলেই ধীরে ধীরে ব্রিটিশ প্রভাব ও শাসন প্রতিষ্ঠিত হয়। তবে বাংলার অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব, ক্ষমতার লড়াই এবং প্রশাসনিক দুর্বলতাও সেই পরিবর্তনের পেছনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল।

রোহন:

ভাবতে কষ্ট হয়।

আনন্দ চন্দ্র:

কষ্টের হলেও সত্যের সন্ধান সেখানেই। স্বাধীনতা শুধু বিদেশি শাসনের অবসান নয়—নিজেদের ইতিহাসকে সততার সঙ্গে দেখার ক্ষমতাও স্বাধীনতার অংশ।

রোহন:

তাহলে নতুন প্রজন্মের কী করা উচিত?

আনন্দ চন্দ্র:

শুধু অনুমোদিত ইতিহাস নয়—বিভিন্ন মত পড়ো। প্রশ্ন করো। তোমার পাঠ্যবইকে প্রশ্ন করো, আমাকেও প্রশ্ন করো। তবেই ইতিহাসের কুয়াশা কিছুটা সরবে।

রোহন:

(কিছুক্ষণ নীরব থেকে)

তাহলে সিরাজ না সম্পূর্ণ নায়ক, না সম্পূর্ণ খলনায়ক—বরং তাঁর সময়েরই এক প্রতিচ্ছবি?

আনন্দ চন্দ্র:

ঠিক তাই। তাঁর জীবন আমাদের শেখায়—অভ্যন্তরীণ দুর্বলতা, নৈতিক অবক্ষয় ও রাজনৈতিক বিভাজন একটি দেশকে বাইরের শক্তির কাছে দুর্বল করে তোলে।

রোহন:

(ধীরে নোটবুক বন্ধ করে)

ধন্যবাদ, দাদু। আপনি আমাকে এমন এক দৃষ্টিভঙ্গি দিলেন, যা কোনো পাঠ্যবই দেয়নি।

আনন্দ চন্দ্র:

(মৃদু হাসলেন)

তাহলে সত্যনিষ্ঠভাবেই লিখো, রোহন। ইতিহাসকে ভালোবাসতে হলে তাকে প্রশ্ন করতে জানতে হয়। কোনো মানুষকে অন্ধভাবে পূজা বা ঘৃণা নয়—প্রমাণের আলোয় বিচার করাই ইতিহাসচর্চার আসল পথ।