মন্ত্র জপ কিভাবে করতে হয়?
তারাশিস গঙ্গোপাধ্যায়
রাতের অন্ধকার ঘরে যদি একটি ছোট প্রদীপও না জ্বলে, তবে চারপাশে যত মূল্যবান জিনিসই থাকুক, কিছুই চোখে পড়ে না। ঠিক তেমনি, মন্ত্রের ভিতরে যদি চৈতন্যের আলো না জাগে, তবে বছরের পর বছর জপ করেও তার আসল ফল অনুভব করা যায় না। নামের ক্ষেত্রে এর প্রয়োজন না হলেও বীজের ক্ষেত্রে এর দরকার পড়ে।
আজকাল অনেকেই দেখা যায় মালা হাতে জপ করেন, ঠোঁট নড়ে, শব্দ উচ্চারিত হয়—কিন্তু অন্তরে কোনো কম্পন জাগে না। কারণ অধিকাংশ মানুষ জানেনই না, মন্ত্র শুধু কয়েকটি অক্ষরের সমষ্টি নয়; তারও একটি প্রাণ আছে, একটি সুপ্ত শক্তি আছে। সেই শক্তির কেন্দ্র লুকিয়ে রয়েছে মানুষের নিজের শরীরেই—মণিপুর চক্রে।
শাস্ত্রে বলা হয়েছে, মন্ত্রকে জাগাতে না পারলে সে নিস্তব্ধ বীজের মতো পড়ে থাকে। আর অবোধ, অচৈতন্য মন্ত্র যতই জপ করা হোক না কেন, তার পূর্ণ শক্তি প্রকাশ পায় না। এই জন্যে স্বামী নিগমানন্দ আমাদের জন্যে বলে গেছেন সেই পথ। তাঁর দেখানো পথ কিছুটা সহজ করে বলছি সবার জন্যে।
____________________
মন্ত্র চৈতন্য কিভাবে করতে হয়?
_________________
মানুষের শরীর শুধু রক্ত-মাংসের দেহ নয়; এর ভিতরে আছে সূক্ষ্ম শক্তির বহু কেন্দ্র। তাদের মধ্যেই অন্যতম মণিপুর চক্র—অগ্নির কেন্দ্র, তেজের কেন্দ্র। তন্ত্র ও যোগশাস্ত্রে বলা হয়, সাধক যখন বীজ মন্ত্রজপের আগে মণিপুর চক্রে নিজের ইষ্টমন্ত্রের দীপ্ত রূপ কল্পনা করেন, তখন ধীরে ধীরে মন্ত্রে প্রাণ জাগতে শুরু করে। এই প্রক্রিয়াকেই বলা হয় “মন্ত্রচৈতন্য”।
কিন্তু এই রহস্য আজ প্রায় হারিয়ে গেছে। উপযুক্ত গুরু না থাকায় অধিকাংশ মানুষ শুধু শব্দ জপ করেই জীবন কাটিয়ে দেন। যোগী ও সন্ন্যাসীদের মধ্যেও খুব কম মানুষ আছেন, যারা এই জপ রহস্যের প্রকৃত ক্রিয়া জানেন।
এখন জপ রহস্য কেন প্রয়োজন? শুধু মালা ঘোরানোই বা কর জপই জপ নয়। শাস্ত্রে জপের আগে ও পরে কিছু বিশেষ আচার এবং মানসিক প্রস্তুতির কথা বলা হয়েছে, যেগুলোকে একত্রে বলা হয় “জপ রহস্য”। এর মধ্যে রয়েছে—
কুল্লুকা
সেতু
মহাসেতু
মুখশোধন
করশোধন
চক্রাসন
প্রাণায়াম
ধ্যান
জপ সমর্পণ
ইত্যাদি।
এই প্রতিটি ধাপের উদ্দেশ্য একটাই—সাধকের শরীর, মন, বাক্ এবং প্রাণকে এমনভাবে প্রস্তুত করা, যাতে মন্ত্রের শক্তি তার ভিতরে জেগে উঠতে পারে।
সবার আগে জানতে হয় কুল্লুকা কী? এই “কুল্লুকা” হল এক ধরনের সূক্ষ্ম রক্ষাকবচ। জপের আগে সাধক নিজের চারপাশে এক অদৃশ্য শক্তিবলয় কল্পনা করেন। গুরুপ্রদত্ত মন্ত্র ও ধ্যানের মাধ্যমে তিনি অনুভব করেন, যেন চারদিক থেকে এক আলোকবৃত্ত তাকে রক্ষা করছে। এর ফলে বাইরের অশান্ত ভাবনা, নেতিবাচক শক্তি বা মানসিক অস্থিরতা সহজে জপে বাধা দিতে পারে না।
এবার জানতে হবে সেতু কী?
“সেতু” মানে সংযোগ। জপের আগে নিজের মন, গুরু, ইষ্টদেবতা ও মন্ত্রের মধ্যে এক অভ্যন্তরীণ যোগ স্থাপন করাকেই সেতু বলা হয়।
কারণ মন যদি চারদিকে ছড়িয়ে থাকে, তবে জপ কেবল শব্দেই সীমাবদ্ধ থাকে। সেতুর মাধ্যমে মন ধীরে ধীরে একাগ্র হয়ে ইষ্টের দিকে প্রবাহিত হয়।
এবার জানতে হবে মহাসেতু কী? মহাসেতু হল আরও গভীর অবস্থা। এখানে সাধক অনুভব করতে শুরু করেন—তিনি আলাদা কেউ নন; মন্ত্র, ইষ্ট ও তাঁর নিজের চেতনা যেন একসূত্রে মিশে যাচ্ছে। তখন আর মনে হয় না “আমি জপ করছি”; বরং মনে হয়, মন্ত্র নিজেই ভিতরে জেগে উঠে নিজেকে জপ করছে।
এবার জানত হবে করশোধন কী? করশোধন মানে হাতের শুদ্ধি। কারণ তন্ত্রমতে হাত শুধু শরীরের অঙ্গ নয়—এ শক্তির বাহন। জপ, পূজা বা ন্যাসের আগে হাত ধুয়ে, নির্দিষ্ট মুদ্রা ও মন্ত্রস্মরণের মাধ্যমে হাতকে পবিত্র ও শক্তিময় করা হয়।
এর উদ্দেশ্য হল, সাধকের স্পর্শ যেন সাধারণ স্পর্শ না থেকে সাধনার অংশ হয়ে ওঠে।
মুখশোধনের প্রয়োজন
মন্ত্র উচ্চারণের প্রধান মাধ্যম হল বাক্শক্তি। তাই জপের আগে মুখশোধন করা হয়।
আচমন, প্রণব স্মরণ ও বাক্দেবীর ধ্যানের মাধ্যমে সাধক নিজের বাক্যকে শুদ্ধ করার চেষ্টা করেন, যেন মুখ থেকে বের হওয়া প্রতিটি মন্ত্রশব্দ শক্তিতে পূর্ণ হয়।
আর জানতে হবে জপ সমর্পণ কেন জরুরি!
অনেকেই জপ করেন, কিন্তু শেষে সেই জপ ঈশ্বরকে সমর্পণ করেন না। ফলে জপের শক্তি ধীরে ধীরে অহংকার বা ব্যক্তিগত কামনায় ক্ষয় হয়ে যায়।
শাস্ত্রে বলা হয়েছে, জপ শেষে বিনম্রচিত্তে সমস্ত সাধনাফল ঈশ্বরের চরণে অর্পণ করতে হয়। তখনই জপ নিষ্কাম হয়, শান্ত হয়, গভীর হয়।
সাধকের করণীয়
তিনি শাক্ত হোন বা বৈষ্ণব—সব সাধকেরই উচিত জপের আগে অন্তর ও চেতনার প্রস্তুতি নেওয়া।
কুল্লুকা, সেতু, মহাসেতু, মুখশোধন, করশোধন—এই সমস্ত জপ রহস্যের ধাপ শাস্ত্রীয় নিয়মে সম্পন্ন করে, পরে ভক্তিভরে জপ সমর্পণ করতে হয়। কারণ মন্ত্র কেবল শব্দ নয়। মন্ত্র এক জীবন্ত শক্তি। যে মুহূর্তে সেই শক্তি জেগে ওঠে, সেই মুহূর্তে জপ আর ঠোঁটের কাজ থাকে না—তা হয়ে ওঠে আত্মার যাত্রা।
#মন্ত্র_চৈতন্য
#জপ_রহস্য
#তন্ত্রসাধনা
#মণিপুর_চক্র
#SpiritualAwakening
#KundaliniAwakening
#MantraPower
#Meditation
#SanatanDharma
#MysticIndia
No comments:
Post a Comment