পুরুষোত্তম মাসের শেষ অমাবস্যা: আমাদের কি করা উচিৎ?
আগামীকাল সোমবার পুরুষোত্তম মাসের শেষ অমাবস্যা পড়েছে। এই অমাবস্যা বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ, কারণ এটি তিন বছর অন্তর আগত পুরুষোত্তম মাসের অমাবস্যা এবং সোমবারে পড়ায় একে সোমবতী অমাবস্যাও বলা হয়। এই তিথিতে পূর্বপুরুষদের আশীর্বাদ লাভের বিশেষ সুযোগ রয়েছে।
হিন্দু ধর্মে প্রতিটি তিথি ও প্রতিটি দিন কোনো না কোনো দেবদেবীর উদ্দেশে নিবেদিত। অমাবস্যা তিথির অধিষ্ঠাতা হলেন পিতৃদেবতা। তাই এই দিনটি পিতৃস্মরণ, পিতৃপূজা ও পিতৃতর্পণের জন্য অত্যন্ত শুভ বলে বিবেচিত।
শাস্ত্রমতে, যদি পূর্বপুরুষরা সন্তুষ্ট না হন, তবে জীবনের বহু ক্ষেত্রে বাধা সৃষ্টি হতে পারে। তাই অমাবস্যার দিনে তাঁদের স্মরণ করা, আশীর্বাদ প্রার্থনা করা, দান-পুণ্য করা, তাঁদের ছবি বা স্মৃতির সামনে শ্রদ্ধা নিবেদন করা এবং তিল-তর্পণ করা বিশেষ ফলদায়ক বলে মানা হয়।
অনেকেই তাঁদের প্রিয় খাদ্য রান্না করে নিবেদন করেন এবং পরে কাক, গরু, পাখি বা পিঁপড়েদের খাদ্য দেন। বিশ্বাস করা হয়, এইসব প্রাণীর মাধ্যমে পিতৃলোকের আত্মারা সেই অর্ঘ্য গ্রহণ করেন।
কেউ কেউ মনে করেন অমাবস্যা পালন করা উচিত নয়, আবার কারও বাড়িতে প্রবীণদের নিজস্ব নিয়ম থাকে। পরিবারের বড়দের মতামতকে সম্মান করেই চলা উচিত। তবে অমাবস্যার দিনে দান, তর্পণ ও পূর্বপুরুষদের স্মরণ করা সর্বদাই শুভ বলে শাস্ত্রে উল্লেখ রয়েছে।
শাস্ত্র অনুযায়ী, এই দিনে যজ্ঞ, ব্রত, অনুষ্টান ও সংকল্প অত্যন্ত শুভ ফল প্রদান করে। অমাবস্যাকে কেবল পিতৃপক্ষের সঙ্গে যুক্ত করে দেখলে ভুল হবে। এই তিথির সঙ্গে মহালক্ষ্মীরও গভীর সম্পর্ক রয়েছে। ধন, ঐশ্বর্য, যশ, স্থায়ী সমৃদ্ধি এবং সংসারে লক্ষ্মীর কৃপা লাভের জন্যও এই দিনটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
দীপাবলির মতো মহাশুভ লক্ষ্মীপূজাও অমাবস্যাতেই অনুষ্ঠিত হয়। তাই অমাবস্যাকে কখনও অশুভ ভেবে অবহেলা করা উচিত নয়।
এই দিনে সম্পূর্ণ কালো উড়দ ডাল, কম্বল ইত্যাদি দান শুভ বলে মনে করা হয়। এর ফলে পিতৃলোকের আত্মারা তৃপ্ত হন এবং রাহু-কেতুর অশুভ প্রভাবও প্রশমিত হয় বলে বিশ্বাস।
পাখিদের খাদ্যদান বিশেষ পুণ্যজনক বলে বিবেচিত। কাককে ক্ষীর বা পনিরজাতীয় খাদ্য নিবেদন করাও বহু স্থানে প্রচলিত, কারণ ধর্মীয় বিশ্বাস অনুযায়ী পূর্বপুরুষরা কাকের রূপে এসে সেই অন্ন গ্রহণ করেন। এর মাধ্যমে পরিবারে সুখ, সমৃদ্ধি, যশ ও সাফল্য বৃদ্ধি পায় বলে মনে করা হয়।
বিশেষ করে এই অমাবস্যায় জলাভিষেক, অশ্বত্থ গাছে কাঁচা দুধ অর্পণ, কালো তিল নিবেদন, প্রদীপ প্রজ্বলন, দান-পুণ্য, পিতৃস্মরণ এবং তাঁদের ছবির সামনে সর্ষের তেলের চারমুখী প্রদীপ জ্বালানো শুভ বলে উল্লেখ করা হয়েছে। সাদা ফুল নিবেদন, অশ্বত্থ বৃক্ষরোপণ ও পূজা, হোম-যজ্ঞ এবং পূর্বপুরুষদের প্রিয় খাদ্য দান করাও বিশেষ ফলদায়ক বলে ধরা হয়।
যাঁরা কালসর্প দোষের প্রতিকার করতে চান, তাঁদের জন্য নাগ-নাগিনের বিধিবদ্ধ পূজা করে গঙ্গা বা যমুনায় বিসর্জনের কথাও বলা হয়।
অমাবস্যার রাতে মহালক্ষ্মীর মন্ত্রজপ, গোলাপ ফুল নিবেদন এবং রাত্রিজাগরণ করে পূজা করাও শুভ বলে বিবেচিত।
রাহু-কেতুর কষ্ট থেকে মুক্তির উদ্দেশ্যে জুতো, ছাতা, উড়দ ডাল, সর্ষের তেল, কালো রঙের চটি, চা-পাতা, কম্বল ও বেগুন দান করার কথাও বলা হয়েছে। দরিদ্র মানুষের মধ্যে খাদ্যশস্য, চাল, তেল ও ঋতুভিত্তিক বস্ত্র বিতরণ, গোশালায় দান, গরুকে সবুজ ঘাস, গুড় ও খাদ্য প্রদান এবং ঘি দান করাও পুণ্যস্বরূপ বিবেচিত।
যদি সম্ভব হয়, এই দিনে গঙ্গাস্নান বা গঙ্গায় ডুব দেওয়া অত্যন্ত শুভ বলে বিশ্বাস করা হয় এবং বহু বছরের দুঃখ-কষ্ট দূর হয় বলে লোকবিশ্বাস রয়েছে।
পুরুষোত্তম মাসের সমাপ্তি উপলক্ষে যাঁরা এই মাসে কিছু খাদ্য বা ব্যবহার্য বস্তু ত্যাগ করেছিলেন, তাঁদের সেই বস্তুগুলি দান করার পরামর্শ দেওয়া হয়। যেমন—চটি, ছাতা, বেগুন, চা-পাতা, কম্বল কিংবা যে খাদ্যসামগ্রী ত্যাগ করা হয়েছিল, তা দরিদ্রদের মধ্যে বিতরণ করা। বিশেষভাবে খিচুড়ি বিতরণ এবং ক্ষীর রান্না করে পূর্বপুরুষ ও মহালক্ষ্মীকে নিবেদন করারও পরামর্শ দেওয়া হয়। পিতৃঅর্ঘ্যের জন্য সাধারণ সাদা ক্ষীর এবং মহালক্ষ্মীর নিবেদনের জন্য কেশর মিশ্রিত ক্ষীর অর্পণের কথাও বলা হয়েছে।
সোমবার হওয়ায় মহাদেবের পূজাও এই দিনে বিশেষ ফলদায়ক বলে ধরা হয়। শিবলিঙ্গে দুধ, দই, মধু, চিনি ও ঘি নিবেদন করা শুভ।
এছাড়া সমগ্র গৃহে ঘণ্টা ও শঙ্খধ্বনি করা, লোবানের ধোঁয়া দেওয়া, সমস্ত আলো জ্বালানো, ঘর পরিষ্কার করা, গঙ্গাজল ও গোলাপজল মিশিয়ে মেঝে মোছা, প্রবেশদ্বারে তোরণ ও আমপাতা সাজানো—এসবকেও সৌভাগ্য ও সমৃদ্ধির প্রতীক হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে।
সবশেষে সকল পূর্বপুরুষের প্রতি শ্রদ্ধা ও প্রণাম নিবেদন করে তাঁদের আশীর্বাদ কামনা করা হয়েছে, যাতে জীবনে সুখ, সমৃদ্ধি, যশ, সাফল্য এবং কোনো কিছুর অভাব না থাকে।
#অমাবস্যা #spirituality #spiritualgrowth #spiritualjourney #spiritualawakening
No comments:
Post a Comment