Ami Tarashis Bolchi

Ami Tarashis Bolchi
The blog of Tarashis Gangopadhyay (click the photo to reach our website)

Monday, 15 June 2026

ওঙ্কার সাধনা কিভাবে করতে হয়?

‘ওঁ’কার সাধনা কিভাবে করতে হয়?
 - তারাশিস গঙ্গোপাধ্যায়

আমাদের মধ্যে অনেকেই ‘ওঁ’ জপ করে থাকেন। কিন্তু আপনি কি জানেন, ওঁ জপ করার একটি নির্দিষ্ট সময়, সঠিক দিক এবং সঠিক পদ্ধতি রয়েছে? কখন, কোথায় এবং কোন দিকে মুখ করে ‘ওঁ’ জপ করলে চার গুণ ফল পাওয়া যায়? যার মাধ্যমে এই শক্তিশালী মন্ত্রের চার গুণ শুভ ফল পাওয়া যেতে পারে। এছাড়াও, ওঁ জপ করার সময় এমন ২০টি ভুল আছে, যা কখনোই করা উচিত নয়। জানতে চাইলে পড়ুন এই ধারাবাহিক লেখা।
_________________________

শিষ্য: গুরুদেব, ‘ওঁ’ কে বলা হয় আমাদের সকলের জন্য শক্তির এক বিশাল উৎস। এটা কি সত্যি? ‘ওঁ’-এর বৈজ্ঞানিক দিক কী? এবং ‘ওঁ’-এর জপ আমাদের শরীরের বিভিন্ন অঙ্গ-প্রত্যঙ্গে কীভাবে ইতিবাচক প্রভাব ফেলে?

গুরুদেব: দেখ, ‘ওঁ’ তিনটি অক্ষর নিয়ে গঠিত—অ, উ এবং ম। অ + উ + ম মিলেই ‘ওঁ’ হয়।
‘ওঁ’ কোন মানুষ, কোন ঋষি-মুনি বা কোন দেবতার সৃষ্টি করা মন্ত্র নয়। এই মন্ত্র স্বয়ংপ্রকাশিত। এটি নিজে থেকেই প্রকাশিত হয়েছে।
এই ধ্বনির উৎস হলো অনাহত নাদ। এই অনাহত নাদের উৎপত্তি নাভি থেকে। সেখান থেকেই ওঁ-এর ধ্বনি বেরিয়ে আসে। 

ওঁ হল এক আদিম ও মৌলিক ধ্বনি। এটি উচ্চারণ করার সময়
শরীর ও মস্তিষ্কে এক বিশেষ কম্পনের সৃষ্টি হয়। ‘অ’ ধ্বনি পেট ও বুকে অনুরণন সৃষ্টি করে। ‘উ’ ধ্বনি গলা ও কণ্ঠদেশে পৌঁছয়। আর ‘ম’ ধ্বনি মাথা ও মস্তিষ্কে কম্পন সৃষ্টি করে।

এই কম্পন আমাদের স্নায়ুতন্ত্রকে শান্ত করে। মানসিক চাপ কমায়। তাই ওঁ উচ্চারণ করলে মানসিক শান্তি আসে।
রাগ, বিরক্তি ও অস্থিরতা কমে।
মনোযোগ ও একাগ্রতা বৃদ্ধি পায়।

অনেক বিজ্ঞানীর মতে,
ওঁ ধ্বনির প্রাকৃতিক কম্পাঙ্ক প্রায় ৪৩২ হার্টজ। যা প্রকৃতির নানা স্বাভাবিক শব্দের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। যেমন—
পাখির ডাক, বাতাসের সোঁ সোঁ শব্দ, এবং প্রকৃতির আরও নানা কম্পন।

তাই ওঁ ধ্বনি শুনলে ও উচ্চারণ করলে আমাদের শরীর ও প্রকৃতি যেন একই ছন্দে মিলিত হয়। এর ফলে শরীরের ভারসাম্য বজায় থাকে। মন শান্ত থাকে এবং প্রকৃতির সঙ্গে এক গভীর সংযোগ তৈরি হয়।

হিন্দি বা সংস্কৃতের সমস্ত বর্ণমালার মূল উৎসও এই ওঁ। ক থেকে ক্ষ পর্যন্ত, অ থেকে ঔ পর্যন্ত—সব ধ্বনির মূল উৎস এই ওঁ। কোন ঋষি বা মানুষ এগুলো সৃষ্টি করেননি, এগুলো স্বয়ংপ্রকাশিত।

এ প্রসঙ্গে বলা যায় ভারতে রাধাস্বামী সম্প্রদায় নামে একটি সম্প্রদায় আছে। তাদের প্রধান সাধনাই হলো অনাহত নাদের সাধনা।

শিষ্য : অনাহত নাদের সাধনা বলতে কী বোঝায়?

গুরুদেব : যখন তোমার শরীর সম্পূর্ণ শূন্যতার অবস্থায় স্থির হয়ে যাবে, ইন্দ্রিয়গুলো অন্তর্মুখী হয়ে যাবে, মনও অন্তর্মুখী হয়ে যাবে, আর তোমার চিত্ত সম্পূর্ণ শান্ত হয়ে যাবে -  যাকে বলা হয় ‘কাষ্ঠ-মৌন’ তখন ভিতর থেকে যে নাদ শোনা যায় এ হল অনাহত নাদ।

শিষ্য : এই কাষ্ঠ-মৌন বলতে বোঝায়?

গুরুদেব: যেমন একটি কাঠ কোথাও রেখে দিলে তার নিজের কোন ক্রিয়া থাকে না,
ঠিক তেমনি শরীর, মন ও ইন্দ্রিয় সম্পূর্ণ নিস্তব্ধ ও নিষ্ক্রিয় হয়ে যাবে। কোন চিন্তা থাকবে না। এই অবস্থাকেই কাষ্ঠ-মৌন বলা হয়। তখন নাভির মধ্যে যে ‘ওঁ’-এর ধ্বনি অনবরত ধ্বনিত হচ্ছে, তা নিজের এই কান দিয়েই শোনা যেতে শুরু করবে।
আর এই অবস্থাই ব্রহ্মপ্রাপ্তি। এই অবস্থাই ঈশ্বরপ্রাপ্তি। এই ‘ওঁ’-এর ধ্বনি শুনতে পাওয়াই ঈশ্বরকে উপলব্ধি করা।
এটাই ঈশ্বরের প্রত্যক্ষ বোধ।
এককথায় বলা যায় - যখন মানুষের মন, ইন্দ্রিয় এবং চিত্ত সম্পূর্ণ অন্তর্মুখী হয়ে যায় এবং গভীর নীরব অবস্থায় পৌঁছায়, তখন নাভির সেই ওঁ-ধ্বনি নিজের কানেই শোনা যায়। এটিকেই বলা হয় ঈশ্বর-প্রাপ্তি বা ব্রহ্মজ্ঞান। 

গীতায় একটি শ্লোক আছে—
"এতদ্ দ্বয়মক্ষরং জ্ঞাত্বা ব্রহ্মলোকে মহীয়তে।"
অর্থাৎ, যে এই ‘ওঁ’ শব্দের প্রকৃত জ্ঞান লাভ করে, সে ব্রহ্মকে উপলব্ধি করতে পারে। সে ব্রহ্মের স্বরূপ জানতে পারে। আগেই বলেছি -  আমাদের যত অক্ষর ও যত স্বরচিহ্ন আছে, সবকিছুর উৎপত্তিই এই ‘ওঁ’ থেকে। ‘ওঁ’ অনাহত নাদ থেকে স্বয়ং প্রকাশিত হয়েছে। এবং এই ‘ওঁ’ প্রত্যেক মানুষের মধ্যেই বিদ্যমান। প্রত্যেক নারী ও পুরুষের মধ্যেই এটি রয়েছে।
যে কোন নারী বা পুরুষ যদি ধ্যান ও সাধনার অবস্থায় বসে,
এক-দুই ঘণ্টা নীরব থাকার অভ্যাস করেন, এবং নিজের মন ও ইন্দ্রিয়কে অন্তর্মুখী করার চেষ্টা করেন, তাহলে সাধনার মাধ্যমে তিনি এই ‘ওঁ’-এর ধ্বনি শুনতে পারবেন। ‘ওঁ’-এর ধ্বনি সত্যিই শোনা যায়। তবে এর জন্য কঠোর সাধনার প্রয়োজন।"

শিষ্য: এই ধ্বনি শোনার কোন সহজ উপায় নেই?

গুরুদেব: আরেকটি উপায়ও আছে। বিজয়পুরে রাজা বাবা নামে এক সিদ্ধপুরুষ থাকতেন। শোনা যায়, তিনি নেপালের রাজপরিবারের সদস্য ছিলেন।
ভবঘুরের মতো ঘুরতে ঘুরতে তিনি বিন্ধ্যাচলে এসে পৌঁছেছিলেন। মাত্র ১২-১৩ বছর বয়স থেকেই তিনি সেখানে বহুদিন ছিলেন।
পরে বিজয়পুরের পাহাড়ে নিজের আশ্রম স্থাপন করেন। আজও সেই স্থান ‘রাজা বাবার বাখুলি’ নামে পরিচিত।
রাজা বাবা তাঁর এক বইয়ে লিখেছেন— যদি প্রতিদিন ১২ হাজার বার ‘ওঁ’-এর অজপা জপ করা যায়, এবং টানা এক বছর তা পালন করা যায়,
তাহলে মানুষের হৃদয়ের মধ্যেই ঈশ্বরের দর্শন ঘটে।

শিষ্য: এই অজপা জপ বলতে কি বোঝায়?

গুরুদেব: শ্বাস নেওয়ার সময় মনে মনে ‘ও...’ আর শ্বাস ছাড়ার সময় মনে মনে ‘ম...’ উচ্চারণ। অর্থাৎ— ‘ও... ম...’ ‘ও... ম...’ এইভাবে শ্বাস-প্রশ্বাসের সঙ্গেই জপ চলতে থাকবে। এভাবে প্রতিদিন ১২ হাজার বার জপ করতে হবে। দিনে মাত্র একবার আহার করতে হবে। সেটাও অল্প পরিমাণে। কারও সঙ্গে অপ্রয়োজনীয় মেলামেশা করা যাবে না। নির্জনে থাকতে হবে।
সম্পূর্ণ শুচিতা ও পবিত্রতা বজায় রাখতে হবে। এবং টানা এক বছর এই নিয়ম পালন করতে হবে। তাহলে তাঁর বইয়ের বর্ণনা অনুযায়ী,
মানুষের হৃদয়ের মধ্যেই ঈশ্বরের জ্যোতি প্রকাশিত হবে।

শিষ্য: এখন ১২ হাজার অজপা জপ করতে কত সময় লাগতে পারে?

গুরুদেব: একজন স্বাভাবিক মানুষ গড়ে প্রতি মিনিটে ১৫ বার শ্বাস প্রশ্বাস নেয়। অর্থাৎ এক ঘণ্টায় একজন মানুষের প্রায় ৯০০ বার শ্বাস-প্রশ্বাস হয়।
এর চেয়ে বেশি হলে আয়ু কমে যায়। আর এর চেয়ে কম হলে আয়ু বাড়ে। কারণ শাস্ত্র মতে মানুষের আয়ু শ্বাসের সংখ্যার উপর নির্ভরশীল। তাই আমাদের শাস্ত্রে প্রাণায়ামের উপর এত জোর দেওয়া হয়েছে।

প্রাণায়াম করলে মানুষ দীর্ঘক্ষণ শ্বাস ধরে রাখতে পারে। শ্বাস যত সঞ্চয় হবে, আয়ুও তত বৃদ্ধি পাবে। ৯০০ শ্বাসের হিসাবে যদি ১২,০০০ বার জপের হিসাব করা হয়, তাহলে ১০ ঘণ্টায় প্রায় ৯,০০০ বার সম্পন্ন হবে।
আর বাকি ৩,০০০ বার করতে আরও প্রায় ৪ ঘণ্টা লাগবে।
অর্থাৎ, মোটামুটি ১৪ ঘণ্টার সাধনায় ১২,০০০ বার ওঁ জপ সম্পূর্ণ হতে পারে। যে ব্যক্তি প্রতিদিন ১৪ ঘণ্টা ধরে ওঁ-এর সাধনা করবে, সে যদি এক বছরের মধ্যে ঈশ্বরকে না পায়, তাহলে আর কে পাবে? আমার বিশ্বাস -- অবশ্যই সে ঈশ্বরপ্রাপ্ত হবে। এটাই রাজা বাবার মত।

(চলবে)
(পরের সব অংশ ফেসবুকেনামার প্রোফাইলে পেয়ে যাবেন)

#ওঁকার_সাধনা
#প্রণব_ধ্যান
#অনাহত_নাদের_সন্ধানে
#ওঁকারের_মহাশক্তি
#ব্রহ্মমুহূর্ত_সাধনা
#আত্মজাগরণের_পথে
#অন্তর্নিহিত_দিব্যশক্তি
#spirituality #spiritualawakening

No comments:

Post a Comment