চতুর্থ ভাগ - অস্ত বুধ কি ফল দেয়? আর কি তার প্রতিকার?
- তারাশিস গঙ্গোপাধ্যায়
(পূর্ব প্রকাশিতের পর)
শিষ্য: গুরুদেব, আপনি চন্দ্র ও মঙ্গলের কথা বললেন। এবার কৃপা করে বলুন, কুণ্ডলীতে যদি বুধ গ্রহ অস্ত হয়ে যায়, বিশেষ করে তার অন্তর্দশা চলতে থাকে, তাহলে মানুষের জীবনে কী কী সমস্যা আসে?
গুরু: তাহলে শোন, কুণ্ডলীতে বুধ অস্ত হলে সর্বপ্রথম মানুষের নিজের উপর বিশ্বাস কমে যায়। সে কোনো সিদ্ধান্তই সময়মত নিতে পারে না; সামান্য বিষয়েও দ্বিধাগ্রস্ত হয়ে পড়ে। মনে রেখ, বুধ হল বাকশক্তি ও বুদ্ধির কারক গ্রহ। শাস্ত্রে বলা হয়েছে— “বুধেন বুদ্ধি...” অর্থাৎ বুধের সঙ্গে মানুষের বুদ্ধি, বিচারশক্তি ও প্রকাশক্ষমতার সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে। তাই যখন বুধ ও বৃহস্পতি উভয়েই শুভ ও শক্তিশালী অবস্থায় থাকে, তখন জ্যোতিষে তাকে প্রগল্ভ যোগ বলা হয়। এমন ব্যক্তির মুখে যখন কথা বেরোয়, তখন সমগ্র সভা নীরবে তা শ্রবণ করে; কারণ তার বাক্যে থাকে জ্ঞান, যুক্তি ও প্রভাব। কিন্তু যদি বুধ অস্ত হয়ে যায়, তবে মানুষ সবকিছু বুঝেও নিজের মনের কথা ঠিকভাবে প্রকাশ করতে পারে না। তার বাকশক্তি যেন তাকে মাঝপথেই ত্যাগ করে। আজকের ভাষায় এমন মানুষকে অন্তর্মুখী বা ইন্ট্রোভার্ট বলা হয়। সে নিজের ভেতরেই কষ্ট জমিয়ে রাখে, মানসিক চাপ ও অস্থিরতার মধ্যে জীবন কাটায়।
শিষ্য: গুরুদেব, শুধু মানসিক সমস্যাই কি হয়, নাকি শরীরেও এর প্রভাব পড়ে?
গুরু: অবশ্যই পড়ে, বৎস। বুধ অশুভ বা অস্ত হলে শরীরে নানা ধরনের রোগ দেখা দিতে পারে। শরীরে খিঁচুনি হওয়া, শ্বাসকষ্ট, ত্বকে অ্যালার্জি, ফোড়া হওয়া, এমনকি লিভারের সিরোসিসের মতো জটিল সমস্যারও সম্ভাবনা তৈরি হয়। কারণ বুধই ত্বকের প্রধান কারক গ্রহ। আবার যদি বুধ মৃত্যুভাবে অবস্থান করে এবং পাপগ্রহের প্রভাবে পড়ে, তবে মানুষ হাঁপানিতে আক্রান্ত হতে পারে, গভীর মানসিক অবসাদে ভুগতে পারে এবং আপনজনের মৃত্যুশোক দীর্ঘদিন ধরে বহন করতে হয়। আর যদি বুধ দ্বাদশ ভাব বা দ্বাদশেশের অশুভ প্রভাবে থাকে, তবে সে নেশার কবলে পড়তে পারে কিংবা দীর্ঘস্থায়ী কোনো রোগে আক্রান্ত হতে পারে।
শিষ্য: গুরুদেব, তাহলে এই অশুভ প্রভাব থেকে মুক্তির কোন উপায় কি শাস্ত্রে বলা আছে?
গুরু: নিশ্চয়ই আছে। আমাদের শাস্ত্রে বুধকে শুভ করার বহু প্রতিকার উল্লেখ রয়েছে। নিষ্ঠা, বিশ্বাস ও নিয়ম মেনে সেই প্রতিকারগুলি পালন করলে অবশ্যই উপকার লাভ করা যায়। এবার আমি তোমাকে সেই উপায়গুলিই একে একে বলছি।
গুরু: শোন বৎস, এবার আমরা অস্ত বুধ নিয়ে আলোচনা করব। জন্মকুণ্ডলীতে যদি বুধগ্রহ অস্ত হয়ে যায় এবং সেই সময় তার অন্তর্দশাও চলে, তাহলে মানুষের জীবনে নানা ধরনের মানসিক, শারীরিক ও ব্যবহারিক সমস্যা দেখা দেয়। প্রথম লক্ষণই হলো—নিজের উপর বিশ্বাস কমে যায়। মানুষ সিদ্ধান্ত নিতে দ্বিধাগ্রস্ত হয়ে পড়ে, ছোট ছোট বিষয়েও দীর্ঘ সময় ধরে ভাবতে থাকে, অথচ সঠিক সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারে না। মনে রেখ, বুধ হল বুদ্ধি, বাকশক্তি, যুক্তি, বিশ্লেষণ ক্ষমতা এবং যোগাযোগের কারক গ্রহ। শাস্ত্রে বলা হয়েছে—“বুধেন বুদ্ধি।” অর্থাৎ বুধের সঙ্গেই মানুষের প্রখর বুদ্ধি ও বিচারশক্তির যোগ রয়েছে। তাই যখন জন্মকুণ্ডলীতে বুধ ও বৃহস্পতি উভয়েই শক্তিশালী অবস্থায় থাকে, তখন তাকে প্রগল্ভ যোগ বলা হয়। এমন ব্যক্তি যখন কথা বলেন, তখন সভার সকলেই নীরবে তাঁর কথা শোনে। তাঁর যুক্তি, জ্ঞান ও বাকচাতুর্য মানুষকে মুগ্ধ করে।
কিন্তু যদি বুধ অস্ত হয়ে যায়, তখন ঠিক তার উল্টো ঘটনা ঘটে। মানুষ সবকিছু জেনেও নিজের মনের কথা প্রকাশ করতে পারে না। তার অনুভূতি মুখে আসে না, বাকশক্তি তাকে সহযোগিতা করে না। সে ধীরে ধীরে অন্তর্মুখী হয়ে যায়, নিজের মধ্যেই গুটিয়ে থাকে, অকারণ মানসিক চাপে ভোগে এবং সমাজ থেকে নিজেকে সরিয়ে নিতে শুরু করে।
শিষ্য: গুরুদেব, শুধু মানসিক সমস্যাই কি হয়, নাকি শরীরেও তার প্রভাব পড়ে?
গুরু: অবশ্যই পড়ে, বৎস। বুধ শরীরের ত্বক, স্নায়ু, শ্বাসপ্রশ্বাস ও সঞ্চালন ব্যবস্থার প্রধান কারক। তাই বুধ দুর্বল বা অস্ত হলে শরীরে টান ধরা, স্নায়ুর অস্বস্তি, শ্বাসকষ্ট, হাঁপানি, ত্বকে অ্যালার্জি, চর্মরোগ, এমনকি লিভারের সিরোসিসের মতো রোগের সম্ভাবনাও তৈরি হতে পারে। যদি অস্ত বুধ অষ্টমভাব বা মৃত্যুভাবের অশুভ প্রভাবে অবস্থান করে, তাহলে ব্যক্তি হাঁপানি, দীর্ঘস্থায়ী শ্বাসরোগ এবং মানসিক অবসাদে আক্রান্ত হতে পারে। জীবনে প্রিয়জনের মৃত্যুশোকও তাকে গভীরভাবে নাড়া দেয়। আবার যদি বুধ দ্বাদশভাবের প্রভাবে পড়ে, তাহলে মানুষ নেশায় আসক্ত হতে পারে অথবা দীর্ঘস্থায়ী রোগের কবলেও পড়তে পারে। তাই সময়মতো বুধের দোষের প্রতিকার করা অত্যন্ত প্রয়োজন। আমি এখন তোমাকে এমন কিছু উপায় বলব, যা শাস্ত্রে বহুদিন ধরে পরীক্ষিত এবং যথাযথভাবে পালন করলে অবশ্যই তার সুফল পাওয়া যায়।
শিষ্য: গুরুদেব, তাহলে সেই প্রতিকারগুলো আমাকে দয়া করে বিস্তারিতভাবে বলুন।
গুরু: মন দিয়ে শোন। বুধবার ভিজিয়ে রাখা গোটা মুগ পাখিদের খাওয়াবে। নিজের কাছে একটি সবুজ রঙের রুমাল রাখবে। বুধবার গরুকে গুড় মিশিয়ে রুটি খাওয়াবে। সেই দিন মা দুর্গার মন্দিরে গিয়ে ভক্তিভরে পূজা করবে। জীবনে কখনও পিসি, বোন, কন্যা বা গুরুমার প্রতি অন্যায় করবে না।
সুযোগ থাকলে দুর্গাসপ্তশতী পাঠ করবে। বাড়ির পূজাঘরে রূপোর তৈরি মা দুর্গা, মা লক্ষ্মী ও গণেশের মূর্তি প্রতিষ্ঠা করবে। মায়ের জাগরণ আয়োজন করবে অথবা সেই জাগরণে সেবার মাধ্যমে অংশ নেবে।
বুধবার ফিটকিরি দিয়ে দাঁত পরিষ্কার করা শুভ বলে মানা হয়। নারীদের ক্ষেত্রে বাম নাসিকা ছিদ্র করানোও শাস্ত্রে বুধের শুভতার জন্য উপকারী বলা হয়েছে।
শিষ্য: গুরুদেব, এর থেকেও কি আরও শক্তিশালী কোন প্রতিকার আছে?
গুরু: আছে, এবং এটিকে আমি সবচেয়ে কার্যকর প্রতিকার বলে মনে করি। গণেশ চতুর্থীর দিনে সাদা রঙের শ্রীগণেশের একটি মূর্তি বাড়িতে এনে বৈদিক নিয়মে পূজা করবে।
এক বা দুইজন ব্রাহ্মণকে আহ্বান করবে। তারপর এক হাজারটি লাড্ডু এবং এক হাজারটি দুর্বা ঘাসের অগ্রভাগ প্রস্তুত রাখবে। একটি পিতলের বড় পাত্রের সামনে শ্রীগণেশকে প্রতিষ্ঠা করে তাঁর এক-একটি নাম উচ্চারণের সঙ্গে এক-একটি লাড্ডু ও এক-একটি দুর্বা নিবেদন করবে। এভাবে এক হাজার নামের সঙ্গে এক হাজার লাড্ডু ও এক হাজার দুর্বা অর্পণ করবে। বছরে মাত্র একবার এই সাধনা নিয়ম করে করলে ছাত্রজীবন, ব্যবসা, চাকরি বা জীবনের যে ক্ষেত্রেই থাকো না কেন, আশ্চর্য পরিবর্তন অনুভব করবে। যেমন শরীরে বিঁধে থাকা কাঁটা বেরিয়ে গেলে মুহূর্তে স্বস্তি আসে, তেমনি এই উপায়ও জীবনের বহু বাধা দূর করে দেয়। পরে সেই লাড্ডুগুলো আত্মীয়স্বজন, বন্ধু ও ভক্তদের মধ্যে প্রসাদ হিসেবে বিতরণ করবে।
শিষ্য: গুরুদেব, যদি কারও পক্ষে এত বড় আয়োজন করা সম্ভব না হয়?
গুরু: তাহলেও হতাশ হবে না। মনে রেখ, রোগ যেমন ভিন্ন ভিন্ন হয়, ওষুধও তেমন ভিন্ন হয়। সাধারণ জ্বরের ওষুধে যেমন ক্যান্সার ভালো হয় না, তেমনি বড় কর্মদোষের জন্য বড় সাধনাও প্রয়োজন হয়। অনেক সময় মানুষ ছোটখাটো প্রতিকার করে ফল না পেয়ে দেবদেবীর উপরই সন্দেহ করতে শুরু করে। কিন্তু প্রকৃত ফল তখনই আসে, যখন নিজের প্রারব্ধ অনুযায়ী নিষ্ঠা ও বিশ্বাস নিয়ে সাধনা করা হয়। যদি বড় আয়োজনের সামর্থ্য না থাকে, তবে প্রতিদিন সকাল পাঁচবার ও সন্ধ্যায় পাঁচবার রামরক্ষা স্তোত্র পাঠ করবে এবং শ্রীরাম দরবারের নিয়মিত পূজা করবে। এই সাধনা ছয় মাস নিষ্ঠার সঙ্গে পালন করলে জীবনেও শুভ পরিবর্তন আসতে শুরু করবে।
(ক্রমশ)
#astrology #astrologyposts #জ্যোতিষ
#astrologer
খুব উপকৃত হলাম। ধন্যবাদ।
ReplyDelete