" জানেন কি শুধু 'রাম' নাম উচ্চারণ করলেই হনুমানজী আপনার পাশে এসে দাঁড়ান? জানেন কি কোন মন্ত্রে দূর হয় ভয়, শনি দোষ ও জীবনের বাধা? শাস্ত্রসম্মত ব্যাখ্যা ও বিরল কাহিনি জানুন এই বিশেষ আলোচনায়।"
_____________________
শ্রীহনুমানজীর কৃপা আজও ঘটে
তারাশিস গঙ্গোপাধ্যায়
আমি প্রায়ই একটি কথা বলি—ভারতবর্ষে প্রতিদিন হনুমানজী তাঁর ভক্তদের সাহায্য করতে আবির্ভূত হন। কথাটা শুনে অনেকেরই বিস্ময় জাগবে। কিন্তু একটু নিজের জীবনের দিকে তাকিয়ে দেখুন তো। হয়তো কোনও একদিন আপনি ভীষণ বিপদে পড়েছিলেন। চারপাশে সাহায্য করার মতো কেউ ছিল না। ঠিক সেই সময় কোথা থেকে যেন একজন বৃদ্ধ এসে আপনাকে সাহায্য করলেন। কখনও হয়তো একজন যুবক, কখনও বা একেবারেই অচেনা কোনও মহিলা। আপনার কাজ শেষ হতেই তিনি যেন হাওয়ায় মিলিয়ে গেলেন। আপনি আর তাঁকে খুঁজে পেলেন না।
আমি বিশ্বাস করি, আমাদের জীবনে এমন অনেক ঘটনা ঘটে, অথচ আমরা বুঝতেই পারি না—তিনি আর কেউ নন, স্বয়ং হনুমানজীই অন্য কোনও রূপ ধারণ করে আমাদের সাহায্য করে চলে গেছেন। বিশেষ করে যদি কখনও নির্জন স্থানে, অসহায় অবস্থায়, হৃদয়ের সমস্ত আকুতি দিয়ে আপনি হনুমানজীকে ডাকেন, তাহলে তাঁর কৃপা কোনও না কোনও রূপে আপনার কাছে পৌঁছবেই। তিনি কীভাবে আসবেন, কোন রূপে আসবেন, তা আমরা জানি না। কিন্তু তাঁর কৃপা কখনও ব্যর্থ হয় না।
এই প্রসঙ্গে আমি একটি কাহিনী বলছি আজ। ঘটনাটি জড়িয়ে আছে গোস্বামী তুলসীদাসজীর জীবনের সঙ্গে।
যখন গোস্বামী তুলসীদাসজী সাতাত্তর বছর বয়সে রামচরিতমানস রচনা করেছিলেন, সেই সময় একদিন তিনি ভক্তদের সামনে শ্রীরামকথা বলছিলেন। অসংখ্য মানুষ মুগ্ধ হয়ে তাঁর মুখ থেকে শ্রীরামের লীলা শুনছিলেন। চারদিকে এক অপূর্ব ভক্তিময় পরিবেশ।
হঠাৎ সেই সময় এক অত্যন্ত সুন্দরী নারী ঘোড়ার গাড়ি থেকে নেমে এসে সকলের সামনে উচ্চস্বরে বলে উঠলেন, “পণ্ডিতজী! এতদিন কোথায় ছিলেন? অনেকদিন আমাদের কোঠায় আসছেন না!”
কথাটি শুনে উপস্থিত মানুষের মধ্যে গুঞ্জন শুরু হয়ে গেল। অনেকে মনে মনে ভাবল—তাহলে তুলসীদাসজী বুঝি পতিতালয়েও যেতেন! মুহূর্তের মধ্যেই অর্ধেক শ্রোতা সভা ছেড়ে চলে গেলেন।
কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়, তুলসীদাসজীর মুখে কোনও পরিবর্তন এল না। তিনি যেন কিছুই শোনেননি। সম্পূর্ণ নির্বিকারভাবে তিনি শ্রীরামকথা বলে যেতে লাগলেন।
পরের দিনও যথারীতি তিনি শ্রীরামকথা বলতে বসেছেন। ভক্তরাও আবার জড়ো হয়েছেন। এমন সময় একজন মদ বিক্রেতা সেখানে এসে তাঁকে প্রণাম করে বলল,
“মহারাজ, আজকাল আর আমাদের দোকানে আসেন না কেন? আপনার কাছে এখনও কিছু টাকা পাওনাও আছে।”
এই কথা শুনে আরও অনেকের মনে সন্দেহ জন্মাল। তারা ভাবল—তাহলে ইনি মদও পান করেন! আরও অনেক মানুষ সভা ছেড়ে চলে গেলেন। কিন্তু তুলসীদাসজী তখনও নির্বিকার। তাঁর কণ্ঠে শুধু রামকথার ধারা প্রবাহিত হতে লাগল।
তৃতীয় দিনের ঘটনাটি আরও আশ্চর্য। সেদিনও তিনি যথারীতি রামকথা বলছেন। ঠিক তখনই একজন ব্যক্তি কয়েকটি ছাগল নিয়ে সেই পথ দিয়ে যাচ্ছিল। তুলসীদাসজীকে দেখে সে হেসে বলল, “মহারাজ, অনেকদিন হলো আপনি আর মাংস নেন না। আপনার সেবা করার সুযোগই হচ্ছে না!”
এবার উপস্থিত প্রায় সবাই এক সিদ্ধান্তে পৌঁছে গেল। তারা ভাবল—এই ব্যক্তি তো পতিতালয়ে যায়, মদও খায়, আবার মাংসও খায়! একে একে সবাই সভা ছেড়ে চলে গেল।
শেষ পর্যন্ত সভায় মাত্র একজন মানুষ বসে রইলেন।তুলসীদাসজী শান্তভাবে তাঁর দিকে তাকিয়ে বললেন,“সবাই চলে গেল, আপনি এখনও বসে আছেন কেন? আপনিও যান।”
লোকটি মৃদু হেসে বলল, “আমি কেন যাব? এই কাহিনি তো আমার জন্যই হচ্ছে।”
তুলসীদাসজী বিস্মিত হয়ে তাঁর দিকে তাকিয়ে রইলেন।
তারপর সেই ব্যক্তি নিজের প্রকৃত পরিচয় দিলেন। তিনি বললেন, “আমি শ্রীরামভক্ত হনুমান।”
এরপর তিনি তুলসীদাসজীকে বললেন, “এগুলো ছিল কলিযুগের তিনটি রূপ—কাম, মদ ও ভোগের মোহ। আজ আমি তোমাকে একটি বর দিচ্ছি। যেখানে তোমার শ্রীরামকথা হবে, সেখানে কলিযুগ কখনও প্রবেশ করতে পারবে না।”
এই কারণেই আজও বিশ্বাস করা হয়, যেখানে ভক্তিভরে শ্রীরামকথা হয়, সেখানে হনুমানজী স্বয়ং উপস্থিত থাকেন এবং কোনও অশুভ শক্তি সেই স্থানে প্রবেশ করতে পারে না।
হনুমানজী মন্ত্রের জন্য ততটা ব্যাকুল নন, তার থেকেও অনেক বেশি ব্যাকুল শ্রীরামের নাম শোনার জন্য। আপনি যদি একান্ত আন্তরিকতার সঙ্গে শুধু বলেন—“রাম... রাম...” তাহলেই হনুমানজী আপনার প্রতি আকৃষ্ট হবেন। যেমন “রাধা রাধা” শুনলে শ্রীকৃষ্ণ ছুটে আসেন, তেমনই “রাম রাম” শুনলে হনুমানজী ছুটে আসেন।
তবুও শাস্ত্রে হনুমানজীর বহু শক্তিশালী মন্ত্রের উল্লেখ রয়েছে। তাদের মধ্যে একটি প্রধান বীজমন্ত্র হল—
ॐ हं हनुमते नमः
বাংলা উচ্চারণ—
“ওঁ হং হনুমতয়ে নমঃ।”
এই মন্ত্র যদি নিয়মিত জপ করা যায়, তাহলে মানুষের জীবনে বহু পরিবর্তন আসে। জীবনে বিনয় আসে। সাহস বৃদ্ধি পায়। প্রতিকূল পরিস্থিতিতেও বিজয়ী হওয়ার শক্তি লাভ হয়। ভূত-প্রেত, অশুভ শক্তি এবং নেতিবাচক চিন্তা দূরে সরে যায়। রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি পায়। শরীরে ইতিবাচক শক্তির সঞ্চার হয়। আত্মবিশ্বাস বাড়ে। দীর্ঘায়ু লাভ হয়। শনি, রাহু, মঙ্গল ও কেতুর অশুভ প্রভাব অনেকটাই প্রশমিত হয়। ঋণ, কষ্ট এবং মানসিক দুশ্চিন্তাও ধীরে ধীরে কমতে শুরু করে।
তবে এখানে একটি বিষয় অবশ্যই মনে রাখতে হবে। শুধু মন্ত্র জপ করলেই হবে না। হনুমানজীর উপাসনা করতে হলে নিজের চরিত্রও শুদ্ধ রাখতে হবে।
আমি বলছি না যে আপনাকে সংসার ছেড়ে সন্ন্যাস নিতে হবে। আমি শুধু বলছি, সংসারে থেকেই যদি শাস্ত্রসম্মত, নৈতিক এবং সংযমী জীবনযাপন করতে পারেন, তাহলে হনুমানজীর কৃপা সর্বদা আপনার ওপর বিরাজ করবে। তিনি গৃহত্যাগ চান না। তিনি চান—সৎ চরিত্র, সত্যবাদিতা, সংযম এবং শ্রীরামের প্রতি অটল ভক্তি।
এই চারটি গুণ যদি জীবনে ধারণ করতে পারেন, তাহলে বিশ্বাস রাখুন, হনুমানজীর কৃপা কোনও না কোনও রূপে আপনার জীবনকে স্পর্শ করবেই।
লেখাটি ভালো লাগলে কমেন্ট সেকশনে লিখবেন -- "জয় হনুমানজী।" আর মন চাইলে ভক্ত বন্ধুদের জন্যে শেয়ার করতে পারেন)
ক্রমশ
(পরের ভাগে থাকবে—হনুমানজীর বীজমন্ত্রের বিস্তারিত ব্যাখ্যা, সূর্যোদয়ে জপের নিয়ম, মূল মন্ত্র "শ্রী হনুমতয়ে নমঃ" ২৪ মিনিট জপের গুরুত্ব এবং শনিদেব ও হনুমানজীর বিখ্যাত কাহিনি।)
#HanumanJi
#JaiShriRam
#হনুমানমন্ত্র
#Bajrangbali
#SanatanDharma
#SpiritualWisdom
#Bhakti
#তারাশিসগঙ্গোপাধ্যায়
No comments:
Post a Comment