"অস্ত শুক্র—একটি গ্রহ, যা নীরবে কেড়ে নিতে পারে প্রেম, দাম্পত্য, বিলাসিতা ও সুখ! জানুন আপনার কুণ্ডলীতে এর প্রভাব।"
ষষ্ঠ ভাগ: অস্ত শুক্র কি ফল দেয়? আর কি তার প্রতিকার ?
__________________________
(পূর্ব প্রকাশিতের পর)
গুরু: শোন বৎস, এবার আমরা শুক্রগ্রহ সম্পর্কে আলোচনা করব। জ্যোতিষশাস্ত্রে শুক্রকে ভৌতিক সুখ, সম্পদ, ঐশ্বর্য, সৌন্দর্য, দাম্পত্য জীবন এবং ভোগবিলাসের প্রধান কারক গ্রহ বলা হয়। কিন্তু যদি জন্মকুণ্ডলীতে শুক্র অস্ত হয়ে যায়, তাহলে মানুষের জীবনে নানা ধরনের দুঃখ, রোগ ও অভাব দেখা দেয়। আজ আমি তোমাকে সেই বিষয়ই বোঝাব।
শিষ্য: গুরুদেব, শুক্র কেন এত গুরুত্বপূর্ণ গ্রহ বলে গণ্য হয়?
গুরু: মহর্ষি পরাশর বলেছেন, শুক্র শুধু ঐশ্বর্য ও সৌন্দর্যেরই কারক নন, তিনি চক্ষু, দাম্পত্য সুখ, অলংকার, যানবাহন, ভোগসামগ্রী ও পার্থিব সুখেরও অধিপতি। তাই যদি কারও জন্মকুণ্ডলীতে সূর্য ও শুক্র একই ডিগ্রিতে অবস্থান করে এবং তারা দ্বিতীয় বা দ্বাদশ ভাবে যুক্ত থাকে, তাহলে অনেক সময় সেই শিশু জন্ম থেকেই দৃষ্টিশক্তিহীন হতে পারে। আবার যদি দ্বাদশভাবে সূর্য ও শুক্রের যুগে শুক্র অস্ত হয়, তবে ডান চোখ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। আর যদি দ্বিতীয়ভাবে শুক্র অস্ত হয়, তবে বাম চোখে সমস্যা দেখা দিতে পারে। অনেক ক্ষেত্রেই পাঁচ-ছয় বছর বয়স থেকেই সেই শিশুর চশমা পরার প্রয়োজন হয়।
শিষ্য: গুরুদেব, শুক্র অস্ত হলে দাম্পত্য জীবনে কী প্রভাব পড়ে?
গুরু: যদি শুক্রের মহাদশা বা অন্তর্দশায় শুক্র অস্ত থাকে, তবে স্ত্রীর শরীরে বিভিন্ন রোগ দেখা দিতে পারে, বিশেষ করে নারীদের বিশেষ রোগে ভুগতে হয়। সেই ব্যক্তিও চোখের রোগ ও চর্মরোগে আক্রান্ত হতে পারে। যদি অস্ত শুক্র রাহু বা কেতুর অশুভ প্রভাবে পড়ে, তবে মানুষের সম্মান-প্রতিষ্ঠা নষ্ট হতে পারে। কিডনির অসুখ বা ডায়াবেটিসও দেখা দিতে পারে। আবার শুক্রের সঙ্গে শনির অন্তর্দশা এলে কিডনির রোগের আশঙ্কা আরও বেড়ে যায়। বহু ক্ষেত্রেই কিডনির গুরুতর সমস্যা শুক্র ও শনির যুগ্ম প্রভাব ছাড়া সৃষ্টি হয় না।
শিষ্য: গুরুদেব, আর কী কী সমস্যা হতে পারে?
গুরু: যদি অস্ত শুক্র আরও অশুভ প্রভাবে আক্রান্ত হয়, তবে মূত্রাশয়ের রোগ দেখা দেয়। অনেকের ফোঁটা ফোঁটা করে প্রস্রাব হয়, পুরুষদের প্রোস্টেট গ্রন্থি বড় হয়ে যায়। মহিলাদের ক্ষেত্রেও অনিচ্ছাকৃতভাবে বারবার প্রস্রাব হয়ে যেতে পারে। চর্মরোগও শুক্রদোষের অন্যতম লক্ষণ। এমনকি অনেকের বৈবাহিক জীবন ঠিকমতো শুরুই হতে পারে না। আবার অনেক ক্ষেত্রে সন্তানের প্রাপ্তিও বিলম্বিত হয় বা বাধাগ্রস্ত হয়।
শিষ্য: গুরুদেব, এর প্রতিকার কী?
গুরু: এমন অবস্থায় অবশ্যই শুক্রগ্রহের শান্তি করানো উচিত। বৈদিক নিয়মে শুক্রের মন্ত্র ৭২,০০০ বার জপ করাতে হয় এবং তা ১৮ জন ব্রাহ্মণ দ্বারা একদিনে সম্পন্ন করানো শ্রেয়। এরপর হোম, তর্পণ, মার্জন এবং ব্রাহ্মণ ভোজনের আয়োজন করতে হয়। তবে মনে রেখো, যদি একবার এই সাধনায় ফল না পাও, তাহলে হতাশ হবে না। শুক্র যদি অত্যন্ত দুর্বল বা গভীরভাবে অস্ত হয়ে থাকে, তাহলে দুইবার, তিনবার, এমনকি চারবারও এই উপাসনা করতে হতে পারে।
শিষ্য: গুরুদেব, অস্ত শুক্রের দোষ থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য আর কী কী করণীয়?
গুরু: সর্বপ্রথম ক্রোধ, অহংকার, অতিরিক্ত উত্তেজনা এবং নিয়ন্ত্রণহীন কামনা-বাসনা থেকে নিজেকে দূরে রাখবে। এগুলিই শুক্রকে সবচেয়ে বেশি দুর্বল করে।
শিষ্য: আর দৈনন্দিন জীবনে কী পালন করব, গুরুদেব?
গুরু: প্রতিদিন সকালে টাটকা মিষ্টি দই অল্প পরিমাণে গ্রহণ করবে। শিবমন্দিরে মিষ্টি দই নিবেদন করবে।
শিষ্য: শুক্রবারে বিশেষ কোন নিয়ম আছে?
গুরু: অবশ্যই। শুক্রবার গরুকে রুটির উপর ক্ষীর রেখে খাওয়াবে। এটি শুক্রকে সন্তুষ্ট করে।
শিষ্য: আর কী ধারণ করা উচিত?
গুরু: নিজের কাছে একটি সাদা রেশমের রুমাল রাখবে। যতটা সম্ভব পরিষ্কার, উজ্জ্বল, সাদা বা হালকা রঙের পোশাক পরবে।
শিষ্য: সুগন্ধি ব্যবহার করাও কি উপকারী?
গুরু: হ্যাঁ। পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন থাকবে এবং সুগন্ধি ব্যবহার করবে। এতে শুক্রের অশুভ প্রভাব অনেকটাই প্রশমিত হয়।
শিষ্য: নারীদের জন্য কোন বিশেষ নির্দেশ আছে?
গুরু: নারীরা কাঁচের চুড়ি পরবে। এটি শুক্রকে শক্তিশালী করে।
শিষ্য: কর্মস্থল থেকে বাড়ি ফেরার সময়?
গুরু: বাড়ি ফিরলে পরিবারের জন্য সামান্য হলেও কোন মিষ্টি নিয়ে আসবে। এতে সংসারে সৌহার্দ্য ও ঐশ্বর্য বৃদ্ধি পায়।
শিষ্য: দান সম্পর্কে কী বলবেন?
গুরু: দেশী ঘি, মিছরি ও ক্ষীর ধর্মস্থানে দান করবে। আর কাজে বেরোনোর আগে সামান্য মিছরি মুখে দিয়ে বেরোবে।
শিষ্য: গৃহমন্দিরে কিছু স্থাপন করা যায়?
গুরু: অবশ্যই। পঞ্চধাতু নির্মিত ব্রহ্মা, বিষ্ণু ও মহেশ্বরের মূর্তি গৃহমন্দিরে প্রতিষ্ঠা করতে পারো।
গুরু: কিন্তু বৎস, যদি তুমি আজীবনের জন্য প্রকৃত ঐশ্বর্য ও সৌভাগ্য লাভ করতে চাও, তবে আমি তোমাকে এমন একটি উপায় বলব, যা পালন করলে জীবনে সত্যিই পরিবর্তন আসতে পারে।
শিষ্য: গুরুদেব, সেই সর্বশ্রেষ্ঠ উপায়টি কী?
গুরু: ভগবতী দুর্গার আরাধনায় সম্পূর্ণভাবে নিজেকে সমর্পণ কর। কোন যোগ্য ও বিদ্বান আচার্যের কাছে দুর্গা সপ্তশতী পাঠের সম্পূর্ণ বিধি শিখে নাও।
তারপর প্রতিদিন সম্পূর্ণ দুর্গা সপ্তশতী পাঠ করার চেষ্টা করবে।
শিষ্য: গুরুদেব, প্রতিদিন তো সবার পক্ষে সম্ভব হয় না।
গুরু: তাতে নিরাশ হবে না। প্রতিদিন না পারলে প্রতি মাসের শুক্লপক্ষ ও কৃষ্ণপক্ষের অষ্টমী, নবমী ও চতুর্দশী তিথিতে অবশ্যই পাঠ করবে।
শিষ্য: আর নবরাত্রির সময়?
গুরু: চারটি নবরাত্রি—আশ্বিন, চৈত্র, মাঘ ও আষাঢ়—এই চার নবরাত্রিতেই দুর্গা সপ্তশতী পাঠ করবে। এর মধ্যে দুটি গুপ্ত নবরাত্রি এবং দুটি প্রকাশ্য নবরাত্রি।
শিষ্য: এতে কী ফল হবে গুরুদেব?
গুরু: বছরে মোট প্রায় একশোবার পাঠ সম্পূর্ণ হয়ে যাবে। এটিই বার্ষিক শতচণ্ডী সাধনার সমতুল্য। তখন তোমার জীবনে সাফল্যের পতাকা আকাশে উড়বে—এ কথা নিশ্চিত জেনে রাখ।
ক্রমশ
#অস্ত_শুক্র #শুক্রগ্রহ #Venus #Horoscope #Kundli #Spirituality #Jyotish #Zodiac # #বাংলা_জ্যোতিষ
No comments:
Post a Comment