Ami Tarashis Bolchi

Ami Tarashis Bolchi
The blog of Tarashis Gangopadhyay (click the photo to reach our website)

Tuesday, 19 March 2024

সত্যের আলোয় বাল্মীকির রামায়ণ। - তারাশিস গঙ্গোপাধ্যায় দুই - শ্রীরামের ধরাধামে আবির্ভাব প্রসঙ্গ এবং রামায়ণ যে আর্য অনার্যের যুদ্ধ নয় তার প্রমাণসহ বিশদ আলোচনা।

সত্যের আলোয় বাল্মীকির রামায়ণ।
           - তারাশিস গঙ্গোপাধ্যায়

লেখকের website -  https://www.tarashisgangopadhyay.in/

 
     দুই - (সর্গ ৫ - ১৮)  শ্রীরামের ধরাধামে আবির্ভাব প্রসঙ্গ এবং রামায়ণ যে আর্য অনার্যের যুদ্ধ নয় তার প্রমাণসহ বিশদ আলোচনা।

*                 *                *

    শ্রীরামচন্দ্র অশ্বমেধ যজ্ঞের সভায় সানন্দে চেয়ে থাকেন তাঁর প্রতিবিম্বস্বরূপ দুই বালক লব কুশের দিকে। নৃপতির স্নেহদৃষ্টিতে মুগ্ধ হয়ে শ্রীরামের দিকে চেয়ে লব কুশও শুরু করেন মধুর কণ্ঠে রামায়ণ গান -

যাঁদের বংশে সগর রাজা জন্মেছিলেন, যাঁর গমনকালে ষাট হাজার পুত্র অনুগমন করতেন, যিনি সাগর খনন করিয়েছিলেন, সেই ইক্ষাকুদের বংশ এই রামায়ণে কীর্তিত হয়েছে। আমরা ধর্ম-কাম-অর্থ যুক্ত এই আখ্যান আদ্যন্ত গান করব। আশা করব আপনারা সবাই অসূয়াশূন্য হয়ে এই গান শুনবেন।

সরযূতীরে কোশল নামে এক আনন্দময় সমৃদ্ধিশালী  ধনধান্য- সম্পন্ন বিরাট জনপদ আছে। তার রাজধানী হল অযোধ্যা। স্বয়ং মানবেন্দ্র মনু এই পুরী নির্মাণ করেছিলেন। এই সুদৃশ্য মহানগরী দ্বাদশ যোজন দীর্ঘ, তিন যোজন বিস্তৃত এবং প্রশস্ত মহাপথ  ও রাজমার্গে  সুবিভক্ত। এই সকল পথ বিকশিত পুষ্পে অলংকৃত এবং নিত্য জলসিক্ত। রাজা দশরথ অমরাবতীতে ইন্দ্রের মতই এই অযোধ্যায় বাস করতেন। এই শ্রীসম্পন্ন অতুলপ্রভাসমন্বিত পুরী উঁচু উঁচু অট্টালিকা ও ধ্বজাসমূহে শোভিত। এখানে বহু স্থানে পুরনারীদের জন্য নাট্যশালা, উদ্যান ও আমবন আছে। নগরীর চতুর্দিক শালবনে বেষ্টিত। দুর্গম গভীর পরিখা থাকায় সেখানে অন্যের প্রবেশ দুঃসাধ্য। 

     সেই অযোধ্যায় বেদজ্ঞ দূরদর্শী মহাতেজস্বী রাজা দশরথ রাজত্ব করতেন। সেখানকার লোকেরা সুখী, ধর্মপরায়ণ, শাস্ত্রজ্ঞ, নির্লোভ ও সত্যবাদী ছিল। অযোধ্যায় কামাসক্ত, নীচ প্রকৃতির নৃশংস পুরুষ, অবিদ্বান,  নাস্তিক, মিথ্যাবাদী, অল্পশাস্ত্রজ্ঞ, অসূয়াপরবশ বা অসমর্থ কেউ ছিল না।
   দশরথ দক্ষতার সঙ্গে রাজ্য শাসন করতেন । তাই তাঁর রাজ্যে শান্তি ও সমৃদ্ধি বজায় থাকত। রাজগুরু ঋষি বশিষ্ঠ এবং ঋষি বামদেবের সৎ পরামর্শ রাজাকে সৎপথে রাজ্যশাসন করতে সাহায্য করত। দশরথের মন্ত্রীরা ছিলেন তীক্ষ্ণ বুদ্ধিমত্তার অধিকারী এবং  নীতি, অর্থনীতি ও প্রশাসনের বিশেষজ্ঞ। তাঁরা জানতেন কিভাবে কোষাগার  সমৃদ্ধ করতে হয়, সেনাবাহিনীকে ভালভাবে পরিচালনা করতে হয় এবং গোপনীয়তা বজায় রাখতে হয়। অযোধ্যার বিচার ব্যবস্থা বড় ভাল ছিল। সেখানে কখনো দোষীদের ছাড়া হত না এবং নিরপরাধ কখনো শাস্তি পেত না। এমনই ছিল অযোধ্যার খ্যাতি ও জাঁকজমক। এহেন অমরাবতীতুল্য অযোধ্যার রাজা দশরথ সম্পর্কে বলা হত যে তিনি ছিলেন একজন 'রাজর্ষি'। 
   এই রামগানকে কেন্দ্র করেই বাল্মীকি তুলে ধরেন শ্রীরামের বংশপরিচয়।
    যদিও রামায়ণের মূল কাহিনী মূলতঃ শ্রীরামের জীবনকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হয়েছে, ঋষি বাল্মীকি মহাকাব্যে তাঁর  পূর্বপুরুষদের বিশদভাবে উল্লেখ করেছেন। রামায়ণে শ্রীরামের বংশের কথা এই রামগান ছাড়াও ঋষি বশিষ্ঠ দুবার বর্ণনা করেছেন  - প্রথমে শ্রীরাম ও সীতার বিয়েতে এবং তারপর আবার চিত্রকূটে, যখন ভরত শ্রীরামকে অযোধ্যায় ফিরিয়ে নিয়ে যাবার জন্যে রাজি করাতে চেষ্টা করছিলেন।
    অযোধ্যার এই  রাজবংশের সবচেয়ে বিখ্যাত পূর্বপুরুষ ছিলেন মনুর পুত্র এবং বিবস্বান তথা সূর্যের নাতি রাজা ইক্ষ্বাকু ; সূর্যের নাতি হওয়ায় ইক্ষ্বাকুর বংশকে সূর্যবংশ বা সৌর রাজবংশ বলা হত।  আবার ইক্ষ্বাকুর নাম অনুসারে তাঁর বংশের নাম সুবিখ্যাত ছিল ইক্ষ্বাকু বংশরূপে।  
     ইক্ষ্বাকু রাজবংশের আরেক মহান রাজা রঘুর নাম অনুসারে তাঁর রাজবংশকে রঘুবংশও বলা হয়।  ইক্ষ্বাকুর অন্যান্য বিখ্যাত বংশধর এবং শ্রীরামের পূর্বপুরুষরা হলেন  ত্রিশঙ্কু, সগর, দিলীপ, ভগীরথ, কাকুস্থ, প্রবৃদ্ধ এবং দশরথ। এই রাজবংশের রাজা ভগীরথের মাধ্যমেই পৃথিবীতে গঙ্গা নদীর অবতরণ হয়েছে। অর্থাৎ দশরথের বংশ যে সেইসময়কার সবচেয়ে সমৃদ্ধ বংশ ছিল তা বোঝাই যাচ্ছে।
    কিন্তু নামখ্যাতি যশ অর্থ সুখ সব থাকলেও রাজা দশরথের ছিল না কোন পুত্রসন্তান। তাই তাঁর মন এক অব্যক্ত অশান্তিতে পূর্ণ থাকত। তবে সব সমস্যার সমাধান তো থাকেই। এক্ষেত্রেও ব্যাতিক্রম হল না। মন্ত্রীদের পরামর্শে তিনি অশ্বমেধ তথা পুত্রেষ্টি যজ্ঞ করবেন বলে মনস্থ করেন। এই যজ্ঞে পৌরহিত্য করার জন্য তিনি তাঁর সুহৃদ রাজা লোমপাদের সঙ্গে দেখা করে তাঁর জামাই ঋষি ঋষ্যশৃঙ্গকে সস্ত্রীক আমন্ত্রণ জানালেন অযোধ্যায়। ঋষিও সানন্দে সম্মত হলেন।
   যথাসময়ে ঋষ্যশৃ‌ঙ্গকে সঙ্গে নিয়ে দশরথ অযোধ্যায় প্রবেশ করলেন। ঋষ্যশৃঙ্গের আগমনে অযোধ্যাবাসীরা অত্যন্ত আনন্দিত হ'ল। 
যথাসময় বসন্তকাল উপস্থিত হ'ল দেশে। তখন রাজা দশরথ ঋষ্যশৃঙ্গকে প্রণাম ক'রে যজ্ঞের প্রধান যাজকরূপে বরণ করলেন এবং বশিষ্ঠ বামদেব প্রভৃতি ঋত্বিক ব্রাহ্মণদেরও যজ্ঞের সংকল্প জানালেন। তাঁরা সকলে দশরথকে সাধুবাদ দিলেন এবং সরযূর উত্তর তীরে যজ্ঞভূমি নির্মাণ করে যজ্ঞের অশ্বকে বন্ধনমুক্ত করতে বললেন। দশরথ বিরাট সৈন্যবাহিনী সেই অশ্বের সঙ্গে পাঠালেন। আর অমাত্যদের যথাবিধি সমস্ত আয়োজন করবার ভার দিলেন। এক বছর ধরে চলল এই আয়োজন।
   যথাসময় বছর ঘুরে পরবর্তী বসন্তকাল এসে গেল। তখন দশরথ মহর্ষি বশিষ্ঠকে বললেন, "গুরুদেব, আপনি যথাবিধি আমার যজ্ঞ সম্পাদন করুন। যাতে যজ্ঞের কোনও অঙ্গে বিঘ্ন না হয় তার বিধান করুন।"
   রাজাকে আশ্বস্ত করে বশিষ্ঠ স্থপতি, শিল্পকার, সূত্রধর, খনক, গণক, নট, নর্তক এবং শুদ্ধস্বভাব শাস্ত্রজ্ঞ পণ্ডিতগণকে ডেকে আনিয়ে রাজার আজ্ঞানুসারে  
সব ব্যবস্থা করলেন এবং পৃথিবীতে যত ধার্মিক রাজা আছেন তাঁদের নিমন্ত্রণ পাঠালেন। যথাসময়ে শুভনক্ষত্রযুক্ত দিনে রাজা দশরথ যজ্ঞভূমিতে গেলেন এবং পত্নীগণসহ যজ্ঞে দীক্ষিত হলেন।
   ইতিমধ্যে যে যজ্ঞাশ্ব এক বছর আগে ছাড়া হয়েছিল তা সমগ্র আর্যাবর্ত ঘুরে ফিরে এল। এবার বশিষ্ঠসহ দ্বিজগণ ঋষ্যশৃঙ্গকে সামনে রেখে শাস্ত্রানুসারে যজ্ঞ আরম্ভ করলেন। দেবতাদের উদ্দেশে যে সকল পশুপক্ষী অশ্ব ও জলচর সংগৃহীত ছিল সে সমস্তই ঋষিগণ যথাবিধি বধ করলেন। যুপকাঠে তিনশো পশু এবং রাজা দশরথের অশ্বমেধের উৎকৃষ্ট অশ্ব বাঁধা ছিল। কৌশল্যা সেই অশ্বের সম্যক পরিচর্যা ক'রে  তিন খড়গাঘাতে তাকে বধ করলেন। তার পর তিনি ধর্মকামনায় সুস্থিরচিত্তে সেই নিহত অশ্বের সঙ্গে এক রাত যাপন করলেন। কৈকেয়ী এবং সুমিত্রা সঙ্গে রইলেন।
শ্রৌতকর্মে নিপুণ ঋত্বিক সেই অশ্বের শব নিয়ে যথাশাস্ত্র হোম করলেন। ষোল জন ঋত্বিক অশ্বের সমস্ত অঙ্গ অগ্নিতে আহুতি দিলেন। যজ্ঞ শেষ হল যথাসময়ে। তারপর দশরথ যাজক ও অন্যান্য ব্রাহ্মণদের প্রচুর দক্ষিণা দিলেন। সকলেই হৃষ্ট মনে রাজাকে আশীর্বাদ করতে লাগলেন। এরপর ঋষ্যশৃঙ্গ অথর্বোক্ত মন্ত্রে যথাবিধি পুত্রেষ্টি যজ্ঞ আরম্ভ করলেন।
   যে সময়ে রাজা দশরথ এই যজ্ঞ করছিলেন তখন দেবলোকে চলছিল ত্রিভুবন রক্ষার প্রচেষ্টা। এই সময়ে লঙ্কার রাজা রাবণের অত্যাচারে ত্রিভুবন ছিল কম্পিত। তাই দেবতারা তখন ব্রহ্মার কাছে গিয়ে বললেন, "ভগবান, রাক্ষসরাজ রাবণ আপনার বরে বলীয়ান হয়ে আমাদের পীড়ন করছে, তার বিনাশের উপায় স্থির করুন।"
    উত্তরে ব্রহ্মা বললেন, "রাবণ আমার কাছে বর চেয়েছিল যে গন্ধর্ব যক্ষ দেব দৈত্য নাগ গরুড় ও রাক্ষসের হাতে যেন তার মৃত্যু না হয়। আমিও তাকে সেই বর দিয়েছি। সে অবজ্ঞাবশে মানুষের নাম করে নি। তাই  সেই মানুষরূপে ভগবান বিষ্ণুই তাকে বধ করবেন।"
   অতঃপর দেবতারা বিষ্ণুর স্মরণ নেন। তখন শঙ্খচক্রগদাপদ্মধারী গরুড়বাহন বিষ্ণু সেখানে আবির্ভূত হন। দেবগণ স্তব করে তাঁকে বলেন, " প্রভু, ত্রিভুবনের হিতকামনায় আমাদের একটি প্রার্থনা আপনার কাছে আছে। বর্তমানে অযোধ্যাপতি দশরথ পূত্রেষ্টি যজ্ঞ করছেন। তাঁর  তিন মহিষী আছেন। আপনি কৃপা করে চার অংশে বিভক্ত হয়ে সেই তিন মহিষীর গর্ভে জন্মগ্রহণ করুন এবং মানুষ রূপে অবতীর্ণ হয়ে দেবতাদের অবধ্য দুরাচারী রাবণকে বধ করুন। সেই রাক্ষস আমাদের সকলের উপর অকথ্য অত্যাচার করছে। তাই তার নিধনের জন্য আমরা আপনার শরণাপন্ন হয়েছি।"
  বিষ্ণু তখন তাঁদের অভয় দিয়ে বললেন, "তোমরা ভীত হয়ো না। আমি রাবণকে অবশ্যই সবংশে সংহার করব।"
  অন্যদিকে তখন ঋষ্যশৃঙ্গের উপদেশ অনুসারে দশরথ যজ্ঞ করছিলেন। যথাসময় যজ্ঞাগ্নি থেকে আবির্ভূত হলেন কৃষ্ণকায়, রক্তাম্বরধারী,  শুভলক্ষণসম্পন্ন, দিব্য আভরণে ভূষিত এক বিরাট মূর্তি। তাঁর হাতে ছিল তপ্তকাঞ্চনগঠিত রজতাবরণযুক্ত দিব্য পায়সে পরিপূর্ণ এক বিরাট পাত্র।
যজ্ঞাগ্নি থেকে উত্থিত ব্যক্তি রাজা দশরথকে বললেন, "আমি প্রজাপতিপ্রেরিত পুরুষ। মহারাজ, এই দেবনির্মিত সন্তানদায়ক পায়স আপনার পত্নীদের খেতে দিন।"
  দশরথ সেই পাত্র মাথায় ঠেকিয়ে গ্রহণ করলেন এবং অন্তঃপুরে এসে পায়সের অর্ধাংশ কৌশল্যাকে দিলেন। অবশিষ্ট অর্ধেকের অর্ধাংশ সুমিত্রাকে দিলেন। অবশিষ্টের অর্ধ কৈকেয়ীকে দিয়ে মনে মনে বিবেচনার পর শেষ অংশ আবার সুমিত্রাকেই দিলেন। অর্থাৎ ১৬ ভাগের ৮ ভাগ কৌশল্যা, ৬ ভাগ সুমিত্রা, এবং ২ ভাগ কৈকেয়ী পেলেন। তিন রানী সেই পায়স খেয়ে অচিরে গর্ভধারণ করলেন।
  অশ্বমেধ যজ্ঞ শেষ হবার পর নিমন্ত্রিত রাজারা, অন্যান্য অতিথিরা এবং সপত্নীক ঋষ্যশৃঙ্গ নিজ নিজ দেশে ফিরে গেলেন। এর বারো মাস পূর্ণ হবার পর মহারানী কৌশল্যা চৈত্রের নবমী তিথিতে পুনর্বসু নক্ষত্রে শ্রীরামকে প্রসব করলেন। তারপর রানী কৈকেয়ী পুষ্যা নক্ষত্রে ভরতকে এবং রানী সুমিত্রা অশ্লেষা নক্ষত্রে লক্ষণ-শত্রুঘ্নকে প্রসব করলেন।  অযোধ্যায় নানাপ্রকার উৎসব আরম্ভ হ'ল। জন্মের এগার দিন পরে বশিষ্ঠ রাজকুমারদের নামকরণ করলেন।
   সময়ের সাথে সাথে রাজকুমারদের সকলেই বড় হয়ে উঠলেন। তাঁরা সকলেই  হয় উঠলেন মহাবীর, লোকহিতে রত, জ্ঞানবান ও গুণবান। তেজস্বী পরাক্রমশালী শ্রীরাম নির্মল শশাঙ্কের মত সকলের প্রাণপ্রিয় ছিলেন। তিনি হাতি ঘোড়া ও রথ চালনায় যেমন পটু ছিলেন তেমনিই ছিলেন ধনুর্বিদ্যায়  পারদর্শী। আর পিতার সেবা শুশ্রুষায়  ছিল তাঁর অসীম অনুরাগ।
    লক্ষ্মণ  ছোটবেলা থেকেই সবসময় শ্রীরামের ছায়ার মত থাকতেন এবং তিনি শ্রীরামের দ্বিতীয় প্রাণতুল্য ছিলেন। ভরত শত্রুঘ্নর মধ্যেও সেইরকম স্নেহের ও প্রীতির সম্বন্ধ গড়ে উঠল।
     অর্থাৎ দেখা যাচ্ছে যে রাবণ বধের জন্যেই শ্রীরামচন্দ্রের আবির্ভাব হয়েছিল ধরাধামে। আর বিভিন্ন রামায়ণের সংস্করণে রাম রাবনের যুদ্ধকে আর্য অনার্যের সংগ্রাম বলে মনে করা হয়। একটি জনপ্রিয় তত্ত্ব আছে যে আর্য শব্দটি ফর্সা-বর্ণের লোকদের একটি জাতিকে বোঝায় যারা ইউরোপের তৃণভূমি থেকে ভারতীয় উপদ্বীপে এসেছিল।  তারা বৈদিক সংস্কৃতি নিয়ে এসেছেন এই দেশে এবং তাঁদের মাধ্যমেই সরস্বতী-সিন্ধু সভ্যতার আদি বাসিন্দা দ্রাবিড়দের বাস্তুচ্যুত হতে হয়েছে। এটি আর্য অভিবাসন তত্ত্ব নামে পরিচিত।  তাই অনেক গবেষকের মতে রাম এবং রাবণের যুদ্ধ ধর্মের চেয়ে আর্য এবং দ্রাবিড়দের মধ্যে জাতিগত দ্বন্দ্বের সাথে অধিক সম্পর্কযুক্ত।
  তবে, রামায়ণে আর্য-দ্রাবিড় দ্বন্দ্ব আরোপিত হলেও এই মহাকাব্যে আর্য এবং অনার্য শব্দগুলি কীভাবে ব্যবহৃত হয়েছে তা লক্ষ্য করার মতো।
এই দুটি শব্দই রামায়ণে একাধিকবার এসেছে। আর্য শব্দটি ধারাবাহিকভাবে ভদ্র মানুষজনের  গুণ বোঝাতে ব্যবহৃত হয়েছে - এ হল এমন একটি আচরণ যা সভ্য মানুষদের কাছে প্রত্যাশিত।
    অনেকেই বলেন যে এই আর্যরা কেবল নিজেদের সভ্য বলে মনে করত এবং তাই এই গুণটিকে তাদের নিজস্ব জাতির সমার্থক বলে মনে করত।  যদি আমরা যুক্তির এই লাইনটি মেনে নিই, তাহলে বোঝা যাবে যে ত্রেতা যুগে ভারতীয় উপদ্বীপের উত্তর থেকে দক্ষিণে সুর্যবংশ, রাবণের রাক্ষস বংশ এবং সেই সাথে বানর উপজাতির সবাই ছিল আর্য। সবাই ইতিবাচকভাবে একই জাতির অন্তর্গত। এর স্বপক্ষে একাধিক প্রমাণ মেলে।        প্রথমত, রাজা দশরথ রামের নির্বাসন চাওয়ার জন্য নিজের রানী কৈকেয়ীকে অনার্য বলেন।  
    দ্বিতীয়ত জনস্থানে মারীচের কণ্ঠে  " হায় লক্ষ্মণ" শুনেও শ্রীরামের সাহায্য করার জন্য ছুটে না আসার জন্য সীতা স্বয়ং তাঁর দেওর লক্ষ্মণকে অনার্য বলেন।
     তৃতীয়ত, রাবণ এবং ইন্দ্রজিৎ রামের পক্ষে চলে যাওয়ার জন্য বিভীষণকে অনার্য বলেন।
    চতুর্থত, রাবণ যুদ্ধে শ্রীরামের শরাঘাতে অচেতন হয়ে পড়লে তার সারথি যখন তাঁকে যুদ্ধক্ষেত্র থেকে নিয়ে পালিয়ে যান তখন রাবন কাপুরুষতা দেখানোর জন্যে সারথীকে অনার্য বলেন।
  পঞ্চমত, সীতা দেবী হনুমানকে রাক্ষসীদের হত্যা না করার জন্য অনুরোধ করেন কারণ তারা কেবল রাবণের আদেশ পালন করছিল।  এদের মত আজ্ঞাবাহীদের হত্যা কোন আর্যদের কাছ থেকে প্রত্যাশিত নয়। 
   এছাড়া রামায়ণ পড়লে আমরা দেখব যে মন্দোদরী এবং রাবণের অন্যান্য স্ত্রীরা তথা রাক্ষসবাহিনীর সেনাপতিরাও রাবণকে আর্য এবং আর্যপুত্র  বলে উল্লেখ করেছেন। বানরদের রানী তারা তাঁর স্বামী বালীকে  আর্য সম্বোধন করেছেন। অর্থাৎ রামায়ণ অনুসারে আর্য কোন ভদ্রলোকের বিশেষণ বোঝাতে   ব্যবহৃত হয়েছে এবং অনার্য কোন অসভ্য, প্রতারক, ভীরু ব্যক্তিকে বোঝাতে ব্যবহৃত হয়েছে।
  এছাড়া অযোধ্যায় যেমন বৈদিক মত অনুসারে যজ্ঞ করতে দশরথ ও শ্রীরামকে দেখা গেছে তেমনি লঙ্কায় রাবণ, ইন্দ্রজিতকেও দেখা গেছে বৈদিক মন্ত্র অনুসারে যজ্ঞ করতে। তাই রামায়ণের যুগে এই রাম রাবনের যুদ্ধ কোন আর্য অনার্যের যুদ্ধ নয়। এটি ছিল শুভ শক্তি ও অশুভ শক্তির মধ্যে যুদ্ধ। আর এরা সকলেই নিজেদের আর্য মানতেন।
   যাহোক আবার কাহিনীতে ফেরা যাক।  যথাসময়ে রাজা দশরথের চার পুত্র বড় হয়ে উঠলেন সানন্দে। তবে শ্রীরামচন্দ্র ষোলো বছরে পদার্পণ করার আগেই তাঁর জীবনে এল এক নতুন অভিযানের সুযোগ। 
                       (ক্রমশ)

লেখকের website -  https://www.tarashisgangopadhyay.in/


  #বাল্মিকী #রামায়ণ #valmiki #ramayana #rama #sita #ravan #আধ্যাত্মিক #devotion #epic #মহাকাব্য

Monday, 18 March 2024

সত্যের আলোয় বাল্মীকি রামায়ণ - তারাশিস গঙ্গোপাধ্যায়। এক - শ্রীরামের জন্মের আগে রামায়ণ রচনা হয়নি আর প্রচলিত মত অনুযায়ী বাল্মীকিও কোন দস্যু রত্নাকর ছিলেন না।

সত্যের আলোয় বাল্মীকি রামায়ণ
     - তারাশিস গঙ্গোপাধ্যায়।

লেখকের website -  https://www.tarashisgangopadhyay.in/


         বালকান্ড 

এক - (সর্গ ১-৪)  - শ্রীরামের জন্মের আগে রামায়ণ রচনা হয়নি আর প্র চলিত মত অনুযায়ী বাল্মীকিও কোন দস্যু রত্নাকর ছিলেন না।

 *                *                 *

 মহাকবি বাল্মীকির রামায়ণ রচনার সূত্রপাত হয় তমসা নদীর তীরের একটি তপোবনের আশ্রমে। সেখানেই ঋষি বাল্মীকি তাঁর শিষ্যদের নিয়ে থাকতেন। এই তপোবনে একদিন দেবর্ষি নারদ দেখা করতে এলেন ঋষির সঙ্গে। সেইসময় দুজনের মধ্যে নানা বিষয়ে  বার্তালাপ হয়। কথাপ্রসঙ্গে ঋষি বাল্মীকি তখন ত্রেতা যুগের শ্রেষ্ঠতম রাজার নাম জানতে চাইছিলেন যাঁর মধ্যে কাম্য ষোলটি কলা সম্পূর্ণভাবে রয়েছে।  তাই তিনি দেবর্ষির কাছে জানতে চাইলেন, "সমসাময়িক সময়ে  গুণ, বীরত্ব, ধর্ম, কৃতজ্ঞতা, দৃঢ়তা এবং দৃঢ় সংকল্পে সমৃদ্ধ এমন কোন পণ্ডিত, যোগ্য এবং  সুদর্শন
পুরুষ কি আছেন যিনি অনবদ্য চরিত্রের অধিকারী এবং চিরকাল সকল প্রাণীর কল্যাণে নিবেদিত? এমন কেউ কি আছেন এই সময়ে
যিনি সকল প্রকার পরিস্থিতিতে সংযম বজায় রাখেন, নিজের ক্রোধের উপর বিজয়লাভ করেছেন, যাঁর মনে কোন হিংসা নেই   এবং যখন তিনি রাগান্বিত হন, স্বর্গের দেবতারাও ভয় পেয়ে যান?"
    নারদ তৎক্ষণাৎ উত্তর দিলেন, "বর্তমানে এমন একজন ব্যক্তিই আছেন যাঁকে আমরা জানি, যিনি সত্যিই আপনার বর্ণনার মতই মহান।  তিনি হলেন অযোধ্যার রাজা শ্রীরামচন্দ্র। ইক্ষ্বাকু  বংশে জন্মগ্রহণ করেছেন তিনি।"
    রামায়ণ রচনার আগে ঋষি বাল্মীকির এই প্রশ্ন প্রমাণ করে যে শ্রীরামের জন্মের আগে তিনি রামায়ণ লেখেন নি। তিনি ছিলেন শ্রীরামের সমসাময়িক। আর সেইসময়কার রাজা শ্রীরামের  কথা প্রথম তিনি শোনেন দেবর্ষি নারদের কাছে। তাই শ্রীরামের জন্মের আগে রামায়ণ রচনার প্রবাদ সম্পূর্ণ কাল্পনিক।
    অতঃপর দেবর্ষি নারদ শ্রীরামের জীবনকাহিনী সংক্ষেপে বর্ণনা করলেন বাল্মীকির কাছে - তাঁর জীবনে অপ্রত্যাশিত বনবাস, বনে প্রায় চৌদ্দ বছর যাপন, পরাক্রমী রাক্ষস রাজা রাবণের দ্বারা তাঁর স্ত্রী সীতার অপহরণ, রামের পত্নীবিরহের শোক, বানরদের সাথে তাঁর বন্ধুত্ব, সমুদ্রের উপর সেতু নির্মাণ, রাবন বধ, লঙ্কা জয় এবং অবশেষে অযোধ্যায় ফিরে সিংহাসনে রাজ্যাভিষেক। সবই নারদ খুলে বলেন তাঁকে।  
   নারদ চলে যাওয়ার পর, ঋষি স্নানের জন্য তমসার তীরে গেলেন।  সেখানে তাঁর চোখে পড়ল -  একজোড়া ক্রৌঞ্চ পাখি একে অপরের সাথে মিলনের আনন্দে পূর্ণ হয়ে রয়েছে।

 হঠাৎ একজন শিকারী সেখানে এসে উপস্থিত হয় এবং আড়াল থেকে তীর নিক্ষেপ করে পুরুষ ক্রৌঞ্চটির উপরে। ক্রৌঞ্চ নিহত হয়ে রক্তাক্ত দেহে মাটিতে পড়ে ছটফট করতে থাকে আর তাই দেখে তার স্ত্রী ক্রৌঞ্চী প্রবল বিরহে করুণস্বরে আকুলভাবে কাঁদতে লাগল। ঋষি বাল্মিকি শিকারীর এই নিষ্ঠুর কাজ দেখে গভীরভাবে ব্যথিত হন। দুটি পাখির মিলনক্ষণ এভাবে যন্ত্রণায় ভরিয়ে দেয়ার জন্যে এবং নারী  ক্রৌঞ্চটিকে এমনভাবে বিরহযন্ত্রণায় নিমজ্জিত করার জন্য তিনি প্রবল ক্রোধে শিকারীকে অভিশাপ দেন, "ওহে শিকারী, মাংসের লোভে মোহিত হয়ে তুমি যেভাবে ক্রৌঞ্চ দম্পতির একটিকে মেরে দ্বিতীয়টিকেও প্রবল যন্ত্রণায় বিদ্ধ করেছ, তাতে আমি বলছি - তুমিও জীবনে কখনো সুখ পাবে না। আজীবন মানসিক শান্তি থেকে বঞ্চিত হবে তুমি।"
    কিন্তু এই অভিশাপ বাক্য উচ্চারণ করেই বাল্মীকির মনে জাগল এক অন্য ভাব - তিনি নিজের অভিশাপের  শ্লোকটির গঠন স্মরণ করে  বিস্মিত হয়ে গেলেন। তাঁর মনের ভাব তিনি ব্যক্ত করলেন তাঁর এক শিষ্য ভরদ্বাজের কাছে। এই শ্লোকটি তাঁর সামনে উপস্থাপন করে বললেন, "এই অভিশাপ দিতে গিয়ে আমি যে শব্দগুলি উচ্চারণ করেছি তা অদ্ভুতভাবে চারটি অংশের একটি কাব্যিক ছন্দে আপনা থেকেই রচিত হয়ে গেছে। এই যে চরণবদ্ধ সমান অক্ষর বিশিষ্ট তন্ত্রীলয়ে গানের যোগ্য বাক্য আমার শোকাবেগে উৎপন্ন হয়েছে তা নিশ্চয়  একসময়  শ্লোক নামে খ্যাত হবে।"    
শিষ্য ভরদ্বাজ সানন্দে সেই শ্লোকটি মনের মাঝে গেঁথে নিলেন।

 ঋষি বাল্মীকির উচ্চারিত মূল সংস্কৃত ছন্দটি ছিল -

মা নিষাদ প্রতিষ্ঠাং ত্বমগমঃ শাশ্বতীঃ সমাঃ। 

যৎ ক্রৌঞ্চমিথুনাদেকমবধীঃ কামমোহিতম্ ॥

 এই ঘটনার পর ঋষি বাল্মীকি নিজের আশ্রমে ফিরে আসেন। তাঁর মন তখন তাঁর প্রত্যক্ষ করা দুঃখজনক ঘটনা এবং তাঁর উচ্চারিত শ্লোকটি নিয়েই চিন্তামগ্ন ছিল। সম্ভবত তাঁকে আশ্বস্ত করতে স্বয়ং সৃষ্টিকর্তা ব্রহ্মা তাঁর সামনে আবির্ভূত হলেন।  

তিনি বাল্মীকিকে বললেন, 'তুমি যা রচনা করেছেন তা আসলে একটি শ্লোক। এই শ্লোকের ছন্দ হল অনুষ্টুপ যা খুবই সহজে সঙ্গীত পরিবেশনের জন্য ব্যবহার করা যায়।  অনুষ্টুপ ছন্দ এরকমই বত্রিশটি অক্ষর নিয়ে গঠিত। আমার ইচ্ছাতেই এই শ্লোক ছন্দে রচিত হয়েছে তোমার মাধ্যমে। কারণ আমি চাই তোমার মাধ্যমে রচিত হোক শ্রীরামের উপর এক মহাকাব্য। তুমি নারদের থেকে  শ্রীরামের যে জীবনচরিত শুনেছ সেই ঘটনাবলী সাজিয়ে একটি মহাকাব্য রচনা কর এরকম শ্লোকের মাধ্যমে। তুমি  জগতের কাছে  শ্রীরামের মহিমান্বিত জীবনচরিত প্রকাশ কর।  যা এখন অবধি শ্রীরাম বিষয়ে তোমার অবিদিত আছে সে সমস্তও তোমার তোমার বিদিত হবে। তোমার এই রচনায় কোনও বাক্য মিথ্যা হবে না। আর যত কাল ভূতলে গিরি নদী সকল অবস্থান করবে তত কাল রামায়ণকথা লোকসমাজে প্রচারিত থাকবে। আর যত কাল তোমার রচিত রামের আখ্যান পৃথিবীতে প্রচারিত থাকবে তত কাল তুমিও আমার জগতের উর্ধ্ব ও অধোলোকে বাস করবে। 
  এই দৈব আদেশের পর ঋষি বাল্মীকি দৃঢ় সংকল্প নেন  রামায়ণ রচনার জন্যে।

 কিন্তু সংকল্প নিলেই তো হল না। আগে যে সম্যকভাবে জানতে হবে শ্রীরামের জীবনচরিত। অতএব এবার ঋষি বাল্মীকি শ্রীরামের মহাজীবনের বিস্তারিত বিবরণ জানতে গভীর ধ্যানে বসেন। আপন যোগশক্তির বলে ধ্যানের মাধ্যমে তিনি শ্রীরামের জীবনের ঘটনাগুলিকে নিজের চোখের সামনে দেখতে থাকেন, ঘটনাপ্রবাহ ঠিক যেমনটি ঘটেছিল। আর তারপর শুরু হয় তাঁর রামায়ণ রচনা।
এইভাবে বাল্মীকির হাত দিয়ে রামায়ণ রচিত হয়েছিল। এই রামায়ণ হল ভারতবর্ষের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ইতিহাস। ত্রেতাযুগের সেই ফেলে আসা সময়ের পূর্ণাঙ্গ চিত্র উঠে এসেছে এই ইতিহাসের মাধ্যমে। বাল্মীকি ঋষি এই ইতিহাস চব্বিশ হাজার শ্লোক, পাঁচশ সর্গ রচনা করেন ছয় কাণ্ডে।
    ইতিহাস রচনার পর ঋষি বাল্মীকির প্রয়োজন ছিল এমন কোন সঠিক শিষ্যকে নির্বাচন করা যিনি মহাকাব্যটি স্থানীয় নগর গ্রামের শ্রোতাদের কাছে সুন্দরভাবে উপস্থাপন করতে পারেন।  তিনি যখন এই কথা ভাবছিলেন, তখন তাঁর দুই শিষ্য লব ও কুশ তাঁর সঙ্গে দেখা করতে আসেন।  এই অল্পবয়সী ছেলেদুটি ছিল প্রখর বুদ্ধিমান, গুণী, বেদে পারঙ্গম এবং সঙ্গীতে পারদর্শী। 
   বাল্মীকি যখন দুই ভাইকে শেখাতে লাগলেন তখন তিনি দেখলেন - তাঁরা পাঠে ও গানে  দ্রুত মধ্য ও বিলম্বিত এই তিন মানে এবং ষড়জ ঋষভ প্রভৃতি সপ্ত স্বরে বীণাদি তন্ত্রীবাদ্যের সমলয়ে বড় সুন্দরভাবে এই কাব্য গাইতে লাগলেন। তিনি দেখলেন - এই দুই ভাই গান্ধর্ব বিদ্যা এবং স্বরের উচ্চারণস্থান ও মূর্ছনায় অভিজ্ঞ। তাদের কণ্ঠস্বর সুমধুর। তাঁরা গন্ধর্বদের মতই সুন্দর এবং রূপলক্ষণসম্পন্ন। 
বাল্মীকির তখন দুইজনকে দেখে মনে হয় -  পৃথিবীতে বিষ্ণুর প্রতিচ্ছবি যেমন শ্রীরাম তেমনিই লব এবং কুশ দুজনেই যেন স্বয়ং শ্রীরামের প্রতিবিম্বের মত। তাই রামায়ণ মানুষের কাছে পৌঁছে দেয়ার ধারক ও বাহক রূপে এই দুই শিষ্য তাঁকে যথাযথ সহায়তা করবে।
   অতএব ঋষি বাল্মীকি এরপর লব ও কুশকে তাঁর লেখা রামায়ণ মুখস্থ করান।  দুজনেই মহাকাব্যটিকে সম্পূর্ণ গভীরতায় আত্মস্থ করে নেয় এবং তারপর তারা দিকে দিকে এই রামায়ণ গান ছড়িয়ে দিতে থাকে। অন্তরের আবেগ দিয়ে তারা  অযোধ্যার শহর ও গ্রামের অধিবাসীদের কাছে শ্রীরামের জীবন আলেখ্য তুলে ধরতে থাকে এই রামায়ণ গানের মাধ্যমে।
    এইসময় একদিন ঋষি বাল্মীকি শুনলেন যে শ্রীরামচন্দ্র অশ্বমেধ যজ্ঞ করতে চলেছেন। সেই  যজ্ঞতে অংশগ্রহন করতে দুর দূরান্ত থেকে অযোধ্যায়  অতিথিরা আসছিলেন।  ঋষি বাল্মীকিও লব কুশ সহ তাঁর অন্য শিষ্যদের  সঙ্গে নিয়ে গিয়েছিলেন অযোধ্যায়।  সেইসময় একদিন লব ও কুশ  অযোধ্যার পথে পথে যখন রামায়ণ গান গেয়ে শোনাচ্ছিল তখন শ্রীরাম প্রাসাদের অলিন্দ থেকে তাদের দেখতে পান।  তিনিই লব ও কুশকে এই রামায়ণ গান গাইতে তার প্রাসাদে আমন্ত্রণ জানান। যথাসময়ে
 লব ও কুশ শ্রীরামের সামনে এসে গাইতে শুরু করেন তাঁর জীবন আলেখ্য রামায়ণ।

লব ও কুশের রামায়ণ গান সেদিন যেমন অযোধ্যার রাজদরবারে জাগিয়েছিল আনন্দের স্পন্দন, আজও এই রামায়ণ গান একইভাবে আনন্দের স্পন্দন জাগায় যেখানেই তা অনুষ্টুপ ছন্দের সুরে গাওয়া হয়। ঋষি বাল্মীকি বলেছেন যে এই মহাকাব্যটির গান শুনলেই শ্রোতারা পুণ্য লাভ করে কারণ রামায়ণ কেবল শ্রীরাম, লক্ষ্মণ, সীতার  জীবনী সম্বলিত একটি মহাকাব্য নয়, এই  মহাগ্রন্থ পাঠ জীবনকে উদ্দীপিত করে বেদের জ্ঞান ও বেদান্তের শিক্ষায়, মানুষকে দেখায় আলোর দিশায় চলার পথ।

 রামায়ণ সম্পর্কে বলা হয়েছে:

 "कामार्थगुणसंयुक्तं धर्मार्थगुणविस्तरम् |

 समुद्रमिव रत्नाढ्यं सर्वश्रुतिमनोहरम् ||"
  
এইভাবে শুরু হয়েছে বাল্মীকির রামায়ণ। এই মূল রামায়ণে ঋষি বাল্মীকি সম্পর্কে খুব কম তথ্য পাওয়া যায়। এখানে শুধু বলা হয়েছে যে তিনি একজন বিখ্যাত ঋষি এবং যোগী, যিনি তমসা নদীর তীরে একটি আশ্রমে থেকে সাধনা করতেন এবং শিষ্যদের পাঠ দিতেন।   বনবাসের সময়  শ্রীরাম, সীতা এবং লক্ষ্মণ চিত্রকূটে যাওয়ার আগে তাঁর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। 
      বাল্মীকি যে আগে দস্যু রত্নাকর ছিলেন এবং তাঁকে রাম নাম দেয়ার পর "মরা মরা" জপ করতেন এরকম কোন গল্প মূল রামায়ণে নেই। এগুলো সবই উত্তরকালে সংযোজিত হয়েছে। 
   শুধু রামায়ণের উত্তরকাণ্ডতে (এই উত্তরকাণ্ডও কিন্তু বাল্মীকি রচিত নয়। পরবর্তীকালের সংযোজন।)  রয়েছে - ঋষি বাল্মীকি নিজের পরিচয় দিতে গিয়ে  বলছেন যে তিনি প্রচেতার দশম পুত্র এবং বহু বছর ধরে তীব্র তপস্যা করে সিদ্ধিলাভ করেছেন৷

 আর স্কন্দপুরাণ অনুসারে জানা যায় - ঋষি বাল্মীকি  পূর্বজন্মে একজন শিকারী ছিলেন।  ঋষি শঙ্খের সাথে একটি সাক্ষাৎ তাঁর জীবনধারা বদলে দেয়।  ঋষি শঙ্খ তাঁকে কানে রামনাম  দিয়েছিলেন।  রামনামের নিয়মিত জপের ফলে পরবর্তী জন্মে তিনি ঋষি বাল্মীকির পুত্র রূপে জন্মগ্রহণ করেন আর  বাল্মীকির পুত্র হওয়ায় তিনিও বাল্মীকি নামে পরিচিত ছিলেন। স্কন্দপুরান মতে তিনিই রামায়ণ রচনা করেন। 
    অর্থাৎ দেখা যাচ্ছে যে বাল্মীকির সম্বন্ধে পরবর্তীকালে নানা মুনির নানা মত প্রকাশ পেয়েছে। তবে যেহেতু আমরা এখানে একনিষ্ঠভাবে এই লেখায় শুধুমাত্র বাল্মীকি রামায়ণ অনুসরণ করে রামায়ণকে জানব তাই অন্য সমস্ত পরবর্তীকালে সংযোজিত কাহিনী ত্যাগ করে বাল্মীকির মত অনুযায়ী বলব যে রামায়ণের রচয়িতা বাল্মীকি ছিলেন একজন মহান ঋষি যিনি তাঁর জীবদ্দশায় শ্রীরামের সাক্ষাৎ পেয়েছিলেন। আর শ্রীরামের জন্মের আগে তিনি রামায়ণ লেখেন নি। শ্রীরামের জীবদ্দশায় ঘটে যাওয়া কাহিনী নিয়েই তাঁর রামায়ণ রচনা। পরবর্তী অধ্যায়গুলিতে আমরা দেখব কিভাবে সত্যিকারের রামায়ণকে তুলে ধরা হয়েছিল জগতবাসীর সামনে আর পরবর্তীকালের নানা অবাস্তব সংযোজন কিভাবে জগৎবাসীর চোখে রামায়ণকে হেয় করেছে নানাভাবে।
        (ক্রমশ)
\
লেখকের website -  https://www.tarashisgangopadhyay.in/

#বাল্মিকী #রামায়ণ #valmiki #ramayana #rama #sita #ravan #আধ্যাত্মিক #devotion #epic #মহাকাব্য

Wednesday, 13 March 2024

" অপরের ব্যবহারে কেন দুঃখ পাও?"

" অপরের ব্যবহারে কেন দুঃখ পাও?" তারাশিস গঙ্গোপাধ্যায়

(অনন্তের জিজ্ঞাসা - ষষ্ঠ খন্ড।)
    - তারাশিস গঙ্গোপাধ্যায়।

প্রশ্ন - আমাদের জীবনে আশেপাশের মানুষদের খারাপ ব্যবহারের জন্যে প্রায়ই আমাদের দুঃখ পেতে হয়। এর থেকে উদ্ধারের পথ কি?

   তারাশিস গঙ্গোপাধ্যায় : কোন মানুষ যদি ভাবে যে তার দুঃখের কারণ অন্য কোন ব্যক্তি তবে তার পক্ষে জীবনে সুখ পাওয়া অসম্ভব। অপরের থেকে খারাপ ব্যবহার পাওয়ার কারণে কেউ যদি নিজেকে দুঃখী ভাবে তাহলে সেই দুঃখের থেকে পরিত্রাণের কোন পথ নেই। এর কারণ হল - প্রতিটি মানুষ নিজের কর্মফল ভোগ করে, সে এই জন্মের হোক বা পূর্ব জন্মের। সামনের মানুষটির থেকে পাওয়া খারাপ ব্যবহারও তার পূর্বের কর্মফলের জন্যেই হচ্ছে। তাই জীবনে যে অবস্থাই আসুক সেটা শান্তভাবে মেনে নিতে হয়। সেইসাথে তাকে বুঝতে হয় - মানুষ কখনোই তার আশেপাশের লোকজনদের স্বভাবের পরিবর্তন করতে পারে না। সেই শক্তি তার নেই। সে শুধু পারে নিজেকে পরিবর্তন করতে এবং পরিস্থিতির সঙ্গে মানিয়ে নিতে। সেটা করতে পারলেই অনেক খারাপ সময় পেরিয়ে যাওয়া যায়।

      প্রশ্ন - কিন্তু কোন অন্য মানুষ আমাদের দুঃখের কারণ কখন হয়? 

     তারাশিস গঙ্গোপাধ্যায় :  যখন আমরা অন্য কোন মানুষকে নিজের চেয়ে বেশী গুরুত্ব দিই তখনই যে আমরা আশা করি যে সামনের মানুষটিও আমাকে একইভাবে গুরুত্ব দেবে। আর সেটা না দিলেই আসে হতাশা। তখনই একমাত্র সামনের মানুষটির ব্যবহার দুঃখ আনে মনে। এর একমাত্র উপায় - এরকম মানুষদের গুরুত্ব দেয়া বন্ধ করতে হয় এবং তাদের ব্যবহারের যে পরিবর্তন হবে না সেটা ধরে নিয়েই নিস্পৃহভাবে তাদের সাথে সংযোগ করতে হয়। তাহলে আর তাদের ব্যবহারের জন্যে দুঃখ পেতে হয় না। জানবে অন্য কারোর কাছে কোন বিষয়ে আশা রাখলেই আসে দুঃখ। তাই আশা না রেখে নিস্পৃহ হয়ে থাকতে পারলে সামনের মানুষটির দুর্ব্যবহার সত্বেও দুঃখ পেতে হবে না।

লেখকের website -  https://www.tarashisgangopadhyay.in/

Sunday, 3 March 2024

প্রেম আর মোহ

 সাধারণ দৃষ্টিতে মানুষ মোহকেই প্রেম বলে ভেবে নেয়। কিন্তু প্রেম আর মোহ দুইয়ের মাঝে আকাশ পাতাল ফারাক। মোহ মানুষকে ভাঙে আর প্রেম মানুষকে গড়ে। এবার দেখা যাক দুইয়ের মাঝের পার্থক্য কি ধরা দিয়েছে তারাশিস গঙ্গোপাধ্যায়ের চোখে !

প্রেমের প্রথম বৈশিষ্ট্যই হল - প্রেম কখনো আঘাত দেয় না। প্রেম আঘাত দিতেই পারে না কারণ প্রেম নিজেকেই অপরের করে দেয়। আঘাত দেয় মোহ। কারণ মোহ প্রেমাস্পদকে নিজের করে পেতে এবং পেয়ে সুখ লাভ করতে চায়। সেটি না হলেই সে আঘাত হানে। আর এই আঘাত নিরাময় করে প্রেম।
প্রেম আপন পথে আপন ভাবে একলাই চলে। কিন্তু মোহ সঙ্গে আনে অনেক নেতিবাদী সঙ্গী। মোহ আনে মানসিক অশান্তি - আমি ওর জন্যে এই করেছি, ও আমার জন্যে করবে না কেন? পাওনা গন্ডার হিসেব নিয়ে মোহ ব্যস্ত থাকে। প্রেম কখনো নিজের দেয়া নেয়া নিয়ে ভাবে না। সে শুধু দিয়েই খুশী। নিজেকে উজাড় করে দিয়েই তার আনন্দ।
মোহ সঙ্গে আনে মিথ্যা - কারণ মোহাবিষ্ট নিজেকে সাজিয়ে গুছিয়ে প্রেমাস্পদের চোখে ভালো দেখাতে চায় এবং নিজের দোষ লুকিয়ে গুণটুকুই শুধু দেখায়। কিন্তু প্রেমের মধ্যে কোন বিকার নেই। প্রেম কিন্তু নিজে যেমনটি, তেমনটিই প্রেমাস্পদের সামনে তুলে ধরে ভালো মন্দ নির্বিশেষে।
মোহ আনে ঈর্ষা - প্রেমাস্পদকে কেউ ভালোবাসলে বা তার কাজে কেউ সাহায্য করলেই মোহের জাগে ঈর্ষা। আর এই সাহায্যকারী মানুষটিকে যেন তেন প্রকারে আটকাতে ব্যস্ত হয়ে পড়ে মোহ। কিন্তু প্রেম নিজে ভালোবেসে এবং প্রেমাস্পদকে ভালোবাসা দিয়েই খুশী - অন্যদের নিয়ে সে ভাবে না। ভালোবাসার মানুষটি ভালো থাকলেই সে নিজেও ভালো থাকে।
মোহ আনে একাকীত্ব। কারণ মোহাবিষ্ট মানুষ সবসময় ভাবে - সে যাকে ভালোবাসছে,অপর দিক থেকে যথেষ্ট ভালোবাসা আসছে না। যেহেতু সে নিজেকে নিয়ে ব্যস্ত থাকে তাই অপরের দিকটা বোঝার অবকাশ সে পায় না। ফলে তার মনে হয় - সে অবহেলিত, অত্যাচারিত। তাই সে ধীরে ধীরে একাকীত্বের গ্রাসে পরে যায়। তার চোখে সকলে খারাপ হয়ে যায়, অন্তত যারা তার প্রশংসা নিত্য না করে। কিন্তু যে প্রেমের পথের পথিক তার কোন একাকীত্ব নেই। সে তার প্রেমাস্পদর ভাব ও ভাবনাকে মনের মাঝে সঙ্গী হিসেবে নিয়েই খুশী থাকে।
এখন একবার ভেবে দেখুন তো - এই প্রেম আর মোহের মাঝে কাকে বেছে নেয়া উচিত?

লেখকের website -  https://www.tarashisgangopadhyay.in/

Thursday, 5 October 2023

মন ও মুখ - তারাশিস গঙ্গোপাধ্যায়

                       মন ও মুখ - তারাশিস গঙ্গোপাধ্যায়

আমাদের সমাজে মন আর মুখের সংঘাত বেশিরভাগের মধ্যেই দেখা যায়। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই দেখি - যে বলে - অত্যাচার করা খারাপ সেই করে বেশী অত্যাচার। যে বলে - মানুষের ভালো করা উচিত সেই মানুষের ক্ষতি করে বেশী। যে সবার সামনে চোখের জলে ভেসে বলে - আমার গুরু আমার ভগবান সেই হয় সবচেয়ে বড় গুরুদ্রোহী।
আমার মনে হয় - যে মানুষের মধ্যে যথার্থ জ্ঞান আছে যে কি করা উচিত ও কি উচিত নয় এবং যে একইসাথে জ্ঞানকে নিজের স্বার্থে কাজে লাগায় তার থেকেই এমন ব্যবহার পাওয়া যায়। এই স্ববিরোধী চরিত্রদের মূল বৈশিষ্ট হল - এরা ভীষণ মিথ্যা কথা বলে। জ্ঞান থাকার জন্যে যেকোনো মানুষকে এরা বোকা বানাতে পারে ও ঠকাতে পারে। তাই বহিরঙ্গ দেখে কাউকে বিচার করতে নেই। তবে তারাশিস গঙ্গোপাধ্যায় বলে এদের চেনার একটা উপায় আছে - এদের মধ্যে নিজেকে উত্তম রূপে দেখানোর একটা প্রবণতা থাকে আর সেজন্যে যারা বরেন্য তাদের নিন্দা করতে এরা পিছপা হয় না। আধ্যাত্মিক জগতেও এমন ব্যক্তি বড় কম নেই। তবে এদের থেকে সাবধান থাকা ভালো। কারণ যারা সৎ নয় তাদের মধ্যে শয়তান বিরাজ করে আর শয়তানকে এড়িয়ে যাওয়াই ভালো। তাতে শয়তানের প্রভাবে পড়তে হয় না।
মন ও মুখ যাদের এক তারাই পৃথিবীতে কোনো ভালো কাজ করে যেতে পারেন। কারণ মনের সাথে মুখের সেতুবন্ধ করে বিবেক। আর যেখানে মন আর মুখের সেতুবন্ধ করে বিবেক সেখানে মিথ্যের কোনো স্থান থাকে না আর যেখানে মিথ্যার প্রবেশ নিষেধ সেখানেই পাওয়া যায় সত্যিকারের মানুষকে। কিন্তু যেখানে মন আর মুখের মাঝে বিবেকের সেতুবন্ধ নেই,যে এক বলে আর অন্য কাজ করে সেই ব্যক্তিকে এড়িয়ে চলা সর্বতোভাবে প্রয়োজন। তবে সেক্ষেত্রেও পাপকে ঘৃণা করবেন,পাপীকে নয়। তাকে শোধরানোর উপায় থাকলে শোধরাবেন। আর সে শোধরানোর মত না হলে তাকে নিজের মত থাকতে দিন। সময় যখন অভিজ্ঞতা দিয়ে বোঝাবে তখন সে বুঝবে। তাই সময়ের হাতে তাকে সপে দিয়ে নিজেকে নিস্পৃহ রাখাই ভাল। কারণ সময়ের আগে কেউ তো শোধরায় না। সময় না হলে কি বেড়াল ছানার চোখ ফোটে? চোখ যতক্ষণ না ফুটবে ততক্ষণ সে জানবে কিভাবে আলো কি?
ভালো থাকবেন সবাই। জয় গোপাল।
- ইতি তারাশিস গঙ্গোপাধ্যায়।

লেখকের website -  https://www.tarashisgangopadhyay.in/

Tuesday, 21 April 2020

কিভাবে এড়াব জাগতিক আঘাত? প্রবচন - তারাশিস গঙ্গোপাধ্যায়





আমার সাম্প্রতিকতম প্রবচন সবার জন্য

লেখকের website -  https://www.tarashisgangopadhyay.in/